গুপ্তধন (পর্ব-১১ ও ১২)

নাঈম আল ইসলাম মাহিন

0
176

গত সংখ্যার পর

এগারো

সংবাদটা পুরো উপজেলায় চাউর হয়ে গেল। ইউসুফপুর ইউনিয়নের চৌধুরী বাড়িতে দুধর্ষ ডাকাতি হয়েছে। চৌধুরী সাহেবকে বেঁধে রেখে বাড়ির সব মালামাল নিয়ে গেছে ডাকাতরা। সকাল-সকাল দুটো অটো নিয়ে ছুটল সবাই বাড়ির দিকে। নতুন বউকে নিয়ে বাড়ি ফেরার আনন্দ যাত্রাটা সব হারানোর শোক যাত্রায় পরিণত হল। সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়েছে সাজিদ আর এষা। এতদিন একটা ঘোরের মধ্যে ছিল ওরা। কোটি কোটি টাকার ঘোর। হাজার টাকাকে মনে হয়েছে ফেলনা। নিজেদের অনেক পছন্দের জিনিসও দিয়ে দিতে পেরেছে অন্যকে অবলীলায়। মনটা ভীষণ রকম বিস্তৃত হয়ে গিয়েছিল। একদম আকাশের মতন। আকাশ থেকে হঠাৎ যেন মাটিতে ছিটকে পড়েছে ওরা।
– তুমি মৃণাল সেনকে এসব বলতে গেলে কেন? কুসুম আপুর কথাটা ইফতুর কানে কানে বলল এষা।
– টাইম পাস করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু লোকটা ধৈর্য ধরতে রাজি নয়। ডকুমেন্টটা তো দিলরুবার কাছেই। কী দিতাম বাড়ি আসলে? ভালোই হলো এখন। একটা অজুহাত দেয়া যাবে। ডাকাতির অজুহাত।

চৌধুরী বাড়িতে ডাকাতি হয়েছে শুনে গ্রামের অনেকেই দেখতে এসেছে। সকালের দিকে পুলিশ এসেছিল। একটা সাধারন ডায়েরি হয়েছে। নানাভাই বৈঠকখানায় বসে আছেন। গ্রামের দূর সম্পর্কের আত্মীয়দের কেউ কেউ সঙ্গ দিচ্ছেন তাকে।
ছোটমামা সোজা নানাভাইয়ের পায়ের ওপর পড়লেন। হাঁটুতে মাথা রেখে অনেকক্ষণ কাঁদলেন। নানাভাইয়ের-ও চোখ ভিজে যাচ্ছিলো। মামীর প্রথম আগমনটা সুখকর হলো না এ বাড়িতে। নানাভাই একবারও তাকালেন না মামীর দিকে। আসে পাশের বাড়ির অন্য মামীরা এমন ভাব করছে, যেন একটা অপয়া নিয়ে আসা হয়েছে বাড়িতে। মামীর অবশ্য তাতে তেমন অসুবিধা হচ্ছে বলে মনে হলো না। বাচ্চাদুটো জা’দের হাতে তুলে দিয়ে কুসুমের রুমে গিয়ে মোবাইল নিয়ে বসে গেছেন। এষা চাপা স্বরে বলে গেল, ভাইয়া দুটো রুমই লন্ডভন্ড। ধানের বস্তাদুটোও হাওয়া। হতাশা চেপে রেখে নানাভাইয়ের সাথে কুশল বিনিময় শেষ করে সোজা ছাদে চলে এলো ইফতু। কুসুম আপুও এসেছেন। পেছনে পেছনে নতুন মামী। বইপত্র, আলমারি, ড্রয়ার কোনো কিছুই হাতাতে বাদ রাখেনি মৃণাল সেনের লোকেরা। শেষমেষ আসল জিনিসটা না পেয়ে কিছু নগদ লাভের আশায় ডাকাতির আশ্রয় নিয়েছিল লোকগুলো, যেটা মৃণাল সেনের মূল পরিকল্পনার বাইরে। বিছানা বেডিং গোছগাছ করে দিলো কুসুম আপু। পাশের রুমে ঢুকে নানা ভাইয়ের ফাইলপত্র পুরনো বই আর দলিল-দস্তাবেজের ইতস্তত ছড়ানো অংশ যতœ করে তুলে রাখলো ইফতু। ধানের বস্তাগুলো কেমন করে নিয়েছে ওরা, ভাবছে ও। সোনালি ফসলের মধ্যেই ছিল সোনার কয়েনগুলো। ওরা কি বুঝে শুনে নিয়েছে, নাকি বস্তা খোলার পর কয়েনগুলো পাবে, কে জানে? মৃণাল সেন কি জানে এর সবকিছু?
পরবর্তী করণীয় নিয়ে মিটিং হওয়া দরকার। এখন হাতে আছে শুধু আলাদা করে রাখা দশটি মুদ্রা। কুসুম আপুর পরীক্ষা কাছে চলে এসেছে বলে সব সময় তাকে পাওয়া যাচ্ছে না পরামর্শের জন্য। অনেক সিদ্ধান্ত ইফতু একাই নিয়ে নেয় বলে ভুল হয়ে যাবার সম্ভাবনা থেকে যায়। কুসুম আপুও অনেক কিছু একা একাই করছেন বলে মনে হচ্ছে। মামী মুগ্ধ হয়ে ছাদের নারকেল গাছগুলো দেখছেন। কুসুম আপু এগিয়ে এলেন।

