‘জোরে কিক্ কর্ শিপলু’ চিৎকার দিয়ে পেছন থেকে বলল খালেদ। শিপলু বিপক্ষ দলের গোলপোস্টের সামনে বল নিয়ে একাই ছুটে এসেছে। এই অসাধ্যটা কি করে সাধন হল তা এখনও কারও মাথায় ঢুকছে না। যে শিপলু শুকনো মাঠে আছাড় খেয়ে পড়ে, সেই কিনা আজ একা বল নিয়ে বিপক্ষ দলের পেনাল্টি বক্সে ঢুকে পড়েছে। এখন শিপলুর সামনে শুধু ব্যাগী মনা। এই মনা নামের পাহাড়টাকে কাটাতে পারলেই গোলকিপার মাছুম। মনাকে কাটানোই সবচেয়ে কঠিন কাজ। আর গোলকীপার মাছুম বল ধরার ব্যাপারেও মাছুম বাচ্চা। বল ওর দিকে আসতে দেখলেই ওর দু’চোখ এক হয়ে যায়। আর হঠাৎ করেই ওর দুনিয়াটা কেমন রঙিন হয়ে যায়। লাল, নীল, কমলা, সবুজ অনেক রং ওর চোখে ভাসতে থাকে। বল ডানদিক থেকে আসলে ও লাফ দেয় বাম দিকে। এই জন্য ব্যাগী রাখা হয়েছে পাহাড় সাইজ মনাকে, যার দলীয় উপাধি ব্যাঙ্কি। ব্যাগীর ‘ব্যা’ আর গোলকির ‘লকি’ একসঙ্গে জোড়া দিয়ে হয়েছে ‘ব্যাল্কি’। যাহোক, শিপলু মনাকে কাটানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। সফল হয়ে যাবে বলে সবাই ধরে নিয়েছে। এইসময় একটা অঘটন ঘটল, মনা শিপলুর চোখ থেকে চশমাটা খুলে মাঠের মধ্যে ফেলে দিল। চশমা ছাড়া শিপলু আর একজন রাতকানা লোকের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই, যা কল্পনা করা যায়নি তাই হল। শিপলু বলের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল আর হ্যান্ডবল হয়ে গেল।
ওদিকে ‘ড্যাঞ্জার ক্লাব’ বল পেয়েই গোল দিয়ে দিল, খেলা শেষে ফলাফল দাঁড়ালো, ডেন্জ্যার ক্রীড়া চক্র – ২ সিরিয়াস ক্রীড়া চক্র – ০। ড্যাঞ্জার ক্লাবের ছেলেরা কাপ নিয়ে হৈচৈ করতে করতে চলে গেলে। সিরিয়াস ক্লাবের ছেলেরা চুপচাপ মাঠের এক কোণে বসে আছে।
আজকে আমরা এত সিরিয়াস খেলেও ‘সিরিয়াস ক্লাব’ এর মান-ইজ্জত বাঁচাতে পারলাম না, বলল সাহেদ। আর আমাদের চো-চো-চোখের সামনে দিয়ে কা-কা-কাপটা ওরা নিয়ে যেতে পারল।তোতলাতে তোতলাতে বলল শিশির। সে দলের ম্যানেজার।
আমি ঠিক করে রেখেছিলাম আজকের খেলায় জিতলে কোন ফকিরকে দশ টাকা দেব। কিন্তু তা আর হল না, বলল শিমুল।
কিশোর কবি রানা এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল। কিন্তু বেশিক্ষণ চুপ করে বসে থাকা তার স্বভাবের বাইরে। রানা যা বলে তা যথাসম্ভব ছড়ার ভাষাতেই বলতে পছন্দ করে।
‘হয়েছে বোধ হয় ভুল,
ইচ্ছে করে রাগের চোটে
ছিঁড়ি মাথার চুল, বলল রানা।
আপনাকে আর কষ্ট করে চুল ছিঁড়তে হবে না। দরকার হলে আমরা সবাই মিলে টেনে তোর মাথার সব চুল ছিড়ে ফেলব। খেলায় হেরেছি, সেই দুঃখে বাঁচি না, আর উনি এসেছেন উনার কবিতা নিয়ে, রেগে বলল মিঠু।
তবে তোরা যে যাই বলিস, আজকে শিপলু দেখিয়ে দিয়েছে, খেলা কাকে বলে? শুধু মনা পাহাড়টা ঝামেলা না বাঁধলে আমরা একটা গোল শোধ করতে পারতাম। ক্ষোভের সঙ্গে বলল অজয়।
মাথা নিচু করে এতক্ষণ বসেছিল দলনেতা খালেদ। সে বলল, পুরো খেলাটাই ছিল ষড়যন্ত্র। মনা যখন শিপলুর চশমা খুলে ফেলে দিল, তখন রেফারী ব্যাটা চুপ করেছিল। বলে কিনা, কোন শারীরিক আঘাত লাগেনি, পেনাল্টি কেন দেবে? অন্তত ফাউল তো দিতে পারত!
