প্রবীণের মমতাময় সাহচর্য

শাকের জামিল

0
44

যারা ষাট-সত্তর বছর পেরিয়ে গেছেন, তাদের আমরা বুড়ো বলি। বয়সের কারণে তাদের শরীর নাজুক হয়ে যায়, অনেকে ঠিকমতো চলতে পারেন না, অনেকে ঠিকমতো কথাও বলতে পারেন না। কেউ কেউ আবার স্মৃতিশক্তির দুর্বলতায় ভোগেন। তাদের অক্ষমতার জন্য আমরা তাদের অবহেলা করি। বয়সের কারণে তাদের অনেকের আয়-উপার্জন থাকে না। তাই তারা আমাদের দামি গিফট দিতে পারে না। ফলে আমাদের কাছে তাদের গুরুত্ব কমে যায়। তবে তারা আমাদের মুরব্বি, তাদের জীবন থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়ার অনেক কিছু আছে। আজ তাদের বিষয়েই কথা বলবো।
এই বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে বেশিরভাগ হয় তোমার দাদু-নানু, বা দাদী-নানী সম্পর্কের আত্মীয় বা প্রতিবেশী। চাচা-মামা সম্পর্কের কেউ কেউও এমন বয়স্ক থাকতে পারে। তাদের সাথে কেমন আচরণ করা উচিত? তারা যদি তোমার বাসায় থাকেন তাহলে তাদের খাবার সম্পর্কে খেয়াল করা দরকার। বিশেষ করে ডায়াবেটিক রোগী হলে ঠিক সময় মতো খাবার খাচ্ছেন কি না, কী পরিমাণে কোন খাবার খাচ্ছেন সেটা খেয়াল করা দরকার। ইনসুলিন ঠিকমতো নিচ্ছেন কি না, ওষুধ ঠিকভাবে খাচ্ছেন কি না দেখা দরকার। যদি হার্টের রোগী বা উচ্চ রক্তচাপের রোগী হন, সেক্ষেত্রে নিয়মিত তার ব্লাড প্রেশার চেক করতে হয়। বড়দের কাছ থেকে তুমিও শিখে নিতে পারো কিভাবে স্ফিগমো ম্যানোমিটার দিয়ে প্রেশার মাপতে হয়। শিখতে পারো কিভাবে ইনসুলিন পুশ করতে হয়। একটু দায়িত্বশীল এবং আগ্রহী হলে এসব কাজ শিখে নেয়া কোন ব্যাপার না।
তুমি বলতে পারো তোমার দাদু বা নানু অত্যন্ত ভুলোমনা। দাদুটা কিচ্ছু মনে রাখতে পারে না। এত সহজেই ভুলে যায়। সকালে কী খেয়েছে সেটা এখন দুপুরেই ভুলে গেল! আসলে তিনি ডিমেনশিয়া (স্মৃতিলোপ) রোগে ভুগছেন। বিশেষ করে যাদের ব্রেন স্ট্রোক হয় তাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যাটা প্রবল থাকে। দাদুর বিরুদ্ধে তোমার এমন অভিযোগ থাকতে পারে। নিউইয়র্কের বাসিন্দা ১৫ বছর বয়সী কেনিথ শিনোজুকারও একই অভিযোগ ছিল। তার দাদু রাতে উঠে এদিকে সেদিকে হাঁটাহাঁটি করতো। কখনো হাঁটতে গিয়ে আঘাত পেত। কেনিথ দাদুকে সহযোগিতা করার বুদ্ধি বের করল। সে পয়সা আকৃতির একটি সেন্সর তৈরি করে সেটি লাগিয়ে দিলো দাদুর মোজায়। কেয়ারটেকারের স্মার্ট ফোনের সাথে মোজার সেন্সরের সংযোগ তৈরী করল। ফলে দাদু যখনই বিছানা থেকে নেমে এদিক ওদিক হাঁটাহাঁটি শুরু করেন তখনই কেয়ারটেকারের ফোনে অ্যালার্ম বাজতে থাকে। আর তিনি দ্রুত এসে তাকে উদ্ধার করে বিছানায় ফিরিয়ে দিতে পারেন। এভাবেই দাদুকে রক্ষা করা গেল বিপদের হাত থেকে। কেনিথের এ আবিষ্কারটি জিতে নিয়েছে ৫০,হাজার ডলারের পুরস্কার। তুমিও দাদু-নানুদের সমস্যা সমাধান করে নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন করতে পারো।
যদি দাদু-নানু তোমার বাসায় না থাকে? যদি তারা গ্রামের বাড়িতে কিংবা অন্য শহরে থাকে তাহলে? তাহলে বছরে অন্তত ২ বার তাদের সাথে দেখা করার চেষ্টা করতে হবে। স্কুল ছুটির দিনগুলোতে তাদের কাছে বেড়াতে যাওয়ার দাবি তুলবে বাবা-মায়ের কাছে। এতে করে তোমার বেড়াতে যাওয়াও হবে আর তাদের সাথে সময় কাটানোর সুন্দর সুযোগও হবে। তাছাড়া এখন ইন্টারনেটের যুগ। ভিডিও কল দিয়ে দাদু-নানুর সাথে নিয়মিতো কথা বলবে। তাদের খোঁজ নিবে। কেমন আছেন? শরীর কেমন? ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করছেন কিনা সেগুলো জানবে। তাহলে তারা তোমার জন্য হৃদয় খুলে দোয়া করবেন। তোমার সাফল্যের পথে তাদের দোয়া অত্যন্ত জরুরি।
এখন কথা হলো দাদু-নানুদের কাছে আমরা কী পাই? ঐ যে শুরুতে বললাম তারা শারীরিকভাবে দুর্বল, আর্থিকভাবেও আয় না থাকার কারণে আমাদের চাহিদামতো গিফট দিতে পারেন না। তাহলে তাদের কাছ থেকে কী পেতে পারি? প্রথমত আমরা পাই অসামান্য স্নেহ আর আদর। যারা দাদু-নানু পায়নি তারা কখনোই এটা অনুভব করতে পারবে না। তাদের মমতামাখা হাত দিয়ে যখন তোমার মাথায়, মুখে বুলিয়ে দেন, সেটা জান্নাতী পরশ। এটি অমূল্য সম্পদ। দেখবে তারা তোমার জন্য কত রকম খাবার আনিয়ে রেখেছে কিংবা পিঠা পায়েস বানিয়ে রেখেছে শুধু তোমাকে ভালোবেসে। এই ভালোবাসা টাকায় কেনা যায় না। দাদু-নানু তোমাকে শৈশবে কোলে পিঠে নিয়েছে, এখন হয়তো নিতে পারবে না কিন্তু তোমাকে দেখা মাত্র তারা কোলে জড়িয়ে নেয়, কপালে চুমু খায়। এই আনন্দ তোমার ভবিষ্যৎ জীবনের পথচলার নিবিড় শক্তি জোগাবে।
দ্বিতীয়ত, তারা আমাদের জন্য বটবৃক্ষের মতো আশ্রয়। অনেক দুষ্টুমি করে বাবা-মায়ের মার খাওয়ার ভয়ে আমরা গিয়ে দাদু-নানুর কাছে আশ্রয় নিই। তারা আমাদের আশ্রয় দেন। আমাদের পক্ষ হয়ে বাবা মায়ের কাছে ওকালতি করেন। আমাদের চাহিদামতো জিনিস পাওয়ার জন্য আমরা দাদু-নানুকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করি। বাবা-মায়ের অগোচরেও তারা আমাদের অনেক কিছু দিয়ে থাকেন।
তৃতীয়ত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটি সেটি হলো তাদের কাছে আমরা জীবনের অর্থ শিখতে পারি। তাদের দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতার সঞ্চয় অনেক বড় হয়। সেখান থেকে তারা আমাদের গল্প শোনান। যখনি সময় পাবে দাদু-নানুর কাছ থেকে তাদের জীবনের ঘটনা শুনতে চাইবে। তিনি কোথায় কী কী কাজ করতেন, কোথায় ভ্রমণে গিয়েছিলেন, কী দেখেছিলেন, কোন বিপদে পড়েছিলেন, সেখান থেকে কিভাবে উদ্ধার পেয়েছিলেন? তার শৈশব কেমন ছিল? স্কুল-কলেজ-বিশ^বিদ্যালয়ে তারা কী দেখেছেন? মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশে কী হয়েছিল? কিভাবে আমরা একটি স্বাধীনদেশ পেলাম ইত্যাদি সব জানতে চাইবে। তোমাদের মনে জাগা যত প্রশ্ন আছে তাদের জিজ্ঞাসা করবে। সব প্রশ্নের উত্তর তারা দিতে না পারলেও দেখবে বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তরই তারা দিতে পারবেন। অনেক প্রশ্নের উত্তর বইতে পাবে না। সেগুলোর জন্য তারা হচ্ছেন সবচেয়ে ভালো রেফারেন্স। তাদের অভিজ্ঞতা থেকে তারা তোমাকে বলতে পারবেন যে তুমি কোন ধরনের সমস্যায় ভবিষ্যতে পড়তে পারো, সেটাতে না পড়তে হলে কী করতে হবে? তাদের কাছ থেকে যদি আগেই জেনে যাও এটা তোমার জন্য অনেক কাজে দেবে।

সুতরাং যখন সুযোগ পাবে দাদু-নানু অর্থাৎ প্রবীণদের সাথে সময় কাটানোর চেষ্টা করবে। তোমার গেমস খেলার চেয়ে তাদের সাথে খেলাধূলা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখবে বার্ধক্য হলো দ্বিতীয় শৈশব। এই বয়সে তাদের মন শিশুদের মতো হয়ে যায়। সুতরাং তারা তোমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। তাদের কাছে থাকবে, তাদের থেকে শিখবে। তারা হতে পারেন তোমার ভবিষ্যৎ গড়ে দেয়ার পাথেয়।