গুপ্তধন (পর্ব-৯)

নাঈম আল ইসলাম মাহিন

0
80

(গত সংখ্যার পর)

নয়

কোচিংয়ে এসে একদম মন বসাতে পারছিলো না কুসুম। স্বর্ণমুদ্রাগুলো অরক্ষিত পড়ে আছে ওয়ার্ড্রবের ভেতরে। এষাকে বলে এসেছে কিন্তু সবাই তো ছোট ছোট। অনেকগুলো বিষয়ে আলোচনা করা দরকার। চারজন একসাথে বসার সুযোগই মিলছে না। কেমিস্ট্রি স্যার ইকুয়েশন বোঝাতে গিয়ে সোনার সংকেত বললেন। অঁ-অ্যাটোমিক নাম্বার ৭৯। অপ্রাসঙ্গিক একটা প্রশ্ন করে বসল কুসুম।
Ñ স্যার, একটা স্বর্ণমুদ্রার মূল্য কত?
অন্যরা হো হো করে হেসে উঠল। চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন স্যার।
Ñ একটা প্রাচীন স্বর্ণমুদ্রার দুই রকম মূল্য রয়েছে। প্রথমত তার ওজনের স্বর্ণের বাজারমূল্য। দ্বিতীয়ত তার ঐতিহাসিক মূল্য। সাধারণত কোনো জিনিসের ঐতিহাসিক মূল্য এর মূল মূল্য থেকে অনেক বেশি হয়। যেমন কিছুদিন পূর্বে আমেরিকায় মুদ্রাব্যবস্থা চালুর শুরুর দিকে, মানে ১৭৯৩ সালের দিকের একটা ১ পয়সা পাওয়া যায়। এর মূল্য ওঠে ৩ লাখ ডলার বা আড়াই কোটি টাকা । ৪ ডলারের একটা স্বর্ণমুদ্রার দাম ওঠে ৭ লাখ ডলার। ভাবতে পারো কত টাকা?
কুসুম সত্যিই আর কিছু ভাবতে পারছিলো না। কারণ গভীর রাতে ব্যাগ খুলে ও একটা মুদ্রা নেড়েচেড়ে দেখেছে । স¤্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে তৈরি। ১৬৭০ সালে। তার মানে স¤্রাট বাহাদুর শাহ জাফরও এই মুদ্রা তৈরি করেননি। এগুলো মুঘল রাজ পরিবারের গচ্ছিত সম্পদ।
কোচিং থেকে বের হয়ে এলো কুসুম। স¤্রাট আওরঙ্গজেবকে বাদশাহ আলমগীর নামেও অভিহিত করা হয় । মুঘল স¤্রাটদের মধ্যে সবচেয়ে বড় শাসক, ন্যায়পরায়ণ শাসক ছিলেন তিনি। তার শাসনামলে মুঘল স¤্রাজ্য ভারতবর্ষে সবচেয়ে বেশি বিস্তৃৃতি লাভ করেছিল, অথচ তিনি রাজ তহবিল থেকে কোনো ভাতা নিতেন না। নিজের হাতে কুরআন কপি করে বাজারে বিক্রি করে সামান্য উপার্জনে জীবন কাটাতেন।
ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে এসব জেনেছে গতকাল কুসুম ।
সাইকেল নিয়ে ধীরগতিতে চলছে ও। মার সাথে দেখা করতে আজ কেন যেন খুব ইচ্ছে করছে। হঠাৎ দেখল ইউসুফপুর চারঘাটের পাকা সড়ক ধরে দুরন্ত বেগে ছুটে আসছে এষা। পরনে জিন্স, মাথায় স্কার্ফ, পায়ে স্কেটিং সু। রাস্তার লোকজনকে মুগ্ধ হবারও সুযোগ দিচ্ছে না। কুসুমের কাছাকাছি এসে শাঁ করে সাইকেলের চারদিকে একটা চক্কর দিয়ে থেমে গেল।
Ñ বাব্বাহ! এই না হলে আমার বোন! কুসুম আপুর মুগ্ধ দৃষ্টির সামনে লজ্জায় ¤্রয়িমাণ হলো এষা ।
একটা অনির্ধারিত মিটিংয়ের সুযোগ পাওয়া গেল সামান্য এগোতেই। বড়সর একটা দীঘি আছে এই এলাকায়। বাঁধানো ঘাট, বসার জায়গা। দীঘির চারদিকে সারি সারি নারকেল আর খেজুরগাছ। এককালে কোনো এক জমিদারের বাড়ি ছিলো এটা। দীঘির পানি টলটলে। প্রতিদিন প্রচুর লোক গোসল করে এখানে এসে।
Ñ কী ব্যাপার! রাজ্য অরক্ষিত রেখে সেনাপতিরা নৌবিহারে কেন? বলল কুসুম।
Ñ রাজ্যের স্থিতি আর বিস্তৃতি নিয়ে রানী মায়ের সাথে জরুরি পরামর্শ আছে যে, ইফতু দাঁড়িয়ে কুর্নিশের ভঙ্গি করলে হেসে ফেললো সবাই ।
Ñ উহ! কত কথা যে জমা হয়ে আছে। সাজিদ শুরু করলো। রাতে আমরা গুনেছি। প্রতিটি ব্যাগে ১০০০ করে মুদ্রা আছে।
Ñ মুদ্রা না বলে কয়েন বললেই তো হয়। শুধরে দিলো এষা। মোবাইল গেইমে কয়েন শব্দটার বেশ ব্যবহার আছে। কেউ শুনে ফেললে ভাববে আমরা গেইম নিয়ে কথা বলছি।
Ñ রাইট! বলল ইফতু। যতটুকু ধারণা করি, কালো বক্সটায় ৫০ টা রুপার রেকাবি আছে। মানে ৫০ হাজার স্বর্ণমুদ্রা আছে সেখানে। আমরা আনতে পেরেছি মাত্র চার হাজার। বলল কুসুম। এখন আমাদের পলিসি কী হওয়া উচিত?
Ñ যা এনেছি তাই তো ব্যয় করে শেষ করতে পারবো না। নতুন করে আরো মুদ্রা এনে ঝুঁঁকি বাড়িয়ে লাভ কী?
Ñ প্রশ্নই আসে না, বলল ইফতু। অলরেডি জায়গাটা মৃণাল বাহিনীর নজরে পড়ে গেছে। যা করার দ্রæত করতে হবে ।
Ñ আচ্ছা আপু, যা এনেছি তার আনুমানিক মূল্য কত হবে? জানতে চাইলো সাজিদ।
ব্যাগ থেকে ক্যালকুলেটর বের করতে করতে কুসুম বলল, আজকের বাজারদর অনুযায়ী ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের মূল্য ৫৫ হাজার ৬৯৬ টাকা। আমরা বিক্রি করতে গেলে হয়ত ৫০ হাজারের বেশি পাবো না। সেক্ষেত্রে চার হাজার কয়েনের দাম হবে ২০ কোটি টাকা। অবশ্য ঐতিহাসিক মূল্য হিসাব করতে গেলে এই ক্যালকুলেটরে জায়গা হবে না।
Ñ আর ৫০ হাজারের দাম?
Ñ দুইশত পঞ্চাশ কোটি টাকা! নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল ইফতু।
Ñ দুইশত পঞ্চাশ কোটি! বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেল সাজিদের মুখ। এখান থেকে ২৫০০ টাকাও যদি খরচ করে কিছু কিনি, বড়রা বলবে টাকা কে দিয়েছে? কোথায় পেলে এত টাকা? তাহলে এই অর্থের কী মূল্য আছে আমাদের কাছে?
Ñ তার মানে বড় কাউকে জানাতে হবে। বড় কারো হেল্প ছাড়া এই কয়েন বিক্রয় করতে পারব না আমরা। কুসুম আপুর কথা শেষ হলে নড়েচড়ে বসল ইফতু।
Ñ আমার মনে হয় আজকের বোর্ড মিটিংয়ে সব কথা আলোচনা করে শেষ করতে পারবো না। তবে যে বিষয়গুলো সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে তা হলোÑ
এক. কয়েনগুলো দ্রæত ওই গুহা থেকে বের করে আনতে হবে।
দুই. কয়েনগুলো কোথায় রাখবো, সেরকম একটা নিরাপদ গোপন জায়গা রেডি করতে হবে ।
তিন. দিলরুবাদের ফোন করে বলে দিতে হবে যেন কোনোভাবেই মৃণাল সেনকে কো-অপারেট না করে। বললেন কুসুম আপু।
Ñ অলরেডি বলে দিয়েছি, কিন্তু মৃণাল সেন নাকি প্রতিদিনই ফোন করে বাসার ঠিকানা চাচ্ছে । আব্বুকেও ডিস্টার্ব করে কি না ফোন করে জানতে হবে আজ ।
চার. পরীক্ষামূলকভাবে দু’চারটা কয়েন বিক্রি করে দেখতে হবে উপযুক্ত মূল্য পাওয়া যায় কি না।
Ñ তবে তার আগে জানতে হবে এই ধরনের খুঁজে পাওয়া সম্পদে আমাদের কোনো অধিকার আছে কি না। মানে আমাদের জন্য এটা হালাল কি না। বলল সাজিদ।
Ñ বাহ! বেশ মাথা খুলেছে তো সাজিদ তোমার। খুব ভালো লাগলো এই পয়েন্টটা। যাও তোমাকে গোল্ডেন এ প্ল­াস দিয়ে দিলাম। হেসে ফেললো সবাই
Ñ একদম ঠিক কথা বলেছো, কুসুম আপু বলল। যাই করি তাই করি হারাম কোনো কিছুতে ঢোকা যাবে না ।
Ñ দেশের আইনে কী বলা আছে তাও জানতে হবে। বলল ইফতু।
Ñ তাহলেই হয়েছে। এই সম্পদের খোঁজ পেলে সরকার কাউকে এক পয়সাও দেবে না, বলল এষা। বড়দের মধ্যে কাকে জানালে ভালো হয় সেটা ঠিক করতে হবে।
Ñ বাবাকে আবার বলো না, বলল সাজিদ। সব টাকা দিয়ে হয় বাদাম না হয় শুকনা মরিচ কিনবে।
আবার হাসলো সবাই। পকেট থেকে কিটক্যাট বের করে দিলো ইফতু সবাইকে।
Ñ আমার বড়লোক ভাইয়া! বললেন কুসুম আপু।
Ñ কে নয় বড়লোক? সাজিদের হাইট মাপতে মাপতে বলল ইফতু।

শপিংমলে ঢুকে একগাদা কেনাকাটা করল মৃণাল সেন।
Ñ ওস্তাদ, অনেক টাকা নেমে গেল না?
Ñ আরেহ, এটাতো ইনভেস্টমেন্ট। বিনিয়োগ। সময় হলে কোটি গুণ আদায় করে নেয়া যাবে।
টেলিফোনে একবারই কথা হয়েছে মিসেস বাহাদুরের সাথে। বাসার ঠিকানা কোনোভাবেই দিতে রাজি হননি। পরে আর ফোন ধরেননি। বিভিন্ন নাম্বার থেকে বেশ কয়েকবার ট্রাই করা হয়েছে। শেষমেশ জিপিআরএস ব্যবহার করে বাসায় চলে এসেছে মৃণাল সেন আর তার এক চ্যালা ।

নিদারুণ অর্থকষ্ট আর অনিশ্চয়তার মধ্যে আগামী দিনগুলো কিভাবে পার হবে এই নিয়ে কথা বলতে বলতে মা মেয়ে রাতের খাবারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলো, অকস্মাৎ দরজায় নক। পিপহোল না থাকায়, না খুলে বোঝার উপায় নেই কে এসেছে। দরজা খুলেই চমকে গেল দিলরুবা। মুখের ওপর দরজা লাগিয়ে দেয়া যায় কিন্তু তাতে লাভ কী? লোকটা বড় ভয়ঙ্কর। ঠিকানা না জেনেও যে বাসায় চলে আসতে পারে, তার পক্ষে দরজার বাইরে দাঁড়িয়েও যেকোনো কিছু করা সম্ভব।
Ñ আমাকে ভেতরে ঢুকতে বলবে না মা?
দিলরুবার জবাবের জন্য অপেক্ষা করলো না লোকটা। অনেকটা ঠেলেঠুলে ঢুকে পড়লো ঘরে।
Ñ আমার আরো আগেই আসা উচিত ছিল ভাবী, বলতে বলতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য, খাবার-দাবার আর পোশাক-আশাকের অনেকগুলো পলিব্যাগ টেবিলের ওপর রাখলো মৃণাল সেন।
Ñ আহারে! কি ভালো মানুষ!
Ñ ভালো মানুষটারে তাহলে জেলে ভরলেন কেন? চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করল দিলরুবা।
Ñ এসব কী বলছ মা! আমি কেন তাকে ধরিয়ে দেবো। আমার কী লাভ? বরং সে আর আমি দু’জন একসাথে কাজ করতে পারলে বিশাল কিছু অর্জন করা সম্ভব হতো। তা তোমার বাবার মানিব্যাগটা তো তোমার হাতে এসে পৌঁছেছে। তাই না?
দিলরুবার মায়ের এইসব গুপ্তধন ফুপ্তধন নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই বরং স্বামী ভেতরে থাকার পরও তাদের এই দুর্দিনে যে কেউ একজন তাদের সাথে দেখা করতে এসেছে সেটাই অনেক বড় কিছু মনে হচ্ছে।
Ñ দেখা মা, মানিব্যাগটা বের করে দেখা।
অনিচ্ছাসত্তে¡ও মানিব্যাগটা নিয়ে আসলো দিলরুবা। বাঘের মতন থাবা দিয়ে মানিব্যাগটা হাতে নিল মৃণাল সেন। তন্নতন্ন করে খুঁজলো পুরোটা ব্যাগ। সব আছে, কেবল সিলমোহরের ফরমানটা নেই।
Ñ আরো তো একটা কাগজ ছিল, বলল মৃণাল সেন।
Ñ কী কাগজ ?
Ñ তুমি জানো না বুঝি? গুপ্তধনের আনলক ডকুমেন্ট। যেটা পাওয়ার জন্য গত এক বছর ধরে তোমার বাবার পেছনে লেগে আছি আমি। তোমার কাছে নেই আর অন্য কোনো কাগজ? বুঝেশুনে বলছো তো?
Ñ জি আঙ্কেল। অত্যন্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল দিলরুবা। ওদের সামনেই ইফতুর বাবাকে ফোন দিলো মৃণাল সেন।
Ñ হ্যালো ভাইজান, কেমন আছেন? আপনার ছেলে তো একটা সোনার ছেলে। কী নাম যেন ওর? জি জি, ইফতেখার আহমেদ। লক্ষ-কোটিতেও মেলে না এমন সন্তান। কতগুলো টাকা আর কী দরকারি কাগজপত্র! কেমন আমানতদারির সাথে ছেলেটা পই পই করে সব বুঝিয়ে দিয়ে গেল বাসায়। আমি ওর সাথে একটু দেখা করতে চাই। ছোট্ট একটা উপহার দিতে চাই। প্লি­জ, না করবেন না ভাইজান। আপনার বাসার অ্যাড্রেসটা কী যেন? কী? ঢাকায় নেই? নানাবাড়ি? চারঘাট? আচ্ছা আচ্ছা আমি লিখে নিচ্ছি।
চৌধুরীবাড়ি
ইউসুফপুর
চারঘাট, রাজশাহী।
থ্যাংক ইউ ভাইজান। ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিত হয়ে গেল দিলরুবা। ওর মাও বুঝলো কতটা ভয়ঙ্কর এই লোক। যাওয়ার সময় অত্যন্ত মোলায়েম স্বরে হুমকি দিয়ে গেল লোকটা। তোমার কথা যদি ঠিক না থাকে মামণি, সবাইকে কিন্তু তার জন্য অনেক মূল্য দিতে হবে।
চলবে…