॥ চার ॥
গত সংখ্যায় আমরা প্যাকপ্যাকের কথা জেনেছিলাম। প্যাকপ্যাক কোনো সাধারণ হাঁস নয়। সে নিজের সাথে বই রাখতো এবং নিজেকে জ্ঞানী ভাবতো। প্যাকপ্যাক কিন্তু বই পড়তো না, জ্ঞানীও ছিল না। তবে ভাব দেখাতে গিয়ে সে অহংকারী হয়ে উঠেছিল। এক ঘটনায় আরো কিছু পশু-পাখিসহ প্যাকপ্যাককে খেসারত দিতে হয়েছিল। ঐঘটনার পর প্যাকপ্যাক বুঝতে পারলো,
“এদ্দিন বিদ্যাকে ডানার নিচে রেখে দিয়েছিলাম। কিন্তু জ্ঞানতো ডানার নিচে রাখার জিনিস নয়। মগজে ও অন্তরে রাখতে হবে জ্ঞান। আর এ জন্যই আমাকে পড়তে হবে। এ কথা ভাবতেই প্যাকপ্যাকের মনটা আনন্দে ভরে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে সে পড়াও শুরু করে দিল।”
ফুলকুঁড়ি প্রথম বর্ষ ২য় সংখ্যায় লিখেছিলেন আল কামাল আবদুল ওহাব, ফররুখ আহমদ, আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন, সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়, সাজজাদ হোসাইন খান, সৈয়দ মুসা রেজা, হোসেনুজ্জামান আল-আমীন, আহমদ মতিউর রহমান, নূর মোহাম্মদ মল্লিক সহ আরো অনেকে।
খোকন সোনা’ কবিতায় কবি আল কামাল আবদুল ওহাব লিখেছেন-
খোকন সোনা বলো
পঙ্খীরাজে সোয়ার হয়ে
কোথায় আজি চলো।
নীল আকাশে পাখা মেলে
কোথায় তুমি যাও যে চলে
কিসের খোঁজে তারায় তারায়
প্রাণের শিখা জ্বালো।
‘পিন্টুর পদ্য লেখা’ গল্পে কবি ফররুখ আহমদ লিখেছেন-
“একটু খোলাখুলি বলতে হয় তা হলো বছর দুয়েক আগে স্কুল ম্যাগাজিনে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই কয়েকজন হিংসুটে ছেলে তাকে গরু বলে ডাকা শুরু করে। প্রবন্ধটি লেখা হয়েছিল ‘গো-পালন’ বিষয় নিয়ে। গরুর শুভাকাঙ্ক্ষী হলেও এতে করে কিছুতেই পিন্টুকে গরু খেতাব দেওয়া চলে না। কিন্তু বরাত খারাপ হলে যা হয় এক্ষেত্রেও তা হল। পিন্টুর গরু নামটা সাংঘাতিকভাবে ছড়িয়ে পড়ল ছেলে মহলে। তখন পিন্টুর ইচ্ছে যে একটা দুর্দান্ত রকমের কবিতা লিখে সে তার পূর্বখ্যাতি পুনরুদ্ধার করবে।”.
‘হাই জাম্প’ কবিতায় কবি আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন লিখেছেন-
হাবুল মামা হাঁক ছাড়েন,
ন’ফুট উঁচু লাফ মারেন,
ডিগবাজী খান শূন্য পরে
দড়াম করে চিৎপটাং।
অলিম্পিকের রেকর্ডধারী
ভাংল মামার বিশাল ঠ্যাং।
‘সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায় ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’ প্রবন্ধে লিখেছেন,
“আমাদের এদেশের বহু মানুষের জ্ঞান-গুরু ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রকৃতপক্ষে ঐ রকম এক অসীম সাহসী ডুবুরিই ছিলেন। তবে তিনি সাধারণ ডুবুরির মত পারস্য উপসাগরে ডুব দিয়ে মুক্তোর জন্য ঝিনুক সংগ্রহ করেননি, বা অস্ট্রেলিয়ার কোরাল সাগরে ডুব দিয়ে প্রবালকীটের কীর্তি কাহিনীর তথ্য জোগাড় করেননি। তিনি ডুব দিয়েছিলেন জ্ঞান- সাগরে। যেখানে হাঙ্গর, কুমিরের ভয় না থাক; পাহাড়ের প্রাচীরের ন্যায় বাধা, গুহার অনির্দেশ্য অন্ধকারে পথ চলার অনিশ্চয়তার ভীতি যথেষ্টই ছিল। পদে পদে তিনি বাধার দেয়ালে ধাক্কা খেয়েছেন, পথ চলতে গিয়ে পথের দিশা হারিয়ে ফেলেছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জ্ঞানের জ্যোতির্ময় লোকে পৌঁছুতে পেরেছিলেন।”
