ম্যাপ : এক খণ্ড কাগজে পৃথিবী হাজির (প্রথম পর্ব)

আবরার হক

0
63

আসসালামু আলাইকুম বন্ধুরা। আশা করছি তোমরা সব্বাই অনেক ভালো আছ। নতুন বছরের এই সময়ে শীতের দিনের কাঁপাকাঁপিময় শুভেচ্ছা।
বন্ধুরা, আমাদের মুসলমাদের কোনদিক হয়ে নামাজ পড়তে হয় বলো তো? মনে মনে নিশ্চয় ভাবছ, এ আবার কেমন প্রশ্ন? এ তো সবাই জানে, পশ্চিম দিকে। তুমি নিজেও হয়তো কিছুক্ষণ আগে পশ্চিমমুখী হয়ে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়েছ। কিন্তু আমেরিকায় যে মুসলমান বসবাস করে, সেও কি পশ্চিম দিকে নামাজ পড়ে? না, সে বরং অনেকটা পূর্ব দিক হয়ে নামাজ পড়ে। ঠিক পূর্ব নয়, বরং দক্ষিণ- পূর্ব, যাকে বাংলা ভাষায় অগ্নি দিকও বলা হয়। আসল ব্যাপারটা হলো, মুসলমানদের কেবলা হলো আসলে কাবার দিকে। যে কারো স্থান থেকে কাবা যেইদিকে, সে সেইদিকে হয়েই নামাজ পড়বে।
এখন তুমি বড়দের কাছ থেকে বা বই থেকে জেনেছ যে কাবা ঘর আমাদের থেকে পশ্চিম দিকে। কিন্তু তুমি কি দেখেছ? তুমি কিন্তু চাইলেই দেখতে পারো। কীভাবে? নিজের বাসা থেকে সোজা পশ্চিম দিকে হেঁটে গিয়ে কাবাঘরে পৌঁছানোর মাধ্যমে? এভাবে ভাবলে তো আর বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। এজন্য স্মার্ট সলিউশান হচ্ছে ম্যাপ বা মানচিত্র। পুরো পৃথিবীর যে কোনো জায়গা তোমার থেকে কোনদিকে, এমনকি কতদূরে, সেটাও তুমি সিম্পলি একটা ম্যাপ দেখেই বুঝে নিতে পারবে। ইন্টারস্টিং না? চলো, আজ আমরা এই ম্যাপ নিয়েই কিছু জানার চেষ্টা করি।

