অভিমানী মন

শাকের জামিল

0
117

কৈশোর বয়সটাই এমন যে বড় ও না আবার একেবারে শিশুও না। এর মাঝামাঝি একটা অবস্থা। অর্থাৎ কোনো কিছুর দায়িত্ব নাই আবার দায়িত্বের বাইরেও থাকা যায় না। সেকারণে নিজের আচার আচরণের মধ্যে একটা দোলাচল বা দোটানা ভাব থাকে। কোনো কাজ করতে গেলে মনে হয় এটা করার অধিকার কি আমার আছে? অথবা মনে হয় এই কাজটা আমি না করলে কে করবে? আবার মনে হয় এই কাজটা আমাকে কেন করতে হচ্ছে?
শৈশবে যেকোনো ধরনের মানসিক প্রতিক্রিয়া দেখানো যায়। কিন্তু কৈশোরে এসে নিজেকে খানিকটা দায়িত্ববাদী আচরণ করতে হয়। তাই সব ধরণের প্রতিক্রিয়া দেখানো যায় না। সেজন্য শিশুরা রাগ করে আর কৈশোরে এসে শুরু হয় অভিমান করা। অর্থাৎ রাগ পুষে রাখা। একটি শিশু রাগ করে চিৎকার চেঁচামেচি করবে, ঘরের জিনিসপত্র ওলট পালট করবে এটাকে স্বাভাবিক ধরে নেয়া হয়। কিন্তু যখনি তুমি কৈশোরে পা দিচ্ছো তখন নিজের কাছেই মনে হবে; আরে আমি তো আর শিশু নই। রাগ প্রকাশ না করে এক ধরনের ভদ্র রাগ করো তুমি তখন। সেটির নাম অভিমান। যখনি নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কাজ করতে হয়, বা কেউ তোমার ওপর কোনো কাজ চাপিয়ে দেয় কিংবা খারাপ আচরণ করে তখন অভিমান জাগে নিজের মধ্যে। অভিমানের সাথে মান জড়িত। নিজের মান বা সম্মান কিছুটা লঙ্ঘিত হয় যদি কোনো কিছু নিজের ইচ্ছেমতো না হয়। যদি নিজের চাওয়াটা পূরণ না হয় তখনি আমরা মনে করে নিই আমাকে সম্মান দেয়া হলো না। সেটা থেকেই অভিমানের জন্ম।
অভিমান হলো অপ্রকাশিত নি¤œমাত্রার রাগ। অভিমান জমে থাকে মনের মধ্যে। জমতে জমতে সেটি ক্ষোভের আগুনের জন্ম দেয়। ক্ষোভ হচ্ছে ছাইচাপা আগুনের মত। এটি মনকে পোড়াতেই থাকে। পুড়তে পুড়তে মন বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। সে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। আর সেটাই পরিণত হয় দূর্ঘটনায়। আমাদের চোখের সামনের শান্তুশিষ্ট মানুষটি ভয়ানক হয়ে ওঠে তখন। অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির জন্ম নেয় তখন।
কোন কোন কাজে অভিমান হয়?
সামান্য বিষয় থেকেই অভিমানের জন্ম। যেমন খেতে বসেছ। এক ভাইকে বড় মাছের টুকরা/ মুরগির রান দিয়েছে। আর তোমাকে ছোটটা দিলো। ব্যাস, অভিমানের শুরু। অথবা একজনের জন্য গিফট এনেছে তোমার জন্য আনেনি। অভিমানে গাল ফুলে গেল। কিংবা দুজনের জন্যই গিফট এনেছে। কিন্তু তোমার গিফটটা একটু কম আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে। শুরু হলো অভিমান। অভিমান হয় আবদার পূরণ না হলে, বাবা মা বকা দিলে, পরীক্ষায় খারাপ করে শিক্ষকের বকা শুনলে। অভিমান হয় পাড়াপ্রতিবেশিদের কান ঝালাপালা করা উপদেশ শুনলে। অভিমান হয় খেলতে না দিলে, ছুটিতে বেড়াতে নিয়ে না গেলে। এমন আরো কতভাবে যে অভিমান হয় প্রতিদিন সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। মনে করে দ্যাখো কী কী বিষয়ে তুমি অভিমান করেছিলে।
অভিমান অতি সামান্য বিষয় হলেও এর পরিণত ভয়াবহ হয় বলেই আজকে এ বিষয়ে আলোচনা করছি। অভিমান থেকে আত্মহত্যা করলো ভিকারুন্নেসা স্কুলের ছাত্রী অরিত্রী। ক্লাস সেভেনে পড়া অরিত্রী যে এমন ভয়াবহ সিদ্ধান্ত নিয়ে নেবে সেটা কি কেউ ভাবতে পেরেছিল? প্রতিবছর ঈদ বা পূজাতে দেখা যায় স্কুল পড়–য়া মেয়ে আত্মহত্যা করছে সামান্য একটা নতুন ডিজাইনের জামা না পাবার অভিমান থেকে। শুধু তাই না, মোবাইল কিনে না দেয়া, সাইকেল কিনে না দেয়া, স্কুলে বকা দেয়া বা শাস্তি দেয়া এ ধরনের ঘটনা থেকে বিরাট বিরাট দূর্ঘটনা ঘটে যাচ্ছে আমাদের সমাজে। কিশোর বয়সের অনুভূতিপ্রবণ সময়ে সামান্য ঘটনা থেকেই এসব ভয়ানক ঘটনার জন্ম নিচ্ছে। তাই অভিমান নিয়ে সচেতন হওয়া দরকার।
