কালু চাচা

শরীফ আবদুল গোফরান

0
28

রাফে’রা কুমিল্লায় থাকে। স্টেশন রোডে তাদের বাসা। বাবা সাংবাদিক। মা একটি বেসরকারী ব্যাংকে চাকরি করেন। আব্বা, আম্মা আর ছোট্ট ভাইয়া রিফাতকে নিয়ে তাদের সংসার। দাদা হোসেন উকিল একেবারে বুড়ো হয়ে গেছেন। খুব একটা হাটা চলা করতে পারেন না। সারাদিন একা একা দোতলায় লাঠি ধরে হাঁটা হাটি করবে। আর তসবি টিপে টিপে জিকির করবে। তাঁকে সঙ্গ দেওয়ার কেউ নেই। বছর ২/৩ আগে দাদীও মারা গেছেন। সে থেকে তিনি আরো নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছেন। রাফে মাঝে মধ্যে দাদাকে সঙ্গ দেওয়ার চেষ্টা করে। নানা গল্প শোনে দাদার কাছে। কিন্তু খুব একটা মজা পায় না সে। দাদা কথা শুরু করলে এমনিতেই হাসি পায় ওর। কারণ দাদার একটি দাঁতও নেই। সে কি বলছে মোটেও বুঝা যায় না, তিনি গল্প বলার সাথে সাথে এমন হাসাহাসি করেন, তার কথা আর হাসি একাকার হয়ে যেতো। তাই রাফেও দাদার সাথে হাসতে হাসতে লুটোপুটি খেতো, দাদা আবার মাঝে মধ্যে বলে, কি। মজা লাগে? তখন। রাফে বলে, তোমার কথাতো বুঝা যায় না, তাই হাসি পায়। গল্পের চেয়ে তোমার হাসিটাই বেশি মজা।

রাফে পড়ে ফাইভে। আর রিফাত টুয়ে। স্কুলে যাওয়া-আসা করে কালু চাচার সাথে। মা-বাবার অনুপস্থিতিতে কালু চাচাই তাদের আপনজন। কারণ রাতে ছাড়া মা-বাবার সাথে দেখা হয় না। তাই এই কালু চাচাই তাদেরকে কোলে পিঠে করে বড় করেছে। বলতে গেলে তাদের খেলার সাথীও কালু চাচা। ওর ডাকেই তাদের ঘুম ভাঙ্গে আবার ওর গল্প শুনতে শুনতেই তাদের ঘুম আসে। কখন কি করতে হবে সব মুখস্ত তাদের। কালু চাচা আগে থেকেই সব মুখস্ত করে দিয়েছেন। মনে হয় কালু চাচার মাধ্যমে তারা সেনাবাহিনীর মতো সব ট্রেনিং নিয়ে নিয়েছে। কালু চাচা কখনও রাগ হতো না।

সেদিন হরতাল, স্কুলে ক্লাস হবে না। তাই ক্লাস ছুটি হয়ে গেছে। বন্ধু শিপন বলল, চল রাফে আজকে আমাদের বাসায়। চল। রাফেও উচ্চ-বাচ্য না করে সুড় সুড় করে গাড়িতে উঠে বসলো। কিন্তু মনে পড়ে যায় কালু চাচার কথা। হয় তো চাচা ফিরে যাবে। মনে মনে ভাবলো, যাবো কি যাবো না। এবার স্থির করে নিল। না, যাই। একদিন না হয় না বলেই গেলাম। বিকেলেতো বাসায়ই যাব।

সারা বিকাল শিপনের সাথে খেলা আর আনন্দের মাঝে বাসার কথা ভুলেই গেলো রাফে। এর মধ্যে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। বুকের ভেতর ধুক ধুক করে উঠলো। না, কিছু হবে না। বাড়ি গিয়ে হয়তো দেখবো আব্বু-আম্মু কালু চাচাকে বকছে। সে ভেজা চোখে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে, আমাকে দেখে ছুটে আসবে। জিজ্ঞেস করবে কোথায় ছিলে এতক্ষণ? ছেলেধরা ধরেনি তো? দুপুরে খেয়েছ? কেউ মেরেছে? সে হাত-পা লাফাতে বলবে, আরে না, না। আজকে সারাদিন শিপনদের বাসায় আনন্দ করেছি।

এসব ভাবতে ভাবতে বাড়ির সামনে এসে পড়লো রাফে। কলিং বেল টিপে দাঁড়িয়ে থাকলো। কিছুক্ষণ পর কালু চাচা এসে দরজা খুললো, আর যেই না রাফে ঘরে ঢুকেছে অমনি কালু চাচা কষে দু’গালে দুটো থাপপড় দিয়ে চিৎকার করে উঠলো, কোথায় ছিলে এতক্ষণ? তোমার জন্য আমার কি চিন্তা, খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে গেছি।

