আজাদের জীবনযুদ্ধ

নাঈমুল হাসান তানযীম

0
55

‘এই যাইবোনি যাইবোনি শনিরআখড়া, রায়েরবাগ, সাইনবোর্ড, সানাড়পার, চিটাগাংরোড, তাড়াতাড়ি ওঠেন। তাড়াতাড়ি তাড়াতাড়ি।’ বলেই লেগুনার হাতল ধরে ঝুলতে লাগলো আজাদ।
সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত এভাবেই কাটে ওর প্রতিদিন। সারাদিন হেল্পারি করে মাস শেষে পাঁচ হাজার টাকা পায় ও। বস্তিতে মা আর ছোট বোনটি থাকে। বাবা মারা গিয়েছেন আজ তিন বছর হলো। ওর বাবা রিকশা চালাতো। সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করে যা পেতো তা দিয়েই কোনোমতে কেটে যেতো। বাবা থাকতে ওদের তেমন কষ্ট ছিল না। ছোট বোনটার কোনো আবদারই অপূর্ণ থাকতো না। যেই না বাবা মারা গেলেন তারপর থেকেই যেন অন্ধকার নেমে এলো ঘরে। ওর মাকে বাসায় বাসায় বুয়ার কাজ নিতে হলো। ও নিলো লেগুনায় হেল্পারির কাজ। এভাবেই কষ্ট করে কোনোমতে কাটছে ওদের দিন। মাঝেমধ্যে ভাবে ও, কেন যে বাবা চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে! তিনি কি জানতেন না, তাঁর অবর্তমানে আমাদের কত কষ্ট হবে। সব দোষ তো ওই ট্রাকওয়ালার। যে পেছন থেকে বাবাকে মেরে দিয়ে মুহূর্তে উধাও হয়ে গেছে। ওদিকে রিকশাসহ বাবা দুমড়ে মুচড়ে গিয়েছিল। অনেকদিন পর আজ বাবার কথা মনে পড়ল ওর। চোখের পাতা ভিজে উঠল। গলাটা ধরে এলো। হঠাৎ ড্রাইভারের ডাকে সম্বিত ফিরে পেল। ‘এই ব্যাটা! খাড়ায়া খাড়ায়া কী দেখোস, যাত্রী ওঠানোর কোনো খবর নাই, আরামসে দাঁড়ায়া আসে, নবাব সলিমুদ্দী আইসে কোত্থেক্কা’ বলেই হাঁক ছাড়ল ড্রাইভার। অগত্যা কোনো কথা না বলে কাজে মনোযোগ দিলো আজাদ।
‘এই যাইবোনি যাইবোনি শনির আখড়া, রায়েরবাগ, সাইনবোর্ড, সানাড়পার, চিটাগাংরোড, তাড়াতাড়ি ওঠেন। তাড়াতাড়ি তাড়াতাড়ি।’

ড্রাইভার সারাদিনই ওকে নানারকম গালিগালাজ করে। জবাবে ও কিচ্ছু বলে না। কোনোরকমে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ রাখতে চেষ্টা করে। মনে আছে, একদিন ড্রাইভারের কড়া কথার জবাবে দুইটা কথা বলেছিল ও। তারপর কতগুলো চড় থাপ্পড় খেয়েছিল মনে করতে পারছে না। মাঝেমধ্যে মন চায়, হেল্পারগিরি ছেড়ে দিতে। কিন্তু মা আর ছোট বোনটার কথা ভেবে কষ্ট করে হলেও থেকে যায় ও।

মাত্র বারো বছর বয়স ওর। এই বয়সেই কঠোর পরিশ্রম করে দিনরাত। ওকে কেউ শিখিয়ে দেয়নি, মায়ের মুখে, ছোট বোনটার মুখে দু’বেলা আহারের ব্যবস্থা করতে হবে। সময়ই ওকে বুঝিয়েছে তা।

প্রতিদিন নানা কিসিমে’র যাত্রীর দেখা মেলে। ভালো-খারাপ মিলিয়েই। তবে মনে হয়, খারাপ আচরণ করে এমন সংখ্যাটাই বেশি। মানুষের আচার-আচরণ দিনদিন খারাপ থেকে খারাপ হচ্ছে। পান থেকে চুন খসলেই শুরু হয়ে যায় অকথ্য গালিগালাজ। কখনো কখনো গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধা করে না কেউ কেউ। এই তো সেদিনকার ঘটনা। মাঝবয়সী এক যাত্রীর কাছে ভাড়া চাইলো ও। লোকটা জানালো, নেমে দেবে ভাড়া। ও বলল, সবাইই দিয়ে দিয়েছে। আপনিও দিয়ে দিন। কেন এ কথা বলল, দিলো কষে এক থাপ্পড়। থাপ্পড় খেয়ে সাথে সাথে পড়ে গেল লেগুনার ভেতরে। একটুর জন্য বেঁচে গেল নিচে পড়ে যাওয়া থেকে। লোকটার এমন কাÐে ক্ষোভ প্রকাশ করলো অন্যান্য যাত্রীরা। কিন্তু ও কিছুই বলল না। কারণ, কিছু বললেই ওকে আরও বড় বিপদে পড়তে হবে। সেদিনকার এই ঘটনার পর থেকে ও আর কোনোদিন মুখের ওপর কারও সাথে কথা বলেনি। এমনিতেও খুব একটা বলে যে তাও না।

মানুষের নানা কথা শুনতে শুনতে, চড় থাপ্পড় খেতে খেতে অনেকটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে ও। এখন আর ওগুলো তেমন কিছু মনে করে না। ও শুধু জানে, কিছু বললেই ওর বড় ধরনের সমস্যা হবে। হেল্পারের কাজটা ছুটে যাবে। মা আর ছোট বোনটার মুখের দিকে চেয়ে হলেও যে ওকে কষ্ট করে ধরে রাখতে হবে হেল্পারির কাজটা…