আ-আ- আমার মনে হয় রেফারী ব্যাটা টা-টা-টাকা খেয়েছে ডেঞ্জার দলের কাছ থেকে। শিশিরের কণ্ঠেও রাগ।
‘কিরে শিপলু, তুই কিছু বলছিস না?’ বলল শিমুল।
‘কি আর বলব, বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।’ মুখ ভার করে বলল শিপলু।
রানা ঘড়ি দেখে বলল,
‘সময় গিয়েছে অঢেল
শেষ হয়েছে বিকেল
কালকে খেলিস বল,
এখন বাসায় চল।’
ঠিক এই সময় মসজিদ থেকে মাগরিবের আযান ভেসে এল, সবাই যার যার বাসার দিকে রওনা হল।
পরদিন সকাল সাড়ে এগারটা। স্কুলের মাঠে সবাই খেলাধুলা করছে। শিপলু, রানারা টেনিস বল দিয়ে ‘বোমবাস্টিং’ খেলছে। খেলাটা খুবই মজার। বল দিয়ে যত জোরে পারা যায় অন্যের গায়ে আঘাত করা। কিন্তু বল যার হাতে থাকে তার শরীর যদি কেউ ছুঁয়ে দেয় তবে তাকে আঘাত করা যায় না। খেলা যখন তুঙ্গে ঠিক তখনই ড্রিলস্যার বাঁশি বাজালেন। সঙ্গে সঙ্গে মাঠের সব খেলাধুলা বন্ধ হয়ে গেল। ছাত্ররা সবাই লাইন দিয়ে পিটির জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছে।
স্যার-আপারা সবাই সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। শুরু হয়ে গেল। আর ভাল লাগে না. প্রতিদিন কড়া রোদে পিটি করা অসম্ভব। কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলল মাসুদ।
কবে যে এই ক-ক-কষ্ট থেকে মু-মু-মুক্তি পাব, আল্লাহই ভাল জানেন, বলল শিশির।
মোটাসোটা রানা রোদে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, রানার একটা বদভ্যাস হল, যা বলে তা কবিতার ভাষায় বলে। এজন্য ক্লাস এইটের সকল ছেলেরা তাকে কবি উপাধিতে ভূষিত করেছে।
‘শোন সবাই কথা
করছে মাথা ব্যথা
অনেক কষ্টে বলল রানা। কড়া রোদে তার গোলগাল ফর্সা চেহারাটা লাল হয়ে গেছে।
এই রোদের মধ্যে পিটির হাত থেকে রক্ষা পেলে কোন ফকিরকে পাঁচ টাকা দিয়ে দেব। বলল শিমুল।
আরে! আরে! রানা এমন করছে কেন? মনে হয় মাথা ঘুরে পড়ে যাবে, চিৎকার দিয়ে বলল অজয়।
লাইনের মধ্যে হৈ চৈ শুনে ড্রিলস্যার লালমিয়া ছুটে আসলেন। ছেলেরা সবাই পিটি থামিয়ে দিল।
কি হয়েছে এখানে? এত চেঁচামেচি কিসের? মেঘগর্জন করে উঠলেন লাল মিয়া স্যার
শিপলু তাড়াতাড়ি বলল, স্যার রানার মনে হয় গরমে মাথা ঘুরছে।
রানা কোনমতে স্যারের দিকে তাকাল। ওর চেহারা দেখে এখন যে কারও মন খারাপ হয়ে যাবে। ধীরে ধীরে বলল,
‘অনেক করেছি চেষ্টা,
কিন্তু পাচ্ছে তেষ্টা,
যাবোই বোধহয় মরে
যাচ্ছি আমি পড়ে’
বলেই দু’চোখ উল্টে ঠাস করে পড়ে গেল রানা। স্যার চিৎকার করে বললেন, সবাই মিলে ধরে ওকে ক্লাসে নিয়ে চল।
