স্বপ্নের ফুলকুঁড়ি স্মৃতিময় ফুলকুঁড়ি (প্রথম পর্ব)

জয়নুল আবেদীন আজাদ

0
49
ফুলকুঁড়ি পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মাসুদ আলী, ইঞ্জিনিয়ার আবুল ফয়েজ, সানা উল্লাহ নূরী, বর্তমান সম্পাদক জয়নুল আবেদীন আজাদ (ডান থেকে)। বক্তব্য রাখছেন ঢাকা ডাইজেস্ট সম্পাদক এম.এ.রশীদ চৌধুরী

॥ এক ॥

প্রিয় স্বদেশে আছে আমাদের অনেক প্রিয় বিষয়। তবে ছোট- বড় সবার প্রিয় বিষয়ের কথা উল্লেখ করতে হলে শিশুকিশোর সংগঠনের কথা বলতে হয়। বাংলাদেশের শিশুকিশোর সংগঠনের ইতিহাস খুবই সমৃদ্ধ। মুকুলফৌজ, কচিকাঁচার মেলা, খেলাঘর, ফুলকুঁড়ি আসর, বাংলাদেশের শিশুকিশোরদের মন জয় করেছে। তবে আজকে শিশুকিশোর সংগঠনের কথা বলবো না, বলবো একটি শিশুকিশোর পত্রিকার কথা- যে পত্রিকাটির সাথে আমি জড়িয়ে রয়েছি প্রায় ত্রিশটি বছর ধরে। ফুলকুঁড়ি আসরের সাথে আমি যখন জড়িত হই, তখন বয়সে ছিলাম তরুণ। ছাত্র ছিলাম বাংলাসাহিত্যের। শিশুসংগঠনের কাজগুলো এমনিতেই সৃষ্টিশীল, আর বাংলার ছাত্র হওয়ায় আমি ছিলাম সৃজনউন্মুখ। সৃজন কাজে চমৎকার উৎসাহ পেতাম তখনকার সংস্কৃতি উপদেষ্টা মাসুদ আলী ভাইয়ের কাছ থেকে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা বেশ কিছু সাহিত্য সংকলন বের করে ফেললাম। সৃজন চেতনায় আমরা চমৎকার কিছু গান এবং শ্লোগানও রচনা করলাম। তখন আমাদের দিনগুলো যেন দ্রুত ফুরিয়ে যেত, অথচ হাতে ছিল অনেক কাজ।

শিশুকিশোরদের জন্য কাজ করতে গিয়ে আমরা একটি পত্রিকার অভাব খুব করে অনুভব করলাম। নাওয়া-খাওয়ায় অনিয়ম করে অনেক খেটেখুটে একটি সংকলন হয়তো বের করা যায়, কিন্তু সেভাবে একটি মাসিক পত্রিকা বের করা যায় না। নিয়মিত পত্রিকা বের করতে হলে বড় অঙ্কের অর্থের যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন যোগ্য সম্পাদক, সহ-সম্পাদক ও প্রাণবন্ত এক কর্মীবাহিনীর। শিশুতোষ লেখাও এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নিয়মিত একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশনার কাজটি যে সহজ নয় তা বাংলা শিশুপত্রিকার ইতিহাসের দিকে নজর দিলেই উপলব্ধি করা যায়। চোখের সামনেই দেখলাম অনেক কষ্টে বের করা শিশুপত্রিকা বন্ধ হয়ে যেতে। স্বনামধন্য শিশুকিশোর সংগঠনের পত্রিকাও বন্ধ হয়ে যেতে দেখেছি। তাই একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশের স্বপ্ন অন্তরে লালন করলেও তেমন তাড়াহুড়ো করতে চাইনি। তবে এই স্বপ্নের কথা আমাদের উপদেষ্টারা জানতেন, শুভাকাংঙ্ক্ষীরাও জানতেন।

