
সেই বিদ্যুৎ যাওয়া রোগ থেকে ছাদের সাথে সম্পর্কটা গড়ে ওঠে। আজকাল বিদ্যুৎ চলে যাওয়া রোগের দাওয়াই সবার ঘরে ঘরে। আইপিএস, জেনারেটর ইত্যাদি ব্যবস্থা হয়ে গেছে। তাছাড়া বিদ্যুৎটাও আগের মতো যায় না। কিন্তু বিদ্যুৎ চলে গেলেই রহমান সাহেব এবং তার ছেলেমেয়েদের ছাদে ওঠার অভ্যাসটা রয়েই গেছে। রহমান সাহেবের ছাদের আকর্ষণ নানা কারণে। পেশায় আর্কিটেক্ট হলেও আকাশ রাজ্য নিয়ে তার দারুণ কৌতূহল। গাছ-গাছড়া নিয়েও কম মাতামাতি করেন না। ছেলেমেয়ে এসব পাগলামোর কিছুটা তো পাবেই। ঐ যে বললাম রহমান সাহেবের এসবকে ‘পাগলামো’ বলে আখ্যা দিয়েছেন তার স্ত্রী দীনা রহমান। অথচ তিনিও কম যান না, একটা স্বনামধন্য স্কুলের শিক্ষিকা হয়েও নানা সমাজকল্যাণমূলক কাজ করে বেড়ান। রহমান সাহেব আাবার টিপ্পনি কাটেন— নিজের খেয়ে বনের মোষ চড়ান!
মোটামুটি এই হলো রহমান সাহেবের পরিবারের গঠন-গাঠন। ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে একটু দূরে মিরপুরে তাদের বসবাস। এককালে মিরপুরকে ঢাকার বাইরের অঞ্চল হিসেবে ধরা হতো। মিরপুরে পঁচিশ-ত্রিশ বছর ধরে বাস করা লোকেরা এমনটাই বলেন। যাতায়াতের জন্য তেমন সহজ রাস্তা ছিল না। ছিল না তেমন ঘরবাড়ি। পরিবেশটা ছিল অনেকটা শহরতলীর মতো। সেই নিরিবিলি প্রকৃতির নিবিড় স্নেহ পরিবেশে বসবাসের আশায় রহমান সাহেব মিরপুরে কাঠা দশেক জমি কিনে বাড়ি করেন।
তখন চারদিকে পতিত জমি ডোবা ঝোপঝাড় ছিল বেশি। ফাঁকা ফাঁকা দু’চারটে বাড়ির মধ্যে রহমান সাহেব তিনতলা বাড়িটা তোলেন। সবাই বলত ‘হলুদ বিল্ডিং’। আত্মীয়-স্বজন বন্ধুবান্ধবরা অসহযোগিতা করেও রহমানকে বাধা দিতে পারল না। এখন সেই মিরপুরের দিকে তাকিয়ে ওরা চোখ টাটায়। রহমান সাহেব মুচকি হেসে নিজের দূরদর্শিতার বাহবা নেন। বাড়ির নাম-ড্রিম। মানে স্বপ্ন। মূলত গাছগাছড়া আর আকাশের নক্ষত্র নিয়ে যার কাজ কারবার, তার জন্য এই নিরিবিলি আশ্রয় পছন্দ হবারই কথা। দীনাও গাছপ্রেমিক বটে। তা না হলে ঔষধি, ফুল, ফল মিলিয়ে বিশাল গাছের বাগান ছাদে বেড়ে উঠতে পারত না। গাছ পরিচর্যা চায়। তাই দীনা পরচর্চায় মন না দিয়ে রহমানের গাছের যত্নে শেষ বিকেলের ঘণ্টা ব্যয় করেন। সহযোগিতায় থাকেন লেদু চাচা। লেদু চাচা সম্পর্কে একটু বলতেই হয়। লেদু চাচা রহমানের এক ছোট দাদার ছোট ছেলে। অনেক শখ করে গিয়েছিলেন লন্ডন। তখন লন্ডনে যাওয়া ছিল সহজ। যেভাবে সিলেটীরা লন্ডনমুখী হয়, সেরকম। বিয়েও করেছিরেন এক ব্রিটিশ মহিলাকে। কিন্তু তার ভাগ্য মন্দ, পারিবারিক জীবন সুখের হয়নি। অবশেষে দুঃখভারাক্রান্ত মনে দেশে ফিরে আসেন। বাড়িতে একা পড়েছিলেন। গ্রামীণ জীবন তার পছন্দ নয়। তাই ভাতিজা রহমানের কথায় চলে এসেছেন ঢাকা। আর এখানে রহমানের দুই ছেলেমেয়ে আর গাছগাছড়ার সাথে ভালোই সময় কাটে। তবে লেদুচাচাকে ‘পরগাছা’ বলা যাবে না। গুণের বহর ম্যালা। গলায় সুর আছে। সিলেটী আঞ্চলিক গান তার পেটভর্তি। লেদুচাচা সম্পর্কে পরে আরো জানা যাবে।
বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার নিয়ম মেনে আজও রহমান সাহেব, মেয়ে অর্থি ও ছেলে জিশানকে নিয়ে ছাদে উঠেছেন। কান টানলে মাথা আসে। সেভাবে দীনাও ছাদে আশ্রয় নিয়েছেন। রহমান সাহেব অভ্যাসমতো ছাদে উঠেই আকাশের দিকে দৃষ্টি ছুঁড়ে দেন টেলিস্কোপ দিয়ে। মাত্র গতকাল পঞ্জিকা থেকে মাঘ বিদায় নিয়েছে। গেল দু‘বছর আগে লন্ডন থেকে নিয়ে এসছেন এই যন্ত্রটা। দীনার ভাষায় যন্ত্রণাটা। শীতকাল শেষে ফাগুন প্রবেশ করেছে। নিয়মমাফিক প্রকৃতি বসন্তকালে প্রবেশ করেছে। কিন্তু রাতেরবেলা হিম জড়িয়ে ধরে। ভোররাতের দিকে গায়ে কাঁথা বা কম্বল একটা কিছু না জড়ালে কম্মসারা! ঠাণ্ডা লেগে সর্দি-জ্বরে কয়েকদিন ভুগো!
মাঘ গেলেও আকাশটা সেজে আছে মাঘের মতো। ঝকঝকে নীল আকাশ দক্ষিণ পূর্বকোণ থেকে পশ্চিম কোণে ছায়াপথের অবস্থান আগের মতো। উত্তরপূর্ব আকাশে দেখা দিয়েছে সপ্তর্ষিমণ্ডল। শনিরাশি পশ্চিম আকাশ থেকে চলে যাচ্ছে। সিংহরাশিকে পুরোপুরি দেখা যায়। রহমান সাহেব লেন্সটাকে একটু একটু ঘুরিয়ে আরো স্পষ্ট করে দেখছেন। ছাদে ওঠার জন্য বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সময়কে বেছে নেন কেন। আকাশ দেখার জন্য অন্ধকার প্রয়োজন কি না এমন প্রশ্ন করেছিল অর্থি। হাসতে হাসতে বলেছিলেন— ভৌতিক পরিবেশে আকাশটাকে দেখতে ভালো লাগে! খুলে বলি, শহরে হাইরাইজ্ড বিল্ডিংগুলো যেভাবে আলো ছড়িয়ে চারপাশ আলোকোজ্জ্বল পরিবেশ তৈরি করে, তাতে আকাশের মিটিমিটি জ্বলা-নেভা নক্ষত্র আর চাঁদের মায়াবী আলো লজ্জায় চুপসে যায়। অর্থি মুচকি হেসে বলল, বুঝেছি।
ছাদে ছোট ছোট বেতের মোড়া পাতা আছে। ওগুলো হয়েছে এখন অর্থি-জিশানের বসার আসন। ছাদে এলে ওরা দুষ্টুমি করে না। কয়েক শ’ টবে গড়ে তোলা বাগানের সুন্দর পরিবেশ মুগ্ধ করে ওদের। এসব গাছের অনেকগুলোর পরিচয় ওদের জানা। ফুলগাছের পরিচয় তো ফুল ফোটার মাধ্যমে। ফলের পরিচয় ফল ধরার মাধ্যমে জানা যায়। কিন্তু ঔষধি গাছের পরিচয় জানতে আম্মুর সাহায্য নিতে হয়, আম্মু না হয় আব্বুর। অবশ্য ওদের আব্বু গাছের পরিচর্যার সময় কিংবা ছাদে বেড়াতে এলে গাছ চিনিয়ে দেন। কোন গাছের ঔষধি গুণ কেমন তাও বলেন। এভাবে শুনতে শুনতে ওদের অনেক গাছই চেনা। দিব্যি গড়গড় মুখস্থ বলতে পারে কোনটার ঔষধি গুণ কী। বিশেষ করে বন্ধু-বান্ধব, মেহমান কেউ এলে ওরা গাছের পরিচয় বলে জ্ঞানের বহর মেলে ধরে। এতে রহমান এবং দীনা মনে মনে খুশি হন। কারণ প্রকৃতির সাথে ছেলেমেয়ের পরিচয় হোক এটা তাঁরা চান। আজকাল শহরে যেসব ছেলেমেয়ে বাস করে তাদের প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয় হওয়ার সুযোগ হয় না। এটা রহমান সাহেব মোটেই পছন্দ করেন না। তিনি দীনাকে প্রায়ই বলেন- যেসব ছেলেমেয়ের নিজের আশেপাশের প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয় বা সম্পর্ক নেই, এদের দেশের প্রতিও মমতা নেই। দীনা তাই বিশ্বাস করেন। মাঝেমধ্যে দীনা তার স্কুলের ছাত্রীদের নিয়ে এখানে সেখানে বেড়াতে যান। উদ্দেশ্য প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয়। এমন একটা প্রোগ্রামে দীনা তাদের ছাদের গাছপালা দেখাতে নিয়ে আসেন। তখন ক্লাস থ্রি’তে পড়া অর্থি আর ফাইভের জিশান হয়ে যায় উদ্ভিদবিদ্যার শিক্ষক। পটাপট বলে যায় এটা তুলশি, সর্দি হাঁপানি ডায়বেটিসে কাজে লাগে। এটা ঘৃতকুমারী বাত-ব্যথায় কাজে লাগে ইত্যাদি।
— তোমাদের আকাশরাজ্য বিচরণ শেষ হলো? অদূরে বসা দীনা গলা চড়িয়ে বললেন।
— না আম্মু, আমরা আকাশরাজ্যে আরো কিছু সময় থাকব। অর্থি বলল।
— আচ্ছা আব্বু, চন্দ্রবিজয়ের পরও আজো মানুষ চাঁদকে নিয়ে কত কিছু কল্পনা করে, কেন? আর চাঁদের বুড়ি কী? অর্থি প্রশ্ন করে।
— শোনো, চাঁদটা মহাকাশে অন্যান্য বাসিন্দার তুলনায় নিকটতম প্রতিবেশী। রাতের বেলা পৃথিবীবাসীকে যে মায়াবী আলো বিতরণ করে তাতে চাঁদের প্রতি মানুষের ভালোবাসা গভীর। বাহ্যিকভাবে চাঁদকে যত বেশি সুন্দর দেখায়, বাস্তবে আহামরি কোনো সৌন্দর্য নেই। নেই কোনো আবহাওয়া, পানি বা বৃষ্টি, নেই বাতাস। নেই গাছপালা, জীবজন্তু বা কীটপতঙ্গ, আছে শুধু রাশি রাশি পাথর আর পাহাড়।
— বুড়িটা—? অর্থি ধৈর্য ধরে রাখতে পারে না।
— পৃথিবী থেকে চাঁদের গায়ে আমরা যে কালো দাগ দেখি, তাকে চাঁদের কলঙ্ক বলা হয়। বাস্তবে তা হচ্ছে উঁচু-নিচু খাদ। পাহাড়। দূর থেকে মনে হয় যেন কোনো বুড়ি বসে চরকায় সুতো কাটছে। চাঁদে বুড়ি তো দূরে থাক, চাঁদে কোনো প্রাণীর অস্তিত্বই নেই। কোনো প্রাণীর সেখানে বাঁচা বাস্তব নয়।
