॥ তিন৷৷
সকালবেলা সবাই গোল হয়ে রানার নতুন ছড়া শুনতে বসেছে। যা ধারণা করা হয়েছিল তাই ঘটেছে। রানা শিপলুকে নিয়েই একটা ছড়া লিখেছে। ছড়া তো নয়, যেন মহাকাব্য, শিপলুর আর সহ্য হচ্ছে না। ও উঠে বারান্দাঘরে গিয়ে বসল। এখান থেকেও রানার লেখা ছড়াটা শোনা যাচ্ছে। অজয় খুব সুন্দর করে আবৃত্তি করছে।
‘খেয়েছিল ভরপেট,
ধরেছিল টয়লেট
শিপলুর মনে খুঁত
কাছে পিঠে থাকে ভূত।
মাঝরাতে একা তাই,
টয়লেটে গিয়ে ভাই….
পড়েছিল ফাঁদে,
দেখেছিল সাদা ভূত,
বাথরুমের ছাদে।
ভূত যেন ভূত নয়,
সাদা কোন শয়তান,
আঁধারেই হামলা,
শেষে বুঝি নেবে জান।
চশমাটা বেঈমান,
চোখ ছেড়ে চলে যায়,
চশমার কারণে
প্রাণটাই যায় যায়….‘
নাহ্! অসহ্য, রানাটাকে নিয়ে আর পারা গেল না। কি একটা ঘটনা, তা নিয়ে মহাকাব্য রচনা করতে হবে? এসব কথা ভাবতে ভাবতে শিপলু কাচারীঘরের দিকে হাঁটা দিল।
মিঠু সকাল থেকেই মাছ ধরার জন্য বড়শি পেতে বসে আছে। পুকুর ভর্তি মাছ। কিন্তু বেচারার কপাল মন্দ। তাই একটা কাঁকড়া ছাড়া বড়শিতে আর কিছুই ওঠেনি। কিন্তু হাল ছাড়ার পাত্র মিঠু নয়। এক দৃষ্টিতে সে পুকুরের দিকে তাকিয়ে আছে। এই বুঝি বড়শিটা নড়ে উঠল, কোন বড় মাছ বুঝি আটকে গেল তাতে। কিন্তু না, এমন কিছুই হচ্ছে না। এদিকে, সবাই আজগর মামাকে ঘিরে বসেছে। তিনি গতকাল রাতে শিপলু কেন ভয় পেয়েছিল সেই রহস্য উদঘাটন করেছেন। দু’টো বালিশের উপর ভর দিয়ে বসে তিনি গল্প বলা শুরু করলেন। যেহেতু ঘটনা সৃষ্টিকারী মানে শিপলু এখন আমাদের মাঝে অনুপস্থিত, তাই আমি পুরো ঘটনাটা সবাইকে খুলে বলি। তবে সংক্ষেপে বলব কারণ আমাকে গ্রাম ঘুরে দেখতে হবে। বহু বছর পর গ্রামে এসেছি। গ্রামের নির্মল পরিবেশ, বটগাছের নিচের ছায়া……
মাসুদ আজগর মামার কথার মাঝখানে বলে উঠল, মামা, আপনি মূল ঘটনা ছেড়ে অন্যদিকে চলে যাচ্ছেন।
আজগর সাহেব সজাগ হয়ে গেলেন।
চেহারায় একটা রহস্যময় ভার ফুটিয়ে তিনি বলতে শুরু করলেন, ঘটনা অনেকটা এরকম। কালরাতে শিপলুর প্রচন্ড টয়লেট চেপেছিল। সে লজ্জার কারণে কাউকে বলতে পারেনি। তো একাই টর্চ হাতে রওনা হয়েছে। হঠাৎ ওর পা হয়ত কোন লতার সঙ্গে জড়িয়ে যায়, আর ও হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়। তখন হাত থেকে টর্চটা দূরে ছিটকে পড়ে। At that time একটা বিড়াল সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। টর্চের আলো সেটার গায়ে পড়ে। সেটাকে ভূত ভেবেই হয়ত শিপলুর সেই গগনভেদী চিৎকার আমরা শুনেছিলাম। পুরোটা বলে আজগর সাহেব নড়েচড়ে বসলেন।
শাহেদ বলল, মামা, গ্রামে-গঞ্জে নাকি ভূত থাকে। একদম অস্বীকার করি কিভাবে? এমনোতো হতে পারে, পুরো ঘটনাটাই কোন জ্বীন-ভূতের সাজানো খেলা।
