॥ দুই ॥
আগামীকাল শবেবরাত। সেই জন্য প্রস্তুতি চলছে। সাধারণত প্রস্তুতি দুই রকমের হয়। বড়দের প্রস্তুতি আর ছোটদের প্রস্তুতি। বড়দের প্রস্তুতির মধ্যে আছে গরীবদের দান-খয়রাত করা, পাড়া-পড়শীদের বাসায় নাস্তা পাঠানো ইত্যাদি।
আর ছোটদের প্রস্তুতি হচ্ছে রাতে বোম ফুটানো। শাহেদ, মিঠুরা তাদের প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে। বিকেলে সবাই মাঠে বসে প্ল্যান করছে।
আমি আনব চার প্যাকেট তারাবাতি, বলল অজয়।শিমুল চুপচাপ বসে আছে। সবসময় শান্ত থাকাই তার স্বভাব, বন্ধুরা এজন্য তাকে বোকা বলেই ডাকে।
সবাই তো কিছু না কিছু আনবে। আমি কি আনব? জিজ্ঞেস করল শিমুল।
তুই আর কি আনবি? এক কাজ করিস। এক প্যাকেট মোমবাতি নিয়ে আসিস্। মুচকি হেসে উত্তর দিল মাসুদ।
ওর কথায় সবাই হেসে দিল। কিন্তু শিমুল কিছু না বুঝেই বলল, আচ্ছা, ঠিক আছে।
খালেদ বলল, আমার খালাত ভাই সুমন আমাকে দুই ডজন চকোলেট দিচ্ছে তোদের সারপ্রাইজ দিব বলে জানাইনি।
চকোলেট! সবাই একসঙ্গে অবাক হয়ে গেছে।
হ্যা, চকোলেট বোমা। যার প্রচন্ড আওয়াজে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। হেসে উত্তর দিল খালেদ।
শাহেদ প্রচন্ড অবাক হয়েছে। সে বলল তোর চকোলেটের সামনে তো আমাদের ‘নাতা মরিচা’ কিছুই না।
এভাবে বললে খুব খারাপ লাগে। আমার চকোলেট কি তোদের না? সবাই তো একসঙ্গেই ফুটাব। অভিমানের সুরে বলল খালেদ।
সবাই আনন্দে চিৎকার দিয়ে উঠল।
এই সময় মাঠে রানা প্রবেশ করল। খালেদের চকোলেটের খবর সে এবার কাছ থেকে শুনল। রানাও খুশিতে চিৎকার দিয়ে বলল,
দাঁড়িয়ে গেছে লোম,
ফুটাব সবাই বোম!
কি যে খুশির কথা,
লাগবে কি ভাই ব্যথা?
রানার কবিতা শুনে সবাই একসঙ্গে হেসে উঠল।
আজ শবেবরাত। এখন সন্ধ্যা। সবাই মাঠে একত্রিত হয়েছে। খালেদের অপেক্ষায় বসে আছে সবাই। সে এখনও এসে পৌঁছেনি। রানাকে ওর আব্বু আসতে দেয়নি। শিমুল আর শাহেদের অবস্থাও এক। ওদের আব্বু-আম্মুরা আসতে দেয়নি। শিপলুরা ঠিক করে রেখেছে সন্ধ্যায় বোম ফুটানো শেষ হলে রাত জেগে মসৃজিদে নামায পড়বে। শিপলুর দাদু বলেছে, এই রাত নাকি বরকতের রাত। এই রাত জেগে আল্লাহকে ডাকলে সব গুনাহ্ মাফ হয়ে যায়। অবশ্য দাদাভাই আরও বলেছে, এই রাতে কোন প্রকার বোম-পটকা ফুটানো নিষেধ। এতে প্রচুর গুনাহ্ হয়। এইজন্যেই শিপলুরা ঠিক করে রেখেছে, রাত জেগে নামায পড়বে। তখন সওয়াব আর গুনাহের মধ্যে কাটাকাটি হয়ে যাবে।
খালেদ বাসা থেকে বের হয়েছে মাগরিবের আযানের পরে। শিশির ওকে নিতে এসেছে। দু’জন যাচ্ছে মাঠের দিকে। শিপলু, মাসুদরা ওদের জন্য অপেক্ষা করছে। গলিগুলো একদম অন্ধকার। সন্ধ্যা হলেই কিছু দেখা যায় না।
আ-আ-আমার খুব ভয় করছে, খালেদ। বলল শিশির।
কেন রে, ভয়ের কি আছে?
আগে কখনো বো-বো-বোমা ফুটাইনি তো, তাই।
আগে ফুটাসনি তো কি হয়েছে? এখন ফুটাবি।
শুনেছি, সা-সা-সাদা পোশাকে পু-পু- পুলিশ ঘুরঘুর করছে। যারা বোমা ফুটায় তাদের ধ-ধ-ধরে নিয়ে যায়।
এত ভয় পেলে কি চলে?
তুই যাই ব-ব-বলিস্ আমার কিন্তু ভ-ভ-ভয় লাগছে।
হঠাৎ দুটো লাইট এসে ওদের চোখে পড়লো। বড় টর্চ লাইট হাতে দু’জন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে ওদের সামনে। পিছন থেকে চিৎকার শোনা গেল, ‘হাত তুলে দাঁড়াও’। খালেদ কিছু বুঝার আগেই শিশির ভয়ে কেঁদে ফেলল। এক জন পুলিশ ছুটে এসে খালেদের হাত থেকে প্যাকেট দু’টো নিয়ে খুলে দেখল। খালেদ কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই প্রচন্ড এক থাপ্পড় এসে পড়ল তার গালে।
এই বয়সেই বোম ফোটানো শিখেছিস্, চিৎকার দিয়ে উঠল সে। খালেদ ভয়ে কাঁপছে। কি বলবে কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। এই ছোট ব্যাপারটা যে এতো ভয়ঙ্কর রূপ নিবে তা কেউ চিন্তাও করেনি। শিশিরের কান্না আরও বেড়ে গেল, ওদের দু’জনকে একটা গাড়িতে উঠানো হল। গাড়িতে আরও অনেকগুলো ছেলে বসে আছে। এরা সবাই বোধহয় একই অপরাধে আটকা পড়েছে। কয়েকজন ভাবলেশহীন ভাবে বসে আছে। যেন কিছুই হয়নি। মনে হয় আগেও কোন অপরাধ করে পুলিশের গাড়িতে উঠেছে। আর কয়েকজন জোরে জোরে কাঁদছে। এদের কাঁদতে দেখে শিশিরের কান্না আরও বেড়ে গেল। দু’জন কনস্টেবল বন্দুক হাতে চুপচাপ বসে আছে। এদের একজনের চেহারা খুব খুশি খুশি। সে একটা সিগারেট ধরিয়ে টানতে শুরু করল। অপরজন প্রচন্ড গম্ভীর হয়ে বসে আছে। কোন কারণে বোধহয় বিরক্ত হয়েছে। শিশির ছুটে গিয়ে তার পায়ের উপরে পড়ল।
আ-আ-আমাকে ছেড়ে দিন। আমাকে পু-পু-পুলিশে ধরেছে শুনলে আব্বুর হা-হা-হার্ট এ্যাটাক হবে। এ্যাঃ ট্যাঃ ট্যাঃ। আমাকে ছেড়ে দিন। এ্যা… কন্সটেবলের দু’পা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল শিশির।
একটা চড় মাইরে সব দাঁত ফেলাই দিব। আমারে চ্যানো তুমি? কেন বোম ফুটানির আগে মনে ছেলো না এইসব কতা? ধাক্কা দিয়ে শিশিরকে সরিয়ে দিয়ে বলল কন্সটেবল।
শিশির খালেদের পাশে বসে আগের মতো জোরে জোরে কাঁদতে থাকল। খালেদের মুখ ভয়ে শুকিয়ে গেছে। সে এখনও কাঁপছে। এত তাড়াতাড়ি সব ঘটে গেল যে, সে এখনও ধাক্কা সামলাতে পারেনি।
পুলিশের গাড়ি মাঝরাত পর্যন্ত ছেলেধরা অভিযান চালাল। এতে করে আরও এক ডজন ছেলে গাড়িতে জায়গা পেল। রাত আনুমানিক দেড়টা অথবা দু’টার দিকে গাড়ি পুলিশ ষ্টেশনের সামনে থামল। গাড়িতে বসে থাকতে থাকতে অনেকেই ঘুমিয়ে পড়েছে। বদরাগী কন্সটেবলটা সবাইকে বন্দুকের নল দিয়ে খুঁচিয়ে ঘুম থেকে জাগালো। অপর কন্সটেবল আরামে নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছে। আশ্চর্যের বিষয়, সে ঘুমের মধ্যেও হাসছে। নাকি তার চেহারাই এইরকম, হতে পারে।
সবাইকে একটা ফাঁকা রুমে ঢুকানো হলো। পুরো রুমের প্লাস্টার খসে পড়েছে। ছাদের দিকে তাকালে মনে হয় এখনই ধসে পড়বে, রুমে একটা মাত্র লোহার দরজা। দরজার উল্টোদিকের দেয়ালে দু’ফুটের বর্গক্ষেত্রের একটা জানালা। তাতে কয়েকটা লোহার শিক বসানো। একেই বোধ হয় বলে জেলখানা। খালেদ ভেবেছিল জেলখানা অন্যরকম হবে। সাধারণত সিনেমা, নাটকে সেরকম দেখা যায়। কিন্তু এই জেলখানা কল্পনার সঙ্গে মিলে না। এখানকার মশাগুলিও স্বাভাবিক না। খুবই বড় বড়।
রাতটা মশার কামড় খেতে খেতে কোনরকমে পার হল। অনেকে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। খালেদ টেনশনে সারারাত ঘুমুতে পারেনি। ওর আব্বু-আম্মুর না জানি কি অবস্থা? এমনও হতে পারে, তারাও খুব টেনশনে আছেন। পুলিশগুলো ভাল না খারাপ কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। রাতে হয় কিছু বলেনি, কিন্তু সকালে যদি মারে? মেরে যদি হাত, পা অবশ করে দেয়? এসব কথা ভাবতে ভাবতে খালেদের শরীর দিয়ে ঘাম ছুটল। শিশিরটা কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে। ওর স্বভাব একেবারে বাচ্চাদের মতো।
ওদিকে খালেদের আব্বু যত পরিচিত আছে সবার কাছে ফোন করেছে।মসজিদেও খবর নিয়েছে। কিন্তু ওখানে নেই। খালেদের বন্ধুরা সবাই এসেছে। কেউ কিছু বলতে পারে না। শুধু জানতে পেরেছে ওকে মাঠে নেবার জন্য শিশিরকে পাঠিয়েছিল। তার মানে খালেদের সাথে শিশিরও লাপাত্তা। শিশিরের আব্বু খালেদদের বাসায় ফোন করেছিলেন। তারপর সোজা এই বাসায় চলে এসেছেন খালেদের আম্মুর প্রেসার বেড়ে গেছে। তার মাথায় ঠান্ডা পানি দেয়া হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে ফোন করেও কিছু জানা যায়নি। খালেদের বন্ধুরা সবাই ওর রুমে বসে আছে। খালেদ আর শিশিরের আব্বু ড্রইং রুমে বসে কথা বলছেন।
কি করি বলুন তো? সম্ভাব্য সব জায়গাতেই ফোন করেছি। হস্পিটালগুলিতেও খবর নিয়েছি। কোথাও নেই। বলল খালেদের আব্বু।
এখন যা যুগ পড়েছে। দিনে-দুপুরে ছেলেপুলে ধরে নিয়ে যায়।
ছেলেধরাদের কথা বলছেন? সেটাই তো ভাই ভয়ের কথা। এমনিতে রাতের বেলা ঘর থেকে বের হতে দেই না। শবেবরাতের রাত ছিল, ভাবলাম, বন্ধুদের সঙ্গে একটু আনন্দ করবে। তাই আর বাধা দেইনি।
কি যে বলব আপনাকে। আমার ছেলেটা হয়েছে একটু বোকা টাইপের। ওকেও রাত বিরাতে ঘর থেকে বের হতে দেই না। আচ্ছা, ভাল কথা মনে পড়েছে। থানায় কোন খোঁজ নিয়েছেন?
থানায় খোঁজ নিতে হবে কেন?
কেন, গতকাল শবেবরাত ছিল না? এই রাতে বাচ্চারা পটকা ফুটায়, আর পুলিশের কাজ হল এসব বাচ্চাদের ধরা, তাই বলছিলাম আর কি।
কি যে বলেন আপনি ভাইসাহেব। আমাদের ছেলেরা ঐরকম ছেলেই না যে, রাতের বেলা বোম ফুটাতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়বে। কথাটা বলেই খালেদের আব্বু চোখ বন্ধ করে কি যেন ভাবলেন, তারপর লাফ দিয়ে উঠে বললেন, কথাটা তো ভাইসাহেব আপনি ভুল বলেন নি। এমনও তো হতে পারে, ওদের সন্দেহ করে ধরে নিয়ে গেছে। বলেই তিনি তাড়াতাড়ি সবুজবাগ থানায় ফোন করলেন। কিছুক্ষণ কথা বলে ফোন রেখে উঠে দাঁড়ালেন।
অনেকগুলো ছেলেকে কাল রাতে ধরা হয়েছে। আমাদের ছেলেরাও ওখানে থাকতে পারে। চলেন গিয়ে দেখে আসি। বলেই তিনি ঘরের ভিতর কাপড় পাল্টাতে গেলেন।
খালেদ বাসায় শুয়ে আছে। ভয়টা এখনও পুরোপুরি যায়নি। সে তার এতটুকু জীবনে একরাত জেলে কাটিয়েছে এটা ভাবতেই গা কাটা দিয়ে উঠছে। সে ভেবেছিল আব্বু তাকে প্রচন্ড রকম মারবে। কিন্তু তেমন কিছুই হল না। শিশিরকে ওর আব্বু নিয়ে গেছে। সে তখনও বাচ্চাদের মত চিৎকার করে কাঁদছিল। তবে খালেদ মনে মনে তওবা করেছে নিজে তো কোন দিন বোম্ ফুটাবেই না, অন্যকেও ফুটাতে নিষেধ করবে। তার জন্য আম্মুর প্রেসার বেড়েছে। খুব খারাপ কিছুও ঘটতে পারত। আব্বুও সারারাত একফোটা ঘুমাতে পারেননি। কত জায়গায় খোঁজ করেছেন। কত কষ্টই না তাদের হয়েছে। এসব কথা ভাবতে ভাবতে সে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল।
পাড়ার ছেলেরা মিলে একটা নাটকের গ্রুপ খুলেছিল। গ্রুপের নাম ‘সিরিয়াস কিশোর থিয়েটার’। প্রতিবছর একটা করে নাটক মঞ্চস্থ করার পরিকল্পনা আছে সবার। গতবারের নাটকের নাম ছিল ‘মীরজাফরের কোমল হৃদয়’। ইতিহাসে কেবল মীরজাফরের খারাপ দিকটা তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু তারও যে একটা কোমল হৃদয় ছিল সেটা দর্শকদের সামনে তুলে ধরাই ছিল নাটকের প্রধান বিষয়বস্তু। দর্শকনন্দিত হয়েছে নাটকটি। এই নাটকটি লিখে ছিলেন সিরিয়াস কিশোর থিয়েটারের পরিচালক পার্থ বড়ুয়া। কিন্তু এই নামে কেউ তাকে চিনে না। সবাই তাকে ‘ব্যর্থ বড়ুয়া’ বলেই ডাকতে পছন্দ করে। কেননা তিনি তাঁর জীবনে কোন কাজেই সফল হতে পারেননি। কিন্তু থিয়েটারের ছেলেদের ধারণা অন্যরকম। তারা মনে করে তাদের ভাইয়ার মত জিনিয়াস লোক কমই জন্ম নেয় এই পৃথিবীতে। রানাতো একটা ছড়াই লিখে ফেলেছে পার্থ ভাইয়ার নামে।
নাম হলো তার পার্থ,
দুর্মূখেরা বলে ব্যর্থ
কিন্তু তিনি যে অব্যর্থ।
প্রতিভাটা ছিল সুপ্ত,
বলা যায় চোরা গুপ্ত।
এজন্যই তিনি জিনিয়াস,
দলের নাম তাই সিরিয়াস।
যাহোক, এবার যে নাটক মঞ্চস্থ হবে তার নাম ‘আসল পীরের দুঃখ’। আমাদের চারিদিকে শতরকম পাঁর দেখি, সবাই আসলে ভন্ডপীর। সবারই গাড়ি, বাড়ী, ফ্রিজ, টেলিভিশন আছে। কিন্তু একজন সত্যিকারের পীর যে কত কষ্ট করে তাঁর সাধনা চালিয়ে যায়, তাই এই নাটকে তুলে ধরা হয়েছে। এই নাটকটিও পার্থ ভাইয়ার লেখা। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের একটা ঘটনা থেকে নাটকটি লিখেছেন। কে কোন চরিত্রে অভিনয় করবে এখনও ঠিক হয়নি। কিন্তু পীরের ভূমিকায় অভিনয় করবে রানা, এটা সবাই মিলে ঠিক করেছে। নাটকের রিহার্সেল হচ্ছে প্রতিদিন বিকেলবেলা। পাঁচ টাকার ফরম কিনে থিয়েটারের সদস্য হতে হয়। কেবলমাত্র সদস্যরাই রিহার্সেলে ঢুকতে পারে।
পার্থ ভাই, সবাই এসে পড়েছে। রিহার্সেল শুরু করে দিন? বলল অজয়।
পার্থ ভাই নড়ে চড়ে বসলেন, একটামাত্র চেয়ার ছাড়া এই রুমে আর কিছুই নেই। চেয়ারটাতে বসেন পার্থ ভাই। বাকীরা সবাই নীচে গোল হয়ে বসে। মাঝখানের জায়গাটা রিহার্সেলের স্টেজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এখন যা যা বলব, তা সবাই মন দিয়ে শুনবি। নাটক হচ্ছে একটা শিল্প। শুধুমাত্র ডায়ালগ মুখস্ত করলেই অভিনেতা হওয়া যায় না। তার জন্য করতে হয় সাধনা। সাধনা আর ইচ্ছা একত্রিত হলেই হওয়া যায় একজন পূর্ণাঙ্গ শিল্পী। কে কোন চরিত্রে অভিনয় করবি তা আমি ঠিক করব। এর জন্য কেউ মন খারাপ করবি না। কথাগুলো মনে রাখবি। ঠিক আছে, এখন রিহার্সেল শুরু হচ্ছে। বলে থামলেন পার্থ ভাই। এক গ্লাস পানি খেয়ে নিলেন।
প্রথম দৃশ্য হচ্ছে। সাধু বাবার গুহাতে একজন দর্শনার্থী এসেছে। সাধুর চরিত্র করবি রানা। তার দর্শনার্থীরটা করবি শিপলু। শুরু… হাত নেড়ে অবস্থান বুঝিয়ে দিলেন পার্থ ভাই।
দর্শনার্থীঃ
চাইছিনা কোন ভিক্ষা,
এসেছি নিতে দীক্ষা
ফিরিয়ে দেবেন না জানি,
আপনি যে মহা জ্ঞানী।
সাধুঃ
ভুল করিতেছ বৎস
আমি যে সাগরের মৎস্য
পদে পদে আছে কষ্ট
দেখিতে পাইবে পষ্ট।
দর্শনার্থী:
সংসার করেছি ত্যাগ
একহাতে নিয়েছি ব্যাগ
এক কাপড়ে চলে এসেছি,
সত্যকে যে ভালবেসেছি।