— কেন আব্বু? জিশানের প্রশ্ন এবার।
— তাহলে মানুষ চাঁদে যাচ্ছে কেন? আবার বলছে পৃথিবী থেকে চাঁদ পর্যন্ত দ্রুত যাওয়ার জন্য লিফট তৈরি করবে! অর্থির প্রশ্ন।
রহমান সাহেব মুচকি হাসেন। মাথা চুলকান। এমন ভাব দেখান ওদের প্রশ্ন শুনে তিনি কাবু। জবাব দিতে পারছেন না।
— উন্নত দেশগুলোর ইচ্ছের তো কোনো শেষ নেই। তাছাড়া শক্তির লড়াইয়ে চাঁদকে একটা মহাশূন্যের ঘাঁটি হিসেবে পেতে চায়। যদি ভূ-পৃষ্ঠের সকল শক্তির ব্যবহার অকার্যকর প্রমাণিত হয়, ঐ চাঁদ থেকে আঘাত হানা তাদের উদ্দেশ্যে—। রহমান সহেব থামলেন। ওদের দিকে তাকিয়ে অনুভব করতে চাইলেন এসব ভারী কথা ওদের বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে কি না।
— আচ্ছা আব্বু, চাঁদে কি মাধ্যাকর্ষণ আছে? জিশানের আবার প্রশ্ন।
— ভালো প্রশ্ন করেছ, মাধ্যাকর্ষণের কথা তোমরা নিশ্চয় জানো, পৃথিবীতে এই শক্তির জন্যই সকল কিছু মাটির সঙ্গে সম্পর্কিত আছে। চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ আছে কিন্তু চাঁদ যেহেতু পৃথিবীর তুলনায় খুব ছোট তাই এর আকর্ষণ ক্ষমতাও কম। পৃথিবীর ছয় ভাগের এক ভাগ মাত্র। তার মানে পৃথিবীর একটা লোকের ওজন ৯০ কেজি হলে চাঁদে হবে মাত্র ১৫ কেজি হা… হা…হা। আরেকটা মজার বিষয়, পৃথিবীতে হাইজাম্প দিয়ে তুমি যদি ৪ ফুট উঠতে পারো, চাঁদে ঐ সমান লাফ দিয়ে ২৪ ফুট ওপরে উঠতে পারবে।
— বাহ্ বেশ মজার তো! অর্থি বলল।
এমন সময় চারপাশ একসঙ্গে আলোকিত হয়ে উঠল। মানে বিদ্যুৎ চলে এসেছে। বিদ্যুৎ এলে আকাশটা কৃত্রিম আলোয় হারিয়ে যায় যেন। অন্ধকারের আকাশে যে মায়াময় পরিবেশ থাকে তা আর থাকে না।
— জিশান-অর্থি, চলো এবার ঘরে ফেরা যাক। এর চেয়ে বেশি দেরি করলে তোমার আম্মুু রেগে লাল মরিচ হবেন।
— হি…হি..হি। রহমান সাহেবের কথায় মজা পেল ওরা। পা বাড়াল সিঁড়ি ঘরের দিকে।
।। দুই।।
পূর্ণিমা চাঁদের আলোয় ছাদটা আলোকিত। মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে চারিধার। ফাল্গুনের মাঝামাঝি। ঝিরঝির ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। গেল দিনে একপশলা বৃষ্টি ঝরেছিল। চলে যাওয়া হিম আবার ফিরে এসেছে। শীতবুড়ি ভাবল এত জলদি চলে যাবো! ফোকলা দাঁতের হাসিতে গুটিসুটি ফিরে এলো। হেসে বলল, কি গো অর্থি-জিশান, পান দাও। একটুু বসি। এটা হচ্ছে রহমান সাহেবের গল্প। শীতবুড়ির গল্প। ছাদে উঠে অর্থি জিশান রহমান সাহেবের কোল ঘেঁষে বসেছে। তবে দূরবীক্ষণ যন্ত্রের কাছে নয়। মোড়াতেও বসেনি। শীতলপাটিতে আসন নিয়েছে ওরা, উদ্দেশ্য গল্প শোনা।
— আব্বু ভূতের গল্প বলো না! ঐ যে তুমি বলেছিলে ছোট্টবেলা মামার বাড়িতে ভূত দেখেছিলে। সেইটা বলো। অর্থির আবদার।
রহমান সাহেব নিজ জীবন থেকে ছোট ছোট ঘটনা ছেলেমেয়েদের শোনান। গল্পের মতো করে। এর মধ্যে নানা ধরনের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা, ভূতের গল্পও আছে।
রহমান সাহেব মাথা চুলকাতে লেগে যান। গল্প খুঁজতে তার মাথা চুলকাতে হয় না। বিচিত্র তার জীবনের এমন বহু মজার মজার ঘটনা আছে, তা গল্পের ফর্মে ফেলে দিলেই একটা কিছু দাঁড়িয়ে যায়। আর সেসব শুনিয়ে শুনিয়ে তাদের এদের গল্প শোনার বয়সটা পার করা যাবে অনায়াসে। মাথা চুলকান মানে রহমান সাহেব ভাবছিলেন আজকাল কম্পিউটার ইন্টারনেটের যুগের ছেলেমেয়েরা ভূতের গল্প শুনতে চাইবে কী কারণে?
— ভূতের গল্প?
— হ্যাঁ আব্বু, তোমার দেখা ভূতের গল্প। অর্থি আবার জোর দিয়ে বলল।
রহমান সাহেব আবার মাথা চুলকালেন। এবার মাথা চুলকানোর কারণ ওরা যে গল্পটা শুনতে চাচ্ছে সেটা না শুনিয়ে পরীর গল্পটা শোনাতে চান তিনি।
— ভূতের নয়, পরীর গল্প শোনাতে চাই আজ। রাজি?
— পরী আছে নাকি আব্বু? জিশান জানতে চায়।
— অবশ্যই আছে। আজকাল মানুষ আকাশে বিচরণশীল পরীর ছবিও ভিডিও করতে পেরেছে। তবে আমাদের ছেলেবেলায় প্রযুক্তির এত বিকাশ হয়নি। ক্যামেরাই ছিল খুবই দূর্লভ জিনিস। ছবি মানে স্টুডিওতে গিয়ে তোলা সাদাকালো ছবি। সেসব ছবিতে চেহারা যা ফুটে উঠত বাস্তবের সাথে তার মিল ছিল কম।
— তাহলে ছবি তোলা হতো কেন?
— খুব প্রয়োজন হলে। চাকুরি, লেখাপড়া, পাসপোর্ট ইত্যাদি প্রয়োজনে ছবি তোলা হতো। যাক, যা বলছিলাম।
— পরীর গল্পটাই বলো আব্বু! অর্থি নড়েচড়ে বসে।
— ছোটবেলায় আমারও খুব শখ ছিল স্বচোখে পরী দেখার। রাতের বেলা বাইরে বের হলে চোখ রাখতাম বনজঙ্গলে, গাছগাছালি বাগানের দিকে। যদি পরী দেখা যায়-এ ব্যাপারে তোমাদের দাদীজানকে কতদিন বলেছি পরী দেখাতে— শেষতক সৌভাগ্য হলো দেখার—
— স্বচোখে দেখেছ আব্বু? অর্থির প্রশ্ন।
— তাহলে বলছি কী, একবার নয় দু’দুবার। এখনো আমি চোখ বন্ধ করলে ছোটবেলার সে দৃশ্য চোখে ভেসে ওঠে।
— তুমি দেখতে পাও এখনো! জিশান নড়েচড়ে বসে।
— হ্যাঁ, ছোটবেলার অনেক স্মৃতি আমার খুব ভালো মনে আছে। এত্ত ছোট বয়সের স্মৃতি আমার মনে আছে যা আমার বড় ভাইবোনদের সামনে বললে তারা অবাক হন, বলেন এত ছোটবেলার ঘটনা তোর মনে আছে? নাকি শুনে শুনে বলছিস? আমার ছোটবেলার বহু ঘটনা যেমন অবিকল মনে আছে একটু বড় বয়সের স্মৃতি তেমন মনে নেই।
— পরী দেখাটা বলো, রাত হচ্ছে। অর্থি ভারী গলায় বলল।
— বলছি, আমরা তখন কিশোরগঞ্জ ছিলাম। পূর্ব পাকিস্তান আমল। কিশোরগঞ্জ একটা মহকুমা শহর। এসব বলছি এজন্য তোমাদের আবার ঢাকা শহরে থেকে থেকে আগের পরিবেশ আন্দাজ করতে পারো কি না। আগে মহকুমা ছিল যেগুলো, পরে সেগুলো জেলা হয়ে যায়। আর মহকুমাগুলো ছিল উপজেলার মতো। তবে তখন মহকুমাও ছিল গ্রামের মতো। রাস্তা বলতে ছিল দু’টো-একটা। তাও ইট বিছানো বা কংক্রিট সয়লিং।
— হয়েছে আব্বু আসল ঘটনাটা বলো! জিশান ধৈর্য হারাতে বসেছে।
— গরমকাল। গরমকাল এলে ঘর ছেড়ে বাইরে হাঁটাহাঁটি করা সেসময় একটা নিয়ম ছিল। ফ্যান লাইটের সময় তখন তেমন নয়। কিছু কিছু বাড়িতে ফ্যান লাইট এসেছে। সেটা খুবই কম। আমাদের বাসায় ছিল। তোমার দাদা যেহেতু হেড পোস্টমাস্টার, তার সরকারি বাসা ছিল। এখনকার মতো বিদ্যুতের যাওয়া-আসার খেলাও ছিল। যা হোক গরমে বের হয়েছি, আমরা প্রায় সবাই। তোমার দাদা ছাড়া। তোমার তিন ফুপু আমি এবং তোমার চাচাও সঙ্গে। আমাদের বেড়ানোর জন্য একটা পছন্দের জায়গা ছিল শিশুপার্ক, আলোর মেলা। বিকেলে শিশুদের কলগুঞ্জনে মুখর থাকে। বেশ বড়সড় পার্ক। আসলে এটা ছিল জমিদার কিশোরী মোহনের বাগান। অনেকগুলো ফোয়ারা পার্কজুড়ে। বিশাল ফুলের বাগান।
— আব্বু পরীর গল্পটা বলবে? অর্থির কণ্ঠে রাগ।
রহমান সাহেব হেসে দেন। তোমাদের ঘুম পাচ্ছে বুঝি? তাহলে আজ থাক আরেক দিন বলব। জিশান ও অর্থির দিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে আনলেন। প্রতিক্রিয়া বোঝার জন্য।
— না, আজই গল্পটা শোনাও, গল্পটা শুনেই নামব। জিশান বলল।
— হ্যাঁ আব্বু, আমরা বুঝতে পেরেছি সেসময় কেমন ছিল পরিবেশ- এবার পরীর সঙ্গে কিভাবে দেখা হলো বলে ফেলো।
— বলছি, শিশুপার্কটা অজস্র ফুলে ফুলে ভরা ছিল। তাই পার্কের আশপাশে ফুলের সুগন্ধে ভরে থাকত। সেদিন পূর্ণিমার রাত। চাঁদের আলোয় ঝিলমিল করছে পার্কের আঙিনা। কামিনী, গন্ধরাজ, গাঁদা, গোলাপ, নয়নতারা। সাদারঙের ফুলগুলো যেন তারার মতো ঝিকঝিক করছিল।
— তোমরা তখন পার্কে গিয়েছিলে? অর্থির প্রশ্ন।
— না। পার্কে ঢোকার সাহস আমাদের হয়নি। আমরা পার্কের নিচু বাউন্ডারি ওয়ালের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া মানুষের চলাচলের রাস্তা দিয়ে ফিরছিলাম।
— তোমরা তাহলে বেড়াতে গিয়েছিলে?