মামা গম্ভীর হয়ে বললেন, একবিংশ শতাব্দীতে এসে তুমি ভূত-পরীর কথা বলো। তুমি যেমনটা বলছ তেমন কখনো ঘটতে পারে না। আমার প্রতিটা কথার পিছনে লজিক আছে। ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে আমি সেই পথে বিড়ালের পায়ের ছাপ দেখেছি।
শাহেদ চুপ হয়ে গেল। মামা এবার মুখে প্রশান্তির ভাব এনে বললেন, তোমরা হয়ত ব্যাপারটাকে ঠাট্টা হিসেবে নিয়ে খুব মজা পাচ্ছ। কিন্তু ভেবে দেখ তোমাদের যে কারও বেলাতেই এমনটা হতে পারত। তাই রাতে কারও টয়লেট চাপলে সঙ্কোচ না করে এখানকার কেয়ারটেকার মিজান আছে অথবা শাহেদের মামা দুলাল ভাই আছে, তাদেরকে বললেই হবে। আর আমিতো আছিই। এমন সময় মিজান এসে বলল, আফনেগো নাস্তা হাইতনা ঘরে লাগাইছি। হগলে চইলা আসেন।
শাহেদ জিজ্ঞেস করল, কি নাস্তারে মিজান?
মাথা চুলকাতে চুলকাতে মিজান বলল, জ্বে আফনেগো নাস্তা হইতাছে গিয়া গরম গরম ভাপা পিঠা আর মুড়ি দিয়া খাজুইলা রসের নাস্তা।
রানা চুপচাপ বসে ছিল। ভাপা পিঠার। কথা শুনে ওর চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। মনের অজান্তেই ছড়া বলে ফেলল,
ভাপা পিঠা আস্তা,
সঙ্গে রসের নাস্তা
পিঠা খেতে বেশ
নাস্তা খাওয়া শেষ।
ওর ছড়া শুনে সবাই হেসে ফেলল।
বেলা দশটার দিকে শিশির, মিঠু আর শিপলু ঘুরতে বের হল। মিঠুর চেহারা খুশি খুশি, ওর বড়শিতে বড় একটা মাছ ধরা পড়েছে। সেই মাছ দুপুরে খাওয়া হবে। মিঠুর মাছ দেখে খালেদ, মাসুদ আর শাহেদও বড়শি নিয়ে পুকুর ঘাটে বসেছে। অজয়, রানা মামার সঙ্গে বাজারে গেছে।
মিঠু নিরবতা ভাঙল, জানিস, মাছটা না অনেক বড় ছিল। শিপলু বলল, এই কথা সকাল থেকে কমপক্ষে ২০ বার শুনেছি এবং মাছটাও আমরা স্বচক্ষে দেখেছি মাছটা আসলেই বড় ছিল, কিন্তু বারবার এক কথা শুনতে ভাল লাগে না।
মিঠু রেগে গেল। আচ্ছা, ঠিক আছে, আমি আর কোন কথাই বলব না।
শিশির বলল, কি শুরু করলি তোরা। তুচ্ছে জিনিস নিয়ে বা-বা-ঝগড়া করছিস। কত বছর পর গা-গ্রা-গ্রাম দেখতে এসেছি। ম-মন থাকবে প-প-পরিষ্কার, তা না ঝগড়া করছিস।
শিপলু বলল, আচ্ছা, ঠিক আছে। আর ঝগড়া করব না। চল ঐ পূর্ব দিকের রাস্ত দিয়ে হেঁটে আসি।
কিছুদূর যাবার পর পোস্ট অফিস দেখা গেল। ওরা দেখল, একজন বুড়ো মানুষ খালি গায়ে পোস্ট অফিসের বারান্দায় শুয়ে আছে। বুড়ো লোকটার সঙ্গে কথা বলতে ওরা এগিয়ে যাচ্ছিল, এমন সময় কোথেকে একটা ছেলে দৌড়ে এসে ওদের সামনে দাঁড়াল।
আফনেরা কি হেই বেডার কাছে যাইতাছিলেন? জিজ্ঞেস করল ছেলেটা।
হ্যা, কি-কিন্তু কি হয়েছে? অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল শিশির।
ঐডাতো মনা পাগলা। দেহেন না হের মাজায় দড়ি বান্ধা। তয় হের কাছে আফনাগো কি কাম? জিজ্ঞেস করল ছেলেটা।
