ঐতিহাসিক ঘটনাবহুল ’৭১ এর মার্চ

নূরুল আমিন চৌধুুরী

0
36

প্রাক কথন
কিশোরকালে সবার মন থাকে সাদা কাগজের মতো দাগহীন, স্বচ্ছ ও পবিত্র। তাই এ সময়ে অর্জিত অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও দৃশ্যাদি মন ও মননে এমনই রেখাপাত করে, যা পরবর্তী জীবনকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। এরূপ অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও দৃশ্যাবলি ভালো ও মন্দ উভয় প্রকার হতে পারে। আবার কিছু কিছু ভুল তত্ত্ব ও তথ্য বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। তাই কিশোরদের অবগতির জন্য যাবতীয় লেখাজোখা বস্তুনিষ্ঠ, সত্যনিষ্ঠ ও অনুপ্রেরণাদায়ক হওয়া উচিত। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রেক্ষাপটে বহুমুখী তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঐতিহাসিক ও স্মরণীয় মাস। তাই এ মাসের সংখ্যায় ফুলকুঁড়িদের জন্য অফুরন্ত ভালোবাসা নিয়ে নির্ভেজাল সত্যনিষ্ঠ লেখাটা রচিত হলো।
ভিন্ন জাতি বা রাষ্ট্রের আধিপত্য বা নাগপাশ থেকে অধীনস্থ একটা দেশ বা জাতি মুক্ত বা স্বাধীন হতে হলে দীর্ঘ সময় ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অগ্রসর হতে হয়। একেক দেশ ও একেক জাতির মুক্তিলাভ ও স্বাধীনতা লাভের ইতিহাস একেক রকমের। তবে এর জন্য অপরিহার্য বিষয়গুলো হলো :
১) সাধারণ জনগণকে সচেতন করে তোলা।
২) সংগ্রামী গণজোয়ার সৃষ্টি করা।
৩) বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনৈতিক দল গঠন করা।
৪) দেশব্যাপী মিছিল-মিটিং, বক্তব্য-বিবৃত্তি ও প্রচারকার্য জোরদার করা।
৫) ক্ষমতাসীনদের দ্বারা জেল-জুলুম-নির্যাতন সহ্য করার মতো জনবল ও যোগ্য নেতা-কর্মী তৈরি করা।
৬) একটি সর্বজনীন ইশতেহার তৈরি, ঘোষণা ও প্রচার করা।
৭) সার্বিক প্রস্তুতি ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।
আর এসব করার জন্য জাতির মধ্য থেকে সার্বিক নেতৃত্ব প্রদানক্ষম ক্ষণজন্মা একজন লৌহমানবের আবির্ভাব অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। যেমন : আমেরিকার জর্জ ওয়াশিংটন, চীনের মাও সেতুং, তুরস্কের কামাল পাশা, সৌদির আল সৌদ, আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা, ফিলিস্তিনের ইয়াসির আরাফাত, ভারতের মহাত্মা গান্ধী, নেতাজি সুভাষ বোস, পাকিস্তানের মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ, বাংলাদেশের শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
১৯৪৭ সালে ভারত উপমহাদেশে ২০০ বছরের ইংরেজ শাসনের অবসান হয়েছিলো। গান্ধী-জিন্নাহ-নেহরু-শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী প্রমুখ বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন নেতৃবৃন্দের অক্লান্ত তৎপরতা, দেশপ্রেমী প্রচেষ্টা ও অগণিত জনগণের জীবন বলিদানের মধ্য দিয়ে। আবার পাকিস্তানের অধিভুক্ত একটি প্রদেশ পূর্ব পাকিস্তান, অর্থাৎ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ ২৩ বছর যাবৎ পাকিস্তানি শাসকদের বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বিমাতাসুলভ আচরণের শিকার হতে হতে এক পর্যায়ে পাকিস্তানিদের শাসন-শোষণের নিগড় থেকে মুক্ত হতে মরিয়া হয়ে ওঠে। অন্যদিকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীও বাঙালিদের দমনপীড়নে বদ্ধপরিকর হয়ে ওঠে। এরই প্রেক্ষাপটে ’৭১-এর মার্চ মাসটি যেসব ঘটনাবহুল অবিস্মরণীয় কারণে বাংলাদেশের স¦াধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সে সম্পর্কে এবার আলোকপাত করছি।