ফুলকুঁড়ির ১ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যাটি নানা কারণেই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ সংখ্যাটি ছিল ফুলকুঁড়ির প্রথম ঈদসংখ্যা। ফুলকুঁড়ির অন্য সংখ্যাগুলো যেখানে ৫২ পৃষ্ঠার বেশি ছিল না, সেখানে ১৯৭৯ সালের ঈদসংখ্যাটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ১৪০। মনে পড়ে, আমি ও ফুলকুঁড়ি আসরের তখনকার শিক্ষা-সাহিত্য সম্পাদক হোসেনুজ্জামান আল-আমীন যখন ঈদসংখ্যাটি নিয়ে বাংলা একাডেমী গিয়েছিলাম তখন একটা হৈ-চৈ পড়ে গিয়েছিল। বাংলা একাডেমীর অনেকেই লিখতেন ফুলকুঁড়িতে। ঈদসংখ্যাটি দেখে তাঁরা বেশ খুশি হয়েছিলেন। কবি আসাদ চৌধুরী, কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন ফুলকুঁড়ির পাতা উল্টাতে-উল্টাতে বললেন; সংখ্যাটি শুধু ঢাউশ নয়, সুন্দরও হয়েছে। এ সংখ্যায় লিখেছিলেন কবি ফররুখ আহমদ, সানাউল্লাহ নূরী, লুৎফর রহমান সরকার, আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন, আল মুজাহিদী, আলী ইমাম, হোসেন মীর মোশররফ, দিলওয়ার, আল কামাল আবদুল ওহাব, খালেক বিন জয়েন উদ্দিন, রোকেয়া খাতুন রুবী, ফারুক নওয়াজ, দেলওয়ার বিন রশিদ, আবু হাসান শাহরিয়ার, আহমদ মতিউর রহমান, লুৎফর রহমান রিটন, আব্দুল হাই মিনার, মিলান আহমাদ ফারারী সহ আরও অনেকে। তবে ঈদসংখ্যায় বিশেষ উপহার ছিল বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক শওকত আলীর সম্পূর্ণ কিশোর উপন্যাস ‘টুনকু নামে হাতি।’ সে কথায় পরে আসছি।
এ সংখ্যায় ‘ফুলের দেশে’ কবিতায় ফররুখ আহমদ লিখেছেন-
আয়গো তোরা ভাইবোনেরা ফুলের দেশে যাই,
ফুল ঝুরঝুর ফুলের দেশে ফুলের শোভা পাই।
রঙিন পলাশ, পারুল, শিমুল সাঝ সকালে হাসে,
তারার মত শিউলি, বকুল খায় ছড়িয়ে ঘাসে।
রঙ্গের সাথে গন্ধ ফুলের পাইরে যেখানে,
দল বেঁধে ভাই আয়গো সবাই যাইরে সেখানে।
‘সোনার বল’ কবিতায় লুৎফর রহমান সরকার লিখেছেন-
পাশের বাড়ীর পুকুরে
সেদিন বেলা দুপুরে,
নাইতে নেমে ছেলের দল
পেলো একটি সোনার বল।
‘সূর্যচেরা আলো’ কবিতায় আল মুজাহিদী লিখেছেন-
খোকার চোখে স্বপ্ন আঁকা
মস্ত আকাশখানা,
খুকুর চোখে পাখীর ছানা
শংখ চিলের ডানা।
‘ঈদের দিন’ কবিতায় সৈয়দ আমির উদ্দিন লিখেছেন-
নতুন জামা নতুন জুতা নতুন খুশীর নেশা
নতুন করেই আজকে আবার সবার সাথে মেশা।
নতুন ঘর নতুন চর নতুন নদীর ঢেউ
নতুন বাড়ী নতুন উঠোন নয় পুরনো কেউ।
নতুন খাতা ছবির পাতা নতুন মনের ইচ্ছে
নতুন পথ নতুন দীঘি, কাজলা বুবুর কিচ্ছে।