কোন কাজ নেই, এমনি দেখছিলাম। আচ্ছা, তোর নাম কি? জিজ্ঞেস করল শিপলু।
ছেলেটার হাতে গুলতি ছিল। সেটা পেছনের পকেটে রেখে বলল, জ্বে, আমার নাম ফজল। গেরামের মাইনষে ডাকে ফজইল্যা কইয়া। মাডের শেষ মাতায় কতডি কলাগাছ দেহেন না? হের পিছে আমাগো বাড়ি।
মিঠু এখনও পাগল লোকটার দিকে তাকিয়ে আছে। রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলল, আমি কখনও দড়ি দিয়ে বাঁধা পাগল দেখিনি।
ফজল হেসে বলল, এইখানেই হগলে ধরাডা খায়। মনা পাগলায় হেমন পাগল না। হেয় নিজের মাজায় নিজেই দড়ি বাইন্ধা থুইছে।
শিশির বলল, তুই তো দেখি খুব সু-সু-সুন্দর করে ক-কথা বলতে পারিস।
ফজল শিশিরের দিকে তাকাল। ঝুঁকে ওর কাছে গিয়ে বলল, আমনে কি তোতলা? আমার মামায় ঝাঁড়ফুক দিয়া তোতলামি ভাল কইরা দিতে পারে। একবার গফুরে আন্ধার রাইতে কবরের পাশে সাপ দেইখা তোতলা হইয়া গেছিল। ব্যারাম আর সারে না। মামায় এমুন মন্তর মারছিল যে সাপ নিজে আইসা গফুইরার পায়ে পড়ছে। লগে লগে হের তোতলামি ভালা
শিশিরের তোতলামি সম্পর্কে বলায় ও একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল। শিপলু বলল, শোন ফজল, ওতো কোন সাপ দেখেনি, এটা ওর জন্মরোগ।
ফজল বিরক্ত মুখে বলল, হেই চিকিৎসাও আছে। মামায় জানে। আইচ্ছা, আমি অহন যাই। বলেই মাঠের মধ্যে নেমে গেল। পিছনে ফিরেও তাকাল না।
ওরা ছেলেটার চলে যাওয়া দেখল। অদ্ভুত একটা ছেলে। কত সরল, কত স্বাভাবিক। অপরিচিত এতগুলো ছেলের সঙ্গে এভাবে কথা বলল, যেন কতদিনের চেনা। প্রকৃতি এদের এভাবেই তৈরি করেছে। গ্রামের ভিতরের কোন মসজিদ থেকে জোহরের আজানের সুমধুর সুর ভেসে এল। মিঠু বলল, মাছটা মনে হয় এতক্ষণে ভাজা হয়ে গেছে। চল বাড়ির দিকে যেতে থাকি। দুপুরের খাবার সময় হয়ে গেল।
মিঠুর উৎসাহ দেখে অন্যরা হেসে ফেলল। শিপলু কিছু বলার লোভ সামলাতে পারল না। হাসি থামিয়ে বলল, মনে হচ্ছে, সিলভার কাপ মাছটা তোর পথ চেয়ে বসে আছে।
মিঠু কিছু বলল না। শুধু মুখটা কালো করে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকল। শিশির হাসতে হাসতে শিপলুকে চোখ টিপ দিল।
বিকেল বেলা শিশির, শাহেদ আর মিঠু মিজানকে নিয়ে হাঁটতে বের হল। অনেক দূর হাঁটার পর সবাই ক্লান্ত হয়ে রাস্তার ধারে একটা পুকুর পাড়ে বসল। মিঠু শাহেদকে বলল, জানিস, আজকে আমরা একটা পাগল দেখেছি সে নিজের কোমরে নিজেই দড়ি বেঁধে রাখে।
কোথায় দেখেছিস? জিজ্ঞেস করল শাহেদ।
পোস্ট অফিসের বারান্দায় শুয়ে ছিল। জবাব দিল মিঠু।
মিজান বলল, হেরে গেরামের মাইনসে মনা পাগলা কইয়া ডাকে। তয় পাগলামি হেয় করে না।
শিশির অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, পা-পা-পাগলামি না করলে আ-আবার পাগল কিসের?
মিজান কিছু বলতে যাচ্ছিল, তাকে শাহেদ হাতের ইশারায় থামতে বলল, ধমকের সুরে বলে উঠল, এই সুন্দর একটা বিকেলে কি পাগল নিয়ে বকবক শুরু করেছিস। কোথায় কি দেখেছিস তাই বল।
মিঠু বলল, কোথাও যেতে পারলাম না। শুধু পোস্টাপিস পর্যন্ত গিয়েছিলাম। তখনই ঐ বুড়ো পাগলটাকে শুয়ে থাকতে দেখলাম। সত্যিই অপূর্ব লাগছিল।
শাহেদ বিরক্ত কন্ঠে বলল, একটা পাগলকে অপূর্ব লাগার কি আছে?
মিজান ওদের কথার মাঝখানে বলে উঠল, জে ভাইজান, মিঠু ভাই মিছা কয় নাই। হেই পাগলে আসলেই একটা আইশ্চর্য।
শাহেদ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, খুলে বলত দেখি কেমন আশ্চর্য?
মিজান বলা শুরু করল, ভূতে উনার পোলাডারে মারার পর থেইকা হেয় পাগল হইছে। তয় কাউকে ঢিল মারে না, কাউরে দৌঁড়ায় না। হারাদিন ধইরা বিড়বিড়াইয়া কি জানি কয় আর খিদা লাগলে মাইনষের বাড়ি বাড়ি গিয়া খাওন খোঁজে। কেউ খাইতে দিলে খাওন লইয়া পোস্টাপিসে আইসা কালুরে লইয়া ভাগজোগ কইরা খায়।
মিজানকে থামিয়ে দিয়ে শাহেদ জিজ্ঞেস করল, তাঁর ছেলেকে কে মেরেছে বললি? ভূতে?
গেরামের মাইনষে তো তাই কয় ভাইজান।
আর কালুটা কে?
হেইডা একটা কুত্তা। হের লগে লগে থাহে।
আর কিছু জানিস?
