পূর্বকথা : এই গল্পটি গ্রিক গল্পকথক ঈশপের। তার জীবনকাল ছিল খ্রীষ্টপূর্ব ৬২০ থেকে ৫৬৪ সাল পর্যন্ত। ‘ঈশপ’স ফেবলস’ নামে তার ভুবন বিখ্যাত গল্পের বই থেকে নেয়া এটি। অবশ্য গল্পগুলো তিনি নিজে লিখে যাননি। তাঁর গল্পগুলো মানুষের মুখে মুখে কথিত হয়ে কালক্রমে লৈখ্যরূপ নেয়। বন্য পশু-প্রাণী ও জীব-জন্তুদের নিয়েই তাঁর গল্পবলা। মানুষের দোষগুণ ও নানা বৈশিষ্ট্য তিনি এসব প্রাণীদের মাধ্যমে চরিত্রায়ন করেছেন। তাঁর এসব গল্প শিশুদের জন্য হলেও এর উপসংহারে থাকতো মূল্যবান সব নীতিকথা। এমনি একটি গল্পকে উপজীব্য করে লেখা এই গল্পটি। একটি বিড়াল ও একটি চড়ুই পাখি এই গল্পের দু’টি চরিত্র।
বিড়ালটি ছিল খুবই আদুরে। নিভৃত পল্লীর এক কৃষকের পোষা বিড়াল সে। অন্য বিড়ালের মতো ভবঘুরে নয়। সারাদিন তাকে ঘুরে ঘুরে খাবার জোগাড় করতে হয় না। খিদে পেলেই কৃষকের বাড়ির খাবার খেয়ে পেট ভরে তার। বিড়ালেরা সাধারণত অলস প্রকৃতির। এই বিড়ালটিও ছিল অলস। বলতে গেলে আলস্যের ঢেঁকি। নিজের খাবারটা তো আর নিজেকে জোগাড় করে খেতে হয় না। তাই, শুয়ে বসে আর ঘুমিয়ে থাকে সারাক্ষণ। বাড়ির উঠোনে, বারান্দায় বা দুয়ারে সারাদিন ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই কাটে তার দিন।
এক শীতের সকালে উঠোনে শুয়ে শুয়ে রোদ পোহাচ্ছিল বিড়ালটি। সকালের রোদ গায়ে তার আদুরে পরশ বুলিয়ে দিচ্ছিল। এমন সময় এক দুষ্টু চড়ুইপাখি এসে বিরক্ত শুরু করে। কিছুতেই ঘুমোতে দেয় না তাকে। কোত্থেকে ফুড়ুত করে উড়ে এসে বিড়ালের গায়ের ওপর এসে নাচতে থাকে। বিড়াল আড়মোড়া ভাঙতেই চড়ুইপাখিটা ফুড়ুত করে উড়ে যায়। কিছুক্ষণ পর আবার এসে বিড়ালের লেজে একটি ঠোকর দেয়। বিড়াল লেজ নাড়ালেই আবার ফুড়ুত। উড়ে গিয়ে বসে পাশের কাঁঠাল গাছের ডালে। কিছুক্ষণ পর আবার উড়ে এসে বিড়ালের কানে চিমটি কাটে।
চড়ুই পাখির এমন দুষ্টুমিতে ভীষণ বিরক্ত হয় বিড়াল। কিন্তু কিছুই করার নেই। ধরতে পারে না। ধরতে গেলেই ফুড়ুত। উড়ে গিয়ে বসে কাঁঠাল গাছের ডালে। সেখান থেকে আবার উড়ে এসে লেজে ঠোকর দিয়ে যায়। বিড়াল যতোই বিরক্ত হয়, চড়ুইপাখিটি ততোই মজা পায়। এভাবেই চলতে থাকে বিড়ালের সাথে পাখিটির দুষ্টুমি।
সেদিনও বিড়ালটি বাড়ির উঠোনে গা এলিয়ে শুয়েছিল। এমন সময় পাখিটি এসে দুষ্টুমি শুরু করে। উড়ে এসে গায়ে আঁচড় কাটে, নয়তো লেজে ঠোকর মারে। অর্থাৎ রীতিমতো অস্থির করে তোলে বিড়ালকে। আরামের আয়েশ মিটিয়ে দেয় সে বিড়ালের।
