গুপ্তধন (পর্ব-৭)

নাঈম আল ইসলাম মাহিন

0
70

(গত সংখ্যার পর)

সাত

কুসুমের বাবা যখন মারা যায় তখন ও সবে ক্লাস ফাইভে উঠেছে। বাবাই ছিল ওর জীবন। উঠতে-বসতে চলতে-ফিরতে বাবাকে ছাড়া ওর চলত না। বাবাও যেখানেই যেতেন মেয়েকে সাথে নিয়ে যেতেন। কদাচিৎ থানা সদর কিংবা দূরে কোথাও যাওয়ার দরকার হলে কুসুমকে সাথে না নিয়ে গেলে উঠোনে পা ছড়িয়ে এক দুপুর কাঁদত কুসুম। বাবা না ফেরা পর্যন্ত খাবার মুখে তুলত না। কারো সাথে কথা পর্যন্ত বলত না। মা বলতেন ঢং। আর কারো বুঝি বাবা নেই। বাবাকেও বকতেন। তুমি আদর দিয়ে দিয়ে মেয়েটার অবস্থা কি করেছ বুঝতে পারছো? ওকে তো একদিন শ্বশুরবাড়ি যেতে হবে নাকি? বাবা হাসতেন। পরক্ষণেই হয়তো মেয়েকে সাইকেলে চড়িয়ে বের হয়ে যেতেন রাস্তায়। কোন কাজে কিংবা অকাজে। সেই বাবা যখন দুদিনের জ্বরে হঠাৎ মারা গেলেন, কুসুম পাথর হয়ে গেল। মায়ের সাথে নানা বাড়ি গিয়ে কোনোভাবেই মন বসাতে পারেনি ও। এ বাড়িতে এসেও কেমন যেন ছটফট করত সারাক্ষণ। ওর কষ্টটা কেবল ওর সেজ চাচীই বুঝতে পেরেছিল। পরম মমতায় মেয়েটার কৈশোরে পা রাখার সময়টাতে পাশেপাশে ছিলেন তিনি।

বাবা মারা যাবার পর তার সাইকেলটায় হাত দিতে দেয়নি ও কাউকে। নিজের চেষ্টায় অল্পদিনের মধ্যে শিখে নিয়েছিল চালনা। তারপর থেকে যেখানেই যেত সাইকেলটাকে সাথে নিয়ে যেত। স্কুল নানাবাড়ি সব জায়গায় । সাইকেলটা নিয়ে বাইরে বের হলে কেমন যেন এক ধরনের সাহস পায় ও। মনে হয় বাবা আছেন সাথে। মাঝে মাঝে সাইকেলের সাথে একা একা কথাও বলে কুসুম, তবে সেটা খুবই ব্যক্তিগত পর্যায়ে। বাবা মারা যাওয়ার পর বছরখানেকের মধ্যে কুসুমের মা আবার বিয়ে করেন। সেখানে ওর দুটো ভাইবোন আছে। নতুন বাবাকে ওর পছন্দ নয়। তবে ভাইবোনদের জন্য মায়া আছে। মাঝে মাঝে ভাইবোনদের জন্য এটা সেটা কিনে নানাবাড়ি রেখে আসে কুসুম।