হেডস্যার সঙ্গে সঙ্গে ঘোষণা দিলেন, ছাত্ররা, তোমরা সবাই যার যার ক্লাসে চলে যাও। ক্লাস এইটের একজন ছাত্রের শরীর খারাপ করেছে। লাইন ধরে ক্লাসে চলে যাও, হৈ চৈ করবে না কেউ।
ছেলেরা পিটির হাত থেকে রক্ষা পাবার আনন্দে হৈ চৈ করতে করতে যার যার ক্লাসে গেল। রানাকেও সবাই ধরাধরি করে ক্লাসে নিয়ে গেল। শাহেদ দৌড়ে গিয়ে টিফিন রুম থেকে এক গ্লাস পানি নিয়ে এসেছে। অনেকক্ষণ পানির ছিটা দেওয়ার পর ধীরে ধীরে চোখ খুলল রানা। চোখ খুলেই এদিক-ওদিক কি যেন খুঁজতে লাগল।
কি খুঁজছিস রানা অমন করে? জিজ্ঞেস করল মিঠু।
রানা অচেনা চোখে তাকাল মিঠুর দিকে। তারপর জোরে জোরে নিজের লেখা ‘ইচ্ছা’ কবিতাটি পড়তে লাগল।
‘ইচ্ছে করে উড়াই ঘুড়ি,
ঘুড়ি হল সিঙ্গাপুরী।
এনেছে কে? দাদা,
হঠাৎ দেখি কাদা,
কাদায় পড়ে গড়াগড়ি,
ঠান্ডা লেগে জুরে মরি।
দেখতে এল সুমন,
কাজের বেলায় ঠনঠন।
দু’জন মিলে যাব মেলা,
দুপুর শেষে বিকেল বেলা।
ইচ্ছে করে মেলায় ঘুরি,
এই ‘ঘুরি’ নয় সিঙ্গাপুরী।
অতিরিক্ত গরমে মনে হয় রানার ব্রেনে চাপ পড়েছে। হেডস্যারকে বলে ওকে বাসায় দিয়ে আসলেই ভাল হয়। কি বলিস তোরা? বলল শিপলু।
সবাই শিপলুর কথায় একমত হল। ক্লাস ক্যাপটেন জিয়া একটা দরখাস্ত লিখল রানার কয়েকদিনের ছুটির জন্য। হেডস্যার দরখাস্ত মঞ্জুর করলেন।
মিঠু রানাদের পাশের বাসায় থাকে। সে রিকশায় করে রানাকে বাসায় দিয়ে আসল। ক্লাস চলাকালীন সময়ে স্কুল দপ্তরী মতিভাই এসে একটা নোটিশ শুনিয়ে গেল।
“
অনিবার্য কারণবশতঃ অত্র বিদ্যালয়ের সকল ছাত্র/ছাত্রীদেরকে জানানো যাইতেছে যে, বিদ্যালয়ের কার্যক্রম আরম্ভ হইবার পূর্বের পিটি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হইতেছে। ইহা শুধু গরমের সময় পর্যন্ত স্থায়ী হইবে।
“
সবাই আনন্দে চিৎকার করে উঠল। স্কুল ছুটি হলে সবাই মিলে রানার বাসায় গেল। আন্টি দরজা খুললেন, সবাই রানার রুমে গেল। রানা খাটে শুয়ে ফ্যানের দিকে তাকিয়ে আছে। শিশির রানার মাথার পাশে গিয়ে বসল।
কিরে, এখন কে-কে-কেমন আছিস ক-ক-কবি? মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে জিজ্ঞেস করল শিশির।
রানা যেমনভাবে উপরের দিকে তাকিয়ে ছিল তেমনিই তাকিয়ে রইল। শিশিরের কথা যেন শুনতেই পায়নি। জোরে জোরে আবৃতি শুরু করল,
‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে।
পার হয়ে যায় গরু পার হয় গাড়ি…
সবাই অবাক চোখে তাকিয়ে রইল রানার দিকে। শিপলু বলল, তুই এখন বুঝতে পারছিস না রানা, কত বড় উপকার তুই আমাদের সবার জন্যে করেছিস। তোর জন্যই কড়া রোদের পিটির হাত থেকে সবাই রক্ষা পেয়েছে। We are really proud of you.
