নতুন বছর

মাহবুবুল হক

0
101

এবারের পৌষে তো খুব শীত পড়ে গেছে। শুক্রবার সকাল বেলা দাদাভাই গায়ে চাদর, গলায় মাফলার ও মাথায় কানটুপি লাগিয়ে হইচই করছেন। কই, তোমাদের বন্ধুরা কই, এখনো তো কেউ এলো না। দশটা তো বাজতেই চললো।
আরিজ কিছু বলার আগেই আমিরা বলে ফেলে, দাদাভাই তুমি কিচ্ছু জান না। পরীক্ষা শেষ, ক্লাস নেই পর তো নতুন বছর শুরুর আমেজে এখন তো সবাই যার যার নানা বাড়ি ও দাদা বাড়ি বেড়াতে গেছে। এই তো আমরাও তো নানা বাড়ি থেকে ঘুরে আসলাম। দু’দিন পর তো আমরাও দাদা বাড়ি যাবো। আজ তুমি সব বন্ধুকে পাবা না।
হুম, তাহলে তো ওরা আমাকে বলতেই পারতো। আমিও তাহলে আমার দাদা বাড়ি বেড়াতে যেতাম। ওরা যদি আমাকে বলে যেতো, তাহলে কতো না ভালো হতো।
আরিজ বলে ওঠে, আমিরা তো খালি বানিয়ে বানিয়ে কথা বলে। তুমি কিচ্ছু ভেবো না। বাইরে ঠা-ার মধ্যে একটু বৃষ্টি হচ্ছে তো। আমাকে তো আজাদ, মিজানুর, শাহিন ও শরীফ ফোন করেছিল। ওরা সবাই একসাথেই আছে। আমাদের মাঠের পশ্চিম কোনায়। বৃষ্টিটা একটু কমলেই ওরা হুট করে চলে আসবে। তুমি মাথাটা একটু ঠা-া করো। আর এই নাও নারকেল দিয়ে চিঁড়া ভাজা। বসে বসে চিবোতে থাকো।
দাদা ভাই আমি কি তোমাকে বলেছি, আমার মাথা গরম হয়ে গেছে। আমি তো টুপির ওপর দিয়ে কানটুপি পড়েছি। ঠা-ায় আমি জমে যাচ্ছি।
আরিজ, ওই হলো, ‘টাইফয়েড’। এরপর তোমার না আবার ‘ভার্টিকো’ হয়েছে। দুনিয়াটা নাকি শুধু ঘুরছে।
দাদা বলেন, ঘুরুক। তুমি আবারো ওদেরকে ফোন দাও।
বলতে বলতে সিঁড়িতে নানা রকম শব্দ শোনা যায়।
আমিরা চিৎকার করে ওঠে, ওই তো ভাইয়ারা এসে গেছে। দরজা খুলার আগেই আসসালামু আলাইকুম এর শব্দ শোনা যায়। আরিজ কপাট খুলতেই সবাই জোরাজোরি করে একসাথে ঢুকে পড়ে।
দাদাভাইও ওয়ালাইকুম আসসালাম বলে সবার কপালে চুমু দিতে থাকেন। আরিজ হইচই করে বলে, একটু আগেই না রাগ করেছিলে, এখন তো মনে হয় তোমার চেয়ে ঠা-া মানুষ দুনিয়াতে আর একটাও নাই।
কথা বলতে বলতে চিঁড়ার বাটিটা উল্টে গেলো।
আজাদ বলে উঠলো, এই দেখ দেখ একদম চিকন চিঁড়া। নিশ্চয়ই ঠাকুরগাঁও থেকে এসেছে। দাদাভাই চুরি করে একা একা খাচ্ছে। আমাদেরকে দেয় নি। তাই তো চিঁড়াগুলো রাগ করে উল্টে গেছে। চোর ধরা পড়ে গেছে।
আরিজ হাসতে হাসতে বলে, কাল ঠাকুরগাঁও থেকে আমাদের এক খালা এসেছেন। তিনি চিড়া, গুড়, মুড়ি, মুড়কি, কাটারিভোগ আর বাসমতি চাল নিয়ে এসেছেন। নো চিন্তা ডু ফূর্তি। এখনই তোমরা চিঁড়ার বিরিয়ানি পাবে।
মিজান ‘ফুলকুঁড়ি’র হাত তালি দিলো। এক-দুই এক-দুই-তিন। এই তালিতে ঘরটা গরম হয়ে উঠলো। দাদাভাই বসতে বসতে বলেন, এই তোমরা তাড়াতাড়ি বসো। সময় তো শেষ হয়ে যাচ্ছে।
আমিরা হাসতে হাসতে বলে, দাদাভাই ঠিক বলেছো। বৃষ্টিও তো কমতে শুরু করেছে। আল্লাহর রহমতে তোমরা জুম’আর নামাজও পড়তে পারবে।
এই বুড়ি তুমি চুপ করো। খালি বেশি বেশি কথা বলো।
দাদাভাই বলেন, গোফরান, অলী, নাঈম এরা কই?
শরীফ বলে, এরা ছুটিতে দাদা ও নানা বাড়িতে বেড়াতে গেছে। এবার তো অনেক দিন ছুটি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বিজয় দিবস গেল, পাড়ার পিঠা উৎসব গেল, বনভোজন গেল কোনো কিছুতেই ওরা যোগ দিতে পারেনি।