কেমিস্ট্রি বরাবরই দুর্বোধ্য লাগে কুসুমের কাছে। সায়েন্সের সাবজেক্ট কয়টার জন্য যদি বাসায় টিচার পাওয়া যেত এই ক’মাসের জন্য, মানে এসএসসির আগ পর্যন্ত, খুব উপকার হত কুসুমের। নানা ভাইকে বললে হয়তো ম্যানেজ করে দেবেন কিন্তু নানা ভাইয়ের হাতের অবস্থা জানা আছে কুসুমের। দুর্বোধ্য ইকোয়েশনগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখে জল এসে গেল ওর। সে জল গড়িয়ে রসায়ন বইয়ের লবণ জলের দ্রবণের সংকেতের ওপর পড়তে পড়তে পেছন থেকে জাপ্টে ধরলো এষা।
– আপু, তুমি কাঁদছো? মাশাআল্ল­াহ! কী সুন্দর লাগে তোমাকে কাঁদলে! আচ্ছা তুমি কাঁদো না কেন সব সময়? পেছন থেকে কুসুমের ভেজা গালে চুমু খেতে খেতে এষা বললো, কী হয়েছে আপু? আয়রন লেডি! আমি ভাবতেই পারছি না যে তুমি কাঁদতে পারো। হেসে ফেলল কুসুম।
– সব সময় শুধু দুষ্টুমি, তাই না?
– মোটেও না। এই দেখো পত্রিকাটা। সপ্তাহে একদিন নানাবাড়িতে পত্রিকা আসে। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দৈনিকটি। নানা ভাইয়ের পড়া হয়ে গেলে এষা বসে পেপারটা নিয়ে। এই খবর সেই খবর বিনোদন বিজ্ঞপ্তি কিছুই বাদ দেয় না। পড়তে পড়তে ওর চোখে পড়েছে বিজ্ঞপ্তিটা। বিজয় দিবস উপলক্ষে আন্তঃজেলা সাইক্লিং অ্যান্ড স্কেটিং কম্পিটিশন-এর বিজ্ঞপ্তিটি। হেসে ফেললো কুসুম। এই সাইকেল দিয়ে? এটাতো আমার বাবার বয়সী। এই সব কম্পিটিশনে যারা অংশ নেয় তাদের থাকে রেসিং সাইকেল। সবচেয়ে কমদামিটারও ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা দাম। দমে গেল এষা। তবু হাল ছাড়লো না। একবার দিয়েই দেখো না আপু। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, মেয়েদের বিভাগে তোমার চেয়ে ভালো সাইকেল চালাতে পারে এমন মেয়ে পুরো রাজশাহী বিভাগে নেই।

দুপুর গড়িয়ে গেলে বাড়ি ফিরল ইফতু। কখন বাসে উঠেছে কখন নেমেছে কিছুই জানতে চাইলো না কেউ ওর থেকে। যেন এর থেকেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা জমা হয়ে আছে ওকে বলার জন্য সবার। বাড়ির সবার জন্যই কমবেশি উপহার পাঠিয়েছেন বাবা। চকলেট চুলের ক্লিপ কিংবা কলমের মতো ছোট খাটো উপহার। কেবল এষার উপহারটা দেখে সবার চক্ষু চড়কগাছ। এষা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি এমন একটা উপহার ওর কপালে জুটবে। একজোড়া স্কেটিং সু । জুতো জোড়া বুকের সাথে চেপে ধরে আনন্দে কেঁদে ফেলল এষা।
– এটা কিনতে গিয়ে নির্ঘাত তোর বাবাকে মোটা অঙ্কের ঋণ করতে হয়েছে, বললেন মা। মায়ের বিষণœতা আর অস্থিরতার ওষুধ এখন ওর হাতে, ভাবছে ইফতু। একটু সময় নিয়ে সবার অগোচরে মার হাতে তুলে দিলো বাবার চিঠিটি।
দুপুরে খেয়ে দেয়ে ছাদে উঠে সাজিদকে পেলো ইফতু।
Ñ ঠিক এই মুহূর্তে চারজনের একটা মিটিং ডাকা জরুরি, ইফতুকে নিয়ে রুমে ঢুকতে ঢুকতে বলল সাজিদ। ইফতুরও তাই মনে হচ্ছে । কিন্তু কুসুম আপুর তো সন্ধ্যার আগে বের হওয়া বারণ। আর সন্ধ্যার পর মেয়েদের ছাদে ওঠাতেও নিষেধাজ্ঞা আছে।
– এই কয়দিনের আপডেট কী? জানতে চাইলো ইফতু।
– তেমন কিছু না, তবে কুসুম আপু আর এষা মিলে তোমার উর্দু ফরমানটার বেশ কয়েকটা অনুবাদ করেছে। সেগুলো নিয়ে আমিও অনেক ভেবেছি। মনে হচ্ছে এই তথ্যগুলো কোনো একটা গুপ্তধনের পাসওয়ার্ড। আমি নিশ্চিত।
ইফতু দেখল কাগজগুলো। কুসুম আপুর কাজ অনেক গোছালো। এষার থিংকিং ও বেশ ভালো। মোট তিনটা স্ক্রিপ্ট তৈরি করেছে ওরা। প্রথমটায় উর্দু ও ফার্সি শব্দগুলোর সরল অনুবাদ। দ্বিতীয়টায় টেকনিক্যাল শব্দগুলোর সম্ভাব্য অর্থ এবং তৃতীয় স্ক্রিপ্টে সংকেত এবং কোডগুলো ভেঙে বাক্যে রূপান্তর এবং একটা সম্ভাব্য নির্দেশিকা তৈরি। তৃতীয় কাগজটার চেহারা মোটামুটি এই রকম

