ম্যাপ : এক খণ্ড কাগজে দুনিয়া হাজির (পর্ব-২)

আবরার হক

0
34

আসসালামু আলাইকুম বন্ধুরা। শীতের হিমেল পরশমাখা কাঁথামুড়ি দেয়া দিনগুলি পেরিয়ে আমরা এখন বসন্তের সুন্দর দিনগুলোতে প্রবেশ করছি। এই সুন্দর সময়ে চলো, নিজেদের জানার গণ্ডিকে আরেকটু বড় করে নেয়ার চেষ্টা করি। গত লেখায় আমরা দেশ, জেলা বা আরো ছোট জায়গার ম্যাপ নিয়ে জেনেছি। এ পর্যায়ে আমরা ওয়ার্ল্ড ম্যাপ নিয়ে জানার চেষ্টা করবো।
আচ্ছা, আমরা সাধারণত বাসা বা স্কুলে দেয়ালে টানানো যে ম্যাপ দেখে থাকি, সেই ম্যাপ দেখে বলো তো আফ্রিকা মহাদেশ বড়, নাকি গ্রিনল্যান্ড দ্বীপ বড়? সাধারণভাবে কাগজে ছাপানো যে কোনো ম্যাপে দেখলে গ্রিনল্যান্ড দ্বীপ আর আফ্রিকা মহাদেশকে কাছাকাছি সাইজের মনে হয়। কিন্তু বাস্তবে আফ্রিকা মহাদেশের কেবল আলজেরিয়া দেশটিই আয়তনে গ্রিনল্যান্ডের চাইতে বড়, এমনকি ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো দেশটিও গ্রিনল্যান্ডের চাইতে বড়। গ্রিনল্যান্ডের আয়তন যেখানে ২১.৬৬ লক্ষ বর্গকিলোমিটার (বকিমি), সেখানে এই দুইটি দেশের আয়তন যথাক্রমে ২৩.৮২ লক্ষ বকিমি ও ২৩.৪৫ লক্ষ বকিমি। আর আফ্রিকা মহাদেশের আয়তন? সে তো গ্রিনল্যান্ডের চাইতে অন্নেক বিশাল, মানে প্রায় ১৪ গুণ বড়, এর আয়তন ৩ কোটি ৩ লক্ষ বকিমিরও বেশি।
এখন নিশ্চয়ই তোমার মাথার মধ্যে একটা প্রশ্ন কিলবিল করছে, বাস্তব অবস্থা, আর আমাদের সবসময়কার দেখা মানচিত্রের মধ্যে এত পার্থক্য কেন? এর কারণ বুঝতে হলে কতগুলো সহজ ব্যাপার সামনে রাখতে হবে। আমরা যে ম্যাপ দেখি, সেগুলো কাগজে, বা ফ্ল্যাট আকৃতির। কিন্তু পৃথিবী কি এমন? অবশ্যই না। আমরা সবাই জানি পৃথিবীর আকার মোটামুটি গোলাকার। একপাশে একটু চাপা হলেও মোটাদাগে একে গোলাকারই বলা যায়। এখন তুমিই বলো গোলাকার সাইজের কিছুকে কি চারকোণায় প্রকাশ করা যাবে? একটু প্র‍্যাক্টিকাল উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা বুঝার চেষ্টা করি চলো। পৃথিবীর আকৃতি অনেকটা কমলার মতো। এখন এই কমলার খোসা ছাড়িয়ে নিয়ে তুমি কি একে চারকোণা বানাতে পারবে? দেখবে মাঝখানের অংশটা যতটা চ্যাপ্টা হয়েছে, উপরে আর নিচের দিকে মাঝে মাঝে ফাঁকা থেকে যাচ্ছে। এভাবেই মূলত কাগজে ম্যাপ আঁকতে গিয়ে এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। তো এই সমস্যার সমাধান নিয়ে ভূগোলের বিশেষজ্ঞরা অনেক ধরনের বুদ্ধি-আইডিয়া কাজে লাগিয়ে কোনোটাতেই একেবারে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তাদের বিভিন্ন জনের দেয়া বিভিন্ন আইডিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ম্যাপটাকে বলা হয় মার্কেটার প্রজেকশন। ষোড়শ শতকের বেলজিয়ান ভূগোলবিদ ও মানচিত্রবিশারদ জেরারডাস মার্কেটারের নাম থেকে এই নাম এসেছে, যিনি এই ডিজাইনের আসল কারিগর।