– এত ভেঙে পড়ার কি আছে এষা? আমাদের প্রয়োজনটা আসলে কতটুকু? বল সাজিদ, তোর কি কি লাগবে? কুসুম আপুর এমন হঠাৎ প্রশ্নে থতমত খেয়ে গেল সাজিদ। আসলেই তো। কী লাগবে ওর? একটা দামি প্যান্ট, দামি সু, বড়জোর একটা ল্যাপটপ, একটা সাইকেল। এর বেশি আর কি? মোবাইল তো স্কুলের গ-ি পার না হলে ব্যবহার করা ভালো নয়। আর হয়তো একটা দূরবীন একটা ডিএসএলআর, ব্যাস। শখ পূরণ হয়ে গেল। এষাও তেমন কিছু খুঁজে পেল না। একটা ভালো মানের সাইকেল, কিছু পোশাক-আশাক আর কারাতেতে ব্ল্যাক বেল্ট অর্জনের কোর্সটা করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ।
তবে বাবার জন্য অনেক কিছু করতে ইচ্ছে করে ওর। বাবা খুব সৌখিন মানুষ। দশটা পাঁচটা চাকরিতে তার বরাবরই অনীহা। বাবার খুব ইচ্ছে তার বড়োসড়ো একটা বইয়ের দোকান থাকবে। নানান ধরনের স্টেশনারি খাতাপত্র থাকবে সে দোকানে। বাবা সারাদিন বসে বসে বই পড়বেন আর দোকান চালাবেন। মার অবশ্য একটা গাড়ির শখ আছে, তবে সে গাড়ি চড়ে তিনি কোথায় যাবেন সেটা ঠিক বলতে পারেন না। ইফতু আর কুসুমের নিজেদের জন্য তেমন একটা অর্থের প্রয়োজন নেই,তবে অভাবী কিছু ক্লাসমেট আর বন্ধুদের জন্য অনেক কিছু করতে ইচ্ছে করে জানালো দুজনেই।

– এইটুকু সখ পুরণের জন্য গুপ্তধন লাগে না। আর শোন, যদি কখনো একা কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, আমার ওপর আস্থা হারাস না, বলে নিচে নেমে গেলেন কুসুম আপু। পেছনে পেছনে ছোটমামী।

