সাগরতলে রঙিন দুনিয়া

আবরার হক

0
72

পৃথিবীটা কত্ত সুন্দর, তাই না? যতই দেখি, ততই যেন মুগ্ধ নয়নে অপলক তাকিয়ে থাকতে হয়। আচ্ছা, আমরা বেশিরভাগ মানুষ তো পৃথিবীর সৌন্দর্য বলতে কেবল মাটির উপর যে সৌন্দর্য দেখতে পাই, তার কথাই জানি। কিন্তু এ পৃথিবীর সৌন্দর্যের যে আরো কত দিক আছে, তা জানলে যে কেউই চমকে উঠবে। আজ আমরা তেমনই এক বিস্ময়কর সৌন্দর্যের জগৎ নিয়ে জানার চেষ্টা করবো।

আমরা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে গেলে রংবেরঙের বিভিন্ন কিছু দেখে অবাক হই। রঙের বৈচিত্র্য যেন আমাদের মনের আনন্দ অনেক বেশি বাড়িয়ে ফেলে। রহস্যের অনন্য আধার সাগর ওপর থেকে দেখতে কেবল নীল দেখা গেলেও এর তলদেশে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ রঙের দুনিয়া। রঙের এই অবিশ্বাস্য সুন্দর জগৎকে আমরা প্রবালপ্রাচীর নামে চিনি। তোমাদের অনেকেই নিশ্চয়ই প্রবাল সম্পর্কে কমবেশি জানো। কারো কারো জন্য হয়তো আজকেই নতুন জানা। অসুবিধা নেই। চলো রঙের এ দুনিয়া থেকে সবাই মিলে একটু ঘুরে আসি।
রঙের এ দুনিয়ার সবচেয়ে বড় অংশটা দেখতে হলে তোমাকে যেতে হবে ঢাকা থেকে প্রায় পৌনে আট হাজার কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের পাশে কোরাল সাগরে। প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ বর্গকিলোমিটারের এই বিশাল ‘প্রবালজগৎ’ পরিচিত ‘গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ (এৎবধঃ ইধৎৎরবৎ জববভ)’ নামে। ১৪২৯ কিমি দৈর্ঘ ও ২৪-২৪০ কিমি প্রস্থের বিশাল আয়তনের এই এলাকাটি প্রায় জার্মানির সমান।

সাতটি প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম এই প্রবালজগৎটি পৃথিবীর বৃহত্তম জীবন্ত কাঠামো। মানে এই পুরো প্রবালপ্রাচীর আসলে জীবন্ত, কোনো জড় নয়। এর পুরো এলাকার মধ্যে রয়েছে ৯৮০টি আলাদা দ্বীপ আর প্রায় ৩০০০ পৃথক প্রবাল প্রাচীর। এর প্রবালসমূহের বৈচিত্র্যও ঈর্ষণীয়, ৬০০ এর বেশি ধরনের হার্ড ও সফট প্রবাল দেখা পাওয়া যাবে এখানে। আর দ্বীপগুলোর মধ্যেও আছে ছোট প্রবালদ্বীপ থেকে প্রায় ১১০০ মিটার উঁচু পাথুরে দ্বীপ। এখানে আছে ২১৯৫ প্রজাতির উদ্ভিদ আর প্রায় ৫০০ প্রজাতির শৈবাল। গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ মেরিন পার্ক অথরিটি মনে করে, এই সম্পূর্ণ প্রবাল প্রাচীরের গঠনের কাজ শুরু হয়েছে প্রায় ৬ লক্ষ বছর আগে। আর বর্তমান স্ট্র্যাকচারে আসা শুরু করেছে তাও প্রায় ২০ হাজার বছর আগে।

পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের যেন মেলা বসেছে এই এলাকায়। কী নেই এখানে? কেবল মাছ আছে ১৬২৫ প্রজাতির, যা মোট সামুদ্রিক মাছের প্রজাতির প্রায় ১০%। এছাড়া আছে হাঙর গোত্রের ১৩৩টি প্রজাতি, ৩০ প্রজাতির তিমি, শুশুক ও ডলফিন, ১৪ প্রজাতির সামুদ্রিক সাপ, ৬ প্রজাতির সামুদ্রিক কচ্ছপসহ আরো কতো কী! এ তো গেলো পানির নিচের কথা। পানির ওপরে তাকালে চোখে পড়ে ২১৫ ধরনের পাখির। সবমিলিয়ে সমুদ্রে যত ধরনের প্রাণী বসবাস করে, তার প্রায় চার ভাগের এক ভাগ টাইপের প্রাণী এখানে দেখা যায়। এর সাথেই গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার হলো, এই প্রাণীগুলোর অনেকগুলোই বিপন্ন ও বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির।