মার্কেটার সাহেব যখন এই ম্যাপ তৈরি করছিলেন, তখন এমন ম্যাপের উপর নির্ভর করেই কিন্তু মানুষ সারা পৃথিবী চষে বেড়িয়েছিলেন। ভাস্কো ডা গামা যখন ভারতবর্ষে এসেছিল সেই ১৪৯৮ সালে, তখন তার আশ্রয়ও ছিল এমন কোনো না কোনো ম্যাপের কাগজ। কিংবা আগের সময়ে যখন কোনো রাজা বা সম্রাট শত্রুদেশের উপর আক্রমণের প্ল্যান করতো, তখন তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রেও থাকতো বিভিন্ন কিছু নির্দেশ করে রাখা কোনো মানচিত্র। যেহেতু আজকের দিনের মতো জিপিএস সিস্টেম ছিল না, তাই ম্যাপের একটু এদিক সেদিক ভয়ঙ্কর বিপদও ডেকে নিয়ে আসতে পারতো তখন।
মার্কেটারের এই ম্যাপে সবগুলো দেশের শেপ বা আকার ঠিক থাকে, এক দেশ থেকে আরেক দেশের দিকও ঠিক থাকে। কিন্তু গণ্ডগোল লাগে সাইজে। মাঝখানের দিক থেকে যত উপরে বা নিচে যাওয়া হবে, দেশের আকারগুলোকে যেন টেনে বড় করে ফেলা হয়েছে। একারণেই মানচিত্রের উপর দিকে থাকা যে রাশিয়াকে দেখে পূর্ব পশ্চিম অনেক দীর্ঘ মনে হয়, তা এদিক থেকেও আফ্রিকার চেয়ে ছোট। পূর্ব পশ্চিমে রাশিয়ার দৈর্ঘ্য যেখানে ৬,৩০০ কিমি, সেখানে আফ্রিকার দৈর্ঘ্য ৭,৩০০ কিমি। আবার একেবারে নিচের দিকে থাকা এন্টার্কটিকা মহাদেশকে আয়তনে প্রকাণ্ড মনে হলেও, আদতে তা এর চেয়ে ঢের ছোট। এরকম কোনো দেশের আকার আসলে কতবড়, বিশেষত অন্য যে কারো সাথে তুলনা করার জন্য, তা https://thetruesize.com/ ওয়েবসাইটে গিয়ে বেশ সহজে দেখতে পারবে। আমি নিশ্চিত, তুমি বেশ মজা পাবে এটা দেখতে গেলে।
এই যে কাগজের ফ্ল্যাট ম্যাপে এত সমস্যা, এ সমস্যার সমাধানের জন্য আছে গ্লোব বা গোলাকার আকৃতির মানচিত্র। এতে সবগুলো দেশের প্রকৃত আকার ফুটে ওঠে। স্বল্প দামেই স্ট্যান্ডযুক্ত এমন মানচিত্র পাওয়া যায়। তুমি চাইলে তোমার পড়ার টেবিলের জন্য একটা মানচিত্র সংগ্রহ করতে পারো। মাঝেমধ্যে সেটাকে ঘুরিয়ে দেখতে পারো, আর মজা করে বন্ধুদের দেখাতেও পারো, কীভাবে তোমার হাতের ইশারায় পৃথিবী ঘুরছে!

