আমি একটি রঙিন কাগজ। ফ্যাক্টরি থেকে রিলিজের পর মাসখানেক গোডাউনে পড়ে থাকলাম। জন্মের পরেই অন্ধকার আর ভ্যাপসা গরমের অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যে পড়লাম। নতুন পৃথিবীতে এসে কোথায় খাতির যত্ন পাব, তা নয়। একদিন আমাদের বের করে ট্রাকে তোলা হলো। নানা পথ পাড়ি দিয়ে একটি বড়ো কাগজের দোকানে জায়গা হলো। আমার রং লাল। দোকানের পরিবেশটা গোডাউনের চেয়ে ভালো। আলো-বাতাস পাওয়া যায়। গোডাউনের মতো দম বন্ধ হয়ে আসে না।
অনেক কাগজই বিক্রি হতে লাগল। একে একে সবাই গ্রাহকদের কাছে যোগ্যতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হচ্ছে। অবশেষে আমারও দিন এলো। বিকেল ৩ টায় স্কুল ছুটির পর এক কিশোর আমাকেসহ নীল রঙের কাগজকে কিনে বাড়িতে নিয়ে গেল। বাড়ি এসেই নাওয়াখাওয়া বাদ দিয়ে আঠা, কাঠি আর আমাদের দুজনকে দিয়ে তৈরি করে ফেলল রঙিন ঘুড়ি। দেহটা হলো লাল, আর লেজের দিকে নীল।
নীল কাগজ ও আমি একসাথে মিলে সুন্দর একটি ঘুড়িতে পরিণত হলাম। জীবনের নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করলাম। নীল কাগজ বা আমার এখন আর আলাদা কোনো পরিচয় রইল না। আমরা দুজন মিলে হয়ে গেলাম ঘুড়ি।
নিতুল বলে ডাক দিলো একজন। সম্ভবত ছেলেটার মা। আমাদের ওভাবেই রেখে চলে গেল নিতুল। বিকেলে আমাদের সাথে দেখা হলো সুতোর। নাটাই-সুতো ও ঘুড়ি মিলে হয়ে গেল নতুন এক পরিবার। লোকে বেশ প্রশংসা করল আমাকে দেখে। কেউ কেউ বলল, ‘শুধু কি দেখতে সুন্দর হলে হবে? গুণ আছে কি না তাও দেখতে হবে।’
নিতুলের এক বন্ধু বলল, ‘ভালো হবে মনে হচ্ছে। বাতাসে ছেড়ে দিয়ে দেখ, উড়তে পারে কি না।’
নিতুলের বয়সী অন্য একজন বলল, ‘না উড়লে আমার কাছে নিয়ে আসিস, অপারেশন করে দেবো। হা-হা-হা…’
এবার নিতুল বলল, ‘তার আর দরকার হবে না। তোর নিজের বানানো ঘুড়িই আগে আকাশে তুলে দেখা। তাহলেই না বুঝব কেমন ঘুড়ির ডাক্তার।’
প্রথমজন আবার বলল, ‘ওর শুধু চাপার জোর আছে। ডাক্তার না ছাই। ওর বানানো ঘুড়ি আখের খেতের মধ্যে ওড়ে। লজ্জায় আকাশে ওঠে না।’
হাসির রোল পড়ে গেল। আমিও হেসে উঠলাম, তবে কেউ দেখল না সেটা। পরক্ষণেই চিন্তা হলো, আমি উড়তে পারব তো?
