বিজয়ের মাস ডিসেম্বর

সেলিনা আক্তার

0
27

প্রিয় বন্ধুগণ, তোমাদের যদি বলা হয় সারাদিন একটি বদ্ধ ঘরে আবদ্ধ করে রাখা হবে। বিনিময় তোমরা যা খেতে চাও দেয়া হবে। তোমরা কি কেউ রাজি হবে? আমি নিশ্চিত তোমরা বলবে, না। না বলার যথেষ্ট কারণও আছে। কেউ আবদ্ধ থাকতে চায় না। পরাধীন থাকতে চায় না। ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র, সকলেই স্বাধীনভাবে বাঁচতে চায়। সম্মান নিয়ে মাথা উঁচু করে এগিয়ে যেতে চায়। আর এই স্বাধীনতা বোধ থেকেই আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ, তথা মুক্তিযুদ্ধ এবং লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন। আর এ মাসেই আমাদের বিজয় এসেছে। আমরা পেয়েছি লাল সবুজ পতাকা ও স্বাধীন বাংলাদেশ।
এই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ এবং একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের মধ্য দিয়ে এর পরিসমাপ্তি ঘটে। এই সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রাম ছিল বহুবিধ ঘটনা, বিরূপ পরিস্থিতি, অসম আর্থিক বণ্টন ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কর্তৃত্বের বঞ্চনাসহ গুরুতর বিষয়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্কের অবনতির চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর থেকেই পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে যেসব ইস্যুতে সম্পর্কের অবনতি ঘটে, তার মধ্যে ছিল ভূমি সংস্কার, রাষ্ট্রভাষা, অর্থনীতি ও প্রশাসনের ক্ষেত্রে দুই প্রদেশের মধ্যে বৈষম্য, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং বৈষম্যমূলক আরো অনেক অনেক বিষয়।
২৫ মার্চ দিবাগত মধ্যরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে বাঙালিদের ওপর অপারেশন চালানোর নির্দেশ দেয়া হয়। ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামক ঐ পরিকল্পনা অনুযায়ী দুটি সদরদপ্তর স্থাপন করা হয়। মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর তত্ত¡াবধায়নে প্রথম সদরদপ্তরটি গঠিত হয়। এখানে ৫৭তম ব্রিগ্রেডের বিগ্রেডিয়ার আরবাবকে শুধু ঢাকা নগরী ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় এবং মেজর জেনারেল খাদিম রাজাকে প্রদেশের অবশিষ্টাংশে অপারেশনের দায়িত্ব দেয়া হয়। অপারেশনের সার্বিক দায়িত্বে থাকেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান।
ছাত্ররা এবং জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক কর্মীরা ক্যান্টনমেন্টের বাইরে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানি সৈন্যদের অভিযান ঠেকাতে রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। ২৫ মার্চ রাতেই পাকিস্তানি সৈন্যরা ওয়ারলেস বসানো জিপ ও ট্রাকে করে ঢাকার রাস্তায় নেমে পড়ে। তাদের প্রথম সাঁজোয়া বহরটি ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে এক কিলোমিটারের মধ্যে ফার্মগেট এলাকায় ব্যারিকেডের মুখে পড়ে। রাস্তার এপাশ-ওপাশ জুড়ে ফেলে রাখা হয়েছিল বিশালাকৃতির গাছের গুঁড়ি। অকেজো পুরোনো গাড়ি ও অচল স্টিমরোলারও ব্যারিকেডের কাজে ব্যবহার করা হয়। কয়েক’শ লোক প্রায় ১৫ মিনিট ধরে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দেয়। তবে সেনাদের গুলি দ্রæতই তাদের নিস্তব্ধ করে দেয়, সেনাবহর শহরময় ছড়িয়ে শুরু করে গণহত্যা।
পাকিস্তানি সৈন্যরা রাস্তায়-ফুটপথে যাকেই দেখতে পায় তাকেই হত্যা করে, সামনে পড়ে সবকিছু ধ্বংসের হুমকি দেয়। বাছবিচার না করে শহরের মানুষ ও সরকারি-বেসরকারি সব ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত করে চষে বেড়ায় সৈন্যদের ট্যাঙ্ক। কামান ও বন্দুকের গোলায় ধ্বংস করে বহু আবাসিক এলাকা, আগুন ধরিয়ে দেয় বাড়িঘরে। সৈন্যরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে ঢুকে অনেক ছাত্রকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষককেও ঐ রাতে হত্যা করে।
