নাটাই গাছের কাঁটা

আবুল খায়ের নাঈমুদ্দীন

0
286

মাছ ধরতে নেমে সায়েম বলতে থাকে আপু আপু এখানে অনেক বড় মাছ আছে। আমার হাতে লেগেছে। সায়েম আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলে এই খোরলটাতেই আছে। ইস দুই বার হাত ফসকে চলে গেছে। বড় বোন নাফিসাকে আপু বলেই সম্বোধন করে কথা গুলো বলে আদরের ছোট ভাই সায়েম।

তারা ভাই বোন তিন বছরের ছোট বড় হলেও চলে সমানে সমান। স্কুলে যায় আসে, এক সাথে খেলে আর ঘরের সব কাজ করে। যত কাজই করে মিলে মিশে করে। তাদের বাড়িতে দুটি ঘর। একটি পশ্চিম ভিটায়, আরেকটি পূর্ব ভিটায়। দু’ঘরের মাঝখানে সাদা বড় আঙিনা। আঙিনার কোণে লাগানো পেয়ারা, বাতাবী লেবু, জাম্বুরা আর কাঠাল গাছ মিলে বেশ সুন্দর পরিবেশ। সব সৃজনে কোনো না কোনো গাছে ফুল ফল থাকেই। তাতে তারা নিত্য সুবাস নেয়। প্রতিদিন সকালে সৌন্দর্য বৃদ্ধির কাজ হিসেবে ও মাকে সহযোগিতা হিসেবে উঠানটা ঝাড়– দেয় নাফিসা। সেখানে পাটি বিছিয়ে তাতে বসেই রোজ বিকেলে রাম সাম যদু মধু খেলে, লুডু খেলে আর গল্পের বই পড়ে। তাদের গল্পের আসরে অনেক সময় বড়রাও সামিল হয়।

পূর্ব পাশের ঘর থেকে বিশ ত্রিশ গজ দূরেই বয়ে গেছে ছোট আঁকাবাঁকা খাল। খালটি তাদের পূর্ব ঘরের পুব পাশের জমিনের পূর্ব পাশ আর দক্ষিণ পাশ পর্যন্ত পুরাটাই খালের অংশ। জমিনটার উত্তর পাশ জুড়ে ষাট শতক পুকুরের দক্ষিণ পাড় লাগালাগি অবস্থানে। পুকুরের পুর্ব পাড় ও উত্তর পাড়েও খালে ঘেরাও করা। খালের প্রসস্ততা হবে বড় জোর আট ফিট। তবুও এছুদের ঘরের পাশ দিয়ে বড় খাল হয়ে মেঘনা নদী থেকে এখানে জোয়ার আসে। তবু পানি থাকে স্বচ্ছ। খালে টেংরা, পুঁটি, পাবদা, চিরিং, চিংড়ি, শৈল, কৈ, টাকি, বোয়ালসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। অনেকে এসব স্থানে মাছ ধরার টব, ছাই, আনতা, ঝুরি এগুলো বসায়।
সেই খালে তারা দুজনে বর্ষা কালে বড়শি বায়, ঠেলা জাল ঠেলে, শুকনো কালে উপরের গাছ থেকে পড়া পাতাও কুড়ায়। চৈত্র মাসে পুরাটা শুকিয়ে চৌচির হয়ে যায়। মাটি ফেটে থাকায় তখন ম্যাপের মতো দেখা যায়। ঘর আর জমিনের সীমানার ঠিক মাঝখানে একটি তেতুল গাছ, একটি আম গাছ, দুটি নারিকেল গাছ ও একটি নাটাই গাছ আছে। নাটাই গাছটি একেবারে দক্ষিণ পাশ ঘেঁষা। বাড়ির সবচেয়ে উচু ও সীমানা গাছ এটি। বাড়ির পাহারাদার ও বলা চলে। কত ডাল কত শাখা প্রশাখা বিস্তার করে আছে কে জানে, কেউতো বলে এখানে নাকি ভূতও থাকে। নিচে তরতাজা একটি খেজুর গাছের মাথা মেলে আছে। শীত কালে এক বছর পরপর কেটে খেজুরের রস বের করা হয়।