দাদাভাই : ঠিক আছে। এবার যোগ দিতে পারেনি, আগামীবার যোগ দেবে। আনন্দ-উৎসব তো করতেই হবে। এখন তো নতুন বছর। মানে নতুন স্বপ্ন। নতুন উদ্দীপনা। এতে আমরা বাতাসে নতুন বইয়ের গন্ধ পাচ্ছি।
মাহিন : আচ্ছা দাদা আমাদের কয়টা নতুন বছর?
কেন, তুমি জানো না। আমাদের নতুন বছর তিনটা। একটা বাংলা নতুন বছর। একটা ঈসায়ী নতুন বছর। আরেকটি আরবি নতুন বছর, যার নাম হিজরি সন। অন্যদের একটা নতুন বছর থাকলেও আমাদের তিনটা। এর অবশ্য কারণও আছে। আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষ মুসলিম। সে কারণে আমরা আরবি মাসকে অনুসরণ করে থাকি। আমরা আবার বাঙালি। সে কারণে বাংলা সন আমাদের অনুসরণ করতে হয়। আমরা কিন্তু বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বসবাস করি না। সবার সাথে তাল মিলিয়ে একসাথে চলি। সে কারণে ঈসায়ী সালকে আমরা অবহেলা বা অবজ্ঞা করতে পারি না।
আরিজ বলে ওঠে, কী যেন বললে, ঈসায়ি সাল! এটা আবার তুমি
কোথায় পেলে? সবাই তো বলে ইংরেজি সাল। তুমি না খটুটে খুঁটে নতুন নতুন কথা উদ্ভাবন করো।
দাদা ভাই হাসতে হাসতে বললেন, সবাই তো আবার সব বিষয়ে অভিজ্ঞ হয় না। সে জন্য সবাই হালকাভাবেই বলে ফেলে। ইংরেজি সাল অনুযায়ী পঁচিশে ডিসেম্বরে আমাদের নবী হযরত ঈসা আ: জন্মগ্রহণ করেছিলেন। যেটাকে সবাই আমরা ইংরেজি সাল বলছি। আসলে এটার সাথে ইংরেজি সালের কি কোনো যোগ আছে? যোগ আছে ঈসা নবী আ: জন্মের সাথে। তোমরা হয়তো বলবে, তিনি যদি আমাদের নবী হন, তাহলে আরবি সালের সাথে এটা সম্পৃক্ত হলো না কেন? এর কারণটা হলো, আরবি সন আগে যাই থাকুক না কেন, আমাদের প্রিয় নবীর সা: একটা বড় ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখনকার আরবি সন গণনা নতুন করে শুরু হয়।
শরীফ : দাদাভাই কি বড় ঘটনা?
দাদাভাই বললেন, সেটা আরেক দিন বলবো। তিনি নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। একে আরবিতে বলে ‘হিজরত’।
আরিজ হাততালি দিয়ে বলে ওহ্ বুঝেছি বুঝেছি, তিনি তো মক্কা থেকে মদিনায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। আমাদের ধর্ম স্যার একদিন কাঁদতে কাঁদতে এই বিষয়টা পড়াচ্ছিলেন।
বাংলা সনেরও তো একটা পুরনো হিসাব আছে, শাহিন হাসতে হাসতে বলে ওঠে। এখন অবশ্য আর আমরা ওই হিসাব ঠিকমতো মেনে চলছি-ই না।
দাদাভাই বললেন, এখন আমরা পুরনো সনের হিসাব বাদ দিয়ে সবকিছুর নতুন হিসাব করছি। বড় হলে স্যারদের কাছ থেকে তোমরা এসব ভালোভাবে জেনে নেবে।
শরীফ বললো, সবচেয়ে ভালো হতো, যদি আমরা সবাই হিজরী সন মেনে চলতাম।
দাদাভাই বললেন, তোমার কথার মধ্যে একটা আবেগ আছে, একটা ভিন্ন অর্থও আছে। যদি মুসলিমরা এখনো সারা দুনিয়া শাসন করতে পারতো, তাহলে হয়তো হিজরি সন ঈসায়ি সনের মতো সারা দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত থাকতো। মুসলিমরা তো একসাথে সারা দুনিয়া শাসন করার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমরের রা: সময় মুসলিমরা অর্ধেক পৃথিবী শাসন করেছিল, এমন একটি তথ্য কবিতায় দিয়েছিলেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি লিখেছিলেনÑ