কালু চাচার কড়া হাতের থাপপড় খেয়ে রাফে ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠলো। কালু চাচা গেট লাগিয়ে চলে গেলো। রাফে তার রুমে গিয়ে কাঁদতে লাগলো।
এর মধ্যে কখন যে আব্বু-আম্মু এসে গেছে সে বুঝতেই পারেনি। আম্মু রাফেকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করছে, কি আব্বু, দৌড়াতে গিয়ে পড়ে গেছ? খুব ব্যথা পেয়েছ। এদিকে রাফের কান্না দেখে ছোট্ট রিফাতও তাকে বারে বারে জড়িয়ে ধরছে। আর সান্ত্বনা দিচ্ছে। ভাইয়া কেদোনা। রাফে কাঁদতে কাঁদতে মাকে বললো, কালু চাচা মেরেছে। কেন মেরেছে, মা আর সে কথা জিজ্ঞেস করলোনা। রাফেকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু বিধি বাম- রাফের কথা শুনে বাবা চিৎকার করে কালু চাচাকে ডাকলো। কালু, কালু এদিকে আয়। কালু চাচা ধীরে পায়ে ঘরে ঢুকলো। বাবা রেগে জিজ্ঞেস করলেন, রাফেকে মেরেছিস কেন? কোন জবাব দিলোনা কালু। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলো।

রাফের সামনেই বাবা কালুকে খুব বকা দিলো। একসময় গলা ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিলো। কালু কাঁদতে কাঁদতে রাফের বাবার পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললো, আমাকে মারবেন না, আমি আর অমন করবো না। কিন্তু বাবার রাগ থামে না। এক সময় কালু চাচা তার পুটলিটা বুকে জড়িয়ে ঘর থেকে বের হলো স্টেশনের উদ্দেশ্যে। সে আর এখানে থাকবে না। চলে যাবে নিজের সন্তানদের কাছে।

মা খাইয়ে দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে যায় রাফেকে। কিন্তু রাফের মোটেও ঘুম আসে না। বার বার কালু চাচার কথা মনে পড়ে। সে তার ভুল বুঝতে পারলো। বার বার নিজেকে প্রশ্ন করছে। ‘ভুলতো আমি করেছি’, বিড় বিড় করে রাফে বলছে, কালু চাচা, আমাকে মাফ করে দাও। আমিইতো অন্যায় করেছি। তুমিতো কোন দোষ করনি। বাবার কথায় রাগ করে চলে যেয়ো না। আমি আর কখনো তোমার কথা অমান্য করবো না।

রাত প্রায় বারোটা। প্রকৃতি এখন শান্ত । নীরব, নিস্তব্ধ। শুধু ঝি ঝি পোকার একটানা ঝি ফি ডাক ভেসে আসছে। নরম চাঁদের আলো বাহিরে ঝলমল করছে।
রাফে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে। একসময় মা টের পেয়ে যায়। মা ডাক দিয়ে বলে, রাফে এত রাত পর্যন্ত কি করছো? তাড়া-তাড়ি শুয়ে পড়ো। মার কথা শুনে রাফে ঘুমিয়ে পড়লো। কখন যে ভোর হয়ে গেছে টেরই পেলো না।

কালুদের বাড়ী নাঙ্গলকোটের মুহরীগঞ্জ গ্রামে। কালুদের গ্রামেই রাফের নানার বাড়ী, রাফেদের কষ্ট দেখেই তার নানা আক্তারুজ্জামান সাহেব কালুকে তাদের বাসায় কাজ করতে পাঠিয়েছে। কালু বলতে গেলে তাদের আপন লোকই। নিজের ছেলে মেয়েদের চেয়েও বেশী আদর করতো রাফে ও রিফাতকে।
রাফের বাবা ঘর থেকে বের করে দিলে কালু আসে কুমিল্লা রেল ষ্টেশনে। তার চোখে পানি। রাফে ও রিফাতের কথা মন থেকে পড়ছে না। তবুও সে আর শহরে থাকবে না। শহরের লোক তার আর মোটেও পছন্দ নয়। শহরের লোকেরা গরীবদের ভালবাসে না। তারা গরীব লোকদের শুধু মারে। এক সময় সে আনমনা হয়ে রেল লাইনের উপর এসে দাঁড়ায়। বার বার পেছন ফিরে রাফেদের বাসার পথের দিকে তাকিয়ে দেখলো। তার কানে যেন রাফের কন্ঠ ভেসে আসছে। ভাবতে ভাবতে সে তন্ময় হয়ে গেল। হঠাৎ একটি আন্তঃনগর ট্রেন ভোঁ করে চলে গেল। অমনি ট্রেনের নিচে পড়ে সাঙ্গ হলো কালু চাচার প্রাণ। তার নিষ্প্রাণ দেহটি দ্বিখন্ডিত হয়ে পড়ে রইলো।

ভোর হলে সবাই বলা বলি করছেঃ স্টেশনে আজ একটি লোক ট্রেনে কাটা পড়েছে।পাড়ার ছেলেরা দল বেঁধে ট্রেনে কাটা লোকটিকে দেখতে গেলো। রাফে ও রিফাতও যেতে চাইলো। কিন্তু আব্বু যেতে দিলো না। এক সময় ডোমরা এসে লাশটি নিয়ে গেলো। বন্ধুরা বললো, রাফে তোর কালু চাচা ট্রেনে কাটা পড়েছে।
অমনি রাফে দরজা খুলে স্টেশনের দিকে ‘কালু চাচা’ ‘কালু চাচা’ বলে চিৎকার করতে করতে দৌড়াতে লাগলো। এরপর সে যে কোথায় গেলো, আর কখনো ফিরে আসেনি। বাবা-মায়ের সন্দেহ, হয়তো স্টেশন থেকে ছেলে ধরা নিয়ে গেছে।

প্রকাশকাল : অক্টোবর ২০০০

Author