ম্যাপ জিনিসটা কী, সেটা বুঝার জন্য ম্যাপ দিয়ে আমরা কী করতে পারি, তা বুঝে নিই আগে। মনে করো, তুমি নতুন কোনো জায়গায় যেতে চাচ্ছো, যেখানে কখনো যাওনি, তাহলে কী করবে? বড়দের কাছ থেকে জেনে নিবে কীভাবে যেতে হয়। উনি হয়তো বলবেন, বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তা ধরে কিছুদূর ডানদিকে গেলে তারপর একটা মুদির দোকান, তারপর বামদিকে রাস্তা ধরে গেলে একটা চৌরাস্তা… এভাবে। কিন্তু কেউ যদি এই ব্যাপারটা তোমার সামনে কাগজে এঁকে দেয়? এটাকেই ম্যাপ বলে। সহজভাবে বুঝতে হলে বলতে হয়, যখন আমরা কোনো এলাকার বিভিন্ন জায়গা, স্থাপনা, রাস্তা ইত্যাদি কোনো কাগজে এমনভাবে আঁকি, যাতে ঐ জায়গাগুলোর অবস্থান বুঝতে পারা যায়, তখন তাকে ম্যাপ বলে।
ম্যাপ অসংখ্য ধরনের হয়ে থাকে। এর কিছু কিছু ধরন আমাদের খুবই পরিচিত, আমরা বিভিন্ন জায়গায় দেখে থাকি, এমনকি আমাদের অনেকের বাড়িতেও হয়তো আছে। আবার কিছু ধরন আছে এমন, যা আছে একেবারে স্পেশালিস্ট ছাড়া অন্যদের কোনো কাজেই লাগে না।
বাংলাদেশের মানচিত্র দিয়েই আলাপ শুরু করা যাক। তোমরা তোমাদের বইয়ে পৃষ্ঠাজুড়ে এই মানচিত্র নিশ্চয়ই দেখেছ। এতে বাংলাদেশের সব জেলার নাম আছে, কোনটা রাজধানী, কোথায় বিভাগীয় শহর, কোথায় জেলা শহর, এগুলো আলাদা আলাদা চিহ্ন দেয়া আছে। দেখেছ না এমন? এই ম্যাপ দেখে তুমি তোমার জেলার নামটাও খুঁজে নিয়েছিলে হয়তো। এবার আমরা এই ম্যাপের ব্যবহার নিয়ে একটু জানার চেষ্টা করি। তোমাদের সুবিধার জন্য এই লেখার সাথেই একটা বাংলাদেশের মানচিত্র যুক্ত করে দেয়া হয়েছে। প্রথমত তুমি এই ম্যাপ দিয়ে বাংলাদেশের সব জেলার নাম আর সেগুলোর অবস্থান দেখতে পারছ। মনে করো, তোমার বাড়ি জামালপুর জেলায়। ম্যাপ দেখে কিন্তু তুমি সহজেই বলে দিতে পারবে বাংলাদেশের কোন জেলা তোমার থেকে কোনদিকে অবস্থিত। মজার না? আরো আছে। কোন জেলা কাছে, আবার কোন জেলা দূরে, সেটাও বলতে পারছ। শুধু কি তাই? এক জেলা থেকে আরেক জেলার আনুমানিক দূরত্বও তুমি বের করে ফেলতে পারবে। কীভাবে জানো? প্রতিটা ম্যাপের সাথে স্কেল দেয়া থাকে; যেখানে বলা থাকে, ম্যাপের এক ইঞ্চি বাস্তবের কত দৈর্ঘ্যকে বুঝায়। মনে করো কোনো ম্যাপ এমনভাবে আঁকা, যেখানে ম্যাপের এক ইঞ্চি = বাস্তবের ৫০ কিমি। তাহলে ঐ ম্যাপে তুমি যদি দুইটা জায়গার দূরত্ব স্কেল দিয়ে মেপে ৪ ইঞ্চি পাও, তাহলে বাস্তবে ঐ জায়গা দুটোর দূরত্ব হবে ২০০ কিমি। এভাবে তুমি অনেক দূরের জায়গাও এর মাধ্যমে জেনে নিতে পারবে। তবে একটা বিষয় একটু সতর্ক থাকতে হবে। এই দূরত্ব কিন্তু সোজাসুজি দূরত্ব, রাস্তার দূরত্ব না। কারণ রাস্তা তো একদম সোজাসুজি হয় না। তাই ম্যাপ দেখে যতটুকু দূরে মনে হবে, রাস্তায় সেটা আরেকটু বেশিও হতে পারে।
ম্যাপের মধ্যে দেখবে এক জেলা থেকে আরেক জেলা পৃথক করার জন্য দাগ টানা আছে। খেয়াল করে দেখবে দাগগুলো একরকম না, কিছু কিছু দাগ একটু ভিন্ন, হয়তো একটু মোটা, অথবা কিছু আছে ডট বা ড্যাশ দেয়া। এগুলো আলাদা হয় কেন? এটা বুঝার জন্য দেখবে ম্যাপের সাথে একটা বক্স থাকে, যেখানে এসবের মানে লেখা থাকে। সেখানে দেয়া থাকে, কোনটা আন্তর্জাতিক সীমানা, কোনটা বিভাগের সীমানা, কোনটা জেলার সীমানা ইত্যাদি। এছাড়াও থাকে রাজধানী, জেলা সদর বা বিভাগীয় সদরের অবস্থান। যেমন, আমরা জানি বাংলাদেশের বৃহত্তম জেলা হলো রাঙামাটি। এখন রাঙামাটির জেলা শহর কি সম্পূর্ণ জেলাজুড়ে বিস্তৃত? তা তো না। ম্যাপ এক্ষেত্রেও আমাদের ঠিকঠাক পজিশন জানতে সাহায্য করে।

ম্যাপ যে কেবল দেশের হতে পারে, তা কিন্তু নয়। ম্যাপ আরো বড় জায়গার, যেমন মহাদেশ বা পুরো বিশ্বেরও হতে পারে, যেমনটা তোমরা অনেকেই এরমধ্যে হয়তো দেখেছ। একইভাবে ছোট জায়গার, যেমন কোনো বিভাগ, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন/ওয়ার্ড, এমনকি কোনো গ্রাম বা পাড়ারও ম্যাপ হতে পারে। আমরা উপরে স্কেলের কথা জেনেছি। মনে করো, আমরা যে কোনো ম্যাপই তোমার বইয়ের এক পৃষ্ঠার মধ্যেই আঁকব। তাহলে কী হবে? যত ছোট জায়গার ম্যাপ হবে, তত বেশি ডিটেইল বা বিস্তারিত সেখানে দেখার সুযোগ থাকবে। আর বড় জায়গার ক্ষেত্রে হবে উল্টো। একটু বুঝিয়েই বললেই ব্যাপারটা একদম জলবত তরলং হয়ে যাবে। ধরো তোমাদের যে পাড়া আছে, সেই পাড়ার ম্যাপ যদি এক পৃষ্ঠাজুড়ে আঁকা হয়, তাহলে সব বিল্ডিং বা বাড়ি, রাস্তা/গলি, মসজিদ, মন্দির, স্কুল, খেলার মাঠ, দোকান ইত্যাদি চিহ্নিত করা যাবে। কিন্তু বাংলাদেশের ম্যাপে কি এভাবে সব দেখানো যাবে? বাড়ি বা রাস্তা দূরে থাক, এক পৃষ্ঠাজুড়ে করা বাংলাদেশের ম্যাপে সব উপজেলার নামই তো দেয়া যাবে না। সেজন্য যত বড় এলাকার ম্যাপ হবে, তার স্কেল তত ছোট হবে। এবং ছোট এলাকার ম্যাপের ক্ষেত্রে হবে উল্টোটা, বড় স্কেল। এ পর্যায়ে এসে, স্কেল বড় ছোট হওয়ার এ ব্যাপারটা একটু বুঝা দরকার। চাপ নিও না, সহজ একদম। ধরো তোমাদের পাড়ার যে ম্যাপ, তাতে ১ ইঞ্চি = ২০ মিটার হয়। মানে তোমাদের পাড়া যদি ২০০ মিটার দীর্ঘ হয়, তাহলে ম্যাপে সেটা ১০ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের মধ্যেই দেখা যাবে। কিন্তু বাংলাদেশের ম্যাপ হলে? সেক্ষেত্রে দেখা যাবে ১ ইঞ্চি দিয়ে অন্তত ৫০ কিলোমিটার হচ্ছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ম্যাপের স্কেল হচ্ছে ছোট বা ক্ষুদ্র স্কেল, আর তোমার পাড়ার ম্যাপ হচ্ছে বড় স্কেল।