চড়ুই পাখির এমন দুষ্টুমি সহ্য করতে না পেরে বিড়াল একদিন খপ করে ধরে ফেলে পাখিকে। কথায় বলে না, চোরের দশদিন তো গেরস্তের একদিন। বিড়ালেরও সেই একদিন এসে যায়। ধরেই রাগে গরগর করতে থাকে বিড়াল। যেন এখনই মেরে ফেলবে সে। চড়ুইপাখিও ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। বিড়ালের দু’পায়ের নিচে প্রায় চ্যাপ্টা হয়ে পড়ে থাকে সে। আর করুণ স্বরে মিনতি করতে থাকে। ‘মেরো না আমায়, বন্ধু। আর দুষ্টুমি করবো না আমি। এবারের মতো ছেড়ে দাও, প্লিজ।’
বিড়াল ভাবে ছোট্ট এক চড়ুইপাখিই তো। কী হবে মেরে। ছেড়েই দিই। পাখিটির কী আকুতি মিনতি। কী সুন্দর করে টিউ টিউ করছে। আহারে, মরণের কী ভয়! এসব ভাবতে ভাবতে বিড়াল বলে, ‘বেশ তো! নেহ। ছেড়ে দিলাম তোমাকে। ফের যদি দুষ্টুমি করো, একেবারে কামড় বসিয়ে দেবো গায়।’
ছাড়া পেয়েই চড়ুই ফুড়ুত। উড়ে গিয়ে বসে সেই কাঁঠাল গাছটির শাখায়। গা ঝাড়া দেয়। পশমগুলো উলুবুলু করে নেয়। ‘উহ, মেরেই ফেলছিল আমায়। কী যে শক্তি বিড়ালের গায়।’ সেদিন আর তেমন দুষ্টুমি করে না পাখিটি। কিন্তু চড়ুইপাখির মন তো! ভুলে যায় সব। ভুলে যায় সেদিনের কথা। আবার দুষ্টুমি শুরু করে সে।
চড়ুই পাখিরা এমনিতেই দুষ্টু প্রকৃতির। তার ওপর পেয়েছে এক নিরীহ বিড়ালকে। তাকে দেখলেই চড়ুইয়ের মন উসখুস করতে থাকে। কী করে বিড়ালকে ঠোকর মারা যায়, কী করে তার ঘুম ভাঙানো যায়। এই সব চিন্তা সারাক্ষণই তার মাথায় ঘুরঘুর করতে থাকে।
সেদিন কাঁঠাল গাছের শাখা থেকে একটি ভারী হলুদ রঙের পাতা ঠোট দিয়ে ছিঁড়ে ফেলে দেয় সে নিচে। পাতাটি সোজা গিয়ে পড়ে বিড়ালের গায়ে। বিড়ালটি তখন সকালের মিষ্টি রোদে চোখ বুজে শুয়েছিল। শীতের রোদের পরশে সবেমাত্র ঘুম আসছিল তার। চড়ুইয়ের ফেলে দেয়া হলুদ পাতাটি পড়লো তো পড়লো, একেবারে বিড়ালের নাকের ওপরে এসে। চমকে উঠে বিড়াল। সুড়সুড়ি লাগে নাকে। বিরক্ত হয়ে সে খপ করে কামড়ে ধরে সে হলুদ পাতাটি। কামড় দিয়েই বুঝতে পারে, আরে এটা তো চড়ুই পাখি না, একটা কাঁঠাল পাতা! ভীষণ লজ্জা পায় সে। বিড়ালের এমন লজ্জা পাওয়া দেখে গাছের শাখায় বসা চড়ুইপাখির কী যে খুশি। খুশিতে কিছুক্ষণ ডালের ওপর লেজ দুলিয়ে নাচে। পাখিটির নাচ দেখে বিড়ালও মজা পায়। বুঝতে পারে হলুদ পাতাটি ওই পাখিটিই ফেলেছে তার নাকের ওপর।
যা হোক, আবার সে চোখ বুজে ঘুমায়। পাখিটি এবার ফুড়ুত করে উড়ে এসে বিড়ালের গায়ের ওপর নাচতে শুরু করে। বিড়াল গা ঝাড়া দেয়। পাখিটি আবার ফুড়ুত করে উড়ে চলে যায়। বিড়াল বিরক্ত হচ্ছে দেখে পাখিটি কিচির-মিচির, ইকির-পিকির শব্দ করে হাসে। চড়ুইপাখির দুষ্টুমিতে বিড়ালও মিঁয়াউ মিঁয়াউ করে। তার পর চলে যায় অন্য কোথাও ঘুমাতে। একটু আরাম করে ঘুমানো তার চাই-ই। চড়ুই পাখির জ্বালাতনে এখানে, এই কাঁঠাল তলায় আর ঘুমোনো হলো না তার।