‘পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্ল­াহর নামে শুরু করছি।
দরুদ ও সালাম নবী মুহাম্মদের সা: প্রতি যিনি আমাদের পথ দেখিয়েছেন। মোঘল সা¤্রাজ্যের মহান স্থপতিকেও স্মরণ করছি। এই বিপ্ল­বের মাধ্যমে যেন সমুন্নত হয় শেষ স্বাধীন নবাবের মসনদ।
১২৩২৭ ৬২০৫।’
আজ থেকে ১৬০ বছর আগের লোকজন কি তালা ব্যতীত অন্য কিছুর মাধ্যমে লক করা এবং চাবি ছাড়া লক খোলার কৌশল জানতো? ইফতু শুন্যে ছুড়ে দেয় প্রশ্নটা।
– আমি সে কথাই ভাবছি, বললো সাজিদ। পাজল কিংবা ক্যাপচা কি আবিস্কার হয়েছিল তখন?
নতুন স্কেটিং সু পেয়ে এষা যেন বাতাসে ভাসছে। ছাদে উঠেই পায়ে সু লাগিয়ে তিন-চারটা চক্কর দিয়ে নিলো। দরজা খুলে ছাদে এসে দাঁড়াল সাজিদ। পঞ্চম চক্করে ওকে অতিক্রম করার সময় সাজিদ বলল,
– মেয়েদের রাতের বেলা ছাদে আসা বারণ।
– তবে হিজড়াদের ক্ষেত্রে এ নিষেধাজ্ঞা বলবৎ নয়, তাই না? প্রজাপতির পাখায় ভর করতে করতে বলল এষা। রসিকতাটা গায়ে মাখলো না সাজিদ।
– তাই বুঝি ওপরে এলে? বলে পাল্টা খেতাব লাগিয়ে নিচে নেমে গেল সাজিদ। পায়ে চাক্কাওয়ালা জুতো নিয়ে ইফতুদের দরজায় এসে দাঁড়ালো এষা। কুসুমের একটা চিরকুট ইফতুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো, মা’র কী হয়েছেরে ভাইয়া? মানে আম্মু তো এখন আর মাটির পৃথিবীতে নেই। রীতিমতো বাতাসে ভাসছেন।
– ঠিক তোর মতো, না রে?
– এক্সাক্টলি! কিন্তু আম্মুর স্কেটিং সু টা যে কী, তা বুঝতে পারছি না। কথায় কথায় হেসে লুটিয়ে পড়ছেন। রাতের খাওয়া হয়ে যাওয়ার পরও বেশ কয়েকবার খাওয়া অফার করেছেন আমাকে। অকারণে তিনবার গাল টিপে আদরও করেছেন। ওপরে ওঠার আগ মুহূর্তে দেখলাম আম্মুর হাতে ট্রলি ব্যাগ। আমাকে ডাক দিলেন। চুলের বেণিটা ঠিক করে দিতে দিতে বললেন, তোদের দুজনকে এখানে রেখে কদিনের জন্য যদি অন্য কোথা থেকে ঘুরে আসি, খুব কষ্ট হবে তোদের? কোথায় যাবে মা? হঠাৎ এত উতলা হলো কেন বলতে পারো ভাইয়া?
– ওষুধে কাজ দিয়েছে, বলল ইফতু।
– মানে?
– হুম! বাবার চিঠি। অনেক অশ্রু আর অনুরাগ নিয়ে লেখা এই চিঠি।
পরদিন কাকডাকা ভোরে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিলেন মা। একটা রাত কোনোমতে পার করেছেন। আর এক মুহূর্তও যেন তাকে আটকে রাখা যাবে না। এষা যেন আকাশ থেকে পড়লো।
– কোথায় যাচ্ছ মা ? বাবার মেসে? মায়ের কথাটা অবলীলায় মাকে ফিরিয়ে দিলো ও। একরাশ লজ্জায় কাঁচুমাচু হয়ে গেলেন মা। মনে হলো বাবা মা তো নয় যেন একটা অবুঝ খুকি আর একজন আবেগী খোকার সাথে বসবাস ওদের। এর থেকে এষা আরও ঢের পরিণত।

চলবে…