রানা এবার তাকালো শিপলুর দিকে। বলল,
‘আপনাকে বড় বলে বড় সেই নয়,
লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়।’
অজয় বলল, নাহ্, ওর ব্রেন সার্কিটের ফিউজ ছিঁড়ে গেছে। এখন কোন কথাই বুঝবে না ও. তারচে ভাল আমরা এখন সবাই চলে যাই। কালকে এসে একবার মোটা কবিকে দেখে যাব।
শাহেদ রানার পাশে গিয়ে বসল। তারপর সবাইকে অবাক করে দিয়ে কাঁদতে শুরু করল। কান্না ভেজা কন্ঠে বলল, রানা, তুই আমাদের খুব কাছের বন্ধু। তাড়াতাড়ি ভাল হয়ে যা ভাই। তোকে আবুল চাচার মিষ্টির দোকান থেকে গরম গরম জিলাপী খাওয়াব। কাঁদতে কাঁদতে দু’হাতে মুখ ঢাকল যে।
রানা ভাবলেশহীন ভাবে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল, তারপর গুণ গুণ করে নিজের লেখা, ‘মিষ্টান্ন। ছড়াটা বলতে লাগল।
দোকান ভরে মিষ্টি,
অদ্ভুত এক সৃষ্টি।
পোড়াবাড়ির চমচম,
খাবে। সবাই কম কম।
বগুড়ার দৈ,
চিড়া, মুড়ি কৈ?
মিষ্টি মধুর সন্দেশ
সবাই মিলে খাব বেশ
আরো আছে গজা
খেতে ভীষণ মজা,
এবার খাব রসমালাই,
আসছে বাবা চল পালাই।
মিঠু শাহেদকে টেনে দাঁড় করাল। পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছে দিল। এমন সময় ঘরে আন্টি ঢুকলেন। হাতে একটা প্লেটে সাজানো অনেকগুলো পাটিসাপটা পিঠা।
তোমরা বস বাবারা, পিঠা খাও। রানার কি হয়েছে তোমরা কেউ বলতে পারো? বাসায় আসার পর থেকে চুপচাপ শুয়ে আছে। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে আন্টি বললেন।
শিপলু তাড়াতাড়ি বলল, জ্বীনা আন্টি, তেমন কিছুই হয়নি। শরীরটা একটু খারাপ। করেছিল। আমরা হেডস্যারকে বলে কয়েকদিনের ছুটি মঞ্জুর করিয়েছি। কয়েকদিন বিশ্রাম নিলেই ওর শরীর ঠিক হয়ে যাবে।
তাড়াতাড়ি ভাল হলেই চিন্তা যায়, বলতে বলতে আন্টি চলে গেলেন। সবাই বসল রানার পাশে, পিঠা নিল প্রত্যেকে।। খেতে খেতে সবাই রানার বিষয়ে কথা বলতে থাকল।
ব্যাটা কবি একদিকে উপকার করেছে। অন্যদিকে সবাইকে সমস্যায় ফেলেছে, বলল অজয়।
শিশির লাফ দিয়ে উঠে বলল, ইউরেকা।
পে-পে-পেয়েছি। এই রোগের চি-চি-চিকিৎসা আমি পেয়েছি। কাঁটা দিয়ে কা-কা-কাটা তুলতে হবে।
তার মানে। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল শিমুল।
তা-তা-তার মানে খুবই সোজা। রোদের মধ্যে শ-শ-শরীর খারাপ হয়েছে, আবার রোদই পারবে ওকে ভা-ভা-ভাল করতে। দু’ঘন্টা রো-রোদে ফেলে রাখলে স-সব ঠিক হয়ে যাবে। বলল শিশির।
তুই মানুষটা হালকা-পাতলা, কিন্তু তোর বুদ্ধি যে এত মোটা তাতো জানতাম না। তোর কথামত চিকিৎসা করলে ওকে হেমায়েতপুর পাঠাতে দেরী লাগবে না। রেগে বলল মাসুদ।
ধমক খেয়ে চুপসে গেল শিশির। খালেদ বলল, চল এখন যাওয়া যাক। কাল এসে একবার দেখে যাব। সবাই কম থেকে বেরুতে যাবে, এমন সময় পিছন থেকে