ভূ-প্রাকৃতিক, সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থান আর প্রাণ প্রকৃতির এই বিস্ময়কর মিলনমেলাকে ১৯৮১ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থী ও পর্যটক এই গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে যান।

রঙের এই অসাধারণ জগৎ সম্পর্কে আরেকটা অত্যন্ত ইন্টারেস্টিং তথ্য না দিলে লেখাটা অপূর্ণ থেকে যাবে। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গুগল ম্যাপ তাদের স্ট্রিটভিউ টেকনোলজিকে রীতিমতো জলের তলায় নিয়ে যায়। হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছ, জলের তলায় স্ট্রিটভিউ! প্রথম পর্যায়েই গুগল যে কয়েকটি সামুদ্রিক এলাকাকে স্ট্রিটভিউ এর আওতায় আনে, গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ তার একটি।

বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত সেন্টমার্টিনের ব্যাপারে একটা কথা তোমরা শুনে থাকবে। একে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ বলা হয়। এটিও কিন্তু প্রবালের সাহায্যেও গড়া ওঠা। এতে প্রায় ৬৬ প্রজাতির প্রবাল, ১৮৭ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ১৫৩ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল, ১৫৭ প্রজাতির গুপ্তজীবী উদ্ভিদ, ২৪০ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, ১৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৪ প্রজাতির উভচর ও ১২০ প্রজাতির পাখি পাওয়া যায়।

এত কথার পর তোমাদের অনেকের মধ্যেই নিশ্চয়ই প্রবাল সম্পর্কে জানার আগ্রহ জন্মেছে। প্রবালকে দেখে বাহ্যিকভাবে উদ্ভিদ মনে হতে পারে। কিন্তু এগুলো আসলে উদ্ভিদ নয়, বরং পলিপ নামক এক ধরনের সামুদ্রিক ক্ষুদ্রকায় অজস্র প্রাণীর সমষ্টি। এগুলো এদের কাছ দিয়ে যাওয়া তুলনামূলক আরো ক্ষুদ্রাকার প্রাণীদের খাবার হিসেবে গ্রহণ করে। এদের আরেকটি খাবার হলো ‘জুওজ্যান্থেলি’ নামক এক ধরনের শৈবাল। এগুলোর সাথে সম্পর্কের কারণেই মূলত প্রবালসমূহ বিভিন্ন রঙের হয়ে থাকে।
অপরিণত দেহযন্ত্র বিশিষ্ট কোটি কোটি প্রবাল জমে সৃষ্টি হয় প্রবাল প্রাচীরের। হাজার হাজার বছর ধরে এসব প্রবাল তাদের শরীরে ক্যালসিয়াম কার্বনেট জমিয়ে থাকে। ফলে একসময় তা জমে শক্ত হয়ে যায়। এভাবেই বছরের পর বছর প্রবাল জমে আস্তে আস্তে গড়ে উঠতে থাকে প্রবাল প্রাচীর। এদের বড় হওয়ার গতি খুব ধীর, গড়পড়তা বছরে ধরনভেদে ১-১০ সেন্টিমিটার বড় হয়।

প্রবাল বিভিন্ন রঙ, আকৃতি আর সাইজের হয়ে থাকে। হরিণের শিং, গাছ, পাখা, মস্তিষ্ক বা মৌচাক, এরকম আরো অজস্র আকৃতির প্রবাল দেখা যায়। প্রবাল অনেক ধরনের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের হয়ে থাকে। অনেক প্রবাল আছে যেগুলো নিজেরা মিলে রীতিমতো সাগরতলে আলোকসজ্জা করে রাখে। কম গভীরতার পানিতে সূর্যের আলো আটকে রেখে সেই আলো প্রতিফলিত করে এক ধরনের প্রবাল। কয়েক বছর আগে বিজ্ঞানীরা তো সূর্যরশ্মি যেতে পারে না, সমুদ্রের এমন গভীরেও আলোজ্বলা প্রবালের সন্ধান পেয়েছেন।