— হ্যাঁ, সে রকমই। পার্ক পেরিয়ে একটু হাঁটলেই তোমার দাদিজানের মামার বাসা। সেসময় মহকুমা পুলিশ কর্মকর্তাকে বলা হতো এসডিপিও। তোমার দাদিজানের মামা ছিলেন একজন এসডিপিও। আমরা তার বাসায় গিয়েছিলাম। পথ খুব বেশি নয়। হেঁটে গিয়েছিলাম, ফিরছিলামও হেঁটে। রিকশার খুব দরকার পড়ত না।
— তারপর কী দেখলে বলো? অর্থির আর তর সইছে না।
রাত একটু বেশিই বলা যায়। বিশেষ করে মফস্বল শহরের জন্য।
— রাত কয়টা আব্বু? জিশানের প্রশ্ন।
— দশটার কাছাকাছি। পার্কের পাশ দিয়ে আমরা হেঁটে আসছি। আমাদের ওই স্থানে এলে এমনিতেই ভয় ভয় করত। পার্কের ভেতর পাথরের মূর্তি ছিল বেশ কয়েকটি। রাতে নাকি ওই মূর্তিকে পার্কে হাঁটাহাঁটি করতে দেখেছে কেউ কেউ। অনেক গল্প পার্ক নিয়ে মুখে মুখে। তাই আমাদের গা ছমছম করছিল। এমন সময় তোমাদের এক ফুপি বলে উঠলেন-ঐ, ঐ যে পরী! আমরা সবাই পার্কের দিকে চোখ রাখলাম। দেখলাম পার্ক সংলগ্ন পুকুরের কাছে দু’জন পরী ফুল তুলছে—
— দু’জন। অর্থি ভয় পেয়েছে। গলার কাঁপা কাঁপা উচ্চারণ তাই।
— কেমন দেখতে আব্বু? জিশান প্রশ্ন করে।
— দূর থেকে যা চোখে মালুম হলো, সাদা ড্রেস পরা, দু’কাঁধে পাখা আছে, মুখ দেখা যাচ্ছিল না। আর আমাদের তখন ভয়ে হাত-পা আড়ষ্ট হওয়ার জোগার। তোমাদের দাদি বললেন, জোর পায়ে হাঁটো সবাই। কিন্তু আমাদের পায়ে জোর থাকবে কিভাবে। ভয়ে বসে পড়ার মতো।
— তারপর? অর্থি বেশ ভয় পেয়েছে বোঝা গেল।
— তারপর আর কী? আমরা হেঁটে বাসায় ফিরলাম। আমাদের একজন নাইটগার্ড ছিলেন। রহিম ভাই। তাকে বললাম পরী দেখেছি। রহিম ভাই বললেন পরী? কত দেখছি ভাইজান। আমাদের পোস্ট অফিসের সামনে টেনিস খেলার মাঠ আছে না। এইহানের ক্লাবের বাগানে পত্তিদিন পরী আহে।
— চলো এবার ঘরে ফেরা যাক। সবাই উঠে পড়ল।
।। তিন।।
বিকেলবেলা একপশলা বৃষ্টি হলো। বৃষ্টি হলে লেদু চাচার কাজ একটু কমে। গাছে পানি দিতে হয় না। একদিন ভালো বৃষ্টি হলে কয়েক দিন আর গাছ পানি খেতে চায় না। লেদু চাচা গাছ পানি খায় বলে থাকেন। পানি দেয়া না লাগলেও গাছের যত্নআত্তি করা থেকে লেদুচাচা ছুটি নেন না। মরে যাওয়া গছের পাতা সাফ করা, ডাল, লতা-পাতা ঠিকঠাক বেঁধে দেয়া ইত্যাদি কাজে তিনি থাকেন সবসময় মশগুল। লেদুচাচার ভাষায়— গাছের মহব্বত করতে অয়, মহব্বত করলে গাছও মানুষরে মহব্বত করে। অভ্যাসবশত লেদুচাচা ছাদে উঠে একটা ছোট আকৃতির দা আর টুকরি নিয়ে গাছ পরিচর্যায় লাগেন। রোজকার মতো দীনাও একটু আগে ভাগে ছাদে হাঁটাহাঁটি করছিলেন।
— লেদুচাচা আপনার বুঝি অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। ছাদে উঠলেই গাছের যত্নে লেগে যান?
— অয় মা অয়। গাছ বড় লক্ষ্মী। যারা গাছের যতন করইন তারার রোগবালাই কম অয়। একটা হাছা গফ্ হুনতায়নি মা? লেদুচাচা বলেন।
— বলেন চাচা, আমি হাঁটতে হাঁটতে শুনব। দীনা সময় নষ্ট করতে চায় না। একটু পর মাগরিবের আজান। আজান হলেই নিচে নামতে হবে। তাই এর আগে হাঁটাহাঁটি শেষ করা চাই।
— হুনো মা, একজন লন্ডনি সিলোটি আমরার গাঁওয়ের পাশের গাঁওয়ের বেটা চৌধুরীসাব। হার্টের বেরাম অইছিল। পয়সা আছে, গ্যালা লন্ডন চিকিৎসা করানিত। ডাক্তারে কইলা অপারেশন করতে। ডাক্তার আরো কইলা অপারেশন করলে বাঁচবো ছয় মাস। বেটায় অপারেশন না করাইয়া দ্যাশে আইলা। একটা টিল্লা খরিদ করলা। টিল্লারে সুন্দর করি কাটিয়া বাড়ি বানাইলা। হাঁস, মুরগি, গরুর খামার বানাইলা। বিভিন্ন জাতের পক্ষীর চিড়িয়াখানা বানাইলা। নিজ হাতে এইসব পশুপাখি গাছের যত্ন করতা। বেটা ছয় বছরেও মরছে না। বেটা দীর্ঘজীবী অইছে।
— ঠিক বলেছেন চাচা, গাছপালা পশুপাখির যারা চাষ করে, যত্ন করে আল্লাহ তাআলা তাদের সম্পদ বাড়িয়ে দেন, তাদের হায়াৎ দারাজ করেন।
— এমন সময় কাছের মসজিদ থেকে আজান ভেসে এলো— আল্লাহু আকবার… আল্লাহু আকবার…
দীনা মাথার কাপড়কে আরো একটু টেনে সিঁড়িঘরের দিকে পা বাড়ালেন। মুখে লেদুচাচাকে বললেন, চাচা চলি, চা খেতে আসবেন কিন্তু।
লেদুচাচা গাছের যত্ন থেকে হাত গুটিয়ে নিলেন। গাছের পাশে জরুরি প্রয়োজনে বসানো কলটি ছেড়ে হাতমুখ ধুয়ে অজু সারলেন। চিলেকোঠায় ফিরে এলেন। এখানে একটা ছোট একজনী তক্তপোষ পাতা। জায়নামাজও আছে গোটানো। পেতে নেন খুব যত্ন করে। এখানে কখনো কখনো তিনি নামাজ আদায় করে থাকেন। সেভাবে আজো করলেন। নামাজ শেষে তসবি হাতে দোয়া-দরুদ পাঠ করলেন মিনিট ত্রিশেক। তারপর মুনাজাতে মগ্ন হলেন। দীর্ঘ মোনাজাত। চোখের পানিতে তার দুই গণ্ড ভিজে একাকার।
— দাদাজান কী করেন? অর্থির কণ্ঠ শুনে ফিরে তাকান। এতক্ষণ একটা ঘোরের মধ্যে ছিলেন। বাস্তবজগত সম্পর্কে ছিল না তার খেয়াল। অর্থিকে দেখে বুঝতে পারেন চা খাওয়ার সময় উতরে যাচ্ছে দেখে দীনা পাঠিয়েছে অর্থিমণিকে।
— দাদাজান, আম্মু আপনাকে চা খেতে ডেকেছেন। আর চা খেয়ে আপনি আবার ছাদে আসবেন। আমরা গল্প শুনবো কিন্তু। লেদুচাচা দু’হাতে জায়নামাজ ভাঁজ করে বললেন— চল চল দাদুমণি, নিচে চল, চা খাইয়া আবার আইমুনে—
লেদুচাচা অর্থির হাত ধরে নিচে নেমে আসেন। চায়ের টেবিলে রহমানও অপেক্ষায়। চায়ের সঙ্গে নাশতা হিসেবে ডালপুড়িও ছিল। দীনার হাতে এসব ‘বিহারী’ খাবার ভালো হয় নাকি। রহমানের মতো। তাই ডালপুড়ি চা খেতে খেতে বেশ জমে ওঠে গল্পের আসর। কিন্তু হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। বিদ্যুৎ গেলেও ঘর অন্ধকার হলো না। বিকল্প ব্যবস্থা করা। তাই লাইট এবং ফ্যান দুটোই চালু হয়ে গেল তৎক্ষণাৎ। কিন্তু তাতে কী, চারপাশ অন্ধকারে গেল তলিয়ে।
— দাদাজান, চলেন ছাদে যাই, গল্প শুনব আপনার।
— লেদুচাচা, যাউকা, আপনার নাতি নাশারারে লইয়া ছাদে। আমরাও আইমুনে। ঘণ্টাখানেক লোডশোডিং থাকব।
অনুমতি পেয়ে জিশান অর্থি দাদাজানকে নিয়ে ছাদের দিকে ছোটে। ধুপ্ধাপ সিঁড়ি ভেঙে উঠে আসে ছাদের চিলেকোঠায়। তারপর খোলা আকাশের নিচে। ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। একটা শীতলপাটি বিছিয়ে বসে যায় দাদাজানকে ঘিরে অর্থি ও জিশান।
লেদুচাচা এক অদ্ভুত মানুষ। ভাতিজা রহমানের দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে তার সময় কাটে ভালো। এরাও দিনে দিনে দাদাজানের বেশ ভক্ত হয়ে উঠেছে। কখনো গল্প, কখনো গান শুনিয়ে তাদের বশ করে ফেলেছেন লেদুচাচা। সেভাবে আজ তারা ছাদে এসে চুপটি বসেছে গল্প শোনার জন্য।
— দাদাজান, আপনার ছেলেবেলার গল্প শোনান। জিশান বলল।
— দাদাজান বাঘ শিকারের গল্পটা বলেন। অর্থি বলল মাথা নাচিয়ে।
— হ্যাঁ, হ্যাঁ… দাদাজান, আপনার ছেলেবেলার সেই বাঘ শিকারের গল্পটা বলেন। জিশান সমর্থন দিলো অর্থির প্রস্তাবে।
ঠিক আছে আইজ বাঘ শিকারের গল্পটাই বলি। আমরার অঞ্চল তো দেখছনি দাদারা, টিল্লা, টক্কর, বন-জঙ্গল, হাওর-বাওর, আগে এই বন-জঙ্গল আরো বেশি আছিল। শীতকালে আমরার অঞ্চলো আসাম, ভারতের মধ্যে পড়ছে, আসামের পাহাড় থাকি চিতাবাঘ নামত। ঐসব অঞ্চলে প্রচণ্ড শীতে কাতর হইয়া চিতাবাঘ বাংলাদেশে আইত খাদ্যের সন্ধানে।
— লোকেরা বুঝতে পারত কিভাবে? জিশানের প্রশ্ন।
— বুঝতে পারত বাঘ সাহেবের চলাফেরায়। বাঘ তো আইত খাইবার লাগি। তাই আসিয়াই গরু-মহিষ ছাগল যা পাইল শিকার বানাইল। বাঘ কিন্তু সবকিছু খায় না। কিছু রাখে। ঐগুলা চিহ্ন হিসেবে বুঝা যায় আশপাশের টিল্লায় বাঘ আছইন। আর রাইতে ডাকইন—
— দাদাজান, বাঘ কি এমনভাবে ডাকে? আমরা শুনেছি হালুম… ডাকে। অর্থি নিজ মুখে ডেকে শোনাল।
— ঐটা লেখকেরা বাইর করছে। বাস্তবে কোনো বাঘরে ঐরকম ডাকতে কেউ হুনে নাই, বুঝছইন।
এমন সময় রহমান সাহেব ছাদে ওঠেন। অর্থি-জিশানের শীতলপাটিতে বসে লেদুচাচার গল্প শোনার আসরে গিয়ে দাঁড়িয়ে যান। লেদুচাচা দেখেই উঠে দাঁড়ান।
— চাচা আপনি উঠবেন না ওদের গল্প শোনাচ্ছেন, শোনান। আমি একটু আকাশ দেখি। রহমান সাহেব চক্রাকারে মাথা ঘুরিয়ে আকাশ পরখ করলেন। তারপর চলে এলেন তার সাধের টেলিস্কোপ ঘরে। উঁচু একটা টেবিলের ওপর যন্ত্রটা বসানো। একটা উঁচু পা-ওয়ালা হাই চেয়ারে বসেন। মাথার ওপর টিনের শেড। একটা ছোট্ট ঘর। দরজা আছে এক পাল্লার। তালাবদ্ধ করার ব্যবস্থাও আছে। রহমান এই ঘরে ঢুকে চেয়ারে বসলে পৃথিবীটা মিথ্যা হয়ে যায়। মনে হয় আমরা যেখানে বাস করি কত ছোট্ট একটা গ্রহ। আর মানুষ গিজগিজ করছে। সাত শ’ চৌত্রিশ কোটি নব্বই লাখ নাকি!