আমাদের অনেকেতো নাটাই চিনেনা। অথচ নাটাই হলো গ্রামের সবচেয়ে সুন্দর কাঁটাযুক্ত গাছের ফল। আর একটা কাঁটাযুক্ত গাছ আছে তার নাম বাবলা গাছ। সেটি সাধারণত রাস্তার ধারে লাগানো থাকে কিন্তু ফল ধরেনা। আরো একটি কাঁটার গাছের নাম মান্দার গাছ, তাতে গোটা যুক্ত থোকা হয়। মান্দার গাছে কেউ উঠতেই পারেনা। নাটাই ফল কিন্তু সীমের মতো একটু বাঁকা হয়, আবার ভেতরে গোটাও হয়। গোটার চারপাশে সাদা যে আবরণটা থাকে তারই স্বাদটা সবাই আলুতালু করে খায়। পাখিরা খায়, খেতে খেতে নিচে পড়ে, জামরুলের মতো রাতে গাছের নিচে ঝরে পড়ে থাকে আর আশ পাশের শিশুরা কুড়িয়ে নেয়। তাই সাধারণত পাকা নাটাই কুড়িয়ে পাওয়া যায় না।

আজ বৃহস্পতিবার, তাড়াতাড়ি স্কুল থেকে চলে এসেছে দুজন। বৃহস্পতিবারে হাফ স্কুল হয়। এমনিতেই স্কুল ছুটির ঘন্টা বাজার পরই তারা সবার আগে হেঁটে হেঁটে বাড়ি চলে আসে। অবশ্য সাথে আরেকটি মেয়েও আসে সে হলো নাফিসার বান্ধবী শাহানা। নাফিসা সুন্দরী, সুন্দর পোশাক পরে। পড়া লিখায়ও ভালো। সায়েম পঞ্চমে শ্রেণিতে রোল এক দুই ওঠা নামা করে, নাফিসা সপ্তমে রোল এক। সে জন্য পাড়ার অনেক ছেলে তার সাথে দুএকটি কথা বলতে চায়, কিনতু পারেনা। সে দ্রুত স্কুলে যায় আর আসে। আসা যাওয়াতে সবার আগে থাকতো বলে নাফিসাকে অন্যান্য ছেলেরা ইঞ্জিন বলতো।

আজ স্কুল থেকে আসার সময় সে দেখলো ঘরের সামনের খালে মাছেরা লাফালাফি করছে। ঘরে এসে জামা কাপড় বদলিয়ে দুজনে চলে গেছে খালে। অল্প সময়ে ছোট ছোট অনেক মাছ ধরেছে। ভাতের একটি পাতিল পানিতে ভাসানো রয়েছে। মাছ ধরে ধরে সেখানে রাখে। মাছ যেন লাফিয়ে পড়তে না পারে সেজন্য কিছু কাঁচা ঘাস মুড়িয়ে রাখা হয়েছে পাতিলের ভেতর।

যেই মাছটি সায়েমের হাতে ধরতে পারেনি সেই বড় মাছটি নাফিসা এসে হাতড়িয়ে ধরতে গেলে মাটির খোরল থেকে বেরিয়ে খালের পানিতে হারিয়ে যায়। মাছেরা খালের পাড়ে মাটি গর্ত করে যেখানে লুকিয়ে থাকে, সেটাকে খোরল বলে। খোরল হাতিয়ে মাছ ধরা গ্রামের সবার শখও বটে। পানির নড়াচড়া পড়ায় পানি ঘোলাটে হয়ে গেছে, কখন যে খোরল থেকে মাছটি বেরিয়ে গেছে কে জানে? খালে তাদের কোমর সমান পানি, দেখা গেলো একটু দুরে একটি কোরাল মাছ লাফিয়ে ওঠলো। তা দেখে সায়েম চিৎকার করে বলল, আপা আপা ঐ যে ওখানে, এটা আমার হাত থেকে পালিয়ে গেছে। নাফিসারও চোখে মুখে মাছ হারানোর ব্যথা। কিন্তু বুদ্ধিতো আছেই। দৌড়ে বাড়িতে চলে গেলো আবার একটি ঠেলা জাল আর একটি উড়ো জাল হাতে ফিরে এলো। খালের পূর্ব কোণে উড়ো জালটি খুঁটি দিয়ে আটকে দিয়ে ঠেলা জাল হাতে নিয়ে পশ্চিম পাশ থেকে ঠেলতে শুরু করে। সাথে সাথে পা দিয়ে দুপাশের পানিকে এতো জোরে জোরে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে যেন সাগরের ঢেউ তোলে কোনো জাহাজ আসছে। পানির কি খলখলানি মিষ্টি আওয়াজ।
ঠেলা জালটি মাঝামাঝি পর্যন্ত যেতেই কোরাল মাছটি ঠেলা জালে ঢু মেরে বিপরীত দিকে পালিয়ে যেতে চেষ্টা করছে। ওমনি নাফিসা জালটাকে খালের পাড়ের সাথে লাগিয়ে ছেপে ধরলো। আর মাছটির ছটফটানি কে চায়? দুজনের চিৎকার পাইছিরে পাইছি। বলে আনন্দ করে দুজন। ঘর থেকে মা, জেঠি, চাচী সবাই উপস্থিত। সবার কি মজা! প্রায় তিন কেজি ওজনের হবে মাছটি। লাল হয়ে আছে পিঠের অংশে। জালসহ হাতে পেঁছিয়ে পেঁছিয়ে উত্তর পাশের জমিনে ফেলতেই তাদের আরো জোরে চিৎকার।