দুপুরে নানা ভাইকে দেখতে এলেন মৃণাল সেন। কিছু ফলমূল আর মিষ্টি নিয়ে এসেছেন। তিনি সেগুলো ইফতুর হাতে তুলে দিতে দিতে বললেন
– আমার কাগজটা নিয়ে এসো জলদি।
– গত রাতে এ বাসায় কি হয়েছে জানেন তো নিশ্চয়ই। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমার রুমটা। বইখাতা কাগজপত্র সব নিয়ে গেছে ডাকাতদল। জানি না বইখাতা দিয়ে ওরা কি করবে। আপনার কাগজটাও আর খুঁজে পাচ্ছি না। মৃনাল সেন সম্ভবত এ কথা শোনার জন্য তৈরি হয়েই ছিলেন। আর কোনো কথা বাড়ালেন না। দ্রুত প্ল্য­ান বদল করতে পারেন তিনি। নানার পাশে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলেন। খুব মমতা নিয়ে আস্তে আস্তে সব কাহিনী শুনলেন গত রাতের। অনেক আফসোস করলেন। তারপর বললেন
– চাচাজান, জানি এখন এ কথা বলার সময় নয়, তবুও এসে যখন পড়েছিই একটা কথা বলতে চাই।
– বলেন বলেন, কি বলবেন। বলছিলাম কি, আমি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একটা বড়সড় কৃষি লোন নিতে চাচ্ছি। সে জন্য কিছু জমি দরকার। বেশ খানিকটা। এই যেমন ধরেন পনেরো একরের মতো। এত বড় জমি নগদ টাকায় কেনা তো আমার সাধ্যের অতীত। তাই খুঁজছিলাম নতুন চর কিংবা অনাবাদি কোনো জমি। যদি অল্প দামে কেনা যায়।
– জি! আমাকে বলেছে আমার ছেলেরা। এমনিতেই আমাদের অনেক জমি পদ্মায় খেয়ে ফেলেছে। যেগুলো জেগে উঠেছে তাও অন্যের দখলে। অনেক কষ্টে মামলা লড়ে এই জমিটা আমি নিজের নামে করতে পেরেছি। এই চরটার জন্য তাই অনেক মায়া আমার।
– চাচাজান, এই জমির জন্য অনেকগুলো টাকা দেবো আপনাকে। বিশ লক্ষ টাকা। যার কিছু অংশ দিয়ে আপনি অন্য জমিগুলোকে দখলে আনার চেষ্টা করতে পারবেন। আর এমনিতেও বাড়ির যে অবস্থা হয়েছে, এই টাকা আপনার দরকার হবে।
– ঠিক আছে। ছেলেদের সাথে কথা বলে দেখি বলে উঠে দাঁড়ালেন নানা ভাই। চা খেয়ে যেতে বললেন মৃনাল সেনকে, কিন্তু তিনি আর বসলেন না।
মৃনাল সেন এখন চরটা নিজের করে নেবে প্রথমে। তারপর ঢাকঢোল পিটিয়ে লোহা কাটার মেশিন পত্র এনে সবার সামনে গুপ্তধন উদ্ধার করবে, সেই প্ল্য­ানে আছে, ভাবছে ইফতু।
রাতে বড় রুমটার মেঝেতে কাপড় বিছিয়ে সবাই একসাথে খেতে বসলো। আলু ভর্তা ডাল আর ডিম ভাজি। এক একটা ডিম তিন জনে ভাগ করে খেতে হবে। গতরাতে বাড়িতে ডাকাত না পড়লে নতুন মামীর আগমন উপলক্ষে হয়তো ভালো-মন্দ কিছু রান্না হতো আজ। নানা বাড়িতে আসা অবধি এরকম ভাবেই চলছে, ভাবছে এষা। মাছ গোশতের মুখ কদাচিৎ দেখতে পাওয়া যায়। এই নিয়ে কারোরই কোনো কমপ্লেন নেই। পেটে যাই-ই পড়–ক, মন ভরে থাকে অন্য কোনো উপাদেয় আনন্দে। আজ মনে আনন্দ কমে যাওয়ায় নিরানন্দ খাবারটা জিভে লাগছে খুব সাজিদ এষার।