অবশেষে তাঁদের উৎসাহে ১৯৭৮ সালের শুরুর দিকে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশের লক্ষ্যে কাজে নেমে পড়লাম আমরা। মাসুদ আলী ভাই এবং আমার ওপর পত্রিকা প্রকাশের দায়িত্ব অর্পিত হওয়ায় তখন অর্জন করেছি বিচিত্র অভিজ্ঞতা। দীর্ঘ ৩৪ বছরের পথ চলায় এখনতো চারপাশে ফুলকুঁড়ি আসরের কত বন্ধু, কত সহযোগী। কিন্তু শুরুতে এমনটি ছিল না। তখন আমরা নতুন ছিলাম, পরিচিতি কম ছিল, তাই পত্রিকা প্রকাশের কাজটি তেমন সহজ মনে হয়নি। আর পত্রিকা প্রকাশের ঘাটতো একটি নয়, অনেক! চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিফতর থেকে নামের ছাড়পত্র নেওয়া, গোয়েন্দা বিভাগের ইতিবাচক রিপোর্ট পাওয়া, ডিসি অফিস থেকে ডিক্লারেশনের কাজ সারা, জিপিও থেকে রেজিস্ট্রেশন নাম্বার নেওয়া- আসলেই এসব বেশ ঝক্কির কাজ। এসব কাজে প্রকাশিকা তামান্না-ই-জাহান, উপদেষ্টা মাহবুবুল হক সহ আরও অনেকের সহযোগিতার কথা আজ আমরা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছি। এখন তো আমাদের উপদেষ্টা, শুভাকাঙ্ক্ষী, এমনকি সাবেক ফুলকুঁড়ি সদস্যদের অনেকেই গাড়ির মালিক। কাজের প্রয়োজনে চাইলে এখন গাড়ি পাওয়া যায়। কিন্তু শুরুর সময়টা তেমন ছিল না। তখন আমরা পত্রিকার ছাড়পত্র, ডিক্লারেশন ইত্যাদি কাজে অফিস থেকে অফিসে গিয়েছি রিক্সায়, বাসে কিংবা হেঁটে। একদিনের কথা এখনো বেশ মনে আছে। পত্রিকার কাজে এই অফিস, ঐ অফিস করে আমি ও মাসুদ আলী ভাই খুব ক্লান্ত। গরমের সময়, তারপর দুপুর। দরদর করে ঘাম ঝরছে, পিপাসাও পেয়েছে। মাসুদ আলী ভাই কিছু খেয়ে নেওয়ার প্রস্তাব করলেন। আমরা কাকরাইলের কাছে জলখাবার-রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়লাম। মিষ্টি, নিমকি আর চা খেতে খেতে ফুলকুঁড়ি পত্রিকা নিয়ে আমরা অনেক কথা বললাম। যেন সেটি ছিল ‘স্বপ্ন বলার আসর’। কথার ফল্গুধারার মধ্যে হঠাৎ চুপ হয়ে গেলেন মাসুদ আলী ভাই। শুধু চুপ নয়, বেশ গম্ভীরও। আমি তো অবাক! হাসি-খুশি মানুষটিতো এমন হওয়ার কথা নয়। চোখের ইশারায় কারণ জানতে চাইলে মাসুদ আলী ভাইও চোখের ইশারায় একটি লোকের দিকে ইঙ্গিত করলেন। আস্তে করে বললেন: লোকটি গোয়েন্দা হতে পারে? হয়তো আমাদের ফলো করছে। সেদিন জলখাবার রেস্টুরেন্টে কথার ঝাপি বন্ধ করে আমরা রাস্তায় নেমে পড়লাম। সতর্কভাবে কিছু দূর হেঁটে প্রশ্ন করলাম। লোকটি যে গোয়েন্দা কী করে বুঝলেন? জবাবে মাসুদ আলী ভাই রহস্যময় একটা হাসি দিয়ে বললেন: বোঝা যায় বোঝা যায়, তাছাড়া দেওয়ালেরও কান আছে, জানেন তো? মাসুদ আলী ভাই মাঝে মাঝে কেমন যেন ‘ফেলুদা’ হয়ে উঠতেন। (চলবে)

প্রকাশকাল : মার্চ, ২০০৮

Author