হলুদ পাখির সাথে একটা টিয়া পাখিও এসেছে কামরাঙা গাছে। গত দু’দিন হলো অনেক কামরাঙা পেকেছে। কামরাঙাগুলো বেশ ভালো। তুবা মণির মেঝো মামা লাগিয়েছিল গাছটি। জেলা কৃষি অফিস থেকে কিনে আনা ভালো জাতের কামরাঙা। বছর চারেক হলো গাছটির বয়স। প্রতিটা ডালেই ঝুমঝুম করছে পাকা পাকা কামরাঙা। তুবা গ্রীষ্মের ছুটিতে এসেছে ওর নানুবাড়ি বেড়াতে। আম কাঁঠালের সাথে অনেক ফলের সমাহার নানুবাড়িতে। ছোট মামা তুবার খুব পছন্দের মানুষ। কারণ ছোট মামা তার জন্য নিয়মিত চকলেট ও পুতুল কিনে দেয়। হলুদ পাখি আর টিয়া দেখে তুবার খুব লোভ হলো পাখি দু’টো ধরতে। কিন্তু উপায় নেই। ছোটমামা বলেছেন পাখি ধরা নিষেধ। তবে আমি তোমাকে ওদের খেলার সাথী বানিয়ে দিতে পারবো। ওকে তাই হবে, মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় তুবা মণি।
একদিন ছোটমামা ছোট সুন্দর দু’টি বাঁশের খাঁচা কিনে আনলেন। ছোট ছোট বাটিতে সাজানো কাউনের চাল, গমের ছাঁট এবং পানি দেওয়া হলো। এরপর ঝুলিয়ে রাখলেন কামরাঙা গাছে। খাঁচা দু’টোর মাঝ বরাবর রাখলেন দু’টা লাল পুতুল। একটা বউ পুতুল একটা বর পুতুল। তুবার খুব পছন্দ হলো পুতুল দু’টো। সকালে টিয়া ও হলুদ পাখি আসে কামরাঙা গাছে। খাঁচা দেখে প্রথমে ভয় পেয়ে যায় কিন্তু যখন দেখলো দু’টো পুতুল রাখা আছে তখন তারা সাহস পেয়ে খাঁচায় ঢুকল। মনের আনন্দে খেতে থাকল কাউন ও গমের কুড়া। খাবার খায়। লাল পুতুল দেখে পাখি দু’টি তাদের ঠোঁট দিয়ে আলতো করে আঁচড়াতে থাকে। মনে হয় আদর করছে। তুবামনি বাগানের দোলনায় বসে এমন দৃশ্য দেখে খুব খুশি হয়। আনন্দে নেচে ওঠে। শহুরে ইটপাথরের বাড়িতে এমন দৃশ্য কল্পনাও করেনি সে। কামরাঙা গাছটি ছোট হওয়ায় খুব কাছ থেকেই ধরা যায় ডালগুলো। তাই খাঁচাও হাতের নাগালেই রাখা। প্রতিদিনের মত হলুদ পাখি ও টিয়া পাখি আসে কামরাঙা গাছে । সকাল হতে দেরি কিন্তু তাদের হাজির হতে দেরি হয় না। তুবা ঘুম ভেঙেই দেখে ইষ্টিকুটুম হাজির। ছোটমামা আদর করে ওদের নাম দিয়েছেন ইষ্টিকুটুম।
একদিন বিকালে তুবা দেখে হলুদ পাখিটি তার খাঁচার পুতুলটি নিয়ে যাচ্ছে টিয়া পাখির খাঁচায়। আবার টিয়া পাখি তার খাঁচার পাখিটি নিয়ে যাচ্ছে হলুদ পাখির খাঁচায়। যেন বর-বউ খেলা। বউ সাজিয়ে শ্বশুর বাড়ি নিয়ে যাওয়ার পালা। এসব দেখে তুবামণি তার নানুকে ডাকে। সবাই দেখে তো হতবাক। কাউনের চাল দিতে গেলে তুবার কাঁধে এসে বসে টিয়া। আস্তে করে ধরতে