অমূল্য চোখ : অমূল্য দৃষ্টিশক্তি

শাকের জামিল

0
52

আল্লাহ আমাদের দুটো করে জৈব ক্যামেরা দিয়ে দিয়েছেন। এই ক্যামেরার লেন্স, ছবির রেজুলেশন, ছবির ডিটেইলিং, ফ্রেমিং, কালার গ্রেডিং মানুষের তৈরি কোটি টাকা দামের ক্যামেরার সাথে তুলনা করা যায় না। ছোট ছোট দুটো চোখ দিয়ে আমরা বিশাল পৃথিবীর সব কিছু দেখতে পাই। ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে গ্রহণ করা তথ্যগুলোর ৮০ শতাংশের বেশি তথ্য আমরা চোখ দিয়ে নিয়ে থাকি। জাগ্রত থাকা অবস্থায় সারাক্ষণ কাজ করে যায় চোখ। দৃষ্টিশক্তির গুরুত্ব আমরা বুঝি না। তাই চোখের ওপর নির্যাতন করি। চোখকে পুষ্টি দিয়ে যতœ করি না। এর ফলাফল দেখা যাচ্ছে; পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে চোখ। চশমার ওপর ভর করে চলতে হচ্ছে তাকে। এই অবস্থা যদি তোমাদের মত শিশু বয়স থেকেই শুরু হয় তাহলে সেটা অত্যন্ত দুঃখজনক। কিন্তু পরিসংখ্যান সেটাই বলছে।
ঢাকার জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের তথ্যমতে, প্রতি মাসে প্রায় ৪ হাজার শিশু চোখের সমস্যা নিয়ে ভর্তি হচ্ছে। তাদের মধ্যে ৭০ শতাংশের মায়োপিয়া বা ক্ষীণদৃষ্টির সমস্যা। তারা দূরের জিনিস দেখতে পাচ্ছে না। এই সমস্যাটি দিনে দিনে বেড়ে চলছে। এর পেছনের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ডিজিটাল স্ক্রিন টাইম। কম্পিউটার, ট্যাব বা মোবাইলের দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকার কারণে দৃষ্টিসীমা ছোট হয়ে আসছে। সেজন্য এই সমস্যার আরেকটি নাম দেয়া হয়েছে ‘কম্পিউটার ভিশন সিন্ড্রোম’। করোনার সময়ে অনলাইন ক্লাসের সুবাদে সবাইকে বাধ্য হয়ে মোবাইল নির্ভর হতে হয়েছে। আর যারা মোবাইল বা কম্পিউটার গেমে আসক্ত হয়ে পড়ছে তাদের জন্য গেম ছেড়ে ওঠাটা কঠিন হয়ে যায়। পরিণতিতে দৃষ্টিজনিত সমস্যায় পড়ছে তারা।
চোখের সামনে একটা চশমা নিয়ে ঘোরা খুব আনন্দের বস্তু নয়। অথবা কন্টাক্ট লেন্স পরে থাকতেও খুব আরাম লাগে এমন নয়। তাই চোখের যতœ নিতে হবে, দৃষ্টিশক্তি রক্ষা করতে হবে। কিভাবে করতে পারি আমরা?
চোখ পরিষ্কার রাখা :
চোখের ভেতরটা অর্থাৎ অক্ষিগোলক পরিষ্কার রাখার জন্য আল্লাহ স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা রেখেছেন। প্রতি ১০-১৫ সেকেন্ডের মধ্যে চোখের পাতা একবার করে অক্ষিগোলককে পরিষ্কার করে দিয়ে যায়। ল্যাক্রিমাল গø্যান্ড থেকে তরল নিঃসৃত হতে থাকে নির্দিষ্ট মাত্রায়, যাতে চোখ ভেজা থাকে। আর চোখের পাতা সহজে ওঠানামা করে মুছে দিয়ে যায়। যেহেতু রাতে ঘুমের সময় চোখের পাতা বন্ধ থাকে, তখন ভেতরের তরলগুলো জমে চোখের কোণে পিচুটি জমে যায়। সকালে ঘুম থেকে উঠে ভালোভাবে চোখ পরিষ্কার করতে হবে। তবে চোখ খোলা রেখে সজোরে পানির ঝাপটা দিবে না কিন্তু! তাহলে চোখ আহত হয়, চোখ লাল হয়ে যায়। চোখের পাতা বন্ধ রেখে পানির ঝাপটা দেবে। তারপর চোখ খুলে আলতোভাবে পানি দিয়ে চোখ পরিষ্কার করে নেবে। আঙুল দিয়ে চোখের কোণের পিচুটিগুলো বের করে নেবে। ভালোভাবে চোখ ধুয়ে নেবে। বাইরে থেকে বাসায় ফিরলে চোখ-মুখ ধুয়ে নেবে। দিনে কমপক্ষে ৫ বার চোখ ধোয়া উচিত।
চোখের ব্যায়াম :
পড়তে পড়তে বা কাজ করতে করতে মাঝে মধ্যে দুই হাতের তালু দিয়ে দুটো চোখ ঢেকে রাখবে কিছুক্ষণ। হাতের উষ্ণতায় চোখ দুটো একটু আরাম পাবে। আই বল বা চক্ষুগোলক ঘুরানোর কিছু ব্যায়াম আছে, সেগুলো করবে। স্বাভাবিকভাবে বসবে। দূরের দেয়ালে চোখ রাখবে। উপরে, ডানে, নিচে এবং বামে ৪টি পয়েন্ট ঠিক করবে, যে বরাবর তুমি দৃষ্টি দেবে। এরপর প্রথমে উপরে, তারপর ডানে তারপর নিচে আবার উপরে এভাবে ডান দিকের বৃত্তাকার পথ পূর্ণ করবে। আবার বাম বৃত্তাকার পথে প্রথমে উপরে, তারপর বামে তারপর নিচে আবার উপরে এভাবে দৃষ্টি ঘুরাবে। লেন্সের জন্য ব্যায়াম আছে। সেটি হলো তোমার সামনের কমপক্ষে ২০ ফুট দূরের একটি পয়েন্ট বা বস্তু ঠিক করবে। এরপর তোমার যে কোন আঙুল চোখের ১ হাত সামনে রাখবে। এবার প্রথমে আঙুলে দৃষ্টি রাখবে কিছু সময়, এরপর দূরের বস্তুটাতে দৃষ্টি দিবে আবার আঙুলে দৃষ্টি আনবে। এভাবে চলবে। এই ব্যায়ামগুলো তোমার চোখকে আরো শক্তিশালী করবে।
