বিশ্ব ফুটবলের খবরাখবর

ওয়াহিদ আল হাসান

0
24

সবুজ শ্যামল দেশজুড়ে বইছে শীতের প্রবল হাওয়া। এই শীতে গ্রাম ও ফুটপাতের মানুষরা বিশেষ করে গরিব শিশুবন্ধুরা বহু কষ্টে জীবনযাপন করছে। এসব শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সামর্থ্য যাদের আছে তারা সামান্য করে হলেও এগিয়ে আসি।
পাঠকবন্ধুরা, এ সংখ্যায় জানব বিশ্ব ফুটবল অঙ্গনে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কিছু খবরাখবর। আশা করি ভালো লাগবে।
পেলেকে ছাড়িয়ে মেসির রেকর্ড
মাত্র দুদিনের ব্যবধানেই ব্রাজিল কিংবদন্তি পেলেকে ছাড়িয়ে গেলেন মেসি। এর আগে গত ১৯ ডিসেম্বর রাতে ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে গোল করে কিংবদন্তি ব্রাজিলীয় ফুটবলার পেলের এক ক্লাবের হয়ে সর্বোচ্চ গোল করার রেকর্ড স্পর্শ করেছিলেন লিওনেল মেসি। পেলেকে ছাড়িয়ে এক ক্লাবের হয়ে সর্বোচ্চ গোলের মালিক এখন রেকর্ড ছয়বারের বর্ষসেরা এই ফুটবলার।
লা লিগায় গত ২২ ডিসেম্বর রাতে রিয়াল ভাইয়াদলিদের বিপক্ষে ৩-০ গোলে জয় পায় বার্সেলোনা। দলের জয়ের ম্যাচে ৬৫তম মিনিটে ইতিহাস গড়া গোলটি করেন মেসি। পেদ্রির ব্যাক হিলে ডি-বক্সে বল পেয়ে প্রথম ছোঁয়ায় স্কোরলাইন ৩-০ করেন তিনি।
বার্সেলোনার জার্সিতে মেসির ৬৪৪তম গোল এটি। অন্যদিকে নিজ দেশের ক্লাব সান্তোসের হয়ে ১৯ মওসুমে ৬৪৩ গোল করেছিলেন ব্রাজিলের হয়ে তিন বিশ্বকাপ জয়ী পেলে। সেদিক থেকে মাত্র ১৭ মওসুমেই বার্সেলোনার হয়ে এই রেকর্ড স্পর্শ করলেন মেসি।
এর আগের ম্যাচে গোল করে পেলের রেকর্ড ছোঁয়ার দিনে মেসিকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন ব্রাজিল কিংবদন্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেনÑ ‘লিওনেল, ঐতিহাসিক এই রেকর্ডের জন্য তোমাকে অভিনন্দন। তবে সবার আগে বার্সেলোনায় তোমার অসাধারণ এই ক্যারিয়ারের জন্য অভিনন্দন।’
ব্লাটারের বিরুদ্ধে ফিফার মামলা
ফিফার সাবেক সভাপতি সেপ ব্লাটারের বিরুদ্ধে জুরিখ জাদুঘর নির্মাণের সময় আর্থিক দুর্নীতির বিষয়ে মামলা করেছে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। গত ২২ ডিসেম্বর ফিফা এক বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানিয়েছে।
স্কাই স্পোর্টসের খবরে জানা গেছে, ফুটবল জাদুঘর নির্মাণের জন্য কোম্পানি নিয়োগে আর্থিক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগে জুরিখের সেন্ট্রাল প্রসিকিউটরে এই অভিযোগ দায়ের করা হয়।
১৪০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে জুরিখে নির্মিত হয়েছিল ফুটবল জাদুঘর। ২০১৬ সালে খুলে দেওয়া হয়েছিল জাদুঘরটি। ১৯৭০ সালে নির্মিত অফিস ভবন পুনর্নির্মাণ ও ভাড়ায় নেওয়া ৩৪টি অ্যাপার্টমেন্টের ক্ষেত্রেও দুর্নীতি ধরা পড়ে। পঞ্চমবার ফিফার সভাপতি নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সময় ২০১৫ সালের মে মাসে খুলে দেওয়ার কথা ছিল এ ভবন। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও সুইস তদন্তকারীদের চাপে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হলে বিলম্বিত হয় এসব কার্যক্রম।
