॥ পাঁচ ॥
গত সংখ্যায় আমরা ‘গুটুলমুটুল’-এর কথা বলছিলাম। গুটুলমুটুলের আরও কথা আছে-
কন্যা সাজে সোনাবরণ
করবে গুটুল বিয়ে
মুটুল বলে ‘কবুল কবুল’
পাগড়ি মাথায় দিয়ে।
বুড়ো হয়ে মরলো গুটুল,
পাড়ার যত লোক
মুটুলটাকে কাঁধে নিয়ে
করলো মহাশোক।
বুড়ো হলে অর্থাৎ আয়ু ফুরিয়ে এলে মানুষ আর বাঁচতে পারে না। প্রিয় পৃথিবী থেকে তাকে বিদায় নিতে হয়। একথা যেমন গুটুলের বেলায় সত্যি হয়েছে, তেমনি তা সত্যি হয়েছে গুটুলের লেখক আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিনের জীবনেও। তাই পৃথিবী থেকে তিনি বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু তাঁর লেখাগুলো অমর করে রেখেছে তাঁকে। খুবই অমায়িক এবং সাদামনের মানুষ ছিলেন আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন। এ জন্যই হয়তো পুলিশের আইজি হওয়ার পরও সাহিত্যচর্চা থেকে বিরত হননি তিনি। এমন উদাহরণ বিরল। মননশীল মানুষ হওয়ার কারণেই ছড়া- কবিতা, গল্প-উপন্যাস যে কাজেই তিনি হাত দিয়েছেন তা রসোত্তীর্ণ হয়েছে। আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন শুধু যে সাহিত্য চর্চা করেছেন তা নয়, তিনি সাহিত্য চর্চার পৃষ্ঠপোষকও ছিলেন। ফুলকুঁড়ি পত্রিকাকে তিনি নানাভাবে সাহায্য করে গেছেন। আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন সাদা মনের মানুষ ছিলেন বলে উল্লেখ করেছি। এ ব্যাপারে একটু স্মৃতিচারণ করতে চাই। ফুলকুঁড়ির একেবারে প্রথমদিকের কথা। পুলিশের বড় কর্মকর্তা হিসাবে মিন্টুরোডের অভিজাত পাড়ায় ছিল তাঁর বাসভবন। গুটুল মুটুলের প্রকাশনা বিষয়ে কিছু আলাপ সেরে নিতে তাঁর বাসভবনে গিয়েছিলাম। আলাপের এক ফাঁকে হঠাৎ তিনি উড়ে গেলেন এবং একটু পরেই শিশুর মতো মিষ্টি হেসে নাস্তার ট্রে হাতে ড্রয়িংরুমে ঢুকলেন। আমার মতো একজন তরুণের জন্য নাস্তা বয়ে আনতে এই প্রবীণের কোনো সংকোচ নেই। এই জন্য বলেছি, তিনি ছিলেন একজন সাদামনের মানুষ। তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আজ অনেক কথাই মনে পড়ছে।

সে সময় ফুলকুঁড়ির সাহিত্যসভাগুলো ছিল খুবই জমজমাট। রাজধানীর নামীদামী সব সাহিত্যিকই সানন্দে উপস্থিত হতেন আমাদের সাহিত্যসভায়। ফুলকুঁড়ির সাহিত্যসভা এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে, আমাদের তখন মাসে দু’টি সাহিত্যসভা করতে হতো। তাই তখন আমরা বলতাম, ‘ফুলকুঁড়ির পাক্ষিক সাহিত্যসভা’। ফুলকুঁড়ির সাহিত্যসভার একটি সাংগঠনিক কাঠামোও ছিল তখন। আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন ছিলেন এই সাংগঠনিক কাঠামোর সভাপতি। ফুলকুঁড়ির প্রথম সাহিত্যসভাটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮১ সালের ২৪ মে তারিখে, ৯৪/১ নিউ এলিফ্যান্ট রোডস্থ ফুলকুঁড়ি আসরের হলরুমে। এই সভায় সভাপতিত্ব করেন সানাউল্লাহ নূরী, প্রধান অতিথি ছিলেন কবি আল মাহমুদ। উপস্থিত ছিলেন সৈয়দ শামসুল হুদা, আবু হাসান শাহরিয়ার, মুকুল চৌধুরী, সৈয়দ আল ফারুক, আহমদ মতিউর রহমান, ফারুক হোসেন, শরীফ আবদুল গোফরান, তৌফিক আলী, নূরুল কবীর, মাহবুব আনোয়ার, মারুফ রহমান সহ আরও অনেকে। ১৯৮১ সালে শুরু হওয়া ফুলকুঁড়ির সাহিত্যসভা আজও অব্যাহত রয়েছে। প্রথম দিকের সাহিত্যসভাগুলোতে সভাপতি ও প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জয়নুল আবেদীন আজাদ, আবদার রশিদ, আল মুজাহিদী, মিজানুর রহমান শিপন, আল কামাল আবদুল ওহাব, সুকুমার বড়ুয়া, সোলায়মান আহসান, মাহবুবুল হক, অধ্যাপক মুহাম্মদ মতিউর রহমান, মতিউর রহমান মল্লিক, তোফাজ্জল হোসেন প্রমুখ। প্রথমদিকের সাহিত্যসভাগুলোতে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মহিউদ্দিন আকবর, আহমদ আখতার, মাহবুব আনোয়ার, ফাহিমুল কাদির, ফারুক হোসেন, মুকুল চৌধুরী, শফিকুর রহমান রঞ্জু, আখতার হোসাইন, আহমদ মতিউর রহমান, অনিরুদ্ধ আলম, যাযাবর মিন্টু প্রমুখ।

ফুলকুঁড়ির প্রথম দিকের সাহিত্য সভাগুলোতে সভাপতি ও প্রধান অতিথির মন্তব্য লিপিবদ্ধ করা হতো। যেমন ফুলকুঁড়ির ২য় সাহিত্যসভায় সভাপতির মন্তব্যে জয়নুল আবেদীন আজাদ লিখেছিলেন, “আজকের সাহিত্য আসর মোটামুটি ভালই হয়েছে। বড়দের চাইতে ছোটদের অংশগ্রহণ প্রাণবন্ত ছিল। বড়দের আরো পরিকল্পিত ও প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ কাম্য। শিশুকিশোরদের উপস্থিতি আরো বাড়ানো উচিত।”
তৃতীয় সাহিত্যসভায় প্রধান অতিথির মন্তব্যে আবদার রশীদ লিখেছিলেন, “আজকের সাহিত্য আসরে ছোট ছোট ছেলেদের কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ শুনে আমার খুব ভালো লাগলো। সমালোচকের বক্তব্যও। জানা গেল ছোটদের ছন্দ শেখাবার ব্যবস্থা শিগগিরই এই আসরে শুরু হবে। আমি মনে করি সেই সঙ্গে বানান এবং উচ্চারণ শেখাবার ব্যবস্থা রাখলে আরো ভালো হয়।”
৪র্থ সাহিত্যসভায় প্রধান অতিথির মন্তব্যে কবি আল মুজাহিদী লিখেন, “দায়িত্বের সঙ্গে খুব অল্প কাজ করাও মহা ব্যাপার। ছোটদের আসরে নিজেকে যুক্ত করা একটি মহা কাজ। ফুলকুঁড়ির এমনি আসরে এসে আমার খুব ভালো লেগেছে। আবার এখানে আসার লোভ ও আকর্ষণ রয়ে গেল। ফুলকুঁড়ির মিষ্টি, উজ্জ্বল অভিযাত্রার একজন সৈনিক হতে চাই।”
১৭তম সাহিত্যসভায় প্রধান অতিথির মন্তব্যে ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া লিখেন
“ফুলকুঁড়ি একদিন ফুটে উঠবে
চারদিকে তার সুবাস ছুটবে।”
সুকুমার বড়ুয়ার মন্তব্য ভুল হয়নি। ফুলকুঁড়ির সাহিত্যসভা আজও চলছে এবং সেই সভার সুবাস সাহিত্যভুবনে ছড়িয়ে পড়ছে। (চলবে)
প্রকাশকাল : জুলাই, ২০০৮।