কিন্তু চড়ুই পাখির দুষ্টুমি থামার নয়। সে ফুড়ুত করে উড়ে যায় সেখানেই। বিড়ালের কাছের কোনো গাছের ডালে গিয়ে বসে সে। তারপর শুরু হয় আবার দুষ্টুমি। ফুড়ুত করে এসে আঁচড় কেটে দেয় নাকে। বিড়াল এবার কপট রাগ দেখায়। চোখ রাঙিয়ে বলে, ‘এবার যদি ধরতে পারি, একেবারে মেরেই ফেলবো কিন্তু।’
পাখিটি হাসে। হেসে হেসে উত্তর দেয়, ‘ধরো, ধরো তো দেখি। কেমন বাহাদুর তুমি। পারবেই না ধরতে। ধরার আগেই আমি ফুড়ুত।’
এভাবেই কাটছিল চড়ুইপাখি আর বিড়ালের দিন। বিড়ালটি যেমন কৃষকের বাড়ির খাবার খেয়ে বেঁচে আছে। চড়ুই পাখিও ঠিক তাই। সেও কৃষকের বাড়ির গোলার ধান খেয়ে বেঁচে আছে। কৃষকের ঘরের চালের এক কোণে বাসা বেঁধে থাকে। তাই, পাখিটির দুষ্টুমিতে বিড়াল তেমন পাত্তা দেয় না। ভাবে, একই বাড়ির সদস্য আমরা। এমন একটু আধটু দুষ্টুমি আর কপট রাগ তো হবেই।
প্রতিদিনই তাদের মধ্যে দুষ্টুমি চলে, চলে কপট রাগ ও অভিমান। পাখিটি হয়তো বিড়ালের লেজে একটি ঠোকর দিয়ে যায়, বিড়ালও থাবা বাড়িয়ে ধরে ফেলার ভান করে। কিন্তু ধরতে গিয়েও ধরে না। পাখিটি হয়তো বিড়ালের মাথার কাছে এসে আঁচড় দিয়ে যায়, বিড়ালও তাকে মুখে ভেংচি কেটে তাড়িয়ে দেয়। নিত্যদিনই চলে এমন সব মজার লুকোচুরি। এতে চড়ুই আর বিড়ালের বন্ধুত্ব আরো গাঢ় হয়। শেষে এমন হয়, চড়ুইপাখিটি দুষ্টুমি না করলে যেন বিড়ালের ভালোই লাগে না।
একদিন হলো কী? পাশের বাড়ির এক চড়ুইপাখির সাথে এই বাড়ির চড়ুইয়ের তুমুল ঝগড়া হলো। রীতিমতো চিমটাচিমটি, হাতাহাতি, মারামারি। এক সময় এই বাড়ির চড়ুইপাখি রাগে ক্ষোভে ওই বাড়ির চড়ুইকে বলে, ‘দাঁড়াও, তোমায় দেখাচ্ছি মজা। আমার বন্ধুকে বলে দেবো। তখন বুঝবে।’
ওই বাড়ির চড়ুই বলে, ‘যা যা, বলে দিস তোর বন্ধুকে। এমন বন্ধু কতো দেখলাম।’
সত্যিই এই বাড়ির চড়ুইপাখিটি উড়ে এসে তার বন্ধু বিড়ালের কাছে নালিশ করে। বলে, ‘তুমি না আমার পেয়ারের বন্ধু? তুমি কি কিছুই দেখোনি? আমাকে যে মেরেই ফেলেছিল ওই বাড়ির চড়ুইপাখিটা।’
বিড়াল বলে, ‘কে? কে মেরেছে তোমায়? দেখিয়ে দাও আমাকে। এমন শাস্তি দেবো যে, ভুলে যাবে সে নিজের নাম!’
চড়ুই বলে, ‘ওই যে দেখছো না। ওই যে ওই বাড়ির লেবুর ডালে বসে আছে পাখিটা। আমাকে মেরেই ফেলেছিল সে। আমার হয়ে তুমি প্রতিশোধ নাও বন্ধু। ওকে দেখিয়ে দাও, কতো ধানে কতো চাল হয়। কাটুর কুটুর করে শুধু ধান খাওয়া নয়। হিসাব করে খেতে হয় ধান। আমরাও ধান খাই। তবে হিসাব করে খাই। বন্ধু, ওই বাড়ির পাখিটাকে তুমি ধরে এমন শাস্তি দিবে যেন নিজের নামটি পর্যন্ত মনে করতে না পারে সে।’
পাখিটি আবার বলে, ‘এতোটুকু উপকারই যদি না করো বন্ধু, তা হলে কীসের বন্ধু আমরা?’