১৯৯৮ সাল থেকে ফিফা প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন ব্লাটার। পরে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল ২০১৫ সালের অক্টোবরে। সে বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের আনা দুর্নীতির অভিযোগে ফিফার সাত কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করেছিল সুইস পুলিশ। তবে ২০১৫ সালের ২৯ মে পঞ্চমবার ফিফার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন ব্লাটার। তাঁর সময়ে ঘুষ ও দুর্নীতিতে ফিফার নাম জড়ানোয় বিশ্বজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল।
রোনালদোর আরেকটি সাফল্যগাথা
ফুটবল বিশে^ এ যুগের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ঝুলিতে রয়েছে অনেক সাফল্য, অনেক অর্জন। সম্প্রতি জুভেন্টাসের এই তারকার ঝুলিতে যুক্ত হয়েছে আরও একটি সাফল্য। গত ১ ডিসেম্বর এ বছরের গোল্ডেন ফুট অ্যাওয়ার্ড জিতেছেন তিনি। তবে গত ২০ ডিসেম্বর ট্রফিটি হাতে পেয়েছেন তিনি।
পুরস্কার জেতার খবর রোনালদো নিজেই জানিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইন্সটাগ্রামে একটি ছবি পোস্ট করেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘গোল্ডেন ফুট পুরস্কার জিতে সর্বকালের সেরাদের সঙ্গে আমার নাম থাকায় সম্মানিত বোধ করছি। আমাকে ভোট দেয়ার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা সমর্থকদের আন্তরিক ধন্যবাদ।’
প্রথম কোনো পর্তুগিজ ফুটবলার হিসেবে এই পুরস্কার লাভ করেন রোনালদো। গোল্ডেন ফুট অ্যাওয়ার্ড চালু হয় ২০০৩ সাল থেকে। সংবাদমাধ্যমের একটি প্যানেল প্রথমে ১০ জন ফুটবলারকে নির্বাচন করে থাকে। পরে তাদের মধ্য থেকে একজনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। রোনালদো ছাড়াও মনোনয়ন পেয়েছিলেন মেসি, লিইয়েনডস্কি, নেইমার, আগুয়েরো, রামোস, পিকে, সালাহ, কিয়েল্লিনি ও ভিদাল। শেষ পর্যন্ত ভোটে জিতে বাজিমাত করেন রোনালদো।
গোল্ডেন ফুট পুরস্কারটি প্রথম পেয়েছিলেন ইতালির সাবেক ফুটবলার রবার্তো ব্যাজ্জিও। গত বছর এই পুরস্কারটি পেয়েছিলেন লুকা মদ্রিচ। গোল্ডেন ফুট অ্যাওয়ার্ড বিজয়ীর তালিকা : ১. রবার্তো ব্যাজ্জিও (২০০৩), ২. পাভেল নেভদেদ (২০০৪), ৩. আন্দ্রে শেভচেঙ্কো (২০০৫), ৪. রোনালদো নাজারিও (২০০৬), ৫. ডেল পিয়েরো (২০০৭), ৬. রবার্তো কার্লোস (২০০৮), ৭. রোনালদিনহো (২০০৯), ৮. ফ্রান্সেকো টট্টি (২০১০), ৯. রায়ান গিগস (২০১১), ১০. ইব্রাহিমোভিচ (২০১২), ১১. দিদিয়ের দ্রগবা (২০১৩), ১২. আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা (২০১৪), ১৩. স্যামুয়েল ইতো (২০১৫), ১৪. গিয়ানলুইগি বুফন (২০১৬), ১৫. ইকার ক্যাসিয়াস (২০১৭), ১৬. এডিনসন কাভানি (২০১৮), ১৭. লুকা মদ্রিচ (২০১৯)।
মেসি-রোনালদোকে টপকে ফিফার বর্ষসেরা লেভানদোভস্কি
লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে হারিয়ে ২০২০ সালের ফিফা বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরস্কার জিতেছেন রবার্তো লেভানদোভস্কি। ২০১৯Ñ’২০ মওসুমে দারুণ পারফরম্যান্সের কারণে ক্যারিয়ারে প্রথমবার ‘দ্য বেস্ট ফিফা মেনস প্লেয়ার’ হলেন এই পোলিশ স্ট্রাইকার।
গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফিফার সদর দপ্তর থেকে ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ‘দ্য বেস্ট ফিফা ফুটবল অ্যাওয়ার্ড’ বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হয়। ফুটবল বিশ্বের সব জাতীয় দলের কোচ, অধিনায়ক, বিশ্বজুড়ে ফিফা নির্বাচিত সাংবাদিক ও ফিফা ডটকমে নিবন্ধন করা ফুটবলপ্রেমীদের ভোটে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
মোট সাতটি ক্যাটাগরিতে সেরাদের হাতে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। পুরস্কারের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণ থাকে পুরুষ বিভাগের বিশ্বসেরা ফুটবলার কে হবেন সেটা নিয়ে। এবার সেই ক্যাটাগরিতে ছিলেন রেকর্ড ছয়বারের বর্ষসেরা মেসি, রোনালদো ও লেভানদোভস্কি। শেষ পর্যন্ত এসময়ের দুই তারকাকে হারিয়ে বায়ার্ন তারকার হাতেই উঠল এই পুরস্কার।
২০২০ সালে চোখ ধাঁধানো একটি মওসুম কাটিয়েছেন লেভানদোভস্কি। বায়ার্নের হয়ে লিগ, চ্যাম্পিয়নস লিগ, জার্মান কাপসহ ট্রেবল জিতেছেন তিনি। নিজে করেছেন মওসুমের সর্বাধিক গোল। গত মওসুমে নিজেদের লিগে করেছিলেন ৩১ ম্যাচে ৩৪ গোল, চ্যাম্পিয়নস লিগে গোল করেছেন ১৫টি। সব প্রতিযোগিতা মিলে ইউরোপের সেরা পাঁচ লিগের যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে গত মওসুমে ১৬টি গোল বেশি করেন লেভানদোভস্কি। সব মিলিয়ে পুরস্কার পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে ছিলেন পোলিশ স্ট্রাইকারই।
এছাড়া নারী ফুটবলে বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতেছেন ম্যানচেস্টার সিটি ও ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার লুসি ব্রোঞ্জ। বায়ার্ন মিউনিখের হান্স ফ্লিক ও লিডস ইউনাইটেডের মার্সেলো বিয়েলসাকে হারিয়ে ফিফা বর্ষসেরা কোচ হয়েছেন লিভারপুলের ইয়ুর্গেন ক্লপ। আর উরুগুয়ের দুই খেলোয়াড় লুইস সুয়ারেজ ও জর্জিয়ান দে আরাসকায়েতাকে হারিয়ে ফিফা বর্ষসেরা গোলের পুরস্কার ‘পুসকাস অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন টটেনহ্যামের সন হিউং-মিন।
এদিকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফিফার বর্ষসেরা কোচ নির্বাচিত হলেন লিভারপুলের ইয়ুর্গেন ক্লপ। বায়ার্ন মিউনিখের হ্যান্স ফ্লিক ও লিডস ইউনাইটেডের মার্সেলো বিয়েলসাকে হারিয়ে এই পুরস্কার পেয়েছেন ক্লপ। ৩০ বছর পর লিভারপুলকে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের (ইপিএল) শিরোপা জেতান ক্লপ। শিরোপা জয়ের মওসুমে অনেক রেকর্ডও গড়ে লিভারপুল। সেজন্যই সেরা কোচ নির্বাচিত হন ক্লপ। আর মেয়েদের ফুটবলে সেরা কোচ হয়েছেন নেদারল্যান্ডসকে ২০২২ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে নিয়ে যাওয়া সারিনা ভিগমান।
অন্যদিকে ছেলেদের ফুটবলে বর্ষসেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার পেয়েছেন বায়ার্ন ও জার্মানি জাতীয় দলের মানুয়েল নয়্যার। আর মেয়েদের বর্ষসেরা গোলরক্ষক হয়েছেন লিওঁ ও ফ্রান্স জাতীয় দলের সারাহ বুয়াদি।