এরপরে ম্যাপের যে বিষয়টি বুঝা দরকার, তা হলো লিজেন্ড। এখানে লিজেন্ড মানে ব্যাখ্যামূলক বর্ণনা। তোমার পাড়ার যে ঘর, রাস্তা, মসজিদ, মন্দির, মার্কেট, খেলার মাঠ ইত্যাদি আছে, সেগুলো তো ম্যাপে দেখাতে গেলে অনেক ছোট হয়ে যাবে, যেটা আমরা আগেই জেনেছি। ম্যাপের ছোট ড্রয়িং দেখে কীভাবে বুঝবে কোনটা কী? সেজন্য ঘর, দোকান ইত্যাদির জন্য আলাদা আলাদা কিছু চিহ্ন ব্যবহার করা হয়, যেন ঐ ছোট চিহ্ন দেখেই বুঝা যায়, ওখানে আসলে কী আছে। এই চিহ্নগুলোকে বলা হয় লিজেন্ড, আর ম্যাপের একপাশে যে বক্সে এই লিজেন্ডগুলোর ব্যাখ্যা দেয়া থাকে, তাকে বলে লিজেন্ড বক্স। লিজেন্ডকে অবশ্য ম্যাপ কী (Map Key) নামেও বলা হয়।

(কিছু ম্যাপে বামপাশের ছবির মতো কেবল উত্তর দিক দেখানো থাকে, আর কোথাও চারদিকই দেখানো থাকে)
ম্যাপ সম্পর্কে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে একদম ভুলেই গেছি। সেটা হলো ম্যাপের দিক। বাংলাদেশের মানচিত্র তোমরা অনেক দেখেছ হয়তো। কিন্তু কখনো কি সেখানে কক্সবাজারকে উপরদিকে আর পঞ্চগড়কে নিচের দিকে দেখেছ? আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, দেখোনি। এর কারণ জানো? ম্যাপ আঁকার সময় দিক ঠিকমতো হচ্ছে কি না, এটা গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাপে সবসময় উত্তর দিক উপর দিকে, দক্ষিণ দিক নিচ দিকে, পূর্ব দিক ডান দিকে, আর পশ্চিম দিক বাম দিকে হয়ে থাকে। এজন্যই বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের জেলা কক্সবাজার ম্যাপে সবসময় নিচের দিকে থাকে। অনেক ম্যাপে একপাশে এই দিকের ব্যাপারটা কম্পাসের তো একটা চিহ্ন দিয়ে উল্লেখও করা থাকে।

এখনকার সময়ে ম্যাপের অনেক স্মার্ট ভার্সন আমাদের স্মার্টফোন বা ল্যাপটপেই আমরা পেয়ে যাই। কিন্তু স্মার্টফোন বা এরকম আধুনিক ডিভাইস তো ৫০ বছর আগেও ছিল না, মানুষ এত স্মার্ট কিছুর কথা তখনো ভাবতেও পারেনি। কিন্তু সে সময়ে মানুষ বিশ্ব ভ্রমণ করেছে, আলেকজান্ডারের মতো কেউবা আবার যুদ্ধ জয় করতেও বের হয়েছে। আমরা রাসুল সা এর কিশোর বয়সে চাচার সাথে সিরিয়া যাওয়ার কথাও জেনেছি। তখন মানুষের এই দূরযাত্রাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন ছিল এই ম্যাপ। যদিও তখনকার ম্যাপগুলো এখনকার ম্যাপের মতো নিখুঁত ছিল না, কিন্তু সেই সময়ের মানুষদের কাজগুলোর ধীরে ধীরে উন্নতির ফলেই আমরা আজকের দিনের এত স্মার্ট ম্যাপ দেখছি। ম্যাপ নিয়ে লেখার এটা আমাদের প্রথম পর্ব। পরের পর্বে আমরা আরো কিছু মজার মজার জিনিস জানবো, সে পর্যন্ত তোমাদের শীতের পিঠা খাওয়ার নিমন্ত্রণ জানিয়ে শেষ করছি। আল্লাহ হাফেজ। ০

Author