চোখের পুষ্টি :
ভিটামিন ‘এ’-এর অভাবে রাতকানা রোগ হয়, আমরা সবাই জানি। সুতরাং ভিটামিন ‘এ’ আছে এমন খাবার বেশি করে খেতে হবে। যেমন: গাজর, মিষ্টিকুমড়া, টমেটো, মিষ্টি আলু, কলিজা, ছোট মাছ, সবুজ শাকসব্জি ইত্যাদি। চোখের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ওমেগা থ্রি। সামুদ্রিক মাছে এটি পাওয়া যায়। চোখ ভালো রাখতে হলে পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। বিশেষ করে যারা কম্পিউটার এবং মোবাইলে সময় বেশি দেয় তাদের চোখে শুষ্কতা দেখা দেয়, তাদের বেশি পানি পান করতে হবে।
প্রকৃতির কাছে যাওয়া :
শহুরে জীবনে এখন আমাদের যাওয়ার জায়গা সীমাবদ্ধ। ঘর থেকে কোচিং, স্কুল এরপর আবার ঘরেই ফিরে আসা। চারপাশের উঁচু উঁচু বিল্ডিয়ের কারণে আমাদের দৃষ্টিও এখন দূরে যেতে পারে না, আটকে যায়। এর ফলে দৃষ্টিসীমা ছোট হয়ে আসতে থাকে। সেজন্য উন্মুক্ত প্রান্তরে যেতে হবে। সবুজ প্রকৃতি দেখতে হবে। যেখানে মাইলের পরে মাইল শুধু সবুজ আর সবুজ। সেখানে দৃষ্টি আটকাবে না, আনন্দের ¯্রােতে এগিয়ে যাবে।
দিনের আলো বেশি ব্যবহার করা :
প্রাকৃতিক আলো চোখের জন্য সবচেয়ে বেশি নিরাপদ। সেজন্য পড়াশুনা করার ক্ষেত্রে দিনের আলোতে করতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয়। এলইডি লাইটের আলোর ঝলকানি অনেকক্ষেত্রে বেশি হয়ে যায়। অধিক আলোর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে সেটিও চোখের জন্য ক্ষীণদৃষ্টি তৈরি করবে। যদি বাসার চারদিকে বিল্ডিং থাকার কারণে তোমাদের বাসায় সারাক্ষণ বৈদ্যুতিক বাতি জ¦ালিয়ে রাখতে হয় তাহলে সকাল এবং বিকেলে বাসার বাইরে খোলা জায়গায় খেলাধুলা বা ঘোরাফেরা করতে যাবে। এতে চোখে প্রাকৃতিক আলোর সমন্বয় তৈরি হবে।
ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে :
কম্পিউটার, মোবাইল বা ট্যাব ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্ক্রিনের ব্রাইটনেস খুব বেশি রাখা যাবে না, যাতে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। দীর্ঘক্ষণ ধরে তাকিয়ে থাকা যাবে না। বলা হয় প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার পর ২০ ফুট দূরে ২০ সেকেÐ তাকিয়ে
থাকতে হবে। এতে চোখের লেন্স স্বাভাবিক থাকে। এটিকে ২০-২০-২০ পদ্ধতি বলে। এসব স্ক্রিন চোখের সামনে থেকে যতটুকু দূরে রেখে ব্যবহার করলে যথেষ্ট মনে হয় ততটুকু দূরেই রাখা উচিত। যেসব স্ক্রিন/মনিটরের রেডিয়েশন বেশি সেগুলো পরিহার করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে তুমি কি চোখ কুঁচকে তাকাচ্ছো? তাহলে সাবধান! তুমি চোখের উপর নির্যাতন করছো। চোখ স্বাভাবিক রেখে তাকাতে হবে।
চোখের সমস্যা মনে হলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে :
চোখের সমস্যাকে অনেকেই প্রাথমিকভাবে কোনো গুরুত্ব দেয় না। ফলে সমস্যা বাড়তে থাকে। অথচ প্রাথমিকভাবে শণাক্ত হলে সেটি হয়তো সহজেই সমাধান করা যেত। সেজন্য যদি তোমার মনে হয় স্কুলে বোর্ডের লেখা পড়তে সমস্যা হচ্ছে অথবা চোখ প্রায়ই লাল হয়ে যাচ্ছে কিংবা মাথা- চোখ ব্যাথা হচ্ছে তাহলে দ্রæত বাবা মাকে জানিয়ে ডাক্তার দেখাবে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, আল্লাহর দেয়া অমূল্য সম্পদ আমাদের দৃষ্টিশক্তি। দৃষ্টিশক্তি হারানো মানে অর্ধেক কবরে চলে যাওয়া। চোখ যদি সমস্যা করে তাহলে কোনো কাজই ঠিকমতো করা যায় না। তাই চোখকে ভালোবাসতে হবে, চোখের যতœ নিতে হবে।