পৃথিবীতে অভিধান বলে কিছু নেই

নাসীমুল বারী

0
30

পৃথিবীতে ভাষার ব্যবহারে অভিধান বলে কিছু নেই! চমকে গেলে! চমকেই হয়তো তোমরা ভাবছো কেন এমন কথা বললাম? শব্দের অর্থ বা বানান নিয়ে সমস্যায় পড়লে আমরা তো অভিধান ভর করেই সমাধান পাই। প্রতিটি ভাষায়, প্রতিটি দেশে অনেক অনেক অভিধান প্রকাশ হয়েছে। কথাটা একদম খাঁটি। তাহলে আমার কথায় কেন ভিন্নতা? আচ্ছা দেখি, আমি কী বলছি অভিধান কী করে? শব্দের অর্থ, এর গঠনগত, উৎপত্তিগত, ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্য কী? সমার্থক শব্দ কী হবে? বানানের সঠিকতা কী? এক ভাষার শব্দ অন্যভাষায় কী অর্থ হয়? ভাষার এসব শব্দগত নানা খুঁটিনাটি সমাধান অভিধান থেকেই পাওয়া যায়। একভাষিক বা দ্বিভাষিক সব অভিধানই শব্দের অর্থ বা দুই ভাষার অর্থবোধের সমন্বয় করে।
আমার খুব মাথা ঘুরছে। এ বাক্যে আমার শারীরিক অবস্থার ভাব প্রকাশ করেছি। এ প্রকাশটা সঠিক ভাব, কোনোই ভুল নেই। এর শব্দগুলোর আভিধানিক অর্থ দেখি এখন-
আমার- মানে আমি নিজে
খুব- মানে অনেক বেশি
মাথা- মানে আমার মস্তক
ঘুরছে- মানে ঘূর্ণায়মান অবস্থায় আছে।
পুরো বাক্যটার অর্থ দাঁড়াল আমার নিজের মস্তক অনেক বেশি ঘূর্ণায়মান অবস্থায় আছে। আভিধানিকভাবে একটুও ভুল নেই এ অর্থবোধে। তাহলে আভিধানিক অর্থবোধে ভাবটা কি ঠিক হলো? আমার শারীরিক অবস্থা অভিধান মতো কি যথার্থ? মাথা কি কখনো ঘুর্ণায়মান হয়? আচ্ছা মনে করো পাড়ার উঠতি এক কিশোরের সন্ত্রাসী কর্মকাÐের কারণে একজন মুরব্বি তাকে বললেন, তুমি যে পথে হাঁটছো, এটা আগুনের পথ। যেকোনো সময় পুড়ে যাবে। এই পুরো ভাবের আভিধানিক অর্থবোধ আর ওই মুরুব্বির বলা কথার অর্থবোধ কি এক? আগুন আছে এমন রাস্তায় কি সে হাঁটছে? কিংবা তার ব্যর্থতায় সে কি সত্যি সত্যি পুড়ে যাবে?
মোটেই না। দেখলে, অভিধানের অর্থের সাথে বাস্তবের ভাব প্রকাশের কোনো মিল নেই?
তাহলে অভিধানের ভূমিকা কোথায়? আচ্ছা বাংলা ভাষা ছেড়ে অন্য ভাষায় যাই।‘ঞযব মরভঃ ড়ভ গধমর’ বিশ্বসাহিত্যের একটি সেরা গল্প। এ বাক্যের গধমর-দের উপহারের কথা বলা হয়েছে। মেজাই (গধমর)-এর আভিধানিক অর্থ পূর্বদেশী তিনজন জ্ঞানী- যারা শিশু যিশুর জন্মের সময় উপহারসামগ্রী নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে কী দেখলাম ওই গল্পে?
জিম আর ডেলা নামের এক দম্পতি। তাদের সংসার অভাবে ভরা। সম্পত্তি বলতে জিমের আছে পারিবারিক ঐতিহ্যবাহী দামি একটা হাতঘড়ি; তবে ওটার চামড়ার বেল্টটা অনেক পুরোনো আর ছেঁড়া ছিল। ডেলার আছে অনেক লম্বা সোনালি রঙের চমৎকার চুল।
জিম তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে নিজের জন্মদিনে কিছু উপহার দিতে চায়। কিন্তু তার কাছে টাকা নেই। তাই সে চুপি চুপি ওই দামি ঘড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। ওটা বিক্রি করে স্ত্রীর চুল আঁচড়ানোর জন্য কিনে আনে কচ্ছপের খোলে তৈরি অভিজাত দামি একটা চিরুনি। এদিকে স্বামীর জন্মদিনে স্বামীকে কিছু উপহার দিতে ডেলাও আলাদাভাবে বেরিয়ে পড়ে। সে তার নিজের লম্বা সোনালি চুল ভালো দামে বিক্রি করে দেয়। ক্রেতা তা কেটে নিয়ে তাকে ন্যাড়া করে দেয়। তবু সে খুশি হয়ে সে টাকায় স্বামীর ঘড়ির জন্য সবচেয়ে দামি সুন্দর প্লাটিনামের চেইন কিনে আনে।
ঘরে ফেরার পর দেখা যায় দুজনেরই উপহার অকেজো হয়ে গেছে। কিন্তু প্রকাশ পেয়েছে স্বামী-স্ত্রী পরম ভালোবাসা।
এখানেও মেজাই (গধমর) কিন্তু এর আভিধানিক অর্থ প্রকাশ করেনি। সেই তিনজন জ্ঞানী- যারা শিশু যিশুর জন্মের সময় উপহারসামগ্রী নিয়ে গিয়েছিল; তাদের কোনো কথাই তো বলা হয়নি এখানে। তাহলে মেজাই (গধমর) কেন?
শব্দের এমন অসামঞ্জস্য অর্থের কারণ খুবই সাধারণ।
সভ্যতায় মানুষের ভাব প্রকাশটা আগে। এই ভাব প্রকাশই ভাষা। ভাষায় ব্যবহৃত শব্দের দুটো রূপ থাকে- একটা ভিত্তিগত অর্থবোধ, আরেকটা ভাবগত অর্থবোধ। ভাবগত অর্থবোধকে আমরা রূপক, উপমা এসব বলি। কিংবা ব্যাকরণে বাগধারা বলি। কবিতা লিখতে বা সাহিত্যে আমরা রূপক, উপমা অর্থবোধের এসব শব্দ অহরহ লিখে থাকি। শব্দের এমন অর্থবোধের কোনো দৃষ্টিগ্রাহ্য অভিধান নেই। এর অভিধান ‘মস্তিষ্ক’। এই যেমন মাথা শব্দকেই অন্তত ৮/১০টি ভাবগত অর্থে ব্যবহার করতে পারবো আমরা। আমাদের মস্তিষ্কই বলে দেবে কোন শব্দ কোন অর্থে কখন ব্যবহৃত হবে বা হচ্ছে। এই ‘মস্তিষ্ক অভিধান’-এর বানান হলো কথক ব্যক্তির উচ্চারণ আর উপস্থাপন। যিনি কথা বলছেন, তার কথা আর বলার ঢঙেই আমরা এমন শব্দের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বুঝে নেই।

অতএব, মস্তিষ্কই প্রকৃত অভিধান, আর সব স্থুল অভিধান। স্থুল অভিধান ভিত্তিগত অর্থবোধই প্রকাশ করে মাত্র।