পানি থেকে উঠে এসেছে তারা। সারা গায়ে কাদা শাখা, দেখতে একেবারে জেলেদের মতো। সবাই এসে হাসাহাসি করে। তামাশার মধ্য দিয়ে দেখে নিলো হ্যাঁ, ভালোই মাছ পেয়েছে। শুকরিয়া করে আল হামদুলিল্লাহ পড়ে নেয়। মা বলে দিলেন বেশ হয়েছে আজ আর মাছ ধরা লাগবেনা। এগুলো নিয়ে চলে এসো ঘরে। মাছ গুলো ঘরের দিকে পাঠিয়ে তারা পুকুরে নেমে সাঁতার কেটে গোসল করে নেয়। পুকুরে সাতার কাটার মজাই আলাদা।

নাফিসার মনে ওঠে তার বান্ধবী শাহানার কথা। ভালো করে মাছ দিয়ে মেহমানদারী করা যাবে, তাই শাহানাকে দাওয়াত দিবে। মায়ের সাথে পরামর্শ করলে, মাও সায় দেয়। সায়েম মাকে বললো, কৈ মাছ দুটো ভাজি করে দিতে। মা মাছ গুলো নিয়ে রান্না ঘরে গেলেন। ওমনি নাফিসা ভেবে নিলো নাটাই গাছের পাকা পাকা ফল খুবই সুস্বাধু হবে। ভাতের পর নাটাই খাবে আর শাহানাকেও খাওয়াবে। যেই ভাবা সেই কাজ। সায়েমকে বললো ভাই একটি কাজ কর্ গাছে উঠে কিছু পাকনা নাটাই পেড়ে নে। তারপর আমরা এক সাথে খাবো। বিকালে শাহানাকে ডেকে আনবো। সায়েম বোনের কথা মতো পায়ে দড়ি বেঁধে, বিসমিল্লাহ বলে গাছে উঠতে লাগলো। কাঁটা গাছে উঠা কি এতো সহজ! দা হাতে করে উঠতে উঠতে কাঁটা কেটে সমান করে করে তারপর এক কদম এক কদম করে উপরে উঠা। তখন ঠিক দুপুর। রোদেরা খেলা করছে, এ সময় নাকি ক্ষেনের সময়, বিপদ ডানে বাঁয়ে ঘোরে। সায়েম গাছের শীর্ষে ওঠে গেছে, বেশ কিছু নাটাই লগি দিয়ে টেনে টেনে নিচে ফেলেছে। নাফিসা নাটাই কুড়ানোর কাজে ব্যস্ত। টুকরিটা পুরে গেছে। এমন সময় সায়েমের মনে কেন যেন ভয় ভয় লাগছে। একবার নিচে তাকায় আবার উপরে তাকায়। কিন্তু কি থেকে কি হলো হঠাৎ খুব জোরে একটি আওয়াজ হলো যা কোনো গাড়ি উচু রাস্তা থেকে গর্তে পড়ে যাওয়া আওয়াজের মতো বিকট শব্দ, অপর দিকে চিৎকার। নাফিসা পাশে তাকিয়ে দেখে তারই ভাই সায়েম খেজুর গাছের পাশেই মাটিতে পড়ে আছে। নাটাই গাছের সব কাঁটা তার গায়ে বিঁধে আছে। সামান্য একটি গেন্জি গায়ে ছিলো, না হয় পুরা শরীরই শেষ হয়ে যেত। এবার নাফিসার চিৎকার আরো জোরে জোরে দৌড়ে এলেন মা, বাড়ির জেঠি, চাচী সবাই তাকে দেখেতো হায় হায় করছে। এটা কি করলি? সবাই গায়ের সাথে, গেন্জির সাথে আটকে থাকা কাঁটা গুলো টেনে টেনে খুলছে আর কেউ বলে হাসপাতালে নিয়ে যাও, কেউ বলে সাবধানে কাঁটা গুলো খোলো, কেউ বলে সরিষার তৈল মাখো। এরই মধ্যে সায়েমের কান্না কে চায়, সায়েমের মা যা তা বকে দিচ্ছে নাফিসাকে। কিন্তু যা হবার তাতো হয়েই গেল।