নিতুল সবাইকে সাথে নিয়ে মাঠে চলে এলো। অবশ্যই আমাকে হাতে করে। মাঠে এসে দেখলাম, আরও অনেক ঘুড়ি নিয়ে এসেছে ছেলেমেয়েরা। কোনো কোনোটা আকাশে উড়ছে। দেখেই আর তর সইছে না আমার। এটা দেখে নাটাইয়ের সুতো বলে উঠল, ‘বেশি টানাটানি কইরো না যেন, ছিঁড়ে গেলে বুঝবে মজা। হারিয়ে যাবে চিরতরে।’
সুতো আরও কিছু বলল। শুনতে পেলাম না। এক ঝাপটা বাতাস এসে নাড়া দিয়ে গেল। দুলে উঠলাম আমি। হাঁক দিয়ে বলল বাতাস, ‘কিহে নতুন বন্ধু, তাড়াতাড়ি এসো, অনেক মজা করতে হবে আজ।’
বাতাসের সে দলটা চলে গেল। একটার পর একটা বাতাসের দল আসছে আর যাচ্ছে। সবাই ডেকে যাচ্ছে আমাকে। অবশেষে আমাকে ধরে টানতে লাগল নিতুলের বন্ধু। ঘুমিয়ে পড়েছিল নাটাই সুতো, টানের চোটে জেগে উঠল। কয়েক মিটার লম্বা সুতো ছেড়ে দিলো নিতুল। তার বন্ধু আমাকে ছেড়ে দিতেই নাটাই হাতে দৌড় দিলো নিতুল। অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে উপরে উঠে যেতে লাগলাম। বাতাসেরা এসে দুপাশ থেকে সঙ্গ দিচ্ছে। লেজটা দুলছে। দারুণ অনুভূতি। আকাশে উড়াটা সত্যি দারুণ মজার ব্যাপার। অল্প সময়েই অন্য ঘুড়িগুলোর উচ্চতায় উঠে এলাম। হইহই করে আমাকে স্বাগত জানাল অন্য ঘুড়িগুলো। নিতুল ও তার বন্ধুরাও দারুণ আনন্দিত। চোখে দেখা যাচ্ছে খুশির ঝিলিক। আমি ওপরে উঠছি তো উঠছিই। হঠাৎ টান পড়ল। মনে হলো কেউ টেনে ধরেছে। আর ওপরে উঠতে পারছি না। কিন্তু কেন? আমার ভাবভঙ্গি দেখে হেসে উঠল সুতো, ‘বুঝলে বন্ধু, নিতুল সুতোয় টান দিয়েছে। আর উড়তে পারবে না।’
’কিন্তু কেন? আমি তো ভালোই উড়ছি। দেখো না, কোনো কোনো ঘুড়ি ঘাই মেরে নিচে পড়ে যাচ্ছে।’
‘এটাই নিয়ম। আমরা সবাই নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে বাঁধা আছি। চাইলেও এ থেকে বেরোতে পারব না। নিয়ম ভঙ্গে শান্তি নেই।’
সুতোর কথা আমার ভালো লাগল না। তবুও এভাবেই উড়লাম। সন্ধ্যার আগেই আবার আমাকে নামিয়ে আনল নিতুল। আমাকেসহ নাটাই-সুতো নিয়ে বাড়ির পথ ধরল। দিনের নির্ধারিত একটা সময়ে উড়তে লাগলাম। সময়গুলো ভালোই কাটছে আমার। উড়তে ভীষণ ভালো লাগছে। আমার সবসময়ই উড়তে মন চায়। কিন্তু নিতুল সেটা করতে দেয় না। এই ধরাবাঁধা নিয়ম আমার ভালো লাগল না। আমি চাই স্বাধীনভাবে সবসময় উড়তে। মনে মনে সুযোগ খুঁজলাম প্রতিদিনই। যেভাবেই হোক নিতুলের কাছ থেকে মুক্ত হতে হবে। আমাকে নাটাই-সুতোর নিয়মে বেঁধে রেখেছে ও। অসহ্য জীবন। তবে সুতোর সাথে এসব নিয়ে কোনো কথা বললাম না। ও আমার শত্রু। ওকে এসব বললেই নানা জ্ঞানের কথা শোনাতে আসবে।