– ভালোই তো দাম বলেছে, বললেন সেজো মামা। এমন আগাছা আর জঙ্গলে ভরপুর চরের জন্য এত টাকা কে দেবে? নানা ভাই চুপ করে আছেন। বাদামের দামটা একটু পড়ে গেছে। সেজো মামা একাই কথা বলছেন। এই মুহূর্তে আরো কিছু বাদাম রাখতে পারলে এভারেজ করা যেত। বেশি না, আপাতত লাখ দশেক হলেই চলবে আমার। এছাড়া ছোটকেও তো একটা কিছু করে খেতে হবে। বউ সংসার নিয়ে এই বয়সে আপনার উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকলেই বা চলবে কি করে? এবার ছোটমামাও আগ্রহভরে নানা ভাইয়ের দিকে তাকালেন।
– সন্তান তো কেবল তোমরা দুজন নও। আরো দুটো মেয়ে রয়েছে আমার। একটা ছেলে রয়েছে, একটা ইয়াতিম নাতনি রয়েছে। কেবল নিজেদের কথাই ভাবো কেন সব সময়? সেজো মামা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে ফেললেন। নানার কথায় খুশি হলেন কুসুমের মা। স্বামী মারা যাবার পর এ বাড়ি থেকে কিছুই পাননি তিনি।
– আমার একটা কথা আছে। খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে এসে বলল কুসুম।
– বড়দের মাঝে তোমার আবার কি কথা মা? কুসুমের মাকে থামিয়ে দিয়ে নানা ভাই বললেন-
না না ! ওকে বলতে দাও। এই পরিবারে বড়দেরকে আমার ছোট মনে হয় আর ছোটদের মনে হয় বড়। নানা ভাইয়ের এই কথায় সবাই খাওয়া বন্ধ করে কুসুমের দিকে তাকালো। ইফতুর বুক ঢিপঢিপ করছে। কি জানি কি কথা বলেন কুসুম আপু। এষা বারবার ইশারা দিচ্ছে কথাটা না বলার জন্য। তাহলে কি এষাও জানে কি বলবে কুসুম আপু?
– আমরা একটা স্বর্ণমুদ্রা খুঁজে পেয়েছি। পুরো ঘরে যেন বাজ পড়ল।
– স্বর্ণমুদ্রা! কই দেখি দেখি! মামারা খাওয়া রেখে দাঁড়িয়ে গেলেন।
– আচ্ছা, বসো তো দেখি। এত অস্থির হবার কী আছে? মেয়েটা কি বলতে চায় শুনি সবাই। সেজো মামীর ধমকে কাজ হল।
– মুদ্রার ওজন বেশি নয়। বড়জোর এক ভরি। বাজার মূল্য হয়তো হাজার পঞ্চাশেক টাকা।
– তাই বা কম কি? বললেন কুসুমের মা। কিন্তু কার না কার সোনা গয়না তুমি কুড়াতে গেলে কেন মা?
– আমি জানি এই প্রশ্ন উঠবেই। কারণ, দাদা ভাইয়াও অন্যের কিছু নিজের করেননি কখনো। আর আমিও ন্যায়-অন্যায় বোধ তার কাছেই শিখেছি।
– তবে? ছোট মামার প্রশ্ন।
– এটা একটা প্রাচীন মুদ্রা। এখন থেকে প্রায় চারশত বছর আগের, স¤্রাট আওরঙ্গজেবের আমলের। ছোট মামী এতক্ষণ মোবাইলের মধ্যে ডুবে ছিলেন। প্রাচীন মুদ্রার কথা শুনে কুসুমের পাশে এসে দাঁড়ালেন। এই মুদ্রার বাজার মূল্য ছাড়াও একটা ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে। আমি আন্তর্জাতিক নিলাম মার্কেটে মুদ্রাটির একটি ছবি পাঠিয়েছিলাম। এক লক্ষ ডলার পর্যন্ত দাম উঠেছে। অবশ্য মুদ্রাটি যদি সঠিক সময়ের হয় তবেই এই মূল্য পাওয়া যাবে।
– এক… লক্ষ… ডলার…!! মানে প্রায় ৮৫ লক্ষ টাকা! ছোটমামা কুসুমের দিকে অবিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে থাকলেন।
– দেখি, মুদ্রাটা নিয়ে এসো তো আমার কাছে। এতক্ষণ পর মুখ খুললেন নানাভাই। নেড়েচেড়ে দেখলেন তিনি প্রাচীন এই স্বর্ণমুদ্রাটি। ছোটোমামী মুদ্রার একটা ছবি তুলে আবার ডুব দিলেন মোবাইলের রাজ্যে। নানা ভাইয়ের হাত থেকে মুদ্রাটি নিয়ে কুসুমের হাতে ফেরত দিতে দিতে ফিসফিস করে ইফতু বলল, কি ব্যাপার আপু?
– ভরসা রাখো। এই বলে আপু আবার শুরু করলেন।
– কিন্তু কি করে এই মুদ্রা ক্রেতার হাতে পৌঁছাবে আর কী করেই বা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমাদের কাছে টাকা আসবে সেই সিস্টেমতো জানা নেই আমাদের।
– আমি জানি, বলে এগিয়ে এলেন ছোটমামী। চায়নাতে আমার বাবা একজন বড় বিল্ডার ছিলেন। অকশনে এসব পুরনো মুদ্রা কেনাবেচা তার পেশা। আমাকে ভারতবর্ষে আইমিন বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে এই উদ্দেশ্যেই। এই অঞ্চলের ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ। যদি কোনো প্রাচীন মুদ্রা কিংবা পুরাকীর্তির সন্ধান পেয়ে যাই। নয়তো এদেশে এসে আমার ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করার কথা নয় আর তোমাদের ছোট চাচার সাথে ঘর বাঁধারও কথা নয়। এই প্রথম ছোট মামী একটা দীর্ঘ লেকচার ঝাড়লেন। নানাভাই পর্যন্ত স্নেহমাখা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকলেন মামীর দিকে।
চায়নাতে যে অপশন মার্কেট রয়েছে সেখানে আমি কিছুক্ষণ আগে মুদ্রাটির একটি ছবি পাঠিয়েছি। এই এখন রিপ্ল­াই এলো। মুদ্রাটির মূল্য আসলে ১ লক্ষ ডলার নয়, ৩ লক্ষ ডলার। সবাই অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ছোট মামীর দিকে। বাংলাদেশি টাকায় প্রায় আড়াই কোটি টাকা। ছোটদের কথা ভুলে গেছে বড়রা। মুদ্রাটা মামীর হাতে দিয়ে খাবার ঘর থেকে বের হয়ে এলো সাজিদ কুসুম ইফতু আর এষা।
– এটা তুমি কি করলে কুসুম আপু? এষার কাঁদো কাঁদো কন্ঠ।
– ভালোই করেছি মনে হয়, কি বলো তুমি ইফতু?
– হ্যাঁ। কতগুলো অস্থির মানুষকে একটা সামান্য জিনিস দিয়ে ব্যস্ত রাখা গেল।
– খানিকটা স্বস্তিতেও, তাই নয় কি? বললেন কুসুম আপু ।
– তবে ছোট মামী সত্যিই জিনিয়াস, বলে যে যার ঘরে চলে গেল।

বারো

ছোটমামী রাজশাহী গেল ইফতুকে নিয়ে। ছোট মামাকে যেতে দেননি নানা ভাইয়া। কুসুমের পড়ার ব্রেক টাইমে সবাইকে নিয়ে মিটিংয়ে বসলেন তিনি। কুসুমকে বসিয়েছেন তার ডান পাশে।
– এটা আল্ল­াহ পাকেরই বিধান। তিনি জীবিতকে মৃত করেন আবার মৃতকে করেন জীবন দান। আজ যে পথের ফকির কাল সে বাদশাহ। আবার এর উল্টোটাও হয়ে যেতে পারে। পরশু রাতে এই বাড়ি ছিল ডাকাতদের আস্তানা। আমাদেরকে নিঃস্ব করে দিয়ে সব কিছু নিয়ে চলে গেছে ওরা। আর আজই আমরা বসেছি নতুন উৎস থেকে সম্ভাব্য কিছু অর্থের আগমন এবং তার ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করার জন্য।
আলোচনার বিষয়বস্তু শুনে সেজো মামার দন্ত বিকশিত হল, ছোটমামা গলায় খাঁকারি দিলেন আর কুসুমের আম্মু নড়েচড়ে বসলেন। কুসুমের দিকে তাকালেন নানা ভাইয়া।
– এইবার তুই কিছু বল।
– কি আর বলবো, বলে কুসুম সবার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলো। দাদা ভাইয়া আমাদের জন্য বট গাছের মত। এখনো ছায়া দিয়ে আগলে রেখেছেন সবাইকে। মেজো চাচ্চু ছাড়া আর কেউই তেমন কিছু করতে পারেনি এই সংসারে। বাবাও না। এখনো সবাই তাকিয়ে থাকে দাদা ভাইয়ার দিকে কিংবা অলৌকিক কোন পরিবর্তনের আশায়। অথচ আল্ল­াহ নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা নিজেকেই করতে বলেছেন। ছোট চাচী আর ইফতু যদি কাক্সিক্ষত কোনো রেজাল্ট নিয়ে আসতে পারে তো এর সুবিধা আমরা সবাই পাবো। তবে সেটা একটা নিয়মের মধ্য থেকে হলে ভালো হয়।
– সেটা কেমন? বড়দের চোখে বিস্ময়!
– ছোট চাচার কাজ হলো দাদার যত সম্পত্তি বেদখল রয়েছে তা দখলমুক্ত করার জন্য কোর্টে কোর্টে দৌড়ানো। একজন লিগাল অফিসারের বেতন তিনি পাবেন এই কাজের জন্য। সেজো মামাকে গোদাগাড়ী থেকে চলে আসতে হবে। এই বাড়ি এবং তার আশপাশে নানা ধরনের সংস্কার কাজ রয়েছে। সেজো মামা সে সব কাজের তদারকি করবেন। এর বিনিময়ে তার জন্য থাকবে ভালো সম্মানীর ব্যবস্থা।
– আমার মনে হয় কি, একটা আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে আমরা শুরু করতে পারি আগামীর পথচলা। সেটা হতে পারে একটা বিয়ে, নানা ভাই বললেন।
– বিয়ে! সবাই এ ওর দিকে তাকাচ্ছে। কার বিয়ে? একই প্রশ্ন সবার চোখে। নানা ভাইয়ের ঠোঁটে রহস্যময় হাসি। আজ তিনি কিছুটা বিচলিত, অস্থির। এই হাসছেন তো এই কাঁদছেন। দীর্ঘদিন কেবল নাই নাই এর ভেতর জীবন গেছে। টাকা নেই, পয়সা নেই, বাজার নেই, সদাই নেই। জমি দখলে নেই। ছেলে মেয়ে মানুষ হয়নি। আজ কেমন যেন ‘সব ছিল সব আছে’র এক অনুভূতিতে আপ্লুুত হয়ে আছেন তিনি। হঠাৎ কেঁদে ফেললেন নানা ভাইয়া।

– দোষটা আসলে আমার-ই, কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন তিনি। সারা জীবন আল্লাহর কাছে দোয়া করেছি ছেলেপেলে যেন সবসময় আমার সাথেই থাকে। তোরা তাই কেউ চাকরি বাকরি নিয়ে দূরে যেতে পারিসনি। সেজো আর ছোটমামা দু’পাশ থেকে নানা ভাইকে জড়িয়ে ধরলেন।
– তবে আল্ল­াহ আমাকে চারটে ছেলে-বউ দিয়েছেন। মাশাআল্ল­াহ! এ সব কিছুর জন্য তোদের মায়ের কিছু আমলও আছে। আল্ল­াহ তাকে বেহেশত নসিব করুন।

কুসুম সাজিদ আর এষা বের হয়ে এলো বড়দের আবেগঘন আসর থেকে। নবু মামা যাচ্ছেন জাল নিয়ে। বাড়ির পেছনের পুকুরে কিছু মাছ পাওয়া যেতে পারে। ওরাও পিছুপিছু গেল মামার।
– আচ্ছা মামা, ডাকাতির সময় তুমি কি কিছুই টের পাওনি না?
– না মামা। আমিতো ঘুমাই গোলাঘরের পাশে। ওরা এদিকে আসেইনি। সকালবেলা খালুজানের খবর নিতে গিয়ে দেখি তার হাত মুখ বাঁধা।
– ওরা কতজন এসেছিল বলে তোমার মনে হয়? সাজিদের জিজ্ঞাসা।
– দু’তিন জনের বেশি কি আর হবে?
– এত কম মানুষ এসে এত জিনিস কেমন করে নিয়ে গেল? তাও আবার এমন সব জিনিস যা সচরাচর অন্য চোর-ডাকাতরা নেয় না। বইখাতা, দলিলপত্র, ধানের বস্তা…।
– ধানের বস্তা! ধানের বস্তা নেবে কেন? নবু মামার অবাক দৃষ্টি । এবার দুই একটা পোনামাছ উঠেছে জালে।
– নানাভাইয়ের ছাদ ঘরের রুম থেকে ধানের বস্তা গুলো কই গেল?
– ও, সে কথা। সেগুলো তো আমি গোলা ঘরে নিয়া গুছাইয়া রাখছি। ছোট ভাইজান আসতেছে বউ নিয়া। তার জন্য একটা রুম খালি করতে বলল খালুজান। আমি কেবল ধানের বস্তাগুলো গোলা ঘরে নিয়া রাখছি অমনি খালুজান কইলেন এত ছোট রুমে দুইটা নাতি নিয়া বৌমা থাকতে পারবে না। এছাড়া ছোট বাচ্চাদের ছাদে ওঠাও নিরাপদ নয়। এরপর আর কিছু সরাই নাই আমি ওই রুম থেকে।
নবু মামার আর কোনো কথা কানে গেল না ওদের। তিনজনই এক ছুটে গিয়ে ঢুকলো গোলাঘরে। এই হেমন্তে যতটুকু ফসল এসেছে তাতে গোলাঘরের অর্ধেকটা ভরেছে। এখান থেকে প্রতি সপ্তাহে দু-একটা বস্তা বের করা হয় চাল করার জন্য। ওরা চিনতে পারল নানা ভাইয়ের দলিল রাখা রুমটাতে থাকা বস্তা চারটে। সোনালি ফসলের ভেতর লুকিয়ে রাখা আছে সোনার কয়েনগুলো। আনন্দে চিৎকার করার সুযোগ নেই। সেলিব্রেশন করারও সুযোগ নেই। কেবল কুসুম ওর সেজো চাচীর কাছ থেকে একটা তালা জোগাড় করে লক করে দিল গোলাঘর। চাচীকে বলল, এখন থেকে কেউ ধান বের করতে চাইলে এই আমার কাছ থেকে চাবি নিয়ে বের করতে হবে। মামী কুসুমকে বুকে টেনে আদর করলেন। কুসুমের সাম্প্রতিক অবদান একটা খাদের কিনারায় দাঁড়ানো পরিবারে নিরাপত্তার স্বপ্ন জাগিয়ে দিয়েছে।

ইফতুকে নিয়ে এইচএসবিসি ব্যাংকে ঢুকলেন ছোটমামী। অত্যন্ত অভ্যস্ত ভঙ্গিতে কথা বললেন ব্যবস্থাপকের সাথে। ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করেই তিনি নিলাম ডকুমেন্ট এবং ওল্ড গোল্ড কয়েন পাঠাবেন চায়নাতে। অনেকটা এলসির মতই। এক্সপোর্ট হবে গোল্ড কয়েন আর পেমেন্ট আসবে মুদ্রাটি যিনি আমদানি করেছেন তার কাছ থেকে। পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ হতে এক সপ্তাহেরও কম সময় লাগবে। এক্ষেত্রে সময়টা আরো কম লাগছে কারণ গোল্ড কয়েনটি আমদানি করছেন ছোট মামীর বাবা।
ব্যাংক থেকে বের হয়ে একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে ঢুকলেন মামী।
– বুঝলে ইফতু, আমার বাবা একজন অর্থলোভী মানুষ। তোমার ছোট মামাকে বিয়ে করার কারণে সব ধরনের সম্পর্ক ত্যাগ করেছেন তিনি আমার সাথে। অথচ এই একটি কয়েন আমাকে আবার বাবার সাথে যুক্ত করে দিল।
– সেটা কেমন করে মামী?
– কারণ এই কয়েন থেকে আমরা তিন লাখ ডলার পেলে বাবা সেটা রি-সেল করে আরো কমপক্ষে এক লাখ ডলার লাভ করতে পারবেন। বাবা বলেছেন এতদিনে তোমাকে ভারতবর্ষে পড়তে পাঠানোটা সার্থক হল। হঠাৎ করে বাবার আবেগও উথলে উঠেছে। নাতি দুটোকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে গেছেন।
– এ কয় বছর তোমাদের চলেছে কেমন করে? ছোট মামাতো কিছু করে খাওয়ানোর মতো মানুষ না। ভীষণ রকম আয়েসি আর বিলাসী।
– ওর মানসিকতাটা অনেক উঁচু। সে কারণেই ওকে ভালো লাগে খুব। আর শিক্ষিত মানুষ। কিছু একটা করে খাবার সময় চলে যায়নি এখনো সে বিশ্বাস আছে আমার।
নুডুলসের একটা ড্রাই প্রিপারেশন এলো। চপসওয়ে নাম এটার। ইফতু আগে খায়নি কখনো। খুবই উপাদেয় লাগল ওর কাছে। আমাদের কঠিন সময়গুলোতে মালয়েশিয়ায় থাকা আমার এক বোন খুব হেল্প করেছেন। অনেক ঋণী হয়ে গেছি তার কাছে আমি।
– সব ঋণ শোধ হয়ে যাবে মামী। কোনো চিন্তা করো না। আচ্ছা মামী, নিলামে এরকম আর কতবার তোলা যাবে একই ধরনের মুদ্রা?
– যত খুশি ততবার। কারণ অকশনের ভিন্ন ভিন্ন মার্কেট রয়েছে। তবে একই ধরনের মুদ্রা একাধিকবার তুললে পরের গুলোর দাম আস্তে আস্তে কমতে থাকে। ইফতু! কি ব্যাপার!! মিটমিট করে হাসছেন মামী। আরো আছে নাকি এরকম কিছু?
– থাকলে তো তুমি জানবেই, বলে মামীর হাত থেকে মোবাইলটা নিলো ইফতু। একটা কল করতে পারি?
– শিওর শিওর! বলে মামী উঠে দাঁড়ালেন, ওয়াশরুমে যাবেন বলে।
দিলরুবার মা ধরলেন ফোন।
– কেমন আছো বাবা? আমাদের কথা কি ভুলে গেলে? কতদিন আসো না বাসায়।
– আন্টি, আমিতো এখনো রাজশাহীতে।
– একবার এসো বাসায়। আমাদের জীবনে তো আর কোনো আলো নেই। কেবল অন্ধকার আর অন্ধকার। তোমার আংকেল কবে বের হবে সেই প্রতীক্ষা। তবে আপাতত মৃণাল সেনের উৎপাত থেকে বাঁচা গেছে। তোমাকে কোনো ডিস্টার্ব করছে না তো সে?
– না আন্টি। কোনো ডিস্টার্ব করছে না। আমাদের নিয়ে কোনো চিন্তা করবেন না । আগামী সপ্তাহেই আঙ্কেলকে বের করার চেষ্টা করব ইনশাআল্ল­াহ। আপনাদের একবার আসতেও হতে পারে। আমি জানাবো, বলে ফোন রেখে দিল ইফতু।

বাড়ি ফিরে দেখে চারদিকে একটা চাপা আলোচনা শুরু হয়েছে। কুসুম আপুর বিয়ের কথা চলছে। বৈঠকখানায় কুসুম আপুর নতুন বাবা বসে আছেন। তিনিই এনেছেন প্রস্তাবটা। বাবা হিসেবে তারও তো কিছু কর্তব্য আছে, বলছেন তিনি নানা ভাইয়ের সাথে। পাত্র তারই আপন ভাগ্নে। এখনো পড়াশোনা করে তবে খুবই ব্রাইট ফিউচার। তাছাড়া মেয়েটাও তো এতিম। আর কতকাল এর ওর বাসায় থাকবে, বলে যাচ্ছেন কুসুমের নতুন বাবা। নানাভাই ধৈর্যের সাথে শুনছেন সব কথা। কুসুমের মা নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার স্বামীর কথায় তাল মেলাচ্ছেন। এতদিন এসব কর্তব্যবোধ কোথায় ছিল? ভাবছে ইফতু। সোনার গন্ধ পেয়ে সবার দায়িত্ব বোধ জেগে উঠেছে।
কুসুম আপুর রুমে গেল ইফতু। ভাবছিল ওকে কাঁদতে দেখবে। কিসের কান্না? সাজিদ এষা আর আপু রীতিমত আনন্দের ভেলায় ভাসছে। চোখেমুখে উচ্ছ্বাস। সে আনন্দ খানিকবাদে স্পর্শ করল ইফতুকেও। তবে সেটা কুসুম আপুর বিয়ের প্রস্তাবের আনন্দ নয়, উদ্ধারকৃত কয়েনগুলো খুঁজে পাবার আনন্দে। ইশ! এই আনন্দ যদি ছোট মামীর মধ্যেও ছড়িয়ে দেয়া যেত! ভাবছে চারজনই।
চলবে…