একটু আগেই যেমন পড়লে, প্রবালপ্রাচীরগুলোতে জীববৈচিত্র্যের যেন মেলা বসে। তোমরা অনেকেই নিশ্চয়ই ভূপৃষ্ঠে জীববৈচিত্র্যের সবচেয়ে বড় জায়গা আমাজন রেইনফরেস্ট নিয়ে পড়েছ। রেইনফরেস্টে তুলনামূলক ছোট জায়গাতে বিচিত্র বৈশিষ্ট্যের হরেক রকমের প্রাণী দেখা যায়। এই কারণে প্রবালপ্রাচীরগুলোকেও সাগরতলের রেইনফরেস্ট বলা হয়। পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি প্রবালপ্রাচীর মাত্র ৫টি দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, যেগুলো হলো ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপাইনস, ফ্রান্স এবং পাপুয়া নিউগিনি।

কেবল সৌন্দর্য নয়, প্রবালপ্রাচীর অনেক কারণেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো একদিকে পর্যটন ব্যবসা থেকে বিলিয়ন ডলার আয়ের উৎস, পাশাপাশি এগুলো উপকূলীয় জনপদের ঘরবাড়িসমূহকে ঝড় ও
প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে। সুনামি কিংবা জলোচ্ছ্বাসের বিপরীতে প্রাকৃতিক দেয়ালের মতো কাজ করে থাকে এ প্রবালপ্রাচীর। অনেক সময় প্রবাল থেকে ওষুধি গুণাগুণসম্পন্ন পদার্থ পাওয়া যায় এবং লক্ষ লক্ষ জলজ প্রজাতির আবাসস্থল হিসেবে এর ভূমিকার কথা তো ওপরে পড়লেই। এছাড়া প্রবালপ্রাচীর অনেক ক্ষেত্রে পানির ফিল্টারিং করার কাজও করে থাকে। এ কারণে এদের আশেপাশের পানি তুলনামূলক পরিষ্কার হয়ে থাকে।

কোরাল বা প্রবাল যে বর্ণিল রঙের অধিকারী হয়, তা তো শুরু থেকেই দেখছ। কিন্তু কোনো প্রবাল যদি সাদা হয়ে পড়ে? অনেকের কাছে সাদা প্রবালও দেখে সুন্দর লাগতে পারে। কিন্তু সত্যি বলতে, অন্তত প্রবালের ক্ষেত্রে সাদা হওয়াকে বেশ খারাপ খবরই বলতে হয়। আমরা একটু আগে পড়েছিলাম এক ধরনের শৈবালের কারণে প্রবাল বিভিন্ন রঙ ধারণ করে। আর এটি যে সাদা হয়ে যায়, এই প্রক্রিয়াকে ‘কোরাল ব্লিচিং’ বলা হয়। দুশ্চিন্তার কিছু নেই, সহজ করে দিচ্ছি। পানিতে তাপমাত্রা, আলো আর পুষ্টির বড়সড় পরিবর্তন হলে ওপরে উল্লেখ করা সেই শৈবাল প্রবালে আগের মতো সুবিধাজনক পরিবেশ পায় না। এ কারণে শৈবালগুলো প্রবালকে ছেড়ে চলে যায়। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রবাল তার রঙ হারায়, আর সাথে হারায় সেই শৈবালের কাছ থেকে প্রাপ্ত খাবার। এই কারণেই তখন প্রবালগুলো সাদা হয়ে যায়। আর ফলে ধীরে ধীরে প্রবালগুলো মারা যায়।

পৃথিবীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের একটা বড় জায়গা দখল করে আছে প্রবালপ্রাচীরগুলো। এর বর্ণিল গঠন আর জীববৈচিত্র্য মানুষকে যেন চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে। আর তাই তো ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট বা বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকার ২৯টি জায়গাই প্রবালপ্রাচীরের সাথে সম্পর্কিত।

বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে অন্য অনেক প্রাকৃতিক উপাদানের মতো প্রবালপ্রাচীরও বেশ হুমকির মুখে পড়েছে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণা বলছে, বিগত ৩০ বছরে পৃথিবীর মোট প্রবালপ্রাচীরের প্রায় অর্ধেক মৃত্যুর মুখে পতিত হয়েছে। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে থামানো না গেলে আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে মোট প্রবাল প্রাচীরের প্রায় ৯০ শতাংশ হারিয়ে যেতে পারে বলেও সেই গবেষণায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

আমরা সবাই মিলে যদি জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, তাহলেই কেবল এই প্রবালপ্রাচীরগুলো রক্ষা পেতে পারে। তাই আমাদের সকলের উচিত আমাদের নিজেদের জায়গা থেকেই, যদি সেটা খুব ছোট হয়, তাও সেখান থেকে পৃথিবীর ভবিষ্যতের জন্য কাজ করে যাওয়া। সবাই ভালো থেকো, সুস্থ থেকো; আর অবশ্যই, সাবধানে থেকো।