এই ঈদে বাবার জন্য

কবির কাঞ্চন

0
31

ঈদের সব কেনাকাটা শেষ করে বাবা-মা’র সাথে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেয় মোবারক।
আর মাত্র তিনদিন পর ঈদ। এ বছর একেবারে শেষের দিকে এসে ঈদের বাজার করতে হয়েছে ওদের।
মোবারকের বাবা একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করেন। মাস শেষে যা পান তা দিয়ে কোনোমতে তাদের পুরো মাস কেটে যায়।
এ বছর চলতি মাসের মাঝামাঝি ঈদ হওয়ায় বেতন বোনাস পেতে একটু দেরি হয়েছে।
মোবারকের বাবা আসগর মিয়া সবার পছন্দমতো কেনাকাটা করেন। কেনাকাটা শেষে বাসায় ফিরতে গেলে মোবারকের মা, হোসনে আরা বললেন,
– এই, তোমার জন্য কিছু নিচ্ছো না যে?
– আমার তো পায়জামা-পাঞ্জাবি, জামা-প্যান্ট সব আছে। আর কিছু লাগবে না।
– অন্তত একটা পাঞ্জাবি হলেও নাও।
– না থাক। শুধু শুধু অপচয় করার মানে হয় না। তাছাড়া সামনে অনেক খরচ পড়ে আছে।
– আমাদের সবার জন্য সব কিনে দিলে, তাতে কোনো অপচয় হলো না। আর তোমার জন্য ঈদের নতুন পোশাক নিলে অপচয় হবে। এ কেমন কথা! তার মানে আমাদের জন্য যা যা কিনেছো তাও নিশ্চয়ই অপচয় ভাবছো।
– এ তুমি কি কথা বলছো! নিজের বৌ-বাচ্চার জন্য ঈদের কেনাকাটা করেছি। অপচয় ভাববো কেন? আমার তো সব আছে। ওসব বাদ দাও। তোমাদের আর কিছু লাগলে নিয়ে নাও।
মোবারক বাবার হাত ধরে পাশের একটি দোকানে নিয়ে এসে বলল,
– বাবা, এই পাঞ্জাবিটা তোমার জন্য নাও। খুব সুন্দর। পাঞ্জাবিটা তোমাকে খুব ভালো মানাবে।
মোবারকের এমন আচরণে বাবা অবাক হয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
মোবারক আবার হাত টানতে টানতে বলল,
– বাবা, পাঞ্জাবিটা নাও না। তোমাকে বেশ মানাবে।
আসগর মিয়া মৃদু হেসে হ্যাঙ্গারে ঝুলানো পাঞ্জাবিটা নিজের হাতে নিয়ে ভালো করে দেখছেন। এরপর পাঞ্জাবির গলায় ঝুলানো দামের দিকে গভীর আগ্রহ ভরা চোখে তাকালেন। বিয়াল্লিশ’শ পঞ্চাশ টাকা।
পাঞ্জাবির গায়ের মূল্য দেখে আসগর মিয়ার মুখটা কালো হয়ে যায়। মোবারক বাবাকে হঠাৎ মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল, বাবা তোমার আবার কী হয়েছে? এভাবে মন খারাপ করে আছো কেন?
আসগর মিয়া আস্তে করে মোবারককে বললেন,
– না বাবা, আমার পাঞ্জাবিটা আজকে নেয়া সম্ভব হবে না।
– কেন?
– পাঞ্জাবিটার যে দাম তা এ মুহূর্তে আমার কাছে নেই। তাছাড়া তোমাদের জন্য আরও টুকিটাকি কিনতে হবে।
মোবারক মন খারাপ করে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।
এদিকে মোবারকের মা সামনে এসে বললেন,
– কি হলো! পাঞ্জাবিটা কি নেয়া হয়েছে?