এবার ঈদসংখ্যার উপন্যাস ‘টুনকু নামে হাতি’র কথা বলতে হয়। কথাসাহিত্যিক হিসেবে শওকত আলীর মর্যাদার কথা সাহিত্যজগতের লোকজন জানেন। আমি তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে জানি, জানি শিক্ষক হিসেবেও। তাই যখন শওকত স্যার থেকে উপন্যাস আনার কথা বলা হলো তখন আমি একটু ভাবনায় পড়ে গেলাম। স্যার লিখেন কম, আছে মুডের প্রশ্ন, তার ওপর আবার কিশোর উপন্যাস। তাই সময়মত উপন্যাসটি বের করে আনতে পারবো কিনা সেই টেনশনটা ছিল। একটা কৌশল নিলাম। বিকেলের দিকে শওকত স্যারের টিকাটুলির বাসায় যেতাম। স্যার খুশী হতেন, চা-নাস্তার সাথে সমাজ ও সাহিত্য নিয়ে কথা হতো। এরপর স্যার বলতেন, তোমার লেখাটা আজ অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে যাব। স্যার ঠিকই লেখাটা এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। এবং যথাসময়ে ফুলকুঁড়িতে উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছিল। মনে পড়ে, উপন্যাস উপলক্ষে আলাপচারিতায় স্যারের কাছ থেকে নাগরিক ও গ্রামীণ জীবনের অনেক রহস্যই জেনেছিলাম। কুষ্টিয়ার লোকজন যে নিজ জেলাকে ‘কুষ্টে’ জেলা বলে সে কথাটিও জেনেছিলাম স্যারের কাছ থেকেই। এখন সেই সময়ের একটি মজার বিষয় মনে পড়ছে। বিষয়টি ছিল অনেকটা চ্যালেঞ্জের। সাহিত্যজগতে প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য অনেক প্রতিযোগিতা থাকে, চ্যালেঞ্জ থাকে, থাকে প্রতিপক্ষও। প্রতিপক্ষ চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিল- শওকত আলী ফুলকুঁড়ির ঈদসংখ্যায় উপন্যাস দেবেন? অসম্ভব ব্যাপার! চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিলাম এবং যখন শওকত স্যারের চমৎকার উপন্যাসসহ ফুলকুঁড়ির বর্ণাঢ্য ঢাউশ ঈদসংখ্যাটি বের হলো, তখন ওদের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। আমাদের মুখ ফুটে আর কিছুই বলতে হলো না। ‘টুনকু নামে হাতি’ উপন্যাসটি ভাষা, বিষয়বৈচিত্র্য ও চমৎকারিত্বে শিশু-কিশোরদের মনজয় করেছিল। যেমন,
“সে দিন কী যে হলো টুনকু মজার মজার কান্ড করতে লাগলো। যেমন শুভর আব্বার বুকপকেটের রুমাল তুলে নিয়ে আকাশে উড়িয়ে দিয়ে আবার শূন্য থেকে ধরে নিয়ে পকেটে গুঁজে দিলো, আমগাছ থেকে একটা আম ছিঁড়ে এনে শুভর মায়ের হাতে দিল, শুভর মায়ের হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে নিজের পিঠের ওপর রেখে দিল কিছুক্ষণ। যেন মজার খেলা পেয়েছে সে। তো ঐ দিনই শুভর সঙ্গে টুনকুর ভাব হয়ে গেলো।”
ফুলকুঁড়ির প্রথম বর্ষ ৮ম সংখ্যায়ও মজার বিষয় ছিল। ঐ সংখ্যাটি ছিল ফেব্রুয়ারি সংখ্যা। এ সংখ্যায় বিশেষ উপহার হিসেবে আমরা ফুলকুঁড়িতে ‘গুটুল মুটুল’ নামে পুরো একাটি ছড়ার বই ছেপে দিয়েছিলাম। সংখ্যাটি বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। ‘গুটুল মুটুল’ লিখেছিলেন আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন। আর চমৎকার ছবি এঁকেছিলেন হামিদুল ইসলাম। ‘গুটুল মুটুল’ নামের ছড়াটিতে কবি লিখেছেন-
এক যে ছিল গুটুল মুটুল
জমজ দু’টো ভাই
দেখতে তারা একই রকম
কোন তফাৎ নাই।
একই সাথে কাঁদে হাসে
একই সাথে খেলে
চিনতে তাদের করে যে ভুল
পাড়ার যত ছেলে।
হকি খেলায় গুটুল করে
একলা ছ’টা গোল,
মুটুলটাকে কাঁধে নিয়ে
সবাই বাজায় ঢোল। (চলবে)
প্রকাশকাল : জুন, ২০০৮