তুমি বলতে পারোÑ আমি কি অভিমানও করতে পারবো না!! অবশ্যই পারবে। প্রতিদিন আশেপাশের মানুষের আচরণে কিংবা চাওয়া পূরণ না হবার ঘটনায় তোমার অভিমান জন্মাবেই। তবে সেই অভিমানগুলোকে জমিয়ে জমিয়ে পাহাড় বানানো চলবে না। তাহলে কী করতে হবে? অভিমান খরচ করে ফেলতে হবে। কিভাবে? কোন কোন ঘটনায় তুমি অভিমানী হয়েছো সেগুলো লিখে ফেল কাগজে। তারপর কাগজ টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলো। তারপর সেগুলো পুড়িয়ে দাও কিংবা পানিতে ভাসিয়ে দাও। ব্যাস অভিমান খরচ হয়ে গেল। এবার অভিমান প্রতিরোধী ব্যবস্থা নাও। সেটা কেমন? কোন কোন কাজে তোমার অভিমান হয় সেটা মনে রাখো। এমন ঘটনা সামনে এলেই সাবধান হয়ে যাও। মনে মনে বলোÑ এই ঘটনায় আমি অভিমান করবো না।
নিজের চাওয়াকে সবসময় যুক্তি সংগত রাখবে। বাবা মায়ের কাছে এমন কিছু চাইবে না যেটা কিনে দেয়া তাদের আয়ের অনুপাতে ব্যয়সাপেক্ষ। বন্ধুবান্ধবদের যা আছে তার সবই তোমার থাকতে হবে এমন কোনো কথা নেই। খেয়াল করলে দেখবে কয়েকবছর আগে যে জিনিস কেনার জন্য তুমি কান্নাকাটি করে বায়না ধরেছিলে এখন সেই জিনিসটিই তোমার কাছে গুরুত্বহীন। বায়নার জিনিস বেশিরভাগ সময় আকর্ষণীয় হয় কিন্তু কাজে লাগে কম। আর যেসব জিনিস তোমার লাগবেই সেসব জিনিসের গুরুত্ব বাবা মায়ের কাছে তুলে ধরো। তারা কবে কিনে দিতে পারবে সে বিষয়ে খোলামেলা আলাপ করো। তারা নিশ্চিতভাবেই তোমার কথার গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত তোমার প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা করবেন।
বকা শুনলে অভিমান জন্মে। এটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু মনে রাখবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তোমার শুভাকাক্সক্ষীরাই তোমাকে বকে। তারা তোমার মঙ্গল কামনা করেন, তোমার সাফল্য কামনা করেন বলেই বকা ঝকা করেন। তাই বকাঝকার শব্দগুলো ভুলে গিয়ে কোন কাজের জন্য বকেছেন সেই কাজটা ভালোভাবে করার চেষ্টা করো। তোমার সাফল্য সহজেই হাতে ধরা দিবে।
এই বয়সে অভিমানের একটি অন্যতম উপলক্ষ হলো তথাকথিত প্রেমরোগ। প্রাইমারি থেকে হাইস্কুলে উঠলেই মনের মধ্যে এক ধরনের অনুভূতির সূচনা হয়। অনেক কিছুই ভালো লাগতে থাকে চোখে। মিডিয়া, নাটক আর সিনেমার অনুকরণে নিজের জীবনটাকেও রোমান্টিক, কল্পনার বহু রঙে রঙিন মনে হয়। তথাকথিত বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড ছাড়া জীবন অচল এমন ভাবনা কাজ করবে মনে। সবার আছে আমার নেই কেন? আমার বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড কবে হবে? এই ধরনের চিন্তা মাথায় প্রশ্রয় দেয়া চলবে না। সাবধান! জীবন ধ্বংসের জন্য এই সময়ের ভুল চিন্তায় জড়াবে না। অমুককে না পেলে বা অমুককে ছাড়া তোমার জীবন বৃথা এই ধরনের ফালতু ডায়ালগে বিশ্বাস করবে না। লক্ষ্য করে দ্যাখো সিনেমায় যেসব রোমান্টিক নায়ক নায়িকারা এসব ডায়লগ দেয় তাদের নিজেদের জীবনেই কোনো শান্তি নেই। তাদের পারিবারিক জীবনে বিচ্ছেদ আর বিচ্ছেদ। বরং সফল হবার পথে একাগ্র হও। প্রেমের ফাঁদে পড়ে বাবা মায়ের সাথে অভিমান করে কোনো ধরনের বাজে সিদ্ধান্ত নেবে না। তোমার মনের অনুভূতিগুলো শেয়ার করতে পারো বাবা মায়ের সাথে। বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে তারাই তোমাকে সহযোগিতা করবেন, বিপদ থেকে বাঁচাবেন।
নিজকে গড়ার পথ খুব সহজ নয়। সাফল্যের পথে অনেক দূরত্ব পাড়ি দিতে হবে। সেই পথে ছোটখাটো বিষয়ে অভিমান করলে পথচলা গতিহীন হয়ে পড়বে। সুতরাং চলো অভিমানী মনকে অভিমান মুক্ত করে নতুন কিছু করার স্বপ্নে উৎসুক করে তুলি।