॥ তিন ॥
গত সংখ্যায় বলেছিলাম, স্বাধীনতার মাস মার্চেই সচিত্র শিশু-কিশোর মাসিক হিসেবে শুরু হয়েছিল ফুলকুঁড়ির অভিযাত্রা। কিন্তু সালটা তোমাদের মনে আছে কি? হ্যাঁ দু’টি সংকলন প্রকাশের পর ১৯৭৯ সালের মার্চ মাসে নিয়মিত মাসিক শিশু-কিশোর পত্রিকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল ফুলকুঁড়ি। এখানে ছোট্ট বন্ধুদের একটি তথ্য জানাই, মার্চ মাসেই যে আমরা ফুলকুঁড়ির ডিক্লারেশন পেয়ে যাব তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। কারণ অনেকেই বলেছিলেন, ডিক্লারেশন পাওয়া অত সহজ নয়। এমন ধারণাও দেওয়া হয়েছিল যে, ছয়টি সংকলন প্রকাশের পর হয়তো ডিক্লারেশন পেতে পারেন। ফলে আশা আর আশংকার মধ্যে আমরা পরবর্তী সংখ্যার কাজ করছিলাম। কিন্তু কাজ যখন শেষ পর্যায়ে তখনই আমরা পেলাম কাংখিত সুখবরটি, অর্থাৎ ফুলকুঁড়ির ডিক্লারেশন পাওয়ার খবরটি। ফলে এ সংখ্যার সম্পাদকীয়তে আমরা মাসিক পত্রিকা হিসেবে ফুলকুঁড়ির আত্মপ্রকাশের খবরটি দিতে পারিনি। তাই সূচীপত্রের সাথে আলাদা একটি ছোট্ট কাগজে আমরা সেই ঘোষণাটি দিয়েছিলাম। যার ভাষা ছিল- “আমরা আনন্দের সাথে ছোট্টমণিদের এবং সেই সাথে লেখক-লেখিকা, পৃষ্ঠপোষক, গ্রাহক, এজেন্ট ও বিজ্ঞাপনদাতাদের জানাচ্ছি যে, ফুলকুঁড়ি এখন থেকে মাসিক পত্রিকা হিসাবে প্রতি ইংরাজী মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রকাশিত হবে।”
ফুলকুঁড়ির ডিক্লারেশন পাওয়ার পর আমরা উপলব্ধি করলাম, আন্তরিক প্রচেষ্টার ফল আল্লাহ্ অবশ্যই দেন। তাই অযথা চিন্তা কিংবা হতাশার দোলনায় না চড়াই উত্তম। আসলে কাজেই শক্তি, কাজেই মুক্তি। মাসিক ফুলকুঁড়ির প্রথম সংখ্যার প্রকাশনার সাথে জড়িত ছিলেন সম্পাদক-মাসুদ আলী, সহ-সম্পাদক-জয়নুল আবেদীন আজাদ, সহযোগী-মাসুদ মজুমদার, খুরশীদ আলম, প্রচ্ছদ-সেজান সরকার, অঙ্গসজ্জায়-হামিদুল ইসলাম। প্রকাশিকা ছিলেন তামান্না-ই-জাহান। এই সংখ্যার মূল্যও ছিল ‘দুই টাকা মাত্র।’ ৫২ পৃষ্ঠার সংখ্যাটি মুদ্রিত হয়েছিল দুই রঙে।
মাসিক ফুলকুঁড়ির প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছিল, “পাখী যেমন স্বাধীনতা চায়- চায় মুক্ত আকাশে বেঁচে থাকতে, তেমনি প্রতিটি মানুষ চায় স্বাধীনতা, প্রতিটি দেশ ও জাতি চায় স্বাধীনতা।”
আরো লেখা হয়েছিল, “স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজন আত্মমর্যাদাবোধ। যে জাতির আত্মমর্যাদা নেই, যে জাতি অন্য জাতির নকল করে, সে জাতি কখনও স্বাধীনতাকে টিকিয়ে রাখতে পারে না। স্বাধীনতা-সংগ্রামের প্রেরণা হল আত্মমর্যাদাবোধ। আর এ আত্মমর্যাদাবোধই একটি জাতির স্বাধীনতাকে টিকিয়ে রাখে।”