— আব্বু কী দেখছো? অর্থি ও জিশান এসে উপস্থিত। অর্থি খুব নিচু স্বরে জানতে চায়। ওরা জানে এ সময় ওদের আব্বু গভীর ধ্যানে আকাশ পর্যবেক্ষণ করেন। জোরে কথা বলা নিষেধ। অর্থি ও জিশান ছাদের নিয়ম মেনে চলে। যেমন গাছের ফুল ছেঁড়ে না। টেলিস্কোপ ঘরে ঢোকে না। দৌড়ঝাঁপ তেমন করে না।
— দেখছি বেটা প্লুটোকে। সে আর আমাদের সৌরবাসিন্দা না।
— প্লুটোকে এখন কী বলা হবে? জিশান জানতে চায়।
— প্লুটোর আর কোনো নাম থাকল না। একটা নতুন শ্রেণিতে বসানো হলো তাকে— বামনগ্রহ।
— বামনগ্রহ! এ কেমন নাম! জিশান অবাক হয়।
— শুধু তাই নয়, একটা সংখ্যা দিয়ে তার পরিচয় ১৩৪৩৪০।
— বিজ্ঞানীরা প্লুটোর ওপর অবিচার করেছেন। জিশান বলল।
— অবিচার বৈকি! এ নিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা রীতিমতো কম ভাগাভাগি করলেন না। ভোটাভুটি হলো। বেচারা প্লুটোর পক্ষের বিজ্ঞানীরা হেরে গেলেন। প্লুটো একটা ব্যতিক্রমী গ্রহ, এটা সবাই অনেক দিন ধরে জানত। গ্রহের চেয়ে গ্রহাণুদের সঙ্গেই বেশি মিল। তাই তাকে এক শ্রেণি থেকে সরিয়ে অন্য শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে। এই যা—
— কিন্তু আব্বু প্রাণিজগতে কখনো এমনটি শুনি না। জিশান মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল— যেমন বাদুড় পাখির মতো উড়তে পারে কিন্তু ডিম পাড়ে না, তাই বলে বাদুড়কে পাখি বলা হবে কি না এই নিয়ে প্রাণিবিজ্ঞানীরা কখনও ভোটাভুটি করেছেন? জিশান বিজ্ঞের মতো বলল। হা… হা…হা… রহমান সাহেব টেলিস্কোপ থেকে চোখ সরিয়ে নেন। হাসতে থাকেন জিশানের কথায়।
— তোমাদের গল্প শোনা শেষ হলো?
— ঐ অর্ধেকটা। দাদাজান বললেন আরেকদিন বলবেন। অর্থি একটুু টেনে টেনে বলল।
— দেখি নম্বরযুক্ত বামনগ্রহকে। জিশান এগিয়ে আসে। রহমান চেয়ার থেকে নেমে জিশানকে বসার সুযোগ দেন। জিশান চোখ রাখে। বিন্দু বিন্দু আলো শুধু দেখা যায়। কোনটা প্লুটো কোনটা ইউরেনাস শনাক্ত করা জিশানের সাধ্যিতে কুলাবে না। তবে আকাশরাজ্যের এই আলোকমালা দেখতে বেশ লাগে।
এমন সময় শোনা যায় লেদু চাচার কণ্ঠ—
চিনলে নারে অবুঝ মানব খোদা যে কেমন
জিন্দেগী ফুরায়ে গেলে আখেরে ক্রন্দন।।
পয়দা করে আদমেরে কল্বে তাহার বিরাজ করে
তবু তারে চিনলে নারে হইয়া তার বাহন।।
দরবারে শাহ বলে ভেবে হৃদয়চোখে দেখ তবে
কল্বের বাগে দেখতে পাবে খোদ খোদার আসন।।
লেদুচাচার সুরেলা কণ্ঠে সবাই ফিরে তাকায়। ছাদের এক কোণে বসে একাগ্র মনে গান গাইছেন তিনি। এই আত্মভোলা মানুষের প্রতি রহমান সাহেবের ভালোবাসা কম না। চাচা দুনিয়ার জন্য কাঙাল না, পরজীবনের জন্য পাগল। হায়রে! এমন মানুষ কই!
।। চার।।
জ্যৈষ্ঠ মাস। আম-কাঁঠাল পাকার গরম পড়েছে। আর যত গরম পড়বে, বিদ্যুতের খেলাও বাড়বে। তবে ইদানীং বিদ্যুৎ কম যাচ্ছে। কিন্তু ঘরে প্রাণান্ত গতিতে চলা ফ্যান স্বস্তি দিতে পারছে না। ভ্যাপসা গরম। তাই খোলা ছাদে এসে জড়ো হলো একে একে।
প্রথমে দীনা। প্রতিদিনের রুটিন ছাড়াই। তারপর অনুমতিসাপেক্ষে জিশান ও অর্থি। গরমের দোহাই দিয়ে।
রহমান টেবিলে বসে কাজ করছিলেন। তিনিও স্বস্তি পাচ্ছিলেন না। ভাবলেন ছাদে যাই। যেই ভাবা সেই কাজ। আর মাগরিবের নামাজ পড়ে খানিকটা সময় ছাদে কিংবা চিলেকোঠায় সময় পার করা লেদুচাচার রোজকার অভ্যাস। তিনিও ছাদে বসে গুনগুন করছিলেন। অনুচ্চ স্বরে গান ধরেছেন।
আকাশ বেশ পরিষ্কার। ঝকঝকে নীল। আকাশ কি সত্যি নীল? কী রকম নীল? এমন প্রশ্ন অনেকের মনে উদয় হয়। দীনার কাছে মনে হয় কাপড়ে দেবার জন্য সাদা মাড়ে যে নীল রঙ মেশানো হয়— আকাশটা সেরকম নীল। অর্থির কাছে ওদের স্কুল ড্রেসটা যেমন, সেরকম নীল। আর জিশানের কাছে আকাশের নীলটা তার ক্লাসের সহপাঠী বিদেশী ক্লডিয়ার চোখের মতো।
এ নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে ওদের মধ্যে। তবে আজকের আকাশে মেঘও আছে। ঘন নয়। ছেঁড়া ছেঁড়া। ওলটপালট বাতাসও বইছে। এতে গায়ের গরমটা কমেছে।
রহমান সাহেব ছাদে উঠে খুব একটা স্থির থাকেন না।
ছটফটানি ভাবটা ছোটদের মতো। তাই ছাদটা এক চক্কর লাগালেন। নতুন ভ্যারাইটির কয়েকটি ফুলগাছ দেখলেন নেড়ে চেড়ে। এরপর চলে এলেন তার প্রিয় টেলিস্কোপ ঘরে। টেলিস্কোপটা একটা মোটা কালো রঙের কাপড়ে আবদ্ধ ছিল। চেইন সিস্টেম। শি— শব্দে টান দিয়ে চেইন খুলে টেলিস্কোপ উন্মোচন করলেন। চেয়ারে যথারীতি বসেছেন। ধীরে ধীরে মাথা ঝুঁকিয়ে আইপয়েন্টে চোখ রাখলেন। ডান চোখ।
ব্যস, চোখের সামনে মহাশূন্যের অপার রহস্য। ঝিকমিক ঝিকমিক জ্বলা নক্ষত্ররা। অদ্ভুত মায়াবী এই তারারমেলা। রহমান খুঁজতে লেগে যান এ মাসের তারাটিকে। এটা তার রুটিন কাজ। অভিজিৎ খুঁজছেন। আতিপাতি। উত্তর-পূর্ব দিকে চোখ রাখেন। পাওয়া গেল না। আরেকটু রাত গভীর হলে তারাটিকে দেখা যাবে। এটাই নিয়ম। গভীর রাতে বাছাধনরা ধরা দেয়। ধরা তাকে দিতেই হবে।
রহমান এবার টেলিস্কোপ ঘুরিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে মুখ করে খুঁজতে থাকেন। আরেক বন্ধুতারাকে। তুলারাশি। পেয়ে যান। মনটা খুশিতে নেচে ওঠে।
বাহ্ বেশ উজ্জ্বলভাবে ধরা দিয়েছে বাছাধন! আরো একটু পূর্ব দিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে আনতেই পেয়ে যান বৃশ্চিকাকও। শুধু অভিজিৎ ধরা দিলো না! এ মাসের আরো একটা তারা তার পেতে হবে। হুম!