মোবারক বলল, না মা, পাঞ্জাবিটার দাম নাকি অনেক বেশি। বাবার কাছে এত টাকা নেই। তাই নিতে পারছেন না। মা, বাবাকে পাঞ্জাবিটা নিতে বলো না।
হোসনে আরা স্বামীর চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করলেন,
– আর কতো টাকা লাগবে?
আসগর মিয়া গম্ভীর হয়ে বললেন,
– হাজার খানেক টাকা কম আছে।
মোবারক মাকে ফিসফিস করে বলল,
– তোমরা একটু দাঁড়াও। আমি আসছি।
হোসনে আরা স্বামীর সামনে এসে পাঞ্জাবিটা নাড়তে নাড়তে বললেন, বলি, তোমার ছেলের পছন্দ আছে। পাঞ্জাবিটা আমার কাছেও ভালো লেগেছে। তোমাকে মানাবেও ।
– মোবারককে দেখছি না যে? ও আবার কোথায় গেল? রাত অনেক হয়েছে। বাসায় যেতে হবে।
– এমনভাবে বলছো, মনে হয় আমাদের বাসা অনেক দূরে! যেতে পাঁচ মিনিট লাগতে পারে।
– তারপরও।
মোবারক হাঁপাতে হাঁপাতে দোকানে প্রবেশ করলো।
আসগর মিয়া ছেলেকে হাঁপাতে দেখে বললেন, কিরে বাবা, এভাবে হাফাচ্ছিস কেন? আর কোথায় গিয়েছিলে?
মোবারক মাটির ব্যাংকটি বাবার হাতে দিয়ে বলল, এখানে কত টাকা আছে? দ্যাখো। এগুলো আমার ঈদ বকশিশ আর টিফিনের জমানো টাকা।
আসগর মিয়া মাটির ব্যাংকটা হাতে নিয়ে মোবারকের মুখের দিকে একনজর তাকিয়ে মনে প্রশান্তি অনুভব করেন।
এরপর মাটির ব্যাংকটি ভাঙলেন। ৮০০ টাকা।
পাশ থেকে মোবারক বলল,
– বাবা, এখন মোট কত হয়েছে?
– ৩৮০০ টাকা।
মোবারক মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছে।
এতক্ষণ ধরে দোকানদার ক্যাশবাক্সের পাশে বসে সব লক্ষ্য করেন। তিনি মোবারককে কাছে ডেকে বললেন,তুমি কিছু বলবে?
– না মানে ইয়ে, আঙ্কেল। পাঞ্জাবিটার দাম তো বিয়াল্লি­শ ’শ টাকা। একটু কম হবে কি?
দোকানদার হাসিমাখা মুখে বললেন, তোমাদের কাছে কত টাকা আছে?
– ৩৮০০ টাকা।
– বাবার জন্য যে ভালোবাসা তুমি দেখিয়েছো তাতে আমি মুগ্ধ। এই পাঞ্জাবিতে আমি কোনো লাভ করবো না। পাঞ্জাবিটা আমাদের ৩৫০০ টাকায় কেনা। ৩৫০০ টাকা দিয়ে পাঞ্জাবিটা নিয়ে নাও।
মোবারক খুব খুশি হয়ে বাবাকে বলল,
– বাবা, এবার পাঞ্জাবিটা গায়ে দাও।
আসগর মিয়া ইতস্তত করতে করতে বললেন, না থাক বাবা, পরে এসে নেবো। এখন টাকায় হচ্ছে না।
পাশ থেকে দোকানদার বললেন, ভাইজান, পাঞ্জাবিটা নিয়ে নেন। যার ছেলে বাবাকে এত ভালোবাসতে পারে তার মতো গর্বিত পিতা আর ক’জন আছে। এ পাঞ্জাবিতে আমার লাভ শুধুই এক ছেলের বাবাকে ভালোবাসার দৃশ্য অবলোকন। পাঞ্জাবির ক্রয়কৃত দাম ৩৫০০ টাকা দিলেই হবে।
আসগর মিয়া মোবারকের মুখের দিকে মায়ার চোখে তাকিয়ে পাঞ্জাবিটা পরতে উদ্যত হলেন। হোসনে আরা, মোবারক ও দোকানদার মুগ্ধ চোখে আসগর মিয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। নিমিষে উপস্থিত সবার মনে প্রশান্তির সুবাতাস বইতে থাকে।