এ সংখ্যায় লিখেছিলেন- আশরাফ সিদ্দিকী, আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন, আসাদ চৌধুরী, আল মুজাহিদী, হোসেন মীর মোশাররফ, মাসুদ আলী, মাহবুবুর রহমান মোরশেদ, খালেক বিন জয়েন উদ্দিন, লুৎফর রহমান রিটন, হোসেনুজ্জামান আল আমীন সহ আরও অনেকে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ফুলকুঁড়ির জনপ্রিয় বিভাগ ‘সব জান্তার উত্তর’ এই সংখ্যা থেকেই চালু হয়েছিল- যা এখনো অব্যাহত আছে। আর ‘প্রশ্ন জাগে অনেক’ বিভাগটি প্রথম সংকলনের মতো এ সংখ্যাটিতেও লিখেছিলেন আবদুল বারী।
আশরাফ সিদ্দিকী ‘মন ছুটে যায়’ কবিতায় লিখেছিলেন-
আজ শরতের হালকা হাওয়ায়
রূপকাহিনীর গাঁয়
বারে বারে উদাস আমার
মন যে ছুটে যায়।
অশোক-পলাশ বনের ধারে
চম্পা নদীর বাঁকে
সোনার টিয়া গান বাঁধে ভাই
যেথায় ঝাঁকে ঝাঁকে।
আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন ‘গাধার সাধ’ কবিতায় লিখেছিলেন-
ধোপার গাধার সাধ হয়েছে করবে পড়ালেখা
নিত্য যাবে পাঠশালাতে অনেক হবে শেখা।
মুটের মত পরের কাপড় বইবে না সে আর
বোঝার ভারে ধোপার গুঁতোয় জীবন হলো ছার।
‘একটি ইঁদুরের গল্প’ ছড়ায় আসাদ চৌধুরী লিখলেন-
একটি ইঁদুর কাটুস কুটুস কুট
কাগজপত্র, সাবান, কাপড় লুট।
জঙ্গী মেজাজ কেবল দেখায়,
করছে সাবাড় সামনে যা পায়,
তামাক, পনির, চেয়ার কি বিস্কুট।
লুৎফর রহমান রিটন ‘বাসস এনার খবর’ ছড়ায় লিখেছিলেন-
বাসস-এনার খবর শোনো
ডিম পেড়েছে ছাগল,
তিড়িং বিড়িং লাফিয়ে কেবল
ভাংছে ক্ষেতের আগল!
‘লেবেনচুস’ গল্পে হোসেন মীর মোশাররফ লিখেছিলেন- “লেবেনচুস এক বাঁদরের নাম। সে এখন মীরপুর চিড়িয়াখানায় থাকে। সে আগে থাকত সুন্দরবনের এক জলপাই গাছে। সেখানে এক বেদে মেয়ের কাছে ধরা পড়ে। তার কাছ থেকে লেবেনচুসকে কিনে নেয় খুলনা পৌরসভা কর্তৃপক্ষ। সেই পৌরসভার চেয়ারম্যান ঢাকার শিশুদের এই বাঁদর উপহার দিয়েছেন। ঢাকার ছেলেমেয়েরা এই বাঁদরের নাম দিয়েছে লেবেনচুস।”
রোজার ডোভাইসনের গল্প অবলম্বনে ‘প্যাকপ্যাক্’ গল্পে মাসুদ আলী লেখেন- “এক ভোরে প্যাপ্যাক্ ঝোপঝাড়ের মধ্য দিয়ে মনের আনন্দে হেঁটে চলছিল। টুক করে ঠোঁট দিয়ে একটা ছোট পোকা ধরলো। তিন-পাপড়ির টকপাতা ছিঁড়লো একটা। ঘাসের উপরে শিশির কণা নিয়ে খেললো কিছুক্ষণ।” (চলবে)
প্রকাশকাল : মে, ২০০৮