রহমান সাহেব টেলিস্কোপের নল একবার দক্ষিণ আরেকবার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে আচক্র ঘোরাতে থাকেন। যদি পেয়ে যান এই আশায়। মিনিট দশেক সময় যায় এই খোঁজাতে।
— পেয়ে গেছি— পেয়ে গেছি— আর্কিমিডিসের ‘ইউরেকা-ইউরেকা’ বলার মতো রহমান সাহেব চিৎকার দিয়ে ওঠেন।
— কী পেয়েছ আব্বু, কী পেয়েছ— জিশান ও অর্থি উভয়ে একসঙ্গে বলে ওঠে।
— দেখে যাও তোমরা— রহমান রীতিমতো উত্তেজিত। ভাবটা নতুন কোনো গ্রহ আবিষ্কার করে ফেলেছেন।
— নতুন কোনো গ্রহের সন্ধান পেলে? জিশানের প্রশ্ন।
— একজন একজন করে আসো, একদম দম বন্ধ করে আইপয়েন্টে ডান চোখটা রাখো। নড়বে না, নড়বে না— হিস্ হিস্ জিশান চেয়ারে উঠে বসে ধীরে ধীরে। আইপয়েন্টে চোখ রাখে।
— শ্বাস-প্রশ্বাস ধীরে ধীরে নেবে। টেলিস্কোপের নলে হাত না।
— হ্যাঁ হ্যাঁ আব্বু, উজ্জ্বল তারাটি দেখছি। কিন্তু মাঝে মাঝে নিভে যাচ্ছে— জিশান বলল।
— ওই তারার নামই জ্যৈষ্ঠ, বুঝলে জিশান বাবু? ঐ তারার নামেই এ মাসের নামকরণ হয়েছে জ্যৈষ্ঠ মাস।
— আব্বু, আমিও দেখব—। অর্থির আবদার
ভাইয়া যেটা করবে অর্থির সেটা করা চাই। এটা পুরনো সত্যি।
অবশ্যই তুমিও দেখবে অর্থিমণি— জিশান নেমে পড়ো, এবার অর্থির পালা।
ভালো ছেলের মতো জিশান চেয়ার থেকে নামল। অর্থিকে কোলে করে বসিয়ে দিলেন রহমান সাহেব। স্বাভাবিক চেয়ারের চেয়ে উঁচু বলে অর্থির পক্ষে ওঠা কঠিন।
রহমান সাহেব ছেলেমেয়েদের সবকিছুতে নেন। এসব ব্যাপারে খুবই উদার তিনি। তাছাড়া আকাশরাজ্যের সঙ্গে ছেলেমেয়েদের পরিচয় করিয়ে দিতে চান। আজকাল ছেলেমেয়েরা চাঁদকেই চেনে না। শহরের আলো ঝলমল পরিবেশে কখন চাঁদ ওঠে কখন ডুবে তা দেখার সুযোগই পায় না।
অর্থি চোখ রাখে টেলিস্কোপের আইপয়েন্টে। বিষয়টা তার জন্য নতুন নয়। কিভাবে দমবন্ধ করে চোখ রাখতে হয় তা তার জানা। আকাশের দিকে চোখ রাখলে একটা আনন্দে ভরে যায় মন।
ঝিকমিক ঝিকমিক তারার আকাশে অর্থি হারিয়ে ফেলে নিজেকে। মনে মনে উড়ন্ত পরীকে খোঁজে। যদি দেখা যায়। যদি হঠাৎ একঝাঁক পরী ধরা দেয় এই টেলিস্কোপে।
— অর্থিমনি, দেখেছ? রহমান সাহেব জানতে চায়।
— ওরে বাপরে কত তারা— আব্বু, আমি তারাদের দেশে যাবো—
— তাহলে তোমাকে পরী হতে হবে— জিশান বলল।
— অর্থিমণি তো একটা পরীই— শুধু কাঁধে ডানা নেই- রহমান বলল হেসে।
— অর্থিমণি, এ মাসের তারাটা খুঁজে পেয়েছ? জিশান বলল।
— না পাইনি এখনো, অনেক তারার মাঝে হারিয়ে গেল বুঝি। অর্থিকে নামিয়ে দেয়া হলো। অনেক তারার মাঝে গুলিয়ে ফেলেছে এ মাসের তারাটিকে।
— আব্বু তুমি কিন্তু ফাঁকি দিচ্ছ। অর্থি চেয়ার থেকে নেমেই বলল।
— কী রকম? রহমান চেয়ারে উঠতে উঠতে বলেন। চোখ রাখেন টেলিস্কোপের আইপয়েন্টে। খানিকক্ষণ দেখেন ভালোভাবে। না, জ্যৈষ্ঠ তারাটিকে এখন দেখা যাচ্ছে না। আকাশেও মেঘ জমেছে।
— তুমি বলেছিলে ভূতের গল্প বলবে, ছোটকালে নানাবাড়ি গিয়ে দেখেছিলে, সেই গল্পটা বলোনি কিন্তু! অর্থি বলল।
— শোনাবো বলেছি যখন অবশ্যই শোনাবো, কিন্তু আজ না।
— না, আজই। তুমি খালি আজ না কাল বলে দেরি করছ। অর্থির কণ্ঠে জিদ।
— হ্যাঁ আব্বু, আজই শোনাও। জিশান সমর্থন দেয় অর্থিকে।
— তাহলে চলো, আমরা অন্য কোথাও গিয়ে বসি।
রহমান টেলিস্কোপের নলে ক্যাপ পরালেন। কালো কাপড় জড়ালেন পুরো টেলিস্কোপের গায়ে। ধীরে ধীরে চেইন টেনে টেলিস্কোপটা আবদ্ধ করলেন কাপড়ের ভেতর। ধুলোবালি থেকে বাঁচাতে। তারপর চেয়ার থেকে নেমে পড়লেন। দু’হাতে তালি দিয়ে বললেন— তাহলে চলো শীতলপাটিতে গিয়ে বসি।
জিশান অর্থি খুশি। দৌড়ে গিয়ে ছাদের এক পাশে রাখা শীতলপাটি নিয়ে আসে। নানুবাড়ি থেকে আনা এ পাটি। সিলেটের ঐতিহ্য শীতলপাটি। রহমান নিজের বিছানায় পেতে শো’ন গরমকালে। শীতলপাটি সত্যিই শীতল।
রহমান সাহেব আগে বসেন শীতলপাটিতে। জিশান ও অর্থিও বসে আব্বুর মুখোমুখি।
— এবার বলো ভূতের গল্পটা। জিশান-অর্থি বলল।
— ঊনিশ শ’ চুয়াত্তর সালের ঘটনা। দেশে চলছে আকাল। মানে দুর্ভিক্ষ। মানুষ খেতে না পেয়ে মারা যাচ্ছে প্রতিদিন। পত্রিকায় কঙ্কালসার মানুষের ছবি ছাপা হচ্ছে। ডাস্টবিন থেকে পঁচা খাবার কুড়িয়ে ক্ষুধার্ত মানুষ খাচ্ছে এমন দৃশ্যও ধরা পড়ছে সাংবাদিকের ক্যামেরায়। এমন আকালের দিনে তোমার দাদু ঠিক করলেন আমাদের নানাবাড়ি নিয়ে যাবেন।
— তার মানে দুর্ভিক্ষের দিনে তোমরা বেড়াতে বেরুলে? জিশানের প্রশ্ন।
— হ্যাঁ, বেড়াতে বেরুলাম। তোমাদের দাদু ছিলেন সরকারি চাকুরে। সরকারি চাকরির নিয়মমতো বেড়াতে যাবার জন্য ছুটি ও বোনাস মেলে কয়েক বছর পর। যাকে যখন দেবে সে সময় ছুটি এবং বোনাস নিয়ে থাকে। সেটা কর্তার ইচ্ছেয়।
— ও আচ্ছা, এবার বলো ভূতের গল্পটা। অর্থি বলল। এতক্ষণ অর্থি চুপ ছিল। বোঝা গেল গল্পটা শুনতে সে তড়পাচ্ছে।
— আমাদের নানাবাড়ি কিন্তু গ্রামে নয়। শহরেই। ব্রিটিশ আমলে ফরেস্ট রেঞ্জার নানাজী খুলনা শহরে বিশাল জায়গা কিনে বাড়ি বানিয়েছিলেন। অবশ্য গ্রামেও তাঁর বাড়ি ছিল। তখন ঐ এলাকা শহুরে হয়ে ওঠেনি। সারি সারি সুপারি-নারকেল গাছে ভরা। রাতে বাতাসে সেসব গাছের পাতা শির শির আওয়াজ তুলত। ভূতের নাকি সুরের মতো শুনতে লাগত।
— বেশি বড় হয়ে যাচ্ছে ভূমিকা— জিশান টেনে টেনে বলল।
বোঝা গেল জিশানের আসল গল্পটা শুনতে তর সইছে না।
— বা রে, প্রেক্ষাপট না বললে গল্প হয়? তাছাড়া এতো শুধু গল্প নয়— সত্যি!
— আমার মামা ছিলেন দুজন, চার খালা। খুলনা শহরেই থাকতেন তারা। তার মানে মামাতো খালাতো মিলিয়ে আমরা ছোটদের বাহিনী প্রায় এক ডজন। মামাবাড়ি বেড়াতে এসেছি। সাত খুন মাফ। অবাধ স্বাধীনতা। আমাদের কেউ কিছু বলে না।
— হয়েছে এবার গল্পটা বলো। গম্ভীর গলায় জিশান বলল।
— এগুলোও তো গল্প, আমাদের ছেলেবেলার গল্প, তোমাদের জানতে ইচ্ছে করে না? রহমান বললেন।
— করে, কিন্তু ভূতের গল্পটা নিশ্চয়ই মজার, ওটা জানতে ইচ্ছে করছে বেশি। অর্থি বলল।
— ঠিক আছে বলছি। আমাদের সবার বড় ছিলেন কামরুল ভাই। ছোট মামার বড় ছেলে। মেট্রিক পরীক্ষায় দু’একবার অ্যাপিয়ার হয়ে লাড্ডু পেয়েছেন। থাকতেন একটা বারান্দার কিছু অংশ হার্ডবোর্ড দিয়ে পার্টিশন করা ছোট্ট একটি ঘরে। ওই ঘরে বসে আমাদের রাতে গল্পের আসর বসতো। একদিন কামরুল ভাই আমাদের গল্পের আসরে ঢুকে গেলেন। শোনালেন ভূতের গল্প দু’একটা। বললেন, চাক্ষুস ভূত দেখতে চাইলে তিনি দেখাতে পারেন। ভূত দেখানো তার কাছে খুব সোজা।
আমি প্রথমেই রাজি হলাম।
— তুমি রাজি হলে? অর্থি ভীত কণ্ঠে বলল।
— তারপর কিভাবে দেখলে? জিশান বলল।
— কামরুল ভাই বললেন বেশি লোককে দেখানো যাবে না।
একজন কি দুজন। আমি তো প্রথমেই রাজি। তাই আমার সাথে আরেকজন সুযোগ পেল, সে হলো সেলিম। খালাতো ভাই, ভীষণ দুষ্টুু।
— তারপর কী হলো? জিশান উত্তেজিত।
— কামরুল ভাইয়ের কথামতো রাতে তার ঘরে আমরা দু’জন থাকতে রাজি হলাম। কামরুল ভাই গভীর রাতে ডেকে আমাদের ভূত দেখাবেন। ছোট্ট একজনী খাটে আঁটাআঁটি করে দু’জন শোয়া যাবে মাত্র, তিনজন নয়। কামরুল ভাই বললেন তিনি ঘুমাবেন না। চেয়ারে বসে পড়বেন। তার পরীক্ষা আছে।
— তার মানে বেচারা কামরুল চাচাজান তোমাদের জন্য খাটটা দিয়ে নিজে বসে বসে রাত পার করলেন? জিশান বলল।
— হ্যাঁ, সে রকমই। কামরুল ভাই বললেন অন্তত রাত দু’ টা থেকে তিনটের আগে ভূত দেখা যাবে না। দেখা যাবে জানালা দিয়ে রাস্তার ওপর টগবগ টগবগ করে ছুটে যাওয়া জোড়ায় জোড়ায় সাদা ঘোড়া।
— ঘোড়াভূত! অর্থির কণ্ঠস্বর আরো নিম্নে নেমে গেছে। ফ্যাঁস ফ্যাঁস করছিল।
— হ্যাঁ, ঘোড়াভূত!
— বেশ ইন্টারেস্টিং তো! তারপর কী হলো। জিশানের গলায় সামান্য কম্পন। গা ঘেঁষে বসেছে ওরা। বাতাস একটু জোরে বইতে শুরু করেছে। ছাদের টবে অনেক জাতের ফুল ফুটেছে। রাতের বাতাস মিলিত ফুলের অচেনা সুবাস নাকে এসে লাগছে। সুগন্ধে যেন মাতোয়ারা করে তুলছে পরিবেশ। কোন বিল্ডিং থেকে ঝুন ঝুন ঝুন ঝুন নূপুরের শব্দও কানে আসছিল। টিভিতে নাচের অনুষ্ঠান চলছিল বোধ হয়। বিল্ডিংয়ের গা ঘেঁষে দাঁড়ানো নারকেল গাছটার পাতা হিস হিস শির শির শব্দে একটা ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
— আহ্! কী সুগন্ধ! রহমান দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললেন।
— এরপর কী হলো বলো, রাত হচ্ছে— আম্মু লেদুদাদুকে পাঠাতে পারেন ডাকতে। অর্থি বলল।
লেদুচাচা একটু আগে ছাদেই ছিলেন। এশার আজানের পর উঠে গেছেন। মসজিদে যেতে পারেন।
— বলছি। তারপর সেই কামরুল ভাইয়ের ছোট্ট চৌকিতে আমরা দু’জন শু’লাম আঁটাআঁটি করে। কামরুল ভাই হারিকেনের আলো কমিয়ে বই হাতে চেয়ারে বসে ঘুমে ঢুলছেন। পড়ার ভান করতে থাকলেন। চোখে ঘুম নিয়ে কি পড়া হয়?