জ্বে না, তয় দুলাল মামায় ভালো কইরা কইতে পারব।
শাহেদ অন্যদের দিকে তাকিয়ে বলল, ও যা বলেছে তাতে ঐ বুড়োটাকে আমার দেখতে ইচ্ছে করছে। পোস্টাফিস তো সামনেই, চল সন্ধ্যার আগে একটু ঘুরে আসি।
হাঁটতে হাঁটতে ওরা পোস্ট অফিসের সামনে চলে আসল কিন্তু বারান্দায় কাউকে দেখা গেল না। পোস্ট অফিস খোলা। লোকজন আসা-যাওয়া করছে। ওরা নিরাশ হয়ে বাড়ির দিকে রওনা হল।
সন্ধ্যার সময় আজগর মামা সবাইকে নিয়ে গোল হয়ে বসে গল্প শুরু করলেন, “তখন আমি খুব ছোট। পানিকে খুব ভয় করতাম। সাঁতার শিখতে চাইতাম না। কিন্তু গ্রামের ছেলে সাঁতার না শিখে উপায় আছে? একদিন আমার মেজোচাচা আমাকে খুব সাহস দিয়ে পুকুরের মাঝখানে নিয়ে গেল। আমার পেটের নিচে হাত দিয়ে বলল, পানিতে হাত-পা ছুঁড়তে। আমি চাচার কথামতো সাঁতার কাটার মতো করে হাত-পা ছুঁড়তে লাগলাম। কখন যে সে হাত সরিয়ে নিয়েছে টের পাইনি। টের পেলাম তখন যখন ডুবে যাচ্ছিলাম। আমিতো ভয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। চাচা বাড়িতে নিয়ে আসল। ততক্ষণে পানি খেয়ে আমার পেট ঢোল হয়ে গেছে। ছোটবেলায় তাই সাঁতার শিখতে পারিনি। বড় হয়ে শিখতে হয়েছে। আচ্ছা, তোমাদের মধ্যে যে যে সাঁতার পারো, হাত উঠাও তো দেখি।
মিজান বাদে কারো হাতই উঠতে দেখা গেল না। সে দুই হাত উঠিয়ে বসে আছে। আজগর মামা মনে হয় মনঃক্ষুণ্ণ হলেন।
তার মানে তোমরা কেউ সাঁতার পারো না। এটাতো খুব চিন্তার বিষয়। তোমাদের দোষ দিয়েই বা লাভ কি? শহরে সাঁতার শিখার তেমন সুযোগওতো নেই। আচ্ছা, মিজান, তুই কিভাবে সাঁতার শিখেছিস? জিজ্ঞেস করলেন আজগর মামা।
জ্বে কলাগাইছ জাপটাইয়া ধইরা বহুত কষ্টে হিকছি। বলল মিজান।
দুলাল মামা এসে আজগর মামার পাশে বসলেন। দুলাল মামা খুব লম্বা মানুষ। সবাই বলে, ছয় ফুট চার ইঞ্চি। তার বেশিও হতে পারেন।
আজগর মামা বললেন, আসেন দুলাল ভাই। আপনি ছাড়া আসর জমছে না।
দুলাল মামা ঘর কাঁপানো হাসি দিয়ে বললেন, আপনার গল্পের কাছে তো আমার গল্প মার খেয়ে গেছে। আর আমরা ভাই গ্রামের মানুষ। অত গুছিয়ে কথা বলতে পারিনা।
অজয় বলল, না, না, মামা আপনি এই কথা বলে বলে সবসময় এড়িয়ে যান। আমরা আজকে আপনার জীবনে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনা শুনবই।
সবাই সমস্বরে চিৎকার করে উঠল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, দুলাল মামা, বলতেই হবে।
দুলাল মামা শুরু করলেন, একদিন দোকান বন্ধ করতে করতে বেশ রাত হয়ে গেল। আমি আর আমার এক বন্ধু গ্রামের রাস্তা দিয়ে ফিরছিলাম। উত্তর পাড়ের পুকুরটার পাশ দিয়ে আসার সময় কেমন যেন ভয় ভয় লাগছিল। ও পথ সাধারণত মাড়াই না। সেদিন দেরী হয়ে যাওয়াতে শর্টকাটে ওদিক দিয়ে আসছিলাম। রতনের হাতে ছিল হারিকেন। আমার হাতে ছিল টর্চ। ওদিকটাতে কেউ যায় না। তাই জঙ্গলের মতো হয়ে গেছে। হঠাৎ গাছের উপর থেকে কে যেন রতনকে ডাক দিল। তাকিয়ে দেখি একটা কঙ্কাল গাছের উপর পা দুলিয়ে বসে আছে। শরীরটা নেড়েচেড়ে বলল, কিরে রতন, মাছ কি একাই খাবি, আমাকে দিবি না? রতনের দিকে তাকিয়ে দেখি, ওর কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে গেছে। ওর বাম হাতে মাছ ছিল। আমি গাছে টর্চ মেরে জিজ্ঞেস করলাম তুই কে?