গেলে ফুড়ুৎ করে উড়ে যায়। আবার আসে খাবারের লোভে। এভাবেই গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব। ইষ্টিকুটুমের সাথে তার খুব ভাব। খাবার দেয়া হাতের ওপর বসানো পালক নেড়ে আদর করা খুব প্রেম ওদের সাথে। আস্তে আস্তে ছুটি শেষ হয়ে যায় তুবামণির। বাবা বলেছেন আগামী শনিবার চলে যেতে হবে। শুনেই তো মন খারাপ। মুখ গোমড়া করে বসে থাকে সন্ধ্যা থেকেই। ছোট মামা জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে তোর। কোনো উত্তর নেই মুখে। নানু বললেন ওরা তো চলে যাবে তাই। এ কথা শুনে তুবা ভ্যাত করে কেঁদে ওঠে। মামা কাছে এসে আদর করেন। ফোঁপাতে ফোঁপাতে কেঁদে বলে আমি ইষ্টিকুটুমকে নিয়ে যাব। মামা বললেন— না। ওরা এখানেই থাকবে। ওদের বন্দী করা যাবে না। তুমি এর পরে এলে আবার ওদের এখানেই পাবে।
— সত্যি তো? হ্যাঁ সত্যি, এক’শবার সত্যি।
সকাল আটটায় ট্রেন। ফজরের পরেই সবাই উঠে গেল। ব্যাগ গোছানো শেষ। নাশতা সেরে নিয়ে সবাই বের হচ্ছে। ইষ্টিকুটুম ঠিক আগের মতই কামরাঙা গাছে এসে হাজির। তুবার কোমল হাতের পরশে তারা যেন মধুর ভালোবাসা পেয়েছে। যা ওদের ভাবতে শিখিয়েছে। আজ সকালে তুবামণির মন খারাপ দেখে তারাও বুঝতে পারল কিছু একটা হয়েছে ওর। শেষবারের মতো খাবার খাইয়ে আদর করে দিয়ে বের হচ্ছে তুবামণি। কিন্তু কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না ইষ্টিকুটুম। সব সময় তার মাথার ওপর ওড়াউড়ি করছে ওরা। সময় হয়ে এলো বের হবার। বাসার কাছেই রেলস্টেশন। ভ্যানে করে যেতে হয় স্টেশনে। নানুভাই সবাইকে বিদায় দিতে স্টেশনে যাবেন। সবাই একসাথে বাড়ির উঠানে এসে থামল। তারপর বিদায় নিয়ে রাস্তায় গিয়ে ভ্যানে উঠল। সাথে পিছু নিলো ইষ্টিকুটুম। যতই ভ্যান জোরে চলতে থাকে ওরাও তার পিছু পিছু জোরে চলতে থাকে উড়ে উড়ে। সবাই দেখে অবাক। আস্তে আস্তে ভ্যান পৌঁছে গেল ষ্টেশনের প্লাটফর্মের কাছে। আর ইষ্টিকুটুম ষ্টেশনের একটি কাঁঠাল গাছের ডালে গিয়ে বসলো। ভেঁপু বাজিয়ে ট্রেন হাজির হতেই সবাই হুড়োহুড়ি করে ট্রেনে উঠে বসলো। ততক্ষণে তুবামনিও জানালার পাশে গিয়ে দেখতে লাগলো ইষ্টিকুটুমের উড়াউড়ি আর খোঁজাখুঁজি। তারা কাকে যেন খুঁজছে পাখা ঝাপটিয়ে ঝাপটিয়ে। লম্বা হুইসেলে ট্রেন চলতে থাকল সবুজ ধানক্ষেতের বুক চিরে শহরের দিকে। আর তুবামণি ফেলে এলো তার খুব কাছের আদরের দুই বন্ধু ইষ্টিকুটুমকে।
প্রকাশকাল : সেপ্টেম্বর ২০১৮