নিরস্ত্র জনগণের ওপর এই হামলা ও নির্বিচার গণহত্যা অভিযান বিশ্বের সংবাদ মাধ্যমগুলোতে প্রচারিত হয়। ২৫ মার্চ রাতেই পাকিস্তানি সৈন্যরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করার সঙ্গে সঙ্গেই দেশের সকল এলাকায় স্বাধীনতার জন্য স্বতঃস্ফ‚র্ত অভ্যুত্থান গড়ে ওঠে। এই অভ্যুত্থানে অংশ নেয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, পেশাজীবী নির্বিশেষে সকল শ্রেণির মানুষ। পাকবাহিনীর আক্রমণ ও গণহত্যা মোকাবেলার জন্য গড়ে তোলা প্রতিরোধ প্রাথমিক পর্যায়ে স্বল্পস্থায়ী হয়। শত্রু সেনারা সংখ্যায় অনেক ও তারা ছিল অনেক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত, তাই মুক্তিযোদ্ধারা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে যায়। শীঘ্রই দেশের বিভিন্ন অংশে বিচ্ছিন্ন মুক্তিসংগ্রামীদের একটি একক কমান্ডের অধীনে আনা হয়।
এপ্রিল মাসের ৪ তারিখে মুক্তিবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা চা বাগানে পরিবৃত আধা-পাহাড়ি এলাকা তেলিয়াপাড়ায় অবস্থিত দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গলের সদরদপ্তরে একত্র হন। কর্নেল এম এ জি ওসমানী, লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুর রব, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সালাহ উদ্দিন মোহাম্মদ রেজা, মেজর কাজী নুরুজ্জামান, মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর নুরুল ইসলাম, মেজর শাফাত জামিল, মেজর মইনুল হোসেন চৌধুরী প্রমুখ সেনা কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত হন। এ সভায় চারজন সিনিয়র কমান্ডারকে অপারেশনের দায়িত্ব দেয়া হয়। মেজর সফিউল্লাহকে সিলেট-ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের অধিনায়কের দায়িত্ব দেয়া হয়। কুমিল্লা-নোয়াখালী অঞ্চলের অধিনায়কের দায়িত্ব পান মেজর খালেদ মোশাররফ। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মেজর জিয়াউর রহমান এবং কুষ্টিয়া-যশোর অঞ্চলের অধিনায়ক হন মেজর আবু ওসমান চৌধুরী। এ সভাতেই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বাহিনী সম্পর্কিত সাংগঠনিক ধারণা এবং কমান্ড কাঠামোর রূপরেখা প্রণীত হয়। কর্নেল এম এ জি ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর সর্বময় নেতৃত্ব দেয়া হয়।
১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার তথা মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়। পরদিনই তাজউদ্দীন আহমদ আরও তিনজন আঞ্চলিক অধিনায়কের নাম ঘোষণা করেন। ক্যাপ্টেন নওয়াজিশ রংপুর অঞ্চলের, মেজর নাজমুল হক দিনাজপুর-রাজশাহী-পাবনা অঞ্চলের এবং মেজর এম.এ জলিল বরিশাল-পটুয়াখালী অঞ্চলের অধিনায়কত্ব লাভ করেন। প্রতিটি অঞ্চলকে একেকটি সেক্টর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ১০ থেকে ১৭ জুলাই অনুষ্ঠিত সেক্টর কমান্ডারদের এক সম্মেলনে অপারেশন চালানোর সুবিধার্থে সমগ্র বাংলাদেশকে এগারোটি সেক্টর ও বিভিন্ন সাব-সেক্টরে বিভক্ত করা হয়।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ২৭ মার্চ বাঙালিদের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি তাঁর সরকারের পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করেন। ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী (বিএসএফ) অত্যাচারিত ও ভীতসন্ত্রস্ত বাঙালিদের নিরাপদ আশ্রয় প্রদানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেয়।
পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মুক্তিবাহিনীর পাশাপাশি আরও অনেক বাহিনী সংগঠিত হয়। এ সকল বাহিনীর মধ্যে টাঙ্গাইলের কাদের বাহিনী, সিরাজগঞ্জের লতিফ মির্জা বাহিনী, ঝিনাইদহের আকবর হোসেন বাহিনী, ফরিদপুরের হেমায়েত বাহিনী, বরিশালের কুদ্দুস মোল্লা বাহিনী ও গফুর বাহিনী এবং ময়মনসিংহের আফসার বাহিনী ও আফতাব বাহিনী উল্লেখযোগ্য। এসব বাহিনী স্থানীয়ভাবে সংগঠিত হয়ে নিজেদের শক্তিতে দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। সর্বহারা পার্টির নেতা সিরাজ শিকদার বরিশালে তাঁর বাহিনীকে সংগঠিত করেন। ভারতের সেনাবাহিনীর গেরিলাযুদ্ধ বিশেষজ্ঞ মেজর জেনারেল ওবানের সক্রিয় সহযোগিতায় মুজিব বাহিনী নামে আরেকটি বাহিনী গঠিত হয়। মুজিব বাহিনীর সদস্যদের দেরাদুনে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ছাত্রলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মণি, তোফায়েল আহমদ, আবদুর রাজ্জাক এবং সিরাজুল আলম খান ছিলেন এই বাহিনীর সংগঠক।
মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা নিয়মিত ও অনিয়মিত দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল। অনিয়মিত বাহিনী গণবাহিনী নামে পরিচিত ছিল। নিয়মিত বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের সৈন্যরা। ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক ও রাজনৈতিক কর্মিদের প্রাথমিক প্রশিক্ষণের পর বিভিন্ন সেক্টরে গণবাহিনীতে নিয়োগ করা হতো। গণবাহিনীর সদস্যদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরে শত্রুর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার জন্য পাঠানো হয়। নিয়মিত বাহিনীর সদস্যরা সশস্ত্রবাহিনীর প্রথাগত যুদ্ধে নিয়োজিত ছিলেন। ‘জেড ফোর্স’ নামে পরিচিত নিয়মিত বাহিনীর প্রথম ব্রিগেডটি জুলাই মাসে গঠিত হয়। এই ব্রিগেডের কমান্ডার মেজর জিয়াউর রহমানের নামের ইংরেজি আদ্যক্ষর ‘জেড’ অনুসারে ব্রিগেডটির নামকরণ করা হয়। ব্রিগেডটি ১ম, ৩য় ও ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট নিয়ে গঠিত হয়। ‘এস ফোর্স’ নামে পরিচিত দ্বিতীয় নিয়মিত ব্রিগেডটি দ্বিতীয় ও একাদশ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকদের নিয়ে অক্টোবরে গঠিত হয়। এ ব্রিগেডের অধিনায়ক ছিলেন সফিউল্লাহ। খালেদ মোশাররফের অধিনায়কত্বে ‘কে ফোর্স’ গঠিত হয় ৪র্থ, ৯ম ও ১০ম ইস্ট বেঙ্গলের সদস্যদের নিয়ে।
নাগাল্যান্ডের দিমাপুরে ২৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ বিমানবাহিনী গঠিত হয়। এর সংগঠক ছিলেন এয়ার কমোডর এ কে খন্দকার। স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট বদরুল আলম, ক্যাপ্টেন খালেক, সাত্তার, শাহাবুদ্দিন, মুকিত, আকরাম, শরফুদ্দিন এবং ৬৭ জন বিমানসেনা নিয়ে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর যাত্রা শুরু হয়। তাদের সম্বল ছিল মাত্র কয়েকটি ডাকোটা, অটার টাইপ বিমান এবং অ্যালুভেট হেলিকপ্টার। অনুরূপভাবে, পাকিস্তান নৌবাহিনী থেকে বেরিয়ে আসা নৌসেনাদের নিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনী গঠিত হয়। ১৯৭১ সালের ৯ নভেম্বর প্রথম নৌবহর ‘বঙ্গবন্ধু নৌবহর’ উদ্বোধন করা হয়।
এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল মাত্র ৬টি ছোট নৌযান। নিয়মিত ব্রিগেড, সেক্টর ট্রূপ ও গেরিলা বাহিনী, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনী নিয়ে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী সুসংগঠিত ছিল।