আর্থিক দূর্বল ফ্যামেলীর জন্য হাত পা ভেঙ্গে গেলেও রিফুজির লতা আর হাড় ভাঙ্গার লতা বেঁধে দেয়ার চিকিৎসাই গ্রামে প্রাধান্য পায়। তাদেরও অবস্থা তেমন। যেখানে হাস আর মুরগীর ডিম বিক্রি করে নাফিসাদের সংসার চালাতে হয়, সেখানে শান্তনা আর আপসোস ছাড়া কে কি করবে? তাদের কি আর হাসপাতালে নেয়ার সাধ্য আছে? সবাই হাত পা টেনে দেখলো কোনো অঙ্গ ভেঙ্গে গেলো কিনা। দেখা গেলো- না, আল্লাহ রহম করেছেন। যদি কোনো অঙ্গ ভেঙ্গে যেতো? যদি খেজুর গাছের মাঝখানে পড়তো? এ রকম কতো মন্তব্য চলছে। অনেক সময় পর এবার শরীরের কাঁটা দাগ গুলো ফুলে ওঠেছে। কোনো রকমে একটি হালকা চাদর গায়ে জড়িয়ে দিতে দিতে কাঁদছেন মা। চার মেয়ের মাঝে একমাত্র পুত্র এই সায়েম। তারপর কোলে কাঁখে করে মানুষ করছেন, এখন এই অবস্থা। বাবাটা বাড়ি থাকেনা সপ্তাহে একবার মাত্র আসেন। কখনো কখনো মাসেও একবার আসেন না। আসলে একদিন থেকে আবার চলে যান। তাছাড়া সায়েমের বোন রোজিনা যে রোগে রোগে মারা গেলো সে সময়ও বাবা কবরে মাটি টুকু দেয়ার জন্যও আসেননি। কোলে করে ঘরে নিয়ে যাওয়ার সময় ভাবছেন সায়েমের মা। ঘরে নিয়ে জানালার পাশে বসিয়ে দিলেন। জেঠি, চাচীরা ভালো করে পরীক্ষা করে দেখছেন, গায়ে কাঁটা বিঁধে আছে কিনা। মা বিষন্ন মনে রান্না ঘরে গেলেন। একটু পরে এক বর্তন ভাত আর ভাজা বড় কৈ মাছ দুটো তার সামনে এনে দিয়ে বললেন, খা বাবা খা তোর ভাগ্যে ছিলো, কি আর করবি। কয় দিন সময় লাগবে ভালো হতে, এই কয় দিন কষ্ট কর। আমি প্রতিদিন তেল মেখে দেবো, নে খেয়ে নে। আল্লাহ রহম করেছেন। তোর বইন উয্যতি করি সব কাজ করে। এমন ক্ষ্যান দুপুরে কেউ কাউকে গাছে উঠায়? চোর ডাকাত ধরা খেলে মানুষ এ রকম কাঁটা দিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে দেয়। সংসার চালাতে কতো কষ্ট, তার উপর আবার এমন বিপদ। নে খেয়ে নে; বলে আবার রান্না ঘরের দিকে যেতে যেতে বিড় বিড় করে বললেন, শরীরের কোথাও কি কাঁটা ঢুকে আছে কি না কে জানে? খাওয়া শেষে আলোতে নিয়ে ভালো করে দেখতে হবে।

সায়েম হাত নাড়াতে পারেনা, উহ কি ব্যথা। কিন্তু সামনের প্লেটে দেখলো কৈ মাছ দুটা পুরা কাঁচের প্লেট ভরে গেছে। টকটকে ভাজি করা মাছ। জিহবায় পানি এসে যায়। সে ধীরে ধীরে চাদরের নিচ থেকে হাত বের করে “বিসমিল্লাহি আলা বারাকাতিল্লাহ” বলে ধীরে ধীরে খাওয়াটা মুখে দিতে লাগলো। এমন সময় নাফিসা এসে নরম সুরে বললো ভাই আমি কি জানতাম, তুই পড়ে যাবি? আচ্ছা আমি খাইয়ে দিচ্ছি বলে প্লেটে হাত রাখে। আর লোকমা ধরতে ধরতে মুখে বলে থাক কাল তোকে একটা ফুটবল, একটা বেলুন আর চকলেট এনে দেবো। সায়েম কিছুই বলে না।
শুধু ব্যথা যন্ত্রণায় উহ আহ করে।