পরদিন সকাল বেলা নাস্তা খেয়েই আজগরমামা সবাইকে নিয়ে রওনা দিলেন। মিজানও তাদের সঙ্গে আছে। পথঘাট সে-ই দেখিয়ে দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তবে মিজান খুব ভয়ে ভয়ে আছে। তার হাতে একটা লোহার টুকরা। লোহা থাকলে ভূত কাছে আসে না, আর গলায় ‘আয়াতুল কুরসী’ লেখা তাবিজ ঝোলানো খুবই উপকারী জিনিস।
জায়গাটা একদম ঠান্ডা। স্যাঁত স্যাঁতে পরিবেশ। সূর্যের আলো এখানে পৌঁছায় না। গাছগুলোও বড় বড়, কাছেই একটা পুরনো ব্রিটিশ আমলের বাংলো বাড়ি দেখা যাচ্ছে। দেয়ালের আস্তর খসে পড়েছে অনেক আগেই। ইটের ফাঁকগুলো দিয়ে শ্যাওলা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।
শিশির বলল, মা-মা-মামা, আমার কেমন যেন ভ-ভ-ভয় লাগছে।
মামা বিরক্ত কণ্ঠে বললেন, কৈ আমারতো ভয় লাগছে না। আগেই বলেছিলাম, যারা ভয় পাবে, তারা আসবে না, এখনও সময় আছে, বাসায় গেলে চলে যেতে পারো, তবে কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে পাব না।
শিশির আর কিছু বলল না। শীতের সকাল, কিন্তু রোদ উঠে গেছে অনেক আগেই। এদিকটায় গাছপালার জন্য রোদ প্রবেশ করতে পারে না। তাই কেমন যেন গা ছমছম করা ভূতুড়ে পরিবেশ তৈরী হয়েছে।
মামা হাতের ইশারায় সবাইকে থামতে বললেন, আগেই বলে রাখি, ভয় পাবার কিছু নেই। কোন কুচক্রী মহল মিথ্যা ভয় দেখিয়ে জায়গাটাকে অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে। আমরা গ্রামের মানুষকে মিথ্যা ভয়ের মধ্যে থাকতে দিতে পারি না। কি বলো? মামা সবার রায় জানতে চাইলেন।
সবাই মামার কথায় সায় দিল। মামা আবার বলতে শুরু করলেন, আমি দু’জনকে নিয়ে ভিতরে যাব। বাকীরা সবাই বাইরে দাঁড়াবে। ঠিক আছে?
বলেই মামা অজয় ও মিঠুকে কাছে ডাকলেন। বললেন, এ দু’টো ছেলে অসম্ভব সাহসী। ওদেরকে নিয়ে আমি ভিতরে যাচ্ছি। রানা, শিশির তোমরা মিজানের সাথে বাসায় চলে যাও। সাহেদ, তুমি মাসুদকে নিয়ে থানায় চলে যাবে এবং যদি দেখ এক ঘন্টার মধ্যে আমরা আসছি না তবে পুলিশ নিয়ে সোজা চলে আসবে। বাইরে দাঁড়াবে শিপলু আর খালেদ। কি, ঠিক আছে?
সবাই মামার কথামতো কাজ করল। শিপলুর মুখ ভয়ে কালো হয়ে গেছে। কোনো মানে আছে? ভূতের বাড়ির সামনে একা একা দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। না, না ভুল হলো একা কোথায়? সঙ্গে তো খালেদও আছে। ও ব্যাটার যা সাহস। এসব ভাবতে ভাবতে শিপলু একটা গাছের নিচে বসল।
আজগর মামা অজয়, মিঠুকে নিয়ে ভিতরে চলে এসেছেন। ভিতরটা প্রায় অন্ধকার। কিছুই দেখা যায় না। জায়গাটা অন্ধকার হতে পারে আন্দাজ করে মামা সবাইকে টর্চ আনতে বলেছিলেন। অজয়, মিঠু টর্চ জ্বালিয়ে নিল। মামা ব্যাগ থেকে মিনি চার্জার লাইটটা বের করে জ্বালালেন। এখন মোটামুটি প্রায় সব দেখা যাচ্ছে, মিঠু এক জায়গায় টর্চ মেরে স্তব্ধ হয়ে গেল। বলল, মামা দেখেন, ওখানটাতে কি পড়ে আছে।
দেখা গেল, অনেকগুলো সিগারেটের টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। একটা সিগারেট থেকে এখনও ধোঁয়া উঠছে। মামা প্রচন্ড অবাক হয়ে চারপাশে তাকাতে লাগলেন।
তার মানে এখানে কিছুক্ষণ আগেও কেউ ছিল।
তোমরা সতর্ক হয়ে যাও। যে কোন মুহূর্তে হামলা হতে পারে। আমরা ফাঁদে পড়ে গেছি; মামার কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই দরজায় খুট করে একটা শব্দ হল। দরজাটা মনে হয় বাইরে থেকে কেউ বন্ধ করে দিয়েছে। আসলেই তাই, অজয় দরজা টানাটানি করেও খুলতে পারল না।
মিঠু দৌড়ে গিয়ে দরজায় জোরে কয়েকটা লাথি মারল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। মামা বললেন, এগুলো ব্রিটিশ আমলের প্রাচীন দরজা। এগুলো খুব মজবুত হয়। আমাদের আগেই সন্দেহ করা উচিত ছিল এখানে নিশ্চয়ই কিছু একটা হচ্ছে। বলেই মামা চার্জার লাইন নিয়ে পুরো রুমটা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলেন। অজয়ের মুখ শুকিয়ে গেছে। মিঠুও করুণ দৃষ্টিতে চারপাশে দেখছে। এমন সময় বাইরে দৌড়াদৌড়ির আওয়াজ শোনা গেল। কিন্তু কোন কন্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে না।
মামা তার মোটা শরীরটা নিয়ে দেয়ালের কাছে গিয়ে কান পাতলেন। ফিসফিসিয়ে কে যেন ধমকের সুরে বলছে, ‘খবরদার কেউ শব্দ করবি না। সব ফেলে দে, সব। কোন চিহ্ন থাকলে তোদের সব কটাকে আমি অজগর দিয়ে খাওয়াব।’ কথাটা শুনেই আজগর সাহেব কেমন গম্ভীর হয়ে গেলেন। কি বলল লোকটা? অজগর নাকি আজগর? না, না, তা কি করে হয়। ওরা ওঁর নাম জানবে কি করে? আচ্ছা, ওরা কী ফেলে দিচ্ছে? নিশ্চয়ই কোন অবৈধ জিনিস। তার মানে ওরা সরে পড়ছে। এটাতো খুব চিন্তার বিষয়। তাহলে তো ওদের খুঁজে পাওয়া যাবে না। এসব কথা ভাবতে ভাবতে আজগর সাহেব সিগারেট ধরালেন।
ওদিকে শিপলুর মনে ভয় ঢুকে গেছে। সে বার বার চারদিকে তাকাচ্ছে। হঠাৎ মনে হল, খালেদ তার পাশে নেই। পিছনে তাকিয়ে দেখে খালেদ আসলেই ওর সঙ্গে নেই। এবার ওর ভয় দ্বিগুণ বেড়ে গেল। পাশেই তো ছিল, গেল কোথায়? গাছের উপরে কেমন যেন একটা শব্দ হচ্ছে। শিপলু ধীরে ধীরে উপরে তাকিয়ে দেখে গাছের ডালে একটা আস্ত কঙ্কাল দিব্যি পা ঝুলিয়ে বসে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। কঙ্কালটা বলে উঠল, এই তোর নাম কিরে? শিপলু ভয়ে দম ফেলতে ভুলে গেছে। শরীরে কাঁপাকাপি শুরু হয়ে গেছে। কোন মতে বলল, শি-শি-শিইইপলু।
নরকঙ্কালটা কি বীভৎসভাবে হেসে উঠল। বলল, আমি কিন্তু মেঁছোঁভূঁত নাঁ, আমি মাংঁসঁ ভূঁত। মাঁইনষেঁর রক্তও খাই। মেঁছোঁভূঁত ঐ গাঁছে।
শিপলু কঙ্কালটার কথামতো তাকিয়ে দেখে পাশের গাছে আরেকটা নরকঙ্কাল বসে আছে। ভয়ে ওর গলা শুকিয়ে গেছে। মুখ দিয়ে কেমন ঘো ঘো শব্দ বেরুল। ‘বাবা গো’ বলে বিরাট এক চিৎকার দিয়ে শিপলু দৌড় দিল। মনে হয় চোখ বন্ধ করেই দৌড় দিয়েছিল। বেশি দূর যেতে হল না একটা নারকেল গাছের সঙ্গে মুখোমুখি বাড়ি লেগে উল্টে পড়ে গেল। ওর কপাল কেটে রক্ত বেরুচ্ছে কিন্তু ওর জ্ঞান নেই।
ওদিকে খালেদ চুপি চুপি বাংলোটার পিছনে গিয়েছিলো। যা দেখল তাতে তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। অনেকগুলো মানুষ দৌড়াদৌড়ি করছে। সবার মাথায় কাঠের বাক্স। প্রতিটা বাক্সের মাথায় দড়ি বাঁধা। বাক্সগুলোকে লোকগুলো পুকুরে ফেলে দিয়ে দড়িগুলো একটা বাঁশে বেঁধে রাখছে। এতগুলো লোক কোথেকে এল? আর সবাই এমন তাড়াহুড়ো করছে কেন? খালেদের মনে সন্দেহ হল। দেখল, একজন বয়স্ক লোক সবাইকে ধমকাচ্ছে। লোকটা খুব মোটা এবং কালো। তবে খুব। লম্বা। মুখে তার কাঁচা-পাকা দাড়ি আর মাথায় লম্বা টুপি। এসব যখন দেখছিল, তখন খালেদের পিছনে একটা শব্দ হল। ঘুরেই তাকিয়ে দেখে, একজন চিকনা মতো লম্বা লোক ওর দিকে এগিয়ে আসছে। চোখে ভয়ঙ্কর দৃষ্টি, হাতে লাঠি। খালেদ কালবিলম্ব না করে হাতের টর্চটা ওর মাথা বরাবর ছুঁড়ে মারল। জায়গা মতোই লেগেছে। লোকটা উল্টে পড়ে গেল। খালেদের মনে হল, শিপলুর বিপদ। ও সেখান থেকে দৌড় দিল। জায়গামতো এসে দেখে শিপলু নেই। চারপাশে শিপলুকে খুঁজতে লাগল খালেদ। ওকে কেউ ধরে নিয়ে যায়নি তো? হাতের টর্চটাও তাড়াহুড়োয় ফেলে এসেছে। হাতে একটা অস্ত্র রাখা উচিত। এটা ভেবে খালেদ চারপাশে তাকাতে লাগল। কোন বাঁশের জন্য। নাহ কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না। হঠাৎ করে গাছের উপরে একটা শব্দ হল। খালেদ তাকিয়ে দেখে একটা কঙ্কাল ওর দিকে তাকিয়ে আছে।
এই ছোঁড়া তোঁর নাম কিরে? হি হি হি নড়ে চড়ে বলে উঠল কঙ্কালটা।
প্রথমবারের মতো দেখলে যে কেউ ভয় পেয়ে যাবে। খালেদও ভয় পেল। তবে নিজেকে সামলে নিল। ছোটবেলায় একবার বাজী ধরে শ্মশান ঘাটে একরাত ছিল, সহজে ভয় পাবার ছেলে সে নয়।
কঙ্কালটার প্রশ্নে উত্তর না দিয়ে সেটাকে ভাল করে দেখতে লাগল। কঙ্কালটা আবার নড়ে চড়ে বলে উঠল, তুই এখানে কি চাস?
তোর কাছে কিছু চাইনা। আমি আমার বন্ধুকে খুঁজছি। বলল খালেদ।
সেতো মরে গেছে। হি হি হি গনেশ ওকে খেয়ে ফেলেছে। হি হি হি বলেই হাত দিয়ে পাশের গাছটা দেখাল।
খালেদ তাকিয়ে দেখে পাশের গাছে আরেকটা কঙ্কাল। কিন্তু অত সহজে কঙ্কালকে বিশ্বাস করার পাত্র সে নয়। তাছাড়া, ভূতের তো এত জ্ঞান-বুদ্ধি থাকার কথা নয়। ব্যাটা যেভাবে জেরা করছে তাতে সন্দেহ হবারই কথা। আচ্ছা, ঐ কঙ্কালটার নাম কি বলল? গনেশ নাকি?ভূতের আবার নাম হয়? এসব কথা ভাবতে ভাবতে খালেদ গাছের পিছনে চলে গেল, যা আন্দাজ করেছিল তাই, উপরের ডালে এক লোক ঘাপটি মেরে বসে আছে। দু’হাত দিয়ে যেমন করে পুতুল নৃত্য হয় এখানেও সেই কাজটাই করা হচ্ছে। বদমাশ লোকটা বসেছে উপরের দিকের একটা ডালে। ডালপাতার জন্য ওকে সামনে থেকে দেখা যায় না। খালেদ জোরে দু’টো হাততালি দিল। লোকটা নিচে তাকিয়ে দেখে খালেদ দাঁড়িয়ে আছে। তাচ্ছিল্যের সঙ্গে খালেদ বলল, এই তাহলে গ্রামের মেছোভূত? লোকটা কিছু বলতে পারল না। থতমত খেল।
খালেদ দৌঁড়ে পাশের গাছ থেকে একটা মাঝারি ডাল ভেঙে নিল।
এবার ভূতের চেহারা আমি ভোতা না করেছি তো আমার নাম খালেদ না। এখনও সময় আছে, বল্ শিপলু কোথায়? রাগে খালেদের চোখ লাল হয়ে গেছে।
লোকটা করুণ সুরে বলল, গনেশ ওকে সিগন্যাল ঘরে নিয়ে গেছে।
আমার বন্ধুর কিছু হলে তোকে আমি পুকুরে ডুবিয়ে মারব, মনে রাখিস।
জ্বে ভাইজান, তিনারে কিচ্ছু করবে না, শুধু আটকে রাইখবে।
ভালোয় ভালোয় নেমে আয় বলছি। ভূতের বাচ্চা ভূত। খালেদ হাতের ডালটা এক হাত থেকে আরেক হাতে লোফালুফি করতে লাগল।
ওদিকে শাহেদ, মাসুদ হায়দরগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ি থেকে একজন এস.আই. এবং দু’জন হাবিলদার নিয়ে এসেছে। কন্সটেবল দু’জন প্রথমে আসতে চায়নি। অনেক বুঝানোর পর আসতে রাজী হয়েছে।
আজগর মামাকে অক্ষত দেখে ওরা খুশি কিন্তু খালেদ আর শিপলুর কোন পাত্তা নেই। মিঠু, মাসুদ চারপাশে তাকাতে লাগল।
আজগর সাহেব এস, আই. মঞ্জুরুল হাসানের কাছে গিয়ে বলল, আমাদের ফাঁদে ফেলার পর শুনি কে যেন শুধু ফেলে দেবার কথা বলছে। মনে হচ্ছে মালপত্র সরিয়ে ওরা লুকিয়ে পড়ার তালে আছে। এস. আই, হাসান হাতের লাঠিটা নাড়তে নাড়তে বললেন, আমিও সন্দেহ করেছিলাম এখানে গোপনে অবৈধ কিছু হয়। কিন্তু উপর থেকে অর্ডারের অভাবে কিছু করতে পারিনি।
এমন সময় অজয় চিৎকার করে উঠল, মামা দেখেন, কে আসছে!
সবাই তাকিয়ে দেখে অচেনা একটা লোক দু’হাত মাথার উপরে তুলে অপরাধীর মতো আসছে। পিছনে খালেদ একটা বড় লাঠি নিয়ে হাসতে হাসতে ওদের দিকে এগিয়ে আসছে। একপাশে শিপলু মাতালের মতো টলতে টলতে হাঁটছে।
খালেদ কাছে এসে বলল, এই হচ্ছে পুকুর পাড়ের মেছোভূত, বলেই হাতের লাঠিটা দিয়ে লোকটার পায়ে বাড়ি মারল। লোকটা কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমি আর কক্ষনো এমন কইরবো না। আমারে ছাইড়ে দ্যান।
এস.আই. হাসান অবাক হয়ে খালেদের দিকে তাকিয়ে বলল, আমিতো কিছুই বুঝতে পারছি না।
খালেদ বলতে লাগল, সার্কাসে নিশ্চয়ই পুতুলনৃত্য দেখেছেন। এব্যাটা সেভাবে হাত দিয়ে কঙ্কাল নেড়ে লোকজনকে ভয় দেখাতো। এর সঙ্গী পালিয়েছে। একটুর জন্য ধরতে পারিনি, শিপলুর দিকে তাকিয়ে বলল, ঐ ভীতুর ডিমটা ভয়ে পালাতে গিয়ে গাছের সঙ্গে বাড়ি খেয়েছে।
শিপলু রুমাল দিয়ে কপালটা পরিষ্কার করছে। অনেকটা জায়গা কেটে গেছে। চশমার একটা কাঁচও ভেঙ্গে গেছে।
এখানে এত হৈ চৈ কিসের? কে আমার বাগান লুটতে এলোরে? বলতে বলতে একটা লোক কাছে এগিয়ে এল। লোকটা খুব মোটা এবং মুখে কাঁচাপাকা দাঁড়ি আছে।
কি ব্যাপার, হচ্ছে কি এখানে? লোকটা এস.আই. হাসানের সামনে এসে দাঁড়াল।
মতিন সাহেব, আপনার বাগানটা এরা একটু ঘুরে দেখতে এসেছিল, এস.আই. হাসানের কথায় বুঝা গেল লোকটা গ্রামের মাতব্বর মতিন সাহেব।
এটা যে ভূতুড়ে জায়গা তা কি এরা জানেন না? মতিন মাতব্বরের কন্ঠস্বরে রাগ।
আজগর মামা এতক্ষণ চুপ করেছিলেন। তিনি বলে উঠলেন, ভূত বলে যে কিছু নেই, তাই আমরা প্রমাণ করতে এসেছিলাম এবং আমরা সফলও হয়েছি। ঐ দেখুন পুকুরপাড়ের মেছোভূত দাঁড়িয়ে আছে। বলেই আঙ্গুল দিয়ে লোকটাকে দেখালো।
মতিন সাহেব একটু কেশে উঠলেন, পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, দেখুন মশাইরা আপনাদের ভূতের ভয় না থাকতে পারে, আমার আছে। ক্ষতিতো আপনাদের কিছু হবে না, হবে আমাদের। এই গ্রামের মানুষের। মানে মানে কেটে পড়ুন, শুধু শুধু ঝামেলা বাড়াবেন না। বলেই গটমট করে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলেন।
সবাই হতবাক হয়ে তাঁর চলে যাওয়া দেখল। এস. আই. মুখ খুললেন, আজব লোকতো। যার জন্য করি চুরি সেই বলে চোর।
আজগর মামা বললেন, বাদ দিন স্যার, আপনি এই ছ্যাচোড়টাকে নিয়ে ভাল করে ছেচা দিন। সব কথা আপনি বেরিয়ে আসবে।
এস. আই. হাসান বললেন, কথা কিভাবে বের করতে হয় সে পদ্ধতি আমার জানা আছে। আজ তাহলে বিদায় নিতে হচ্ছে। আপনারা পুলিশের কাজ অনেক এগিয়ে দিলেন। By the by আপনারা উঠেছেন কোথায়?
শাহেদ বলল, মোশাররফ হোসেন হাওলাদারের বাড়ি। বাজারের একটু সামনে।
একজন কন্সটেবল বলে উঠল, স্যার, আমি চিনি, ঐ বাড়ির দুলাল সাহেব আমার পরিচিত।
আজগর মামা বললেন, দুপুর হয়ে গেল, জায়গাটা খুব অন্ধকার। বেশিক্ষণ থাকা নিরাপদ হবে না। ক্ষিধেয় পেট চো চোঁ করছে।
পরদিন সকালবেলা এস.আই, হাসান সঙ্গে দু’জন কন্সটেবল এবং থানার ও.সি. ফারুক হোসেনকে নিয়ে উপস্থিত হলেন। আজগর মামা সবাইকে কাচারী ঘরে বসালেন। শাহেদ সবাইকে নিয়ে উঠানে খেলছিল। পুলিশ দেখে খেলা বন্ধ করে সবাই কাচারী ঘরে ঢুকল।
সাব-ইন্সপেক্টর হাসান থানার ও.সি.কে উদ্দেশ্য করে বললেন, স্যার, আমিতো আগেই বলেছিলাম। কিছু একটা হচ্ছিল ওখানে। আপনি তো শুনতেই চাইতেন না, এখন দেখলেন তো, ছেলেরা সাহস করে গিয়েছিল বলেই না জানা গেল।
ও.সি. ফারুক হোসেন খুব মোটা মানুষ। শরীরটাও ছোটখাটো। ভারী কন্ঠে বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন। তবে আমরা নিজেরা আর কতটুকু করতে পারি? আমাদের হাত-পা’তো বলতে গেলে বাঁধা।
আজগর মামা ভিতরে গিয়েছিলেন। তিনি এসে বসলেন। সিগারেটের প্যাকেটটা টেবিলের উপর রেখে বললেন, ঐ ব্যাটার মুখ থেকে কিছু বের করতে পেরেছেন?
এস, আই, বীরত্বের হাসি হেসে বললেন, পেরেছি মানে, দু’টো বাড়ি না দিতেই হড়হড় করে সব বলে দিল। তবে মূল আসামীর নাম বলেনি। এতে নাকি ওর পরিবারের ক্ষতি হবে। অসুবিধা নেই, ওটা আমরাই বের করে নেব।
মামা জিজ্ঞেস করলেন, ওরা গাছের উপর ভূত সেজে বসে থাকতো কেন? এতে ওদের লাভটা কি?
ও.সি. ফারুক হোসেন বলতে শুরু করলেন। যে লোকটাকে ধরা হয়েছে, তার নাম মনু। সে সার্কাসে পুতুল নাচের খেলা দেখাত। পরে এই জায়গায় কাজ নেয়। ওর সঙ্গীর নাম গনেশ। সে পালিয়ে গেছে। তবে যাবে কোথায়? ঠিকই ধরে ফেলব।
এস, আই, হাসান এবার বাকীটা বললেন, ওরা আসলে চুনোপুঁটি। নাটের গুরু এখনও নাগালের বাইরে। ওরা ঐ বাড়ি থেকে হেরোইন পাচার করত, সেটাও অভিনব পদ্ধতি। মাছের পেটে ভর্তি করে। কিন্তু মনুর কথায় যা বুঝলাম, সব হেরোইন ওরা সরিয়ে ফেলেছে। ওদের সিষ্টেমটা লক্ষ্য করুন। গণেশ বসে থাকে সিগন্যাল রুমে। কাউকে আসতে দেখলে ওরা সতর্ক হয়ে যায়। প্রথমে ভূতের ভয় দেখায়, তাতে কাজ না হলে মারার চেষ্টা করে। এভাবেই ওরা গ্রামের কয়েকজন নিরীহ মানুষকে মেরেছে।
আজগর মামা শেষ হয়ে যাওয়া সিগারেটটা এসট্রেতে ফেলে দিয়ে বললেন, এজন্যই সেদিন সব ফেলে দেবার কথা বলছিল। কিন্তু ফেলল কোথায়?
ও.সি. সাহেব কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে কি যেন ভাবলেন। তারপর মুখ খুললেন, যেহেতু ফেলে দেবার কথা বলেছে। তাহলে হয়ত কোন গর্তে অথবা কোন চোরাকুঠুরিতে ফেলেছে।
আজগর সাহেব যোগ করলেন, অথবা পুকুরে।
সাব ইন্সপেক্টর হাসান বললেন, পুকুরে ফেললে খুঁজে পেতে তাদের কষ্ট হবে। আর যদি কোন চোরাকুঠুরিতে লুকিয়ে ফেলে তাহলে তা খুঁজে পেতে আমাদের কষ্ট হবে।
খালেদ আজগর মামার দিকে তাকিয়ে বলল, মামা, আমি কি একটা কথা বলতে পারি?
হাসান সাহেব বললেন, অবশ্যই সার। তারপর ও.সি. সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, এই ছেলেই স্যার সাহস করে সেদিন মনুকে ধরেছিল।
খালেদ বলতে লাগল, “সেদিন যখন আজগর মামা আমাকে আর শিপলুকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে যায়, তার কিছুক্ষণ পরেই ভিতর থেকে কিছু শব্দ আসতে থাকে। কি হয়েছে দেখার জন্যে আমি এগিয়ে যাই। জংগল বাড়ির পিছন দিকটায় দেখি কিছু লোক অনেকগুলো কাঠের বাক্স পানিতে ফেলছে। প্রতিটা বাক্সে দড়ি বাঁধা ছিল। দড়িগুলো তারা একটা বাঁশের সঙ্গে বেঁধে রাখে।
আজগর মামা লাফিয়ে উঠলেন, “দারুন জিনিস দেখেছ খালেদ, সত্যিই দারুন! এই খবর তুমি এত পরে দিচ্ছ!”
ও.সি. সাহেব বলে উঠলেন, “বাবা তুমি আর কিছু দেখেছ?”
খালেদ বলতে লাগল, “আংকেল বেশি কিছু দেখিনি। যেই লোকটা সেদিন মামাকে শাসিয়ে গিয়েছিল, সেও ছিল। সে সবাইকে ধমকে ধমকে কাজ করাচ্ছিল।
এস.আই. হাসান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তার মানে মতিন মাতব্বর।”
“হ্যা, হ্যা, কালো মতো কাঁচাপাকা দাঁড়িঅলা ঐ লোকটাই।” বলল খালেদ।
ও.সি. সাহেব মুখ কালো করে বললেন, “ভাবাই যায় না ওনার মত মানুষ এমনটা করতে পারে।”
মামা বললেন, “চেহারা দেখে আজকাল আর মানুষ চেনা যায় না।”
ও.সি. ফারুক হোসেন সাব-ইন্সপেক্টর হাসানের দিকে তাকিয়ে বললেন “আপনি এখনই ফাঁড়িতে যান। পুরো ফোর্স নিয়ে
জায়গামত চলে আসুন। আমি খালেদকে নিয়ে সেই পুকুর পাড়ে যাচ্ছি। ব্যাটারা হয়ত কালকে কিছু করতে পারেনি। আজকে ঠিক মালগুলো সরিয়ে ফেলবে। তার আগেই আমরা হানা দেব।”
হাসান সাহেব বললেন, “স্যার আপনি চিন্তা করবেন না, আমি আধঘন্টার মধ্যেই পৌঁছে যাব।”
ও.সি. বললেন, “আমি ওয়াকি-টকিতে আপনার সাথে যোগাযোগ রাখব।” বলেই আর বসলেন না। দু’জন কন্সটেবলকে নিয়ে রওনা দিলেন। খালেদ ধুলোমাখা শরীর নিয়েই ও.সি. সাহেবের সঙ্গে গাড়িতে বসল।
বিকেল বেলা উঠোনে সবাই বসে আছে। আজগর মামা সবার মাঝখানে। দুলাল মামাও আছেন। ছেলেরা গোল হয়ে চারপাশে বসে আছে।
আজগর মামা বললেন, “খালেদ, কি কি ঘটেছিল তোমরা যাবার পর, খুলে বলত।”
খালেদ কেশে গলা পরিষ্কার করে নিল। তারপর বলতে লাগল, “ও.সি. আংকেলের কথাই ঠিক ছিল। আমরা গিয়ে দেখি অনেকগুলো লোক বাক্সগুলো টেনে তুলছে। প্রায় পনেরটা বড় বড় বাক্স। মাতব্বর সাহেবও ছিলেন, আমরা সংখ্যায় কম ছিলাম। তাই গাছের পিছনে লুকিয়ে থাকলাম। বিশ মিনিট পর সাব ইন্সপেক্টর সাহেব পুরো ব্যাটেলিয়ান নিয়ে হাজির হলেন। তারপর আর কি? বদমাশগুলোকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলা হল।”
দুলাল মামা আফসোস করে বললেন “ইস, ঐ দৃশ্যটা যদি নিজের চোখে দেখতে পারতাম?”
অজয় বলে উঠল, “তারপর কি হল? ওদের কাছে কোন অস্ত্র পাওয়া যায়নি?”
খালেদ আবার বলতে লাগল, “মজা তো তখনই হয়েছে। যখন সবগুলোকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলা হল, তখন কয়েকজন পালানোর জন্য পুকুরে ঝাঁপ দিল। পুলিশও কম যায় না। তারাও ঝাঁপিয়ে পড়ল পানিতে। এক লোক তো ডুব দিয়ে প্রায় পুকুরের আরেক কিনারে চলে গিয়েছেন। ওকে ধরতে খুব কষ্ট হয়েছে। আর, অস্ত্রের কথা বলছিস? জঙ্গলবাড়ির ভিতর থেকে বারটা কাটা রাইফেল, ছয়টা রামদা, আরও অনেক অস্ত্রশস্ত্র পাওয়া গেছে। সবাইকে ধরে নিয়ে যাবার পর হাজার হাজার মানুষ মতিন মাতব্বরকে দেখতে যায়। এক বৃদ্ধ লোক রাগ সামলাতে না পেরে মতিন মাতব্বরের গালে চড় মেরে বসে।” পুরোটা বলে খালেদ দম নিতে লাগল।
সবাই হা করে খালেদের কথা শুনছিল। দুলাল মামা বললেন, “আসল কথাতো তুমি এড়িয়ে গেলে খালেদ। আমি বাজারে গিয়ে খবরটা শুনেছি।”
একথা শুনে খালেদ লাল হয়ে গেল। শিপলু বলল, “কি খবর মামা, বলেন না।”
দুলাল মামা বলতে লাগলেন, “খালেদ আসলেই সাহসী ছেলে। ‘সাপ্তাহিক নোয়াখালি বার্তা’ পত্রিকা থেকে সাংবাদিক এসে খালেদের ছবি নিয়ে গেছে। আগামীকাল পত্রিকার লোক বাসায় আসবে আজগর ভাই আর অন্যান্যদের ছবি নিতে। এবং পুরো ঘটনা তাঁরা খালেদের মুখ থেকে শুনবে। বিশেষ খবরটা হল, গ্রামের হাইস্কুলে পরশুদিন খালেদকে সংবর্ধনা দেয়া হবে।
দুলাল মামার মুখে খবরটা শুনে সবাই আনন্দে চিৎকার করে উঠল।
অজয় বলে উঠল, “এই খুশির মুহূর্তে রানার একটা ছড়া হয়ে যাক।”
সবাই একসঙ্গে বলে উঠল, “হয়ে যাক।”
অজয় রানার “ছড়া গ্রন্থাগার” বইটা খুলে “দুই বন্ধুর কথোপকথন” ছড়াটা পড়তে লাগল,
“মাছি বলে, মশারে,
একি তোর দশারে।
মানুষরা নির্দয়,
মনে নেই কোন ভয়।
দু’হাতের মাঝে পেলে,
দেয় তোরে ঘষারে।
মশা বলে, মাছিরে,
কোন মতে আছিরে,
মানুষের শরীরে
যায়নাতো বসারে।
মাছি বলে, মশাভাই,
চল দূরে চলে যাই।
শরীরটা শিন শিন,
পেট করে চিন্ চিন্,
ভাল খাবারের দেখা
পাইনারে কতদিন….।”
সবাই হৈ হৈ করে ছড়া থামাতে বলল। বিকেলটা না খেললে কি চলে?
সূর্যমামা ধীরে ধীরে ঘরে ফিরে যাচ্ছেন পুরো আকাশটা লাল করে দিয়ে।(সমাপ্ত)
প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি, ২০০১।