মুক্তিবাহিনী শুরুতে প্রতিরোধমূলক অনেকগুলো যুদ্ধে শত্রুর বিরুদ্ধে সফলভাবে লড়াই করে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে তাদের সাময়িক পশ্চাৎপসরণ করতে হয়। মুক্তিবাহিনী অবশ্য পরে সংগঠিত হয়ে উন্নততর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে একাত্তরের এপ্রিল-মে মাসের পর থেকে নব উদ্দীপনায় যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও গণপ্রজাতন্ত্রী চীন এ যুদ্ধকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে উল্লেখ করে পাকিস্তানকে কৌশলগত সমর্থন দেয়। পক্ষান্তরে ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তাদের মিত্র দেশসমূহ এবং জাপান ও পশ্চিমের অনেক দেশের সাধারণ জনগণ বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নেয়। চীন-যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত সুবিধা অর্জনের লক্ষ্যে ১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট ভারত সরকার সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে একটি মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষর করে। এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ায় বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে এক নতুন মাত্রা যোগ হয়।
এদিকে মুক্তিবাহিনীর সদরদপ্তরে পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কৌশল পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা হয়। চিরাচরিত রণকৌশল পাকিস্তানি সৈন্যদের পরাজিত করার পক্ষে অনুকূল হবে না ভেবে সারাদেশে সর্বাত্মক গেরিলাযুদ্ধ পরিচালনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেমতে সেক্টর কমান্ডারদের দেশের অভ্যন্তর থেকে মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুট করে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে নিয়োগের নির্দেশ দেয়া হয়।
১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ড গঠিত হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা যৌথ বাহিনীর প্রধান নিযুক্ত হন। অবশ্য ৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় অমৃতসর, শ্রীনগর ও কাশ্মীর উপত্যকায় পাকিস্তান বিমানবাহিনীর বোমা বর্ষণের পর থেকেই মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ড কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করে। তখনই ভারতীয় সশস্ত্রবাহিনীর ওপর নির্দেশ আসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে প্রত্যাঘাত করার। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ক্রমশ অগ্রসর হতে থাকে। ফলে পাকিস্তানি সৈন্যদের পরাজয় ও আত্মসমর্পণ অনিবার্য হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হওয়ার প্রাক্কালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন এতে ভেটো প্রয়োগ করায় এই প্রচেষ্টা নস্যাৎ হয়ে যায়।
মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণের মুখে ইতোমধ্যে পর্যুদস্ত ও হতোদ্যম পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তান ৯৩,০০০ হাজার সৈন্যসহ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। এরই মাধ্যমে নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের অবসান হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় বাঙালি জাতির প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ।
ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস। ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবস। প্রতি বছর বিজয় দিবস বাংলাদেশে বিশেষ দিন হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে দেশের সর্বত্র পালন করা হয়। জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্ত প্রায় সকল দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে।