কাব্য কথায় ছুুটি

হেলাল মহিউদ্দিন

0
46

কোনো গরুগম্ভীর স্যারের ক্লাস চলছে। হঠাৎ দপ্তরি হাতে কিছু কাগজপত্র নিয়ে ক্লাসে হাজির। দপ্তরি স্যারকে চুপিচুপি কী যেন বলছে। এবার স্যার গলাখাঁকরি দিয়ে বললেন- সবাই মনোযোগ দিয়ে শোনো। আগামী এত তারিখ থেকে এত তারিখ পর্যন্ত তোমাদের ছুটি…।
এই নোটিশ শোনার পর তোমাদের কেমন লাগবে? তখন কি আর গরুগম্ভীর স্যার যে ক্লাসে দাঁড়িয়ে সে কথা মনে থাকবে? তখন তোমাদের কি গুনগুনিয়ে গাইতে ইচ্ছে করবে না-।
আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে
শাখে শাখে পাখি ডাকে
কত শোভা চারিপাশে,
আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে।

সত্যজিৎ রায়ের লেখা এই গানটি ছুটিতে/ মুক্তিতে/ অবসর পেলে অজান্তেই আমরা গেয়ে উঠি, তাই না? তোমাদের আকাক্সিক্ষত এই ছুটি নিয়ে কবি- সাহিত্যিকগণ কিন্তু অনেক ছড়া-কবিতা, গান, গল্প লিখেছেন। ছুটি নিয়ে তৈরি হয়েছে একাধিক শিশুতোষ চলচ্চিত্রও। যা হোক আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার ছায়ানট কব্যগ্রন্থে’’ “মুক্তিবার” নামক কবিতা লিখেন।
আর ছুটির কথায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন-

মেঘের কোলে রোদ হেসেছে
বাদল গেছে টুটি
আজ আমাদের ছুটি ও ভাই
আজ আমাদের ছুটি।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ আর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তোমাদের মতো করেই ছুটির অবসর অনুভব করতেন। অবসরে তাঁর কবিতার চয়নগুলো যেন নতুন প্রাণ পেত।
শুধু কি কবি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল? কবি সুকুমার রায় লিখেছেন ছুটি নিয়ে অনেক মজার ছড়া। যেমন-।

ছুটি! ছুটি! ছুটি!
মনের খুশি রয় না মনে হেসেই লুটোপুটি।
ঘুচল এবার পড়ার তাড়া অঙ্ক কাটাকুটি
দেখব না আর পÐিতের ঐ রক্ত আঁখি দুটি।

কী চমৎকার ছড়া, তাই না বন্ধুরা। রাগী পÐিত মশাই বা মেজাজি টিচারকে তোমরা ভয় পাও তো? তারা কেন যে এত রাশভারী তা বুঝা বড় দায়।
তবে ছুটি নিয়ে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকুমার রায় ছড়াও লিখেছেন তোমাদের প্রিয় কবি ফররুখ আহমদ। ফররুখ আহমদ তোমাদের মতো কচিকাঁচাদের এত ভালোমতো বুঝতে যে তার ছড়া-কবিতায় সকল শিশুদের খুবই প্রিয়। সুনিপুণ কৌশলে তিনি শিশুমনে সুন্দর ভাব সৃষ্টি, অজানাকে জানার এবং সুন্দর পৃথিবী গড়ার কথা বলেছেন সহজ-সরল ভাষায়। ছুটি নিয়ে অনায়াস ভঙ্গিতে লিখেছেন-।

পাঠশালাতে ছুটি
হেসেই কুটি কুটি,
খুঁজতে গিয়ে রুটি
পেলাম মটর শুটি,
রুই কাতলা পুঁটি
চিংড়ি মাছের ঝুঁটি
তাই তো হুটোপুটি,
তাই তো লুটোপুটি,
পাঠশালাতে ছুটি,
ও ভাই পাঠশালাতে ছুটি।
কত সহজ এবং সাবলীলভাবে কবি আমাদের মনের কথাগুলো বলেছেন, তাই না?
ছুটি নিয়ে লেখা হয়েছে অনেক অনেক ছোটগল্প, উপন্যাস, নভেলা, নাটক ইত্যাদি। আজকে আমরা এত বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ পাবো না। তবে বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর “ছুটি” গল্পটি মাধ্যমিকের পাঠ্যসূচিতে ছিল। আমি যখন পড়েছিলাম তখন গল্পের প্রধান চরিত্র পথিকের জন্য মনের অজান্তেই হু হু করে কান্না চলে এসেছিল।
সাহিত্য ভুবনের এই রহস্য বেশ জটিল। গল্পের চরিত্রগুলোর আনন্দে আমরা হাসি, তাদের দুখে কাঁদি! এমন চমৎকার নৈসর্গিক বিষয় আর কী হতে পারে? তাই তোমাদের প্রতি আমার অনুরোধ তোমরা সব সময় সাহিত্য পাঠে দিনের একটা নির্দিষ্ট সময় রেখো, কেমন?
আমাদের তরুণ কবি-সাহিত্যিকরাও কিন্তু ছুটি নিয়ে চমৎকার সব ছড়া লিখেছেন। যেমন : জনপ্রিয় ছড়াকার আমীরুল ইসলাম লিখেছেন “ছুটির ছড়া, ছড়ার ছুটি নামক” একটি ছড়াগ্রন্থ’। আমীরুল ইসলাম লিখেছেন-।
ওঠো ওঠো ওঠো
সূয্যি যেমন ওঠে
ছোটো ছোটো ছোটো
পাখি যেমন ছোটে।
ওঠাওঠি, ছুটাছুটি,
ফুলকুঁড়ি ফুটি ফুটি।
ছুটি অন্তঃপ্রাণ তোমাদের মতো শিশুকিশোরদের জন্য ছড়াকার কামরুজ্জামান গোপন লিখেছেন-।
আমরা দুটি ভাই
ইশকুলেতে যাই
পড়লো ছুটির ঘন্টা
ছুটল বনে হন হনিয়ে
দুই ভায়েরই মনটা।
ছুটি নিয়ে লিখেছেন ছড়াকার আলী ইমাম, আনজীর লিটন, দিলারা মেসবাহ, জাকির আবু জাফর, জগলুল হায়দার, নাঈম আল ইসলাম মাহিন, লুৎফর রহমান রিটন, আফসার নিজামসহ প্রায় সকল শিশুসাহিত্যিক। শিশুসাহিত্যের বেশ জনপ্রিয় বিষয় “ছুটি” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে আজকের তরুণ এবং কিশোর ছড়াকারগণ ছুটি নিয়ে এখনো লিখে চলেছেন অবিরত।
তবে ছুটির সময় একদিন শেষ হয়ে আসে। তখন আবার ব্যাগ, ওয়াটার বোটল হাতে আমাদের ফিরে যেতে হবে স্কুলে। স্কুলে ফিরে যেতে হবে নিজকে আলোকিত মানুষ গড়ার জন্য। তাই তোমাদের ছুটির দিনগুলো আনন্দে লুটোপুটির পর পাঠে মন দেবে এই প্রত্যাশায় শেষ করছি। তোমরা সবাই ভালো থাকো। খোদা হাফেজ।