একদিন হঠাৎ সুযোগ চলে এলো। সেদিন বাতাসও অনেক বইছিল। নিতুল অনেক সুতো ছাড়ল। বাতাসও আস্তে আস্তে বেড়ে চলল। ওপরে উঠে প্রাণপণে টানাটানি শুরু করলাম। যেভাবেই হোক সুতো আর নিতুলের কাছ থেকে মুক্তি পেতে হবে। আমার ইচ্ছে পূরণ হলো। বাতাস আমাকে সাহায্য করল আজ প্রবলভাবে। কেটে গেল সুতো। ব্যথায় চিৎকার করে উঠল সুতো। আমার খুশি তখন দেখে কে! আস্তে আস্তে অনেক দূরে সরে গেলাম। ছোট্ট বিন্দুর মতো দেখাচ্ছে নিতুলকে। সেটাও আর দেখা গেল না। মাঠ পেরিয়ে চলে গেলাম লোকালয়ে। সেটা পেরিয়ে চলে এলাম জঙ্গলে। বাতাস আমাকে ক্রমেই ভাসিয়ে নিয়ে গেল দূরের পথে।
নিতুল নেই, সুতো নেই, আজ আমি মুক্ত-স্বাধীন। জঙ্গলের দিকে এসে খেয়াল করলাম, স্বাভাবিক ওড়ার ছন্দ হারিয়ে ফেলেছি আমি। কোনোভাবেই আর ডানামেলে উড়তে পারছি না; বরং কাঁপতে কাঁপতে আরও নিচের দিকে চলে যাচ্ছি। সর্বনাশ! হুঁশ ফিরে এলো আমার। বুঝতে পারলাম, স্বাধীনতার নামে আমার স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ হারিয়েছি। কিন্তু তখন আর কিছুই করার ছিল না। বাতাস আমাকে আর সাহায্য করল না। বুঝতে পেরেছি, নিতুলকে ছাড়া আমি কতটা অসহায়। সুতো আমার শত্রু ছিল না। বাতাসে ভেসে আমি জঙ্গলের একটি গাছের মাথায় আটকে গেলাম।
একেবারে বাজেভাবে ফেঁসে গেছি। আর ছুটতে পারলাম না। ওভাবেই ঝুলে রইলাম। জায়গাটা একেবারে নির্জন। কেউ আসে না। দিন-রাত আমি গাছের মাথায় ঝুলে রইলাম। ভোরের শিশিরে ভিজে আমার শরীর নরম হলো। রোদে পুড়ে পুড়ে উজ্জ্বল রং একেবারে ফ্যাকাসে হয়ে গেল। গাছের ডালে জড়িয়ে থাকা লেজ ছিঁড়ে গেল। ব্যথা পেলাম। এখানে আর কোনো ঘুড়ি বন্ধুর সাথে দেখা হয় না। রুগ্ন হয়ে গেলাম। কোনোমতে বেঁচে রইলাম। বুঝে গেলাম, জীবনের সোনালি সময়টা হারিয়ে ফেলেছি। আমার শরীরে যা অবস্থা, মৃত্যুর খুব দেরি নেই।
জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছি আমি। পশ্চিম আকাশে কালো মেঘ জমেছে। বোঝা যাচ্ছে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি হবে। মারা যাব এ নিয়ে দুঃখ নেই। দুঃখ এটাই, জীবনের শেষ সময়ে ঘুড়ি বন্ধু, সুতো আর নিতুলদের দেখতে পাব না। আমার আশঙ্কাকে সত্যি করে শুরু হলো তুমুল ঝড়। ক্ষতবিক্ষত করে দিলো আমার শরীর। শুরু হলো বৃষ্টি। শেষ হয়ে যাচ্ছি আমি। ঝাপসা হয়ে আসছে দৃষ্টি। এখন যদি নিতুলের দেখা পেতাম, তবে ওকে বলতাম, কখনো সৃষ্টিকর্তার নির্ধারিত সীমার বাইরে যেয়ো না। রবের দেওয়া সীমার মধ্যেই আছে প্রকৃত সফলতা, শান্তি। আমি যদি তা আগে বুঝতে পারতাম! কতই না ভালো হতো। আর কিছু ভাবতে পারলাম না। অনুভূতি শূন্য হয়ে গেল। চিরদিনের জন্য নেমে এলো অন্ধকার। মৃত্যুর আগে দেখলাম, আমার দেহটাকে প্রায় গলিয়ে ফেলেছে বৃষ্টির পানি। শুধুমাত্র কাঠির সাথে লেগে আছে এক টুকরো রঙিন কাগজ।