বিড়াল বলে, ‘আচ্ছা, দেখাচ্ছি তবে মজা। আমার বন্ধুর গায়ে হাত তোলে! এত্তো বড় সাহস সে পায় কোত্থেকে। তুমি চিন্তা করো না, বন্ধু। বিষয়টা আমার ওপর ছেড়ে দাও।’
বিড়ালের এমন কথায় তুষ্ট হয় দুষ্টু চড়ুই। সে তখন টায়ে টায়ে থাকে, ওই বাড়ির চড়ুইটা কখন কোথায় যায়, কী করে। সব খবর সে বিড়ালের কানে পৌছে দেয়।
সেদিন ওই বাড়ির চড়ুইপাখিটা সেই একই লেবুগাছের ডালে বসে খেলা করছিল। এই বাড়ির পাখিটা তখন উড়ে এসে তার বন্ধু বিড়ালকে বলে দেয়। ‘ওই যে দেখো, বন্ধু, ওই যে লেবুগাছটির ডালে বসে আছে সে। দেখছো বন্ধু, দেখতে পাচ্ছো তো? ওই যে লেবুগাছটার ফাঁক দিয়ে তার লেজ দেখা যাচ্ছে।’
বিড়াল বলে, ‘হ্যাঁ দেখেছি। আর কিছু বলতে হবে না তোমায়।’
বিড়াল চুপি চুপি চলে যায় ওই লেবুগাছের তলে। গিয়ে সুযোগের অপেক্ষায় টায়ে টায়ে থাকে। এক সময় চড়ুই পাখিটা উড়ে উড়ে বিড়ালের একেবারে কাছাকাছি চলে আসে। আর তখনই বিড়াল এক লাফে খপ করে ধরে ফেলে পাখিটিকে। আর যায় কোথায়! পাখিটি অনেক ছটফট করতে থাকে। কিন্তু বিড়ালের থাবা থেকে কি এমন পুচকে এক চড়ুইর সাধ্য আছে ছুটে যাওয়ার? বিড়াল পাখিটিকে দুই থাবার মধ্যে ফেলে গপাগপ কামড়িয়ে খেয়ে ফেলে।
খেয়ে দেয়ে জিহবা দিয়ে নাক-মুখ চেটে নিয়ে বলে, ‘আহ্, কী যে তৃপ্তি! চড়ুইপাখির গোশতো এতো মজার! এতোদিন কেন বুঝিনি! পাখির গোশতো, এ যেন অমৃতের স্বাদ!’
পরদিন বন্ধু চড়ুইপাখিটি এসে খেলা করতে থাকে বিড়ালের সাথে। এবার আর চড়ুইপাখির দুষ্টুমি ভালো লাগে না তার। আগের দিনের গোশতের স্বাদ আজও মুখে লেগে আছে। চড়ুইপাখির গোশত, আহ্ কী যে স্বাদ। কালকের কথা মনে হলে জিবে পানি চলে আসে বিড়ালের। এক ফাঁকে বিড়ালটি খপ করে ধরে ফেলে বন্ধু চড়ুইপাখিকে। ধরেই এক কামড় বসিয়ে দেয় গায়। মুখ ভরে যায় চড়ুইয়ের রক্তে। চড়ুই পাখিটি চিৎকার দিয়ে বলে, ‘একি বন্ধু, এ কী করছো তুমি? আমাকে যে কামড় বসিয়ে দিয়েছো। রক্তে ভিজে গেছে আমার গা।’
রক্তের গন্ধে বিড়াল আরো পাগল হয়ে যায়। আরেকটা কামড় বসায়। তার পর বলে, ‘তোমার রক্তের স্বাদ এতো মধুর, বন্ধু। আগে তো বুঝিনি। এসো বন্ধু, তোমার গায়ের গোশত খেয়ে এবার তৃপ্ত হবো আমি।’
চড়ুই বলে, ‘হায় বন্ধু, এ কী বলছো তুমি আজ? তুমি না আমার পেয়ারের বন্ধু? এই ছিল তোমার মনে?’
বিড়াল বলে, ‘পেয়ারের বন্ধু, তুমিই তো দেখিয়েছো পথ। তোমাদের গায়ের গোশতের স্বাদ আমি তো আগে পাইনি কখনো! তুমিই না সেই পথ দেখালে আমায়।’ এই বলে বিড়াল আরো এক কামড় বসায় চড়ুইকে। রক্তে ভিজে যায় চড়ুইয়ের পালকগুলো। চড়ুই পাখিটি মূর্ছা যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত অসহায় দৃষ্টি মেলে চেয়ে থাকে তার পেয়ারের বন্ধুর দিকে। জ্ঞান হারানোর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত পাখিটি চেয়ে চেয়ে দেখলো তার পেয়ারের বন্ধু তার-ই গায়ের গোশত খাবলে খাবলে খাচ্ছে। মৃত্যুর আগ মুহূর্তে পাখিটি শুধু বলতে পারলো, “স্বজাতি ভাইকে শায়েস্তা করতে গিয়ে ভিনজাতের কারো সাহায্য নিও না কেউ।”
সেই থেকে বিড়ালটি সুযোগ পেলেই চড়ুই ধরে খায়। চড়ুইয়ের গোশত ছাড়া যেন তার তৃপ্তি মেটে না। ০