সাধুঃ
করিয়াছ বড় ভুল,
পাইবেনা কোন কুল।
এপথ নয় অতি সোজা,
কিছুদিন পর যাবে বোঝা।
হচ্ছে না, হচ্ছে না, কিচ্ছু হচ্ছে না। তোরা মুখস্ত বলে যাচ্ছিস্, হাত-পা, মুখ চোখে অভিনয় ফুটাতে হবে। তাহলে সেটাকে প্রাণবন্ত বলে মনে হবে। ঠিক আছে। তোরা লক্ষ্য কর। আমি করে দেখাচ্ছি। বলেই লাফ দিয়ে উঠে অভিনয় করতে শুরু করলেন পার্থ ভাই।
টানা একমাস রিহার্সেল শেষে নাটক মঞ্চস্থ করার জন্য স্কুলের হলরুম ভাড়া নেয়া হয়েছে। পরশুদিন বিকাল বেলা নাটক। পার্থ ভাইয়ার ছুটাছুটি বেড়ে গেছে। খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি-গোঁফ আর এলোমেলো চুলের পার্থ ভাইকে এখন যে কেউ পাগল বলবে। তাঁর পরিচিত মেকআপম্যান গনেশদা জন্ডিসে পড়েছেন, গনেশদা অবশ্য তাঁর সাগরেদকে পাঠিয়ে দেবেন বলেছেন। কিন্তু পার্থ ভাই ভরসা পাচ্ছেন না। পুরো নাটক ভি.ডি.ও করারও একটা প্ল্যান তার মাথায় আছে। সেট্ সাজানোর জিনিসপত্র জোগাড়ে ব্যস্ত তিনি। হার্ডবোর্ডের উপর রঙিন কাগজ বসিয়ে বটগাছ বানানো হচ্ছে। চট্ দিয়ে বানানো হবে গুহা। খালেদ ওদের বাসা থেকে চটের কয়েকটা বস্তা নিয়ে এসেছে। রানা পুরনো একটা চাদর এনেছে। এটা হবে সাধুর বস্ত্র।
নির্ধারিত দিনে নাটক শুরুর দু’ঘন্টা আগে থেকেই লোকজন আসতে শুরু করেছে। নাটকের টিকিটের দাম রাখা হয়েছে দশ টাকা। বাইরে টিকেট কাউন্টারে বসে আছে মিঠু। নাটকের প্রচারের জন্য মাসুদ বড় বড় রঙিন কাগজে লিখে এলাকার অনেক জায়গাগুলোতে লাগিয়ে রেখেছিল। নাটকের প্রচার ভালই হয়েছে বলা যায়। দর্শকরা হলরুমে ঢুকে জায়গা নিয়ে বসে পড়ছে।
এই কয়েকদিন পার্থ ভাইয়ার বয়স মনে হয় কয়েক বছর বেড়ে গেছে। তিনি এখন চিন্তিত আছেন বটগাছটাকে নিয়ে, এটা কোনভাবেই দাঁড়িয়ে থাকছে না। শুধু হেলে পড়ে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হল শিমুল বটগাছের পিছনে এটাকে ধরে বসে থাকবে। সবার মেকআপ নেয়া শেষ, সবাই চুপচাপ বসে মনে মনে ডায়ালগ ভাবছে। পার্থ ভাইয়ার কড়া নির্দেশ : কেউ যেন কোন কথা না বলে, এতে নাটকে ভুল হবার সম্ভাবনা থাকবে। তাই কেউ কোন কথা বলছে না, এখন শুধু পার্থ ভাই উঠার অপেক্ষা।
নাটক শুরু হতে দেরী হচ্ছে দেখে দর্শকরা হৈ-চৈ শুরু করে দিল। পার্থ ভাই সবাইকে ডেকে বললেন, সবাই মন দিয়ে শোন। কেউ ভয় পাবি না। ডায়ালগ ভুলে গেলেও অসুবিধা নেই। কাটিয়ে নেবার চেষ