ঘুমাস না কিন্তু সেলিম-রহমান— তাহলে মিস করবি। কামরুল ভাই আমাদের বললেন।
না, ঘুমাব না। খুব জোর দিয়ে বললাম দুজন। কামরুল ভাই কিভাবে একটু পর বললেন— এখন তো রাত বারোটা। আরো ঢের দেরি ঘোড়াভূত আসতে। তোরা বরং ঘণ্টা দুয়েক ঘুমিয়ে নে। আমি তো জেগে আছি। পড়ছি। সামনেই পরীক্ষা। তোদের সময়মতো ডেকে দেবো। তবে এক ডাকেই উঠবি। তা না হলে এত রাতে বেশি ডাকাডাকি করলে সবাই উঠে যাবে। ভূতও যাবে কিলও জুটবে।
— তারপর কী হলো? অর্থির প্রশ্ন।
— ধীরে ধীরে রাত গভীরে প্রবেশ করতে থাকে। আমাদের চোখ ভারী হয়ে আসে। ঘুমপরী চুম দিয়ে চোখের পাতা এক করে পালিয়ে যায়। আমরা ঘুমের দেশে ফুল বাগানে উড়ে বেড়াচ্ছি।
— না, এসব না ঠিকঠাক বলো। জিশানের আপত্তি।
— এমন সময় কামরুল ভাইয়ের ফ্যাঁস ফ্যাঁস কণ্ঠ— সেলিম, রহমান— এ্যাই সেলিম, রহমান! আমরা লাফ দিয়ে উঠি। কামরুল ভাই ভয়ে নিজেই জমে গেছেন। আমাদের চৌকিতে উঠে বসেছেন পা দু’খান তুলে। আর যে জানালা দিয়ে ভূত দেখার কথা সেটাও বন্ধ। আমরা জিজ্ঞেস করলাম— এসেছিল? কামরুল ভাই ঘর ঘর ঘর ঘর গলার শব্দে বললেন আজ এসেছিল অনেক-। বুঝতে পারলাম ভয়ে কামরুল ভাই আমাদের যথাসময়ে ডাকতেই পারেননি।
— তারপর কী হলো? ভূত দেখা হলো না? জিশান হতাশ।
— না, হয়েছে সেদিন নয়। কামরুল ভাই বললেন, পরের দিন তার ঘরে শুতে এবং সত্যি সত্যি তিনি ভূত দেখিয়ে ছাড়বেন। আমরা নাছোড়বান্দা রাজি হলাম। বাকি রাত ওই চৌকিতে পার করলাম দু’জন আড়াআড়ি শুয়ে। কামরুল ভাই দেয়ালে ঠেস দিয়ে ঘোড়ার মতো নাক ডেকে ঘুমালেন।
— পরের দিনের ঘটনাটা বলো আব্বু, জলদি! অর্থি অস্থির।
— বুঝতে পারলাম আমাদের ঘুমই মাটি করেছে সব। কুম্ভকর্ণ ঘুমটা ভূত দেখার এত বড় সুযোগ মিস্ করে দিলো। পরের দিন দিনে খানিকটা ঘুমিয়ে নিয়েছি। যাতে রাতের ঘুমটা তাড়ানো যায়। তাছাড়া নানীজানকে বলে গরম গরম চা-ও খেয়েছি। পরের দিন আমাদের চোখে ঘুম নেই। গল্প করে কাটিয়ে দিচ্ছি রাত। কামরুল ভাই বললেন আমরা শুনলাম। খুলনা শহরের বিখ্যাত ভূতের বাড়ির কাহিনীও শোনালেন। না জেনে এক মাড়োয়ারি বাড়িটা কিনে ফেলেন। তারপর ভূতের হাতে তার মৃত্যু হয়।
— পরের দিন ভূত দেখলে কি না? জিশান বিরক্ত।
— বলছি, গির্জার ঘণ্টা বাজতে থাকে। বারোটা থেকে ঘণ্টাধ্বনি কমে শব্দ বাড়ে। আমাদের কান খাড়া। ছোট্ট জানালা দিয়ে আমরা রাস্তা দেখছি। ধীরে ধীরে একদম ফাঁকা হয়ে গেল। কুকুরের চলাফেরা ছাড়া মানুষের ছায়া পর্যন্ত নেই। রাত দু’টা কি আড়াইটা। আমাদের কানে ঘোড়ার খুড়ের শব্দ এলো। দূরে বলে মনে হলো। কামরুল ভাই বললেন— সেলিম রহমান আসছে কিন্তু। আমরা নিঃশ্বাস বন্ধ করে জানালা দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রয়েছি। এমন সময় দেখলাম এক জোড়া সাদা ঘোড়া রাস্তা দিয়ে ছুটে যাচ্ছে আরোহী নেই।
টগ্ বগ্ টগ্ বগ্ টগ্ বগ্ টগ্ বগ্ ….
এমন সময় ভূতের মতো এসে দাঁড়াল লেদুচাচা। হঠাৎ এসে সামনে দাঁড়ানোতে পূর্ণিমার আলোয় ভূতের মতোই লাগে লেদুচাচাকে।
— দীনা আম্মায় খাইতে ডাকছুইন— লেদু চাচা বললেন।
রহমান শীতলপাটি গুটিয়ে লেদু চাচার হাতে ধরিয়ে দেন।
।। পাঁচ।।
আষাঢ় মাস হলেও বৃষ্টির দেখা নেই। বিকেলে আকাশে মেঘ জমেছিল। আকাশটা মুখ গোমড়া করেছিল। বুঝি ‘ভ্যা’ করে কেঁদে দেবে। না, বৃষ্টি ঝরেনি। ঠাণ্ডা বাতাসও ছেড়েছিল। আব্বু বলেছিলেন— ঠাণ্ডা বাতাস ছাড়া মানে বৃষ্টি নামবে। কিন্তু সেই বৃষ্টির দেখা মেলেনি।
বৃষ্টি না হওয়ায় ভালোই হয়েছে জিশান-অর্থির। অন্যান্য দিনের মতো আজো ছাদে উঠেছে ওরা। লোডশেডিং এর কল্যাণে। বেঁচে থাকো লোডশেডিং! চিরকাল তুমি বেঁচে থাকো।!
জিশান অর্থি মনে মনে ভাবে।
শুধু জিশান অর্থি না, একে একে দীনা রহমান, লেদুচাচাও উঠে এসেছেন ছাদে। এই উন্মুক্ত স্থান ছাদটা সবার প্রিয়। আর প্রিয় হবার কারণও আছে। ছাদের অপূর্ব পরিবেশ। আর ছাদে এলে আকাশকে কাছে পাওয়া যায়।
ছাদে এসে দীনা-রহমান শখের বাগানটা একটা চক্কর লাগান। চক্কর লাগায় না কে! জিশান অর্থি লেদুচাচা, সবাই। গাছের সঙ্গে এদের সবার ভাব জমে গেছে।
তবে গাছের সঙ্গে ভাবটা লেদুচাচারই বেশি। তারপর দীনার। লেদুচাচা গাছের যত্ন-আত্তি করেন নিজ সন্তানের মতো। সন্তানকে যেভাবে বাবা-মা যত্ন করে থাকে, লেদুচাচা ছাদের ওপর টবের গাছগুলোকে তেমন মহব্বত করেন।
বাগান দেখতে এসে দীনার চোখ জুড়িয়ে গেল। ফুলে ফুলে সেজে উঠেছে ছাদ। টগর, হাস্নাহেনা, লিলি, বেলি ফুলের সমাহার দেখে খুশি হয় দীনার মন।
— আম্মু, দেখে যাও কী সুন্দর কনকচাঁপা ফুটেছে! অর্থি চিৎকার করে।
কনকচাঁপা গাছ এমনিতে অনেক বড় হয়। কিন্তু এই গাছটি কলম করে একটা কাটা ড্রামে লাগানো। এবারই গাছে ফুল এলো। দীনা তাই এগিয়ে যায় গাছটার কাছে। এখনো কলি অবস্থায়। দেখতে সুন্দর আঙুলের মতো। এ জন্য সুন্দর আঙুলের সঙ্গে কনকচাঁপার উপমা দেওয়া হয়।
— আম্মু, কনকচাঁপার আরেকটা নাম যেন কী? অর্থি বলল।
— মুচকুন্দ। বড় মিষ্টি ঘ্রাণ ফুলের। আগের দিনের লোকেরা এ ফুলের নির্যাস দিয়ে শরবত খেতো। মুচকুন্দ কাঠ বড়ই মূল্যবান।
— তোমার ছাদে এলে বলে দেওয়া যায় কোন ঋতু যাচ্ছে। রহমান কখন তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়ে ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করছিলেন তা দীনা টের পাননি।
—ঠিক বলেছ, তাছাড়া ফুলের ঘ্রাণ যখন নাকে এসে লাগে মনটা সতেজ হয়ে ওঠে। আচ্ছা জিশানের আব্বু, এক কাজ করলে হয় না, বর্ষাকালের এমন সুন্দর ফুল কদমকে ছাদে ঠাঁই দেওয়া যায় না?
দীনার মুখে মুচকি হাসি। কথাটা বলে সে বুঝতে পারে ঠিক হলো না বুঝি— কদম গাছ বিশাল হয়ে থাকে।
— খুউব হয়— আর ছোটকালে একটা গান শুনেছি তাও গাওয়া যায়— গলা ছেড়ে সত্যি সত্যি গাইতে লাগলেন।
দীনা, জিশান ও অর্থি হেসে গড়িয়ে পড়ল।
ঠাণ্ডা বাতাস ছেড়েছে। আকাশের দিকে চোখ যায়। আর আকাশের দিকে চোখ পড়া মানে তাকে টানতে থাকে সাধের টেলিস্কোপ ঘর। আকাশে তেমন মেঘ নেই। ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ এগিয়ে চলেছে। চেষ্টা করলে হয়তো আজ সেই নক্ষত্র দেখা যেতে পারে। রণে ভঙ্গ দেন রহমান।
রহমান চলে এলেন টেলিস্কোপ ঘরে। টেলিস্কোপের মাথার ক্যাপটা সরিয়ে চোখ রাখেন আইপয়েন্টে। ধীরে ধীরে ঘোরাতে থাকেন। বিস্ময়ের এক অপার জগতে ডুব দেন তিনি। পৃথিবীটা মিথ্যে হয়ে যায়। মনে হয় তিনি পৃথিবীতে নেই। কোনো এক গ্রহে চলে গেছেন। সৌরজগতে বিচরণ করছেন। মনে মনে খুঁজতে থাকেন পূর্ব দিকের ছায়াপথ। পেয়ে যান। এরপর আরো পূর্ব দিকে দৃষ্টি রাখেন। ছায়াপথটির আরো নিচের দিকে । একটু একটু করে। অসংখ্য নক্ষত্রের মাঝে খোঁজেন এ মাসের নক্ষত্র— ধনুকে। খুঁজতে থাকেন আরো দুটি নক্ষত্রকে। উত্তর আষাঢ়া ও পূর্ব আষাঢ়া। যাদের নামে হয়েছে এ মাসের নামকরণ— আষাঢ়।
জিশান-অর্থি হাজির।
— আব্বু কী দেখো? অর্থির প্রশ্ন।
এ মাসের নক্ষত্র খুঁজি। রহমান সাহেব জবাব দিলেন।
জিশান-অর্থি জানে এ সময় বেশি কথা বলা নিষেধ। তাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।
— না, এখনো পাইনি। রহমান সাহেব গভীর মনোযোগ দিয়ে খুঁজতে থাকেন। আকাশরাজ্যে বিচরণ করার এক আনন্দই আলাদা।
অর্থি-জিশানকে আরো অপেক্ষা করতে হবে। ওরা জানে একটা নক্ষত্র খুঁজে পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টাও চলে যায়, আবার কয়েক দিন পর্যন্ত। আকাশের মতিগতি সবদিন একরকম থাকে না। মেঘের লুকোচুরি তো আছেই। দৃষ্টির অনেক দূরে থেকে লুকোচুরি খেলতে ভালোবাসে ওরা?