ঐ কঙ্কালটা উত্তর দিল, আমি মেছো ভূত। হি হি হি, বলেই রতনের উপর লাফ দিল। রতন তখন বাবা গো, মাগো বলে মাছ, হারিকেন ফেলেই দৌড় দিয়েছে, আমি কি করব বুঝতে পারছিলাম না, তখন কে যেন মাথায় প্রচন্ড জোরে বাড়ি মারল। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। জ্ঞান ফিরে পাই সদর হাসপাতালে। আমাকে নাকি বড় রাস্তার উপর সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। আজও ঐ ঘটনা আমার মনে আছে। আর কখনও ঐপথে যাইনি, কাউকে যেতেও শুনিনি।
পুরো ঘটনাটা বলে দুলাল মামা ঘরের ভিতরে গেলেন। ছেলেরা কেমন যেন ভয় পেয়েছে। শিশির আর রানা খাটে পা ঝুলিয়ে বসে ছিল। দু’জনেই পা উঠিয়ে ফেলল। কেন যেন মনে হচ্ছে খাটের নিচে কেউ বসে আছে। যে কোন মুহূর্তে পায়ে হাত দিয়ে বসবে। দুলাল মামা সবার জন্য রসের নাস্তা নিয়ে আসলেন। সবাইকে নাস্তা দিয়ে তিনিও খেতে বসলেন। মিঠু দুলাল মামার দিকে তাকিয়ে বলল, মামা, আপনাদের পোস্টাফিসে একটা পাগল দেখলাম। তার ছেলেকে নাকি ভূতে মেরেছে?
দুলাল মামা আবার সেই ঘর কাঁপানো হাসি দিয়ে বললেন, গ্রামের লোকে তো তাই বলে। তবে এসব বিশ্বাসের পক্ষপাতী আমি নই।
তাহলে তোমার কি মনে হয় মামা? ছেলেটা কিভাবে মরেছে? জিজ্ঞেস করল শাহেদ।
দুলাল মামা পানি খেয়ে বলতে লাগলেন, তাহলে তোমাদের পুরো ঘটনাটাই খুলে বলি। উত্তর পাড়ে মতিন মাতব্বরের একটা পুকুর আছে। সে পুকুরে মাছ চাষ করে। তাই কাউকে পুকুরের পানি ব্যবহার করতে দেয় না। পুকুরের পিছনের প্রায় ২৫ বিঘা জমি তাঁর। পুরোটাই নারকেল, সুপারি বাগান, মাঝখানে একটা বৃটিশ আমলের বাংলোবাড়ি আছে। এখন আর ওখানে কেউ থাকে না। সবাই ওটাকে এখন জঙ্গলবাড়ি হিসেবেই জানে। যত্নের অভাবে ওদিকটা পুরোটাই জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। বছর চারেক আগে এক লোককে ঐ জায়গায় সাপে কাটে। তাঁর লাশ পুকুরে পাওয়া গিয়েছিল। সবাই বলে, এখন নাকি সে মেছোভূত হয়ে গেছে। তাই ভয়ে ওদিকে কেউ যায় না। দু’বছর আগে আব্দুল মাষ্টারের ক্লাশ ফাইভে পড়া ছেলেটা ওখানে মারা যায়। কেন ছেলেটা ওখানে গিয়েছিল তাও কেউ জানে না। তবে, মা মরা ছেলেটাকে মাষ্টার সাহেব খুব আদর করত। শোকে-দুঃখে সে পাগল হয়ে যায়।
পুরোটা বলে দুলাল মামা দম নিতে থামলেন। সবাই খুব মন দিয়ে ঘটনা শুনছিল। মাসুদ প্রশ্ন করল, তাহলে মামা, ছেলেটা কিভাবে মারা গেল, তা কেউ বের করতে পারেনি?
মামা রহস্যময় হাসি হেসে বললেন, পেরেছে, তাকে মেছোভূতে মেরেছে।
শিশির ভূতের গল্প শুনলেই ভয়ে কাঁপতে শুরু করে। ও ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, ভূ-ভূত কি করে মা-মা-মানুষ মারবে? আর ওটাতো মে-মে-মেছোভূত। মানুষখেকো ভূ-ভূত তো নয়। দুলাল মামা আবারও সেই প্রাণখোলা হাসি দিয়ে বললেন, তার মানে তোমরা সবাই বিশ্বাস করেছ যে ছেলেটা ভূতের হাতে মরেছে, কিন্তু আমার তো মনে হয় না। কারণ ছেলেটার গায়ে আঘাতের চিহ্ন ছিল। তবে মতিন মাতব্বর এটাকে ভূতুড়ে কাণ্ড’ বলে চালানোর চেষ্টা করেছে। গ্রামের সহজ-সরল মানুষ তা বিশ্বাসও করেছে। কিন্তু আমি তা মানতে রাজি না। আমার মনে হয়, ওখানটাতে কোন ঘাপলা আছে।
দুলাল মামার শেষ কথাটা শুনে আজগর মামা উৎসাহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কেমন ঘাপলা আছে বলে মনে করছেন?। মানে, আপনি কি বলতে চাচ্ছেন এটা কোন খুন-খারাবি বা এই টাইপের কিছু?
‘আপনি ভালই আন্দাজ করেছেন। আমরা ছেলেটার লাশ আনতে সেই জায়গাটাতে গেলে একটা গাছের নিচে অনেকগুলো সিগারেটের টুকরা দেখেছি। অথচ সেই মুহূর্তে কেউ সিগারেট খাচ্ছিল না। তার মানে সেই জায়গাতে অন্য মানুষের যাতায়াত আছে।’ বললেন দুলাল মামা
শিপলু বললন, মামা পুলিশকে ব্যাপারটা জানাননি?
আসলে এটা নিয়ে থানা-পুলিশ হয় নাই। কার দরকার পড়েছে, কাজ-কারবার ফেলে কোট-কাচারি দৌঁড়ানোর। বাবার ব্যবসাটা যেদিন থেকে ধরেছি, সেদিন থেকেই আমি ব্যস্ত মানুষ। আমিও আর এটা নিয়ে ঘাটাঘাটি করি নাই। তারপরে আবার মেছোভূতের ব্যাপার। তাকে ঘাটিয়ে লাভ আছে? শেষের কথাটা বলে মামা আবার হাসতে লাগলেন।
শিপলু রুমাল দিয়ে চশমার কাঁচ মুছতে মুছতে বলল, মামা, পুরো ঘটনা শোনার পর আমারও সন্দেহ হচ্ছে। এটা মনে হয় কোন খুন। ভূতুড়ে ব্যাপার বলে চালানোর মিথ্যা চেষ্টা করেছে মতিন মাতব্বর।
আজগর মামা শুয়েছিলেন। তিনি উঠে বসে বললেন, শিপলুর সঙ্গে আমিও একমত। ওসব ভূতে-ফুতে আমি বিশ্বাস করি না।
তাহলে আজগর মামা, সারদার চাকরি কেন ছেড়ে দিয়েছেন? মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল রানা।
আজগর মামা থতমত খেলেন। গম্ভার হয়ে বললেন, সেটা আমার জীবনের একটা কালো অধ্যায়। আমি সেটা ভুলে যেতে চাই।
খালেদ বলল, আমার জায়গাটা খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।।
আজগর মামা ঘোষণা দিলেন, তিনি পরদিনই সবাইকে নিয়ে সেখানে যাবেন। সবার মনেই ভয়, কিন্তু কেমন একটা। আকর্ষণ সবাই অনুভব করতে লাগল। আজগর মামা দুলাল মামার দিকে তাকিয়ে বললেন, দুলাল ভাই, আপনি যাবেন নাকি। আমাদের সঙ্গে?
দুলাল মামা তাঁর স্বভাবসুলভ মিষ্টি হাসি দিয়ে বললেন, সম্ভব হচ্ছে না ভাই। আমাকে আগামী কালই ঢাকা যেতে হবে বাসার কাজে। তবে একদিন থেকেই চলে আসব। আর একটা কথা, আপনার মাইক্রোবাস কিন্তু ওপথে ঢুকবে না।
(চলবে)
প্রকাশকাল : নভেম্বর, ২০০০।