“অর্ধ পৃথিবী করেছ শাসন
ধূলার তখ্তে বসি,
খেজুর পাতার প্রাসাদ তোমার
বারে বারে গেছে টুটি।”

এরপর অবশ্য উসমানীয়া, উমাইয়া ও তুর্কি মুসলিমরা অনেক দেশ জয় ও শাসন করেছিল। মাঝে মাঝে পরাজিত হয়ে দেশ হারিয়েছিলও। যেমন : ইংরেজদের কাছে পলাশীর যুদ্ধে আমরাও হেরে গিয়েছিলাম। ফলে ইংরেজরা ভারতবর্ষ দু’শ বছর শাসন করেছিল। যারা শাসন করে তারাই তো তাদের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত করে। সেভাবেই ঈসায়ী সন আজ সারা দুনিয়া মেনে চলতে বাধ্য হচ্ছে।
আমাদের বাংলা সনটি অবশ্য হিজরি সনের সঙ্গে মিলিয়ে মোঘল সম্রাট আকবর এখনকার চালু নতুন সনটি প্রবর্তন করেছিলেন।
আরিজ বলে ওঠে, আমরা অবশ্য দুটি সন ব্যবহার করি। একটি বাংলা ও আরেকটি ঈসায়ী। বাংলা সনটি আমরা উদযাপন করি প্রতি বছর ১৪ এপ্রিলে। ঈসায়ী সনটি উদযাপন করি প্রতি বছর পহেলা জানুয়ারিতে।
দাদাভাই বলেন, এইতো আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ২০২০ ঈসায়ি সাল। আমরা এখন থেকে খ্রিস্টাব্দ বা ইংরেজি সাল এসব বলবো না। এসো আমরা নতুন ঈসায়ি সালকে অভিনন্দন জানাই। নতুন বছরের জন্য নতুন করে রুটিন তৈরি করি। প্রতি বছরের রুটিনে নতুন করে তৈরি হই। সময়ের সাথে সাথে তা পরিবর্তন হয়। তোমাদেরকে একটি উপদেশ দিয়ে রাখি, এখন থেকে রুটিন ও ডায়েরিগুলো সংরক্ষণ করে রেখো।
সবাইকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও দোয়া। তোমরা চিঁড়া খাও, আমি জুমআর নামাজের জন্য অজু করতে যাই।