পতাকা প্রসঙ্গ
পৃথিবীর সকল স্বাধীন দেশের নিজস্ব একটা জাতীয় পতাকা থাকে। তাই দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই এদেশের কতিপয় স্বাধীনতাকামী ও দেশপ্রেমী সূর্যসন্তান স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য সুন্দর একটা পতাকার আকার-আকৃতি প্রণয়নে উদ্যোগ গ্রহণ করে। অনেক গবেষণা, অনেক যুক্তি-তর্ক ও অনেক নমুনা যাচাই-বাছাইয়ের পর সবুজ জমিনের মধ্যখানে বাংলাদেশের মানচিত্রের আকৃতিসম্পন্ন পতাকাটাই মার্চ মাসের ১ তারিখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঢাকাস্থ ধানমন্ডির বাসভবনে স্বয়ং বঙ্গবন্ধুর হাতে অর্পণ করেন তৎকালীন ডাকসু ভিপি অসম সাহসী, প্রখ্যাত ছাত্রনেতা আ স ম আবদুর রব। অতঃপর এই আ স ম আবদুর রবই টান টান উত্তেজনার মধ্যে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের কলা ভবন প্রাঙ্গণে বিশাল ছাত্র-জনতার উপস্থিতিতে সর্বপ্রথম পতাকাটি উত্তোলনপূর্বক স্বাধীনতা আন্দোলনপ্রক্রিয়ায় একটি স্মরণীয় মাইলফলক স্থাপন করেন। যদিও পরবর্তীকালে পতাকার মাঝখানে দেশের মানচিত্রের পরিবর্তে লাখো শহীদের লাল তাজা খুনের প্রতীক হিসেবে লাল গোল সূর্যাকৃতিটি ব্যবহৃত হতে থাকে।

স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ
৩ মার্চের বিকেল বেলা তৎকালীন ঢাকার বিশাল পল্টন ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ জাতীয় নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে লাখো ছাত্র-জনতার সমাবেশে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইশতেহারটি পাঠ করেন বিশিষ্ট ছাত্রনেতা শাজাহান সিরাজ।

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ প্রসঙ্গ
স্বাধীনতা আন্দোলনকালীন উত্তাল মার্চ মাসের ৭ তারিখে ঢাকার তৎকালীন ঘোড়দৌড় ময়দানে (যেটা বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)। প্রায় দশ লাখ স্বাধীনতাকামী সংগ্রামী ছাত্র-জনতার বিশাল সমাবেশে একমাত্র বক্তা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার বলিষ্ঠ বজ্রকণ্ঠে প্রদত্ত সংক্ষিপ্ত অথচ জ্বালাময়ী বক্তব্যের শেষে বলেছিলেনÑ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’। অসম্ভব ক্ষমতাশালী একটা সামরিক সরকারের দম্ভকে উপেক্ষা করে বিশাল জনসমাবেশে এমন নির্ভীক ঘোষণাসংবলিত ঐ ভাষণটি বিশে^র বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে বিশেষ স্থান লাভ করেছে, যেটা জাতিসংঘ কর্তৃক
স্বীকৃত।

২৫ মার্চের কালরাত
’৭১-এর ২৫ মার্চের গভীর রাত। এক দিকে স্বাধীনতাকামী সংগ্রামীদের নিদ্রাহীন উৎকণ্ঠা। অপর দিকে একগুঁয়ে জেদি মনোভাবসম্পন্ন সামরিক শাসকদের চরম দমনপীড়ন ও জিঘাংসা চরিতার্থ করতে সংগ্রামী বাঙালিদের ওপর ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামক হত্যাযজ্ঞ পরিচালনার প্রস্তুতি। ঠিক রাত দুপুরে বর্বর সামরিক বাহিনী নিস্তব্ধ ঢাকা শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের ওপর অতর্কিতে সশস্ত্র সামরিক অভিযান পরিচালনা করে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে মূলত নিজেদের পায়ে নিজেরাই কুঠারাঘাত করেছিল। বাঙালিদের ওপর এই অসহিষ্ণু সামরিক হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞই এক দিকে বিশ^বাসীকে হতবাক করে এবং তাদের প্রতি বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি করে। অপর দিকে বাঙালিদের স¦াধীনতা যুদ্ধকে অনিবার্য করে তোলে। যার পরিণামে ঐ রাত থেকে পরবর্তী নয়টি মাস সর্বাত্মক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ‘৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর তারিখে বাংলাদেশ গৌরবজনক স্বাধীনতা লাভ করতে সক্ষম হয়।
প্রিয় কিশোর বন্ধুরা, আশা করি লেখাটা পড়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ জীবনকে অতি কষ্টে অর্জিত স্বাধীন দেশের যোগ্য নেতা ও সৎ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত হবে।