জিশান-অর্থি খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে তারাদের পতন দেখে।
– ইউরেকা – ইউরেকা – ইউরেকা – ইউরেকা –
চিৎকার করে ওঠেন রহমান সাহেব। কোনো নক্ষত্রের সন্ধান পেলেই রহমান শিশুর মতো চিৎকার করেন। এটা তার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। জিশান-অর্থির জানা।
— কী পেয়েছ আব্বু, কী পেয়েছ? অর্থি-জিশান এগিয়ে আসে।
— প্রথমে অর্থিকে চান্স দাও জিশান, কারণ বেশি সময় উজ্জ্বল থাকবে না নক্ষত্রগুলো। রহমান চেয়ার থেকে নেমে অর্থিকে উঠতে সাহায্য করেন।
অর্থি চেয়ারে বসে ধীরে ধীরে মাথা ঝুঁকিয়ে চোখ রাখে আই পয়েন্টে।
— অর্থি, নীল ক্রস দেখতে পাচ্ছ?
— জি আব্বু, পাচ্ছি।
— ঠিক তার নিচের উজ্জ্বল তারাটি হচ্ছে ধনু। দেখতে পাচ্ছ?
— পাচ্ছি। অর্থি আস্তে বলল।
— এর কাছাকাছি আরো দু‘টি নক্ষত্র আরো উজ্জ্বল দেখতে পাচ্ছ?
— পাচ্ছি। অর্থি খুশি।
— ও দু‘টিই উত্তর এবং পূর্ব আষাঢ়া। রহমান বললেন।
এবার জিশানের পালা।
।। ছয়।।
লেদু চাচার জ্বর ছাড়তেই চাইছে না। বেশ কয়েক দিন হয়ে গেল পড়ে আছেন পশ্চিম দিকের ঘরটায়। পাড়ার ডাক্তার বিলাস বাবুকে দেখানো হলো। তিনি বললেন, কয়েক দিন দেখতে। প্যারাসিটামল খেতে বললেন আর জ্বরের ওঠানামা পরীক্ষা করতে বললেন। এই ওঠানামা পরখ করতেই একটা গ্রাফ চার্ট দিয়ে বললেন, দু’ঘণ্টা পরপর থার্মোমিটারে জ্বর মেপে ওতে টুকে রাখতে। ডাক্তার বাবু জিজ্ঞেস করলেন, পারবেন তো?
উপস্থিত ছিল সবাই। জিশান বলে উঠল, ডাক্তার বাবু আমি পারব।
ডাক্তার বাবু হেসে বললেন, বেশ বেশ ভবিষ্যতে কী হবে খোকা?
জিশান ঢোক গিলে বলল— জ্যোতির্বিজ্ঞানী হবো।
ডাক্তার বাবু কপালে চোখ তুলে রহমানের দিকে একবার, দীনার দিকে একবার তাকিয়ে বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে জানতে চান সেটা আবার কী?
রহমান হেসে বললেন— আকাশের গ্রহ নক্ষত্র নিয়ে যারা গবেষণা করেন, তাদের অ্যাসট্রোনোমার বা জ্যোতির্বিজ্ঞানী বলে। আমার ছেলের ও বিষয়ে একটু আগ্রহ আছে ডাক্তার বাবু।
— থাকবে না! বাবার যখন টেলিস্কোপ নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আকাশে চোখ রেখে সময় কাটে, ছেলের সে আগ্রহ থাকতেই হবে। দীনা টিপ্পুনী কাটলেন।
— বাবার পেশাটা কিন্তু অ্যাসট্রোলজিভিত্তিক নয়, আর বাবার আগ্রহ থাকলেই ছেলের থাকবে, এমনটা অনেক সময় দেখা যায় না।
ডাক্তার বাবু শুধু হেসেই গেলেন। রহমান-দীনার অম্লমধুর বাক্য বিনিময় বেশ উপভোগ করলেন।
— ডাক্তার সাহেব বোধহয় আশা করেছিলেন, আমার ছেলে ডাক্তার হবার কথা বলবে, যেহেতু দাদার জ্বর মাপতে সে আগ্রহ প্রকাশ করল। রহমান সাহেব হাসতে হাসতে বললেন।
জিশানদের চলছিল গ্রীষ্মের ছুটি। তাই দাদার জ্বর মাপার কাজটি ঘড়ি দেখে ঠিকঠাক মতোই চালিয়ে গেল জিশান। অর্থিও দাদার কপালে পানিপট্টি দেয়া, পথ্য নিয়ে আসা, ফ্যানের বাতাস সহ্য করতে না পারলে সুইচ অফ করে দিয়ে ছোট্ট হাতপাখা দিয়ে মাথায় বাতাস দেয়া— এসব নানা সেবায় ব্যস্ত থাকল। এমনকি বিকালবেলা ছাদে না উঠে দুজন দাদার পাশে থেকে বেশ সেবা দিতে থাকে।
দীনা যেভাবে বলে যান অক্ষরে অক্ষরে পালন করে দুজন।
এভাবে কেটে গেল পাঁচ দিন। রহমান সকালে ঘর হতে বের হবার সময় একবার, আর সন্ধ্যায় ঘরে ফিরেই কাপড় ছাড়ার আগে আরেকবার লেদুচাচার শরীরের খবর নেন। বিলাসবাবুকে ফোন দিলেই চলে আসেন। ডাক্তার সাহেবও সরকারি ডাক্তার ছিলেন। রিটায়ার্ড করে এলাকায় বাড়ি করেছেন। নিরাময় ফার্মেসি নামে তার নিজস্ব ডিসপেনসারিতে বসেন সকাল-বিকেল। অন্যান্য ডাক্তারদের সবসময় ডেকেডুকে পাওয়া যায় না। বিলাস বাবুকে ডাকলেই পাওয়া যায়। তাই এলাকার সবাই বিলাস বাবুকেই একমাত্র নির্ভরযোগ্য ডাক্তার হিসেবে জানে। বিলাসবাবু এ পরিবারের হাউস ফিজিশিয়ান।
রহমান ঘরে ঢুকেই লেদু চাচার জ্বরের ধারা নিয়ে ভাবেন। পাঁচ-পাঁচটা দিন চলে গেল। আজ বিলাসবাবুকে আবার কল দিবেন। কী বলেন তিনি, শুনে বড় ডাক্তারকে দেখাবেন। কিন্তু চাচা এসব ডাক্তারের ওপর নির্ভর করতে চাচ্ছেন না। বারবার বলছেন— এসব সুন্দর সুন্দর মোড়কে ভরা ট্যাবলেটে তার রোগ ভালো হবে না। তার দরকার গ্রামের ভীম কবিরাজের ঔষধ। অর্থাৎ জড়ি বটি ছাল-বাকল খেলে নাকি তার রোগ ভালো হয়ে যাবে। অনেক অনুরোধ বুঝিয়ে-শুনিয়ে এ ক’টা দিন রাখা গেছে। এখন তিনি প্রায় ব্যস্ত গ্রামে— ফিরে যাবেন। ভীম কবিরাজের ঔষধ খাবেন। ভীমের অবশ্য আশে পাশের দশটা গ্রামে নামডাক কদর ভালো। ছোটবেলায় ভীমের তেতো ঔষধ রহমানের পেটেও গেছে। ভীমের জড়ি বটি মধুসহযোগে খেলেও তেতো স্বাদ থেকে বাঁচার উপায় নেই। অবশ্য তার হাত যশ আছে। বংশপরম্পরা তারা কবিরাজ। ভীমের বাবা রাধেশ্যাম ছিলেন জবরদস্ত কবিরাজ। একাত্তরে যুদ্ধের সময় রাধেশ্যাম পুরো পরিবার নিয়ে কোলকাতা চলে যান। সেখানে থাকা অবস্থায় তিনি মারা যান। ভীম কিন্তু ফিরে আসেন দেশের মায়ায়।
রহমান এসব ভাবতে ভাবতে লেদুচাচার ঘরে ঢোকেন।
— চাচার শরীর কী লাহান?
লেদুচাচা বসাই ছিলেন। জিশান অর্থি দুটো মোড়ায় বসা।
— জ্বর নামছে না বাবা। মাথা খা-লি চক্কর দে-র-
— বিলাসবাবুরে কল দিছি চাচা। দেখি তাইন কিতা কইন, এরপর বড় ডাক্তারের কাছে লইয়া যামু।
রহমান লেদুচাচার সিথানের পাশে রাখা জ্বর মাপা চার্ট উঠিয়ে দেখলেন। জ্বরের গ্রাফটা সুবিধার নয়। কখনো খুব কমেনি। ওঠানামা করছে বেশ।
— জিশান-অর্থি। তোমরা দাদার দিকে নজর রাখো।
রহমান ঘর থেকে বের হয়ে পূর্ব দিকে নিজ ঘরের দিকে হাঁটা দিলেন।
ডাক্তার বাবু এসেছিলেন কিছুক্ষণ আগে। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়ে গেছেন। রক্ত পরীক্ষা আছে এর মধ্যে। কিন্তু লেদুচাচা এসব করতে চান না। ইঞ্জেকশনকে ভীষণ ভয় পান। আর রক্ত দেখতেই পারেন না। তার শরীর থেকে রক্ত বের করে নেবে এতে তিনি রাজি নন।
— চাচা, আমরা চোট পাইয়া থাকি না, শরীর কাটিয়া যায় না, রক্ত বারয় না, আর এইটা হইল চিকন সুঁই দিয়া দুই ফোঁটা রক্ত নিবো- ব্যস্, জিশান অর্থি তারার কতবার নিলো—
— দাদাজান, আমি তো গত মাসেও রক্ত পরীক্ষা করেছি। কোনো ব্যথা পাইনি। আপনিও কোনো ব্যথা পাবেন না। জিশান দাদাকে অভয় দেয়।
— নারে বাবা না, আমি ডরাই, সুঁই আমার শরীরে ঢুকাইলে আমি মরি যাইমু হুঁ হুঁ হুঁ
লেদুচাচা শিশুর মতো কান্না শুরু করেন। অগত্যা তার রক্ত পরীক্ষা হতে বিরত হতে হলো। কিন্তু বড় ডাক্তারকে না দেখিয়ে ঢাকা থেকে চাচাকে যেতে দিলে একটা মারাত্মক ভুল করা হবে। দীনা মনে মনে ভাবে।
— চাচা আপনার রক্ত পরীক্ষা আমরা করলাম না। কিন্তু বড় ডাক্তারকে দেখাতে তো আপত্তি নেই। চলেন আপনাকে কাল বড় ডাক্তারকে দেখিয়ে আনি। দীনা বলল।
ভাতিজা বউ একটা কথা বলেছে ফেলতে পারছেন না লেদুচাচা। কিছু সময় ঝিম মেরে থেকে জবাব দেন— বড় ডাক্তার দেখাইয়া আমারে ফেসুগঞ্জ পাঠাই দি লাও।
তার মানে তিনি ফেঞ্চুগঞ্জের কুরবানপুর গ্রামে গিয়ে ভীম কবিরাজের ঔষধ খাবেন। রহমান-দীনা বুঝতে পারে চাচার মনের মতিগতি। কিন্তু সমস্যা হলো বাড়িতে এখন তেমন কেউ থাকে না। যারা থাকে বেশির ভাগ কামলা, চাকর বাকর। রায়ত দুই পরিবার থাকে অনতিদূরে। চাচাকে সেবা করবে কে? চাচার নিজের কেউ নেই। রহমান দীনার পক্ষেও বাড়িতে গিয়ে বেশি দিন থাকা সম্ভব নয়। দু’চার দিন ছুটি নিতে পারে। যাওয়া আসায় দু’দিন চলে যাবে। বাড়িতে দু’দিন। ব্যস।
— চাচা, আপনি বাড়ি গেলে দেখবে কে? দীনা জানতে চায়।
— আল্লাহ তা’লা দেখবা—
লেদুচাচার হেঁয়ালি জবাব। দীনা-রহমান বুঝতে পারেন আত্মভোলা এ মানুষটা বাস্তবতা বুঝতে চাইবেন না। কী হবে শুধু শুধু ঢাকায় রেখে। মন যখন ছুটে গেছে আর ভীম কবিরাজের ওপর যখন আস্থা, তাকে গ্রামে পাঠিয়ে দেয়াই ভালো।
রহমান দীনা কানে কানে শলা পরামর্শ করেন।
— ঠিক আছে আপনাকে গ্রামে নিয়ে যাবো। কাল বড় ডাক্তারকে দেখিয়ে দু’দিনের ছুটি মঞ্জুর করিয়ে তারপর চাচা। দীনা বলল।
— মা, যেইটা ভালা মনে কর। আমার যাইবার কাম জলদি। লেদুচাচা ধীরে ধীরে বললেন।
— চাচা, আমরা পড়শুদিন যাইমু ইনশাআল্লাহ! রহমান সাহেব বললেন।
অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে লেদুচাচাকে দেশের নামকরা ডাক্তার টি. ইসলামের ক্লিনিক পর্যন্ত নেওয়া গেল। ডাক্তারকে রহমান আগেই জানিয়েছিল রোগী কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে চায় না। তাই রোগীকে আগের দিনের পদ্ধতিতে, মানে স্টেথো দিয়ে শুইয়ে এপাশ ওপাশ করে হাতের সাহায্যে টিপাটিপি করে ঔষধ দিতে হবে।
ডাক্তার তাই করলেন। প্রেসক্রিপশন লেখার সময় লেদুচাচার দিকে তাকিয়ে বললেন— রক্ত পরীক্ষা ছাড়াই ঔষধ দিলাম, ঠিকমতো খাবেন। সাত দিন পর শারীরিক অবস্থা কী হয় জানাবেন।
লেদুচাচা ডাক্তারের মুখের ওপর বলে দিলেন— আমি এইসব ঔষধ খাইতাম নায়।
ডাক্তার শুনে থ। বলে কী রোগী! তাহলে তার এ প্রেসক্রিপশন করা কেন। লেদুচাচার হাত থেকে টেনে নেন এইমাত্র করা প্রেসক্রিপশন। তাহলে আপনার প্রেসক্রিপশনও লাগবে না। কলিংবেলে টিপ দিলেন। ডাক্তারের অ্যাটেনডেন্ট লোকটি এলো। বললেন উনার ভিজিটের টাকাটা ফেরত দিয়ে দাও। রহমান বলতে চাচ্ছিলেন— ভিজিটের টাকাটা ফেরত দেয়ার দরকার নেই। প্রেসক্রিপশনটাও ফেরত দিতে। কিন্তু ঘটনা এত অল্প সময়ের মধ্যে ঘটল, তার তেমন কিছু বলাও আর হলো না।
ডাক্তারের চেম্বার হতে বের হয়ে রহমান মিনিট পাঁচেক দাঁড়িয়ে থাকেন। লেদুচাচা এ কী করলেন। এত বড় ডাক্তার, যার সিরিয়াল পেতে নানা সাধ্য-সাধনা করতে হয়েছে। কলিগ লতিফের সাহায্য না পেলে সিরিয়াল পেতে সাত দিন লাগত। কিন্তু এই অসুস্থ মানুষটিকে কিছু বলেই বা কী লাভ! কয়েক মিনিট চাচার দিকে তাকিয়ে বললেন— চাচা, আপনার বরাতে কিতা আছে আল্লা জানইন, চলউখা বাসাত যাই।
অবশেষে লেদুচাচাকে নিয়ে বাড়িতে যাওয়ার সিদ্ধান্তই পাকা হলো।
সাজ সাজ রব পড়ে গেল। এতে জিশান অর্থির উৎসাহ বরাবর বেশি। দাদাজানের ব্যাগ গুছিয়ে দেয়া, নিজেদেরটাও গুছিয়ে নেয়া। সবকিছু ওরাই করতে লেগে গেল।
এ ব্যাপারে দীনা ছেলেমেয়েদের ভালো ট্রেনিং দিয়েছে। কোথাও বেড়াতে গেলে এসব তারা নিপুণভাবে করতে পারে। দীনাও তাদেরটা গুছিয়ে নিলো।
বাড়িতে জানিয়ে দেয়া হলো। এমনিতে বাড়িতে লোকের অভাব নেই। এছাড়া বাড়ির পাশাপাশি দুটো খাস রায়ত পরিবার আছে। এদের ছেলে-মেয়ে-ঝি বাড়ির সব কাজ করে দেয়। ধান ইত্যাদি যা পাওয়া যায় এরা সামলায়। আর কামলা কিষাণতো আছেই। তবে রক্তের সম্পর্কিত পরিবারের কেউ নেই। সবাই দেশের বাইরে বলা যায়। দেশে থাকার মধ্যে রহমান আর তার ছোট বোন পিয়ারী। এরা দু’জন ঢাকায় সেটেল্ড। একজন প্রকৃতিপ্রেমিক মিরপুর আরেকজন অভিজাত এলাকা গুলশান বাসিন্দা। পিয়ারী একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল। তার পক্ষে বাড়িমুখো হওয়া কঠিন।
লেদুচাচাকে বাড়িতে দেখাশোনা করবে কে এটা ভেবেই রহমান সাহেব চাচাকে নিজের কাছে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তা শুনতে রাজি নন। আর উনার বিশ্বাস, ভীম কবিরাজের ঔষধ খেলেই ভালো হয়ে যাবে রোগ। বাড়িতে খুব বেশি হলে বড়জোর তিন দিন থাকতে পারবেন তারা। তারপর?
— আব্বু কী চিন্তা করছ? জিশান অর্থি কোথা থেকে এসে প্রবেশ করল ড্রয়িং রুমে।
— চিন্তা তো এখন একটাই, তোমার দাদাজানকে নিয়ে। বাড়িতে আমরা বড় জোর তিন দিন থাকতে পারব, তারপর?
— আব্বু, তারপর আমি থাকব দাদাজানের সঙ্গে। জিশান এমনভাবে বলল যেন সে অনেক বড় হয়ে গেছে, একটা রোগীর সেবা করার ক্ষমতা তার হয়েছে।
রহমান মাটি থেকে দৃষ্টি উঠিয়ে এক ঝটকায় জিশানের দিকে তাকালেন। বলে কী ক্লাস ফাইভে পড়া তার ছেলেটি!
— কী বলছিস! তোর কী বয়স, একজন রোগীর সেবা করার ক্ষমতা তোর হয়েছে?
— ক্যান? এ কয়দিন দাদার সেবা করেছে কে, আমি আর অর্থিই তো! অর্থি এটা-ওটা এনে দিত বাকি সব আমিই তো করেছি। আমি পারব। আর ভীম কবিরাজের ঔষধ খেলে দাদা সুস্থ হয়ে উঠবেন। আব্বু, দাদার অসুখটা শুধুই অসুখ না। মানসিক ব্যাপার আছে। বাড়ি গেলে দেখবে তিনি এমনিতেই সুস্থ হয়ে উঠবেন।
রহমান জিশানের বড়দের মতো বিজ্ঞ কথাবার্তা শুনে অবাক হলেন। অনেক কথাই যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু তাই বলে বাড়িতে একটা রোগীকে সেবা করবে সে একা! এটা গ্রহণযোগ্য নয়।
এমন সময় দীনা এলো হন্তদন্ত হয়ে। দীনার একটু ব্যস্ততা বেড়েছে। হঠাৎ বাড়ি যাওয়ার প্রোগ্রাম এর আগে কখনো হয়নি। আট বছর আগে মায়ের মৃত্যুর সংবাদে রাতের কারে যেতে হয়েছিল। সেটা ছিল মৃত্যুর ব্যাপার।
— শোনো তোমার ছেলে কী বলছে।
— কী বলছে তা শোনার একটুও সময় হাতে নেই। দীনা রাগত কণ্ঠে বলল।
— না না জরুরি কথা।
— চট্ করে বলে ফেলো তাহলে। দীনা সোফার একটাতে ধপাস করে বসল।
— বলছে, আমরা বাড়ি থেকে ফিরে এলে জিশান লেদুচাচার কাছেই থেকে যাবে। সেবা করার জন্য।
— সত্যি বলছে, খারাপ বলেনি তো। তোমার ছেলে এমনটা হবে না। তুমি মানুষের সেবা করে এলে সারাটা জীবন। বন্যা ঝড় হলেই রিলিফ টীম নিয়ে কে দৌড়ায় দুর্গত এলাকায়। বলো!
— কিন্তু ওর বয়স কত?
— লেদুচাচার সেবার জন্য আমি না থেকে যাবো।
— তোমার স্কুল?
— খাতা তো সঙ্গেই আছে। ছুটি আছে আট দিন। সমস্যা হবে না। এসব নিয়ে তুমি ভেবো না।
রহমানের মাথা থেকে একটা ভারী বোঝা কেউ সরিয়ে দিল যেন। মনে মনে ভাবে সঙ্গে টেলিস্কোপটা নিয়ে গেলে মন্দ হবে না। পনের কেজি ওজনের যন্ত্রটা বহন খুব কঠিন কাজ না। দীনার ঐ পুরো ছুটিটা সেও একটু চেষ্টা করলে কাটাতে পারে। তাহলে বাড়িতে টিলার ওপর কাঠের দোতলায় বসে আকাশটা দেখার ভিন্ন মাত্রা পেত।
রহমান সাহেবের মাথা থেকে একটা ভারি বোঝা কেউ সরিয়ে দিলো। রহমান সাহেব মনের ভেতরে এ খুশি আর চেপে রাখতে পারেন না। ছুটে যান লেদু চাচার ঘরে।
ঘরে ঢোকার আগে গলায় কাশ এসে দম বন্ধ হবার মতো মনে হয়। জোর শব্দে কাশি দিয়ে তা বের করে আনেন জিভে। থুঃ শব্দ করে বারান্দা থেকে ছুড়ে মারেন উঠোনে। লেদুচাচা রহমানের আগমন টের পান ওই থুথু ফেলার শব্দে। উঠে বসেন বিছানায়।
— চাচা সব্তা ঠিকঠাক আছে আমরা বিয়ানী বেলা যাত্রা করমু। একটা মাইক্রো আমরারে কমলাপুর স্টেশনে লইয়া যাইবা।
— হাছানি বাবা। লেদুচাচা খুশিতে উৎফুল্ল ভাব প্রকাশ করলেন। তার দু’চোখ দিয়ে দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
— চাচা, আপনার নাতিয়ে কিতা কইছুইন জানইননি, আমরার ছুটি শেষ অই গেলে বাড়ি থাকি ঢাকা ফিরি গেলেগিও হে আপনার লগে থাকবো— সেবা করতো করি।
— অয়নি বা। লেদুচাচা ঝর ঝর করে কেঁদে দিলেন।
রহমান নিজেও খুব আপ্লুত। জিশানের কথা ভেবে ভেবে। রহমান সাহেবের মনে পড়ল আজ পূর্ণিমা। চাঁদটা নিশ্চয়ই উদার রূপালি জোছনার আলোয় ছাদটা ধুয়ে দেবে! যদি না আষাঢ়ের মেঘে না ঢাকে। (সমাপ্ত)