রানার কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
‘এবার খাবো জিলাপী
করিস না বরখেলাফী।’
সবাই অবাক হয়ে পিছনে তাকাল। দেখল রানা পেটে হাত দিয়ে হাসছে। হাসতে হাসতে হেঁচকি উঠে গেল। তবু হাসি থামে না, প্রত্যেকে একজন আরেকজনের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল।
কি ব্যাপার রানাটা অমন করে হাসছে কেন? অবাক হয়ে গেছে খালেদ।
রানা হাসি থামিয়ে সবার দিকে তাকাল। মুচকি হেসে বলল, কি ভেবেছিলি তোরা, অ্যা? রানার ব্রেন আউট ইয়ে বেচারা তো গায়া কাছে। আরে অ্যাক্টিং করেছিলাম, পাকা অভিনয়। আর তোরা কিনা চিন্তায় চিন্তায় অস্থির হাঃ হাঃ হাঃ।
সবাই হতবাক হয়ে রানার দিকে তাকিয়ে আছে। কারও মুখে কোন কথা নেই। অজয় প্রথমে মুখ খুলল, ফাজলামো করার আর জায়গা পেলি নাঃ আমরা কি দুশ্চিন্তাতেই না পড়েছিলাম।
শিপলু ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল রানাকে
চমৎকার অভিনয় করেছিস করি। চমৎকার। এবারের বার্ষিক নাটকে তুই মেইন চরিত্রে অভিনয় করবি। হাসতে হাসতে। বলল মিঠু।
আরে, কবি ব্যাটাতো ছুপা রুস্তম বের হল। আমরা ভেবেছিলাম শরীরের মতো ওর বুদ্ধিও এক সাইজের কিন্তু এখন দেখছি আমাদের ধারণা ভুল ছিল। মাসুদের ঘোর এখনও কাটেনি।
উপকার তো তোরা আমার জন্যও করেছিস। না চাইতেই কয়েকদিনের ছুটি পাইয়ে দিয়েছিস। এখনও মুচকি হাসছে রানা।
যাক যা হয়েছে ভা-ভা-ভালোর জন্যই হয়েছে। আমাদের স-স-সবারই উপকার হয়েছে। হাসতে হাসতে বলল শিশির।
ঘড়ি দেখল অজয়। বলল, অনেক দেরী হয়ে গেছে। আরেকটু পরে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। এখনকার মত তাহলে আমরা আসি। কালকে বিকালে মাঠে আসিস।
সবাই যাবার জন্যে উঠে দাঁড়াল। শাহেদ বলল, হ্যাঁ, আমাদের সিরিয়াস হয়ে প্র্যাকটিস করতে হবে। সামনে টুর্নামেন্ট আছে।
রানা সবাইকে গেট পর্যন্ত পৌছে দিল।
এক সপ্তাহ পর। সবাই ক্লাস রুমে বসে আছে। ক্লাস এখনও শুরু হয়নি। সবাই কথা বলছে
সব হয়েছে লাল মিয়া স্যারের জন্য কিভাবে হেডস্যারের সঙ্গে যুক্তি করে আমাদের খেলা বন্ধ করে দিল। বলে কিনা, রোদের জন্য যখন পিটি করা যাবে না, তখন মাঠে খেলাও যারে না। কি চালু রে বাবা। বলল শিপলু।
আসলে স্যা-স্যা-স্যারের মন বলতে কিচ্ছু নেই। ম-ম-মনে কোন মায়া দয়া নেই। বা-বা-বাচ্চাদের মনে কষ্ট দিলে ফেরেশতারাও না-না-নারাজ হন। মনের ক্ষোভ প্রকাশ করল শিশির। এতো সাধের বোমবাস্টিং খেলা বন্ধ করে দেওয়াতে তার মনও খারাপ হয়ে গেছে।
মাসুদ বলল, যখন যেটা করার সময় তখন সেটা করতে হয়। যেমন-১২টায় ক্লাস শুরুর আগে খেলতে হয় বোমবাস্টিং, বিকেলে স্কুল শেষে খেলতে হয় ফুটবল, নয়ত ক্রিকেট। এই রুটিন বদলে গেলে কেমন লাগে বলত?