আমরা সবাই জানি, প্রশান্ত মহাসাগর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মহাসাগর। কিন্তু এটা আসলে কত বড়ো? সাধারণ কাগজের ম্যাপ দেখলে আমরা প্রশান্ত মহাসাগরের আয়তন ভালো করে বুঝতে পারি না। অথচ এর আয়তন গোটা স্থলভাগের চেয়েও বেশি। তুমি যদি মহাকাশে কখনো যাও, পৃথিবীর ঘুর্ণনকালে তুমি এমন সময়ও পাবে, যখন প্রশান্ত মহাসাগর ছাড়া আর তেমন কিছুই দেখতে পাবে না। এখন অবশ্য তুমি Google Earth ব্যবহার করেও তা দেখে নিতে পারো।
আমরা এতক্ষণ যে ম্যাপ নিয়ে কথা বললাম, অর্থাৎ যেখানে বিভিন্ন দেশের আকার, অবস্থান ইত্যাদি নির্দেশ করা থাকে, এটিই কিন্তু ম্যাপের একমাত্র ধরন নয়। এরকম ম্যাপকে বলা হয় রাজনৈতিক ম্যাপ। এর বাইরেও অনেক ধরনের ম্যাপ আছে। এই যেমন একটা আছে, ফিজিক্যাল বা প্রাকৃতিক ম্যাপ। এতে পাহাড়, পর্বত, নদী, সমুদ্র, সমতল ইত্যাদি দেখানো থাকে। এমনকি সমুদ্রের গভীরতার তারতম্য অনুযায়ী নীলের গাঢ় ঘনত্বও কমবেশি হতে পারে। এছাড়া আরো এক ধরনের ম্যাপ দেখে থাকতে পারো তুমি। বাবা চাচারা যখন জমির কাগজপত্র নাড়াচাড়া করেন, সেখানে দেখবে এক ধরনের ম্যাপ আছে, যাতে শুধু অনেকগুলো সংখ্যা লেখা আর ছোট ছোট ঘর আঁকা। এগুলোকে বলে মৌজা ম্যাপ। ইংরেজিতে বলে ক্যাডাস্ট্রাল ম্যাপ। এই ম্যাপে একেবারে প্লট, মানে মালিকানা অনুযায়ী জায়গার ছোট ছোট ভাগ পর্যন্ত চিহ্নিত করা থাকে। জায়গা-জমি মাপতে, বন্টন করতে এই ম্যাপের ব্যবহার করা হয়।
আচ্ছা, তোমাকে যদি বলি, পৃথিবীর কোন জায়গায় কোনো একজন মানুষ অবস্থান করছে, তা কেবল দুইটা সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব, তোমার কি বিশ্বাস হবে? এটা কিন্তু খুবই বাস্তব কথা। উত্তর দক্ষিণে পৃথিবীকে ১৮০ ভাগে ভাগ করা হয়েছে, আবার একইভাবে পূর্ব পশ্চিমে ৩৬০ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এখানে ভাগ মানে কিন্তু আপেল কেটে ভাগ করার মতো ভাগ নয়, বরং কতগুলো রেখা কল্পনা করে নেয়া হয়েছে। তুমি ছাপানো ম্যাপের ছবি দেখলে সেখানে এই দাগগুলো দেখতে পাবে। এই ভাগগুলোকে ডিগ্রি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। পূর্বপশ্চিম কল্পনা করা রেখাগুলোকে অক্ষরেখা আর উত্তর দক্ষিণ কল্পনা করা রেখাগুলোকে দ্রাঘিমা রেখা বলা হয়। তুমি যদি কোনো স্থানের সঠিক অক্ষরেখার অবস্থান ও দ্রাঘিমারেখার অবস্থান জানাতে পারো, তা দিয়েই সেই জায়গাটি একেবারে পিনপয়েন্ট চিহ্নিত করা সম্ভব। এই কাজটাকে আরো সহজ করে দিয়েছে গুগল ম্যাপ আর গুগল আর্থের মত সফটওয়্যারগুলো। যেমন, বাংলাদেশের সংসদ ভবন। এটাকে তুমি গুগল ম্যাপ বা গুগল আর্থে সংসদ ভবন লিখে খুঁজে পাবে, সে তো জানা কথাই। কিন্তু ২৩.৭৬২২২২°, ৯০.৩৭৮৬১১° এই সংখ্যা দুইটি যদি এভাবে সার্চবক্সে দাও, দেখবে তাহলেও কিন্তু ম্যাজিকের মতো সংসদ ভবন তোমার সামনে হাজির হয়ে যাবে।
তুমি কিন্তু এভাবে যে কোনো জায়গার অবস্থান নিজে নিজেই বের করতে পারবে। কীভাবে জানো? ফোনে গুগল ম্যাপ ওপেন করে যেকোনো জায়গায় প্রেস করে থাকলেই দেখবে স্ক্রিনে ঐ জায়গার এই নাম্বার, যেটাকে লোকেশন কো-অর্ডিনেট বলা হয়, সেটি ভেসে উঠবে। আর যদি পিসিতে ওপেন করে থাকো, তাহলে জাস্ট নির্দিষ্ট জায়গার উপর কার্সর নিয়ে গিয়ে মাউসের রাইট বাটন ক্লিক করলেই এটা ভেসে উঠবে। তুমি চাইলে এভাবে বিভিন্ন জায়গার কো-অর্ডিনেট শেয়ার করে বন্ধুদের সাথে মজার মজার গেমসও করতে পারো কিন্তু!
বন্ধুরা, ম্যাপ নিয়ে আমরা দুই পর্বে বেশ কিছু মৌলিক কথা জানতে পারলাম। দেখলে, ম্যাপ কিন্তু মোটেও বোরিং কোনো ইস্যু না। একটু মজা করে জানার চেষ্টা করলেই অনেক মজার মজার বিষয় জানা যাবে। তোমাদের আগ্রহের ঝুড়ি নতুন নতুন বিভিন্ন কিছু দিয়ে ভরে উঠুক, সে প্রত্যাশায় এবারের মতো বিদায়, আল্লাহ হাফেজ।

Author