এই সময় ক্লাসে খসরু স্যার প্রবেশ করলেন। হাতে ইয়া বড় বেত আর নাম ডাকার খাতা। খসক স্যার গণিতের শিক্ষক। স্যারের উচ্চতা মাঝারি। শরীরটা প্রচন্ড রকমের মোটা, যতটুকু কালো হলে একজন লোককে দেখতে খারাপ লাগে স্যার ঠিক ততটাই কালো স্যারের গোঁফ খানার জুড়ি মেলা ভার। মোটা গোঁফখানা কিঞ্চিৎ উপরের দিকে উঠে গেছে। চেহারার মতো স্যারের মোজাজও ভংঙ্কর। পড়া না পারলে দু’হাত খুলে মারতে স্যার মোটেও কার্পণ্য করেন না। বিশাল বেতটা নিয়ে যখন মারার জন্য প্রস্তুত হন তখন ছাত্রদের কাছে মনে হয়, সাক্ষাৎ যমদূত মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে হাজির হয়ে গেছে।
স্যার নাম ডাকার আগে বাড়ীর কাজের খাতা যার যার সামনে খুলে রাখতে বললেন। নাম ডাকা শেষে স্যার খাতা দেখা শুরু করলেন।
যারা যারা অঙ্ক করে আনিনি তারা বেঞ্চের উপরে দাঁড়া। ভয়ঙ্কর আওয়াজে বললেন স্যার।
দশবার কান ধরে উঠবস্ করবি…..
শিশির, রুমন, টিনু, সজীব বেঞ্চের উপরে দাঁড়িয়ে পড়ল। স্যার খাতা দেখা শেষ করে ওদের কাছে গেলেন। স্যার মারার আগে কৈফিয়তের সুযোগ দেন। প্রথমে গেলেন রুমনের কাছে।
কি ব্যাপার, রুমন? তোকে তো ভাল ছেলে বলেই জানতাম। H. W. করিস নি কেন? জিজ্ঞেস করলেন স্যার।
স্যার, আমি দেশ থেকে এসেছি গতকাল রাতে। তাই বাড়ীর কাজ জানতে পারিনি। রমন উত্তর দিল।
ঠিক আছে দশবার কান ধরে উঠবস কর। কিরে টিনু, তুই বাড়ির কাজ কেন করিস নি? স্যার টিনুকে জিজ্ঞেস করলেন।
স্যার, আমার জ্বর হয়েছিল। তিনদিন পরে আজকেই প্রথম এসেছি, স্যার। টিনু তাড়াতাড়ি বলল।
ও হ্যা, হ্যা তোর জ্বরের কথা আমি শুনেছিলাম। ঠিক আছে, তুই বসে পড়। রুমন তুইও বসে পড়। তা শিশির তুই কেন বাড়ির কাজ করিসনি? শিশিরকে জিজ্ঞেস করলেন স্যার।
স্যার, আ-আ-আমার খা-খা-খাতা খু-খুঁজে পাচ্ছিলাম না, তাই ক-ক-করতে পা-পারিনি। স্যারের হাতে বেত দেখে শিশিরের তোতলামি বেড়ে গেল।
স্যার কটমট করে তাকালেন সজীবের দিকে। বললেন, তোর অজুহাতটা কি শুনি?
সজীব উত্তর দেবার জন্য প্রস্তুত হয়েই ছিল বলল, স্যার গতকাল আমাদের বাসায় কারেন্ট ছিল না।
শুধু তোদের বাসাতেই ছিল না, নাকি পুরো এলাকাতেই ছিল না?
খসরু স্যারের মেজাজ গরম হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সজীবের ড্যামকেয়ার হাব। কারণ সজীব খসরু স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ে।
স্যার, পুরো এলাকাতেই ছিল না। সজীব তাড়াতাড়ি জবাব দিল। তোদের মহল্লাতে কোন দোকান ছিলনা? সেখানে মোমবাতি পাওয়া যায়। স্যারের চেহারা দেখে বুঝা যাচ্ছে, যে কোন মুহূর্তে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।
স্যার, দোকান ছিল, কিন্তু গিয়ে দেখি মোমবাতি সব বিক্রি হয়ে গেছে। ভয়ে ভয়ে বলল সজীব, এখন সে বুঝতে পারছে স্যারের মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে।
তোরা দু’জন আমার কাছে আয়। কি করে খাতা হারিয়ে যায় আর কি করে মোমবাতি খুঁজে পাওয়া যায় তার ঔষধ আমার ভাল করে জানা আছে। হুঙ্কার দিয়ে। উঠলেন স্যার।
পরবর্তী চার মিনিট ওদের উপর দিয়ে ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেল। ক্লাস ভর্তি ছাত্ররা কেউ বুঝতেই পারল না কি হচ্ছে। সবাই শুধু দেখল, মেশিনের মত স্যারের বেতসমেত হাত উঠছে আর নামছে। ছাত্ররা ভয়ে সব বোবা হয়ে গেছে।
এদের দু’জনের পরিণতি দেখে তোদের কিছু শিক্ষা হয়েছে আশা করি। এ মারের কথা স্মরণে থাকলে আগামীকাল থেকে বাড়ীর কাজ করে আনতে কেউ ভুলবি না।। হাত ঝাড়তে ঝাড়তে বললেন স্যার।
শিশির গিয়ে মাসুদের পাশে বসল।। ক্লাসের সবার মন খারাপ হয়ে গেছে। সবাই বার বার শিশিরকে দেখছে, সে এখনও ভয়ে কাঁপছে। আসলেই কাল রাতে সে বাড়ীর কাজের অংক খাতা খুঁজে পায়নি। কিন্তু এসব কথা স্যারটা বুঝতে চায়না, তাদের কাছে সবই অজুহাত মনে হয়।
কিরে খুব কি লেগেছে? ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল মাসুদ।
শিশির কোন জবাব দিল না, শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
পরশুদিন শবেবরাত মনে আছে? জিজ্ঞেস করল মাসুদ।
না, ম-ম-মনে নেই।
শোন, নাতা নিবি? আমার কাছে অনেক। আছে।
না-না-নাতা কি?
ছোট ছোট বোম। এগুলো শবেবরাতে ফুটাতে হয়।
জানতাম নাতো।
তুই একটা বৃদ্ধ। শোন, আমি তোকে অনেক গুলি দিব। কোন টাকা লাগবে না।
আ-আ-আচ্ছা, দিস তাহলে। কিন্তু ফু-ফুটাব কখন?
এসব রাতে ফুটাতে হয়। আমরা সবাই। মিলে ফুটাব।
স-স-সবাই মিলে ফুটাবি মানে?
সব জানতে পারবি, ব্রাদার।
আ-আচ্ছা, ঠিক আছে। হাসি ফুটল শিশিরের মুখে। শিশিরকে হাসতে দেখে মাসুদও হেসে দিল।
(চলবে)
প্রকাশকাল : সেপ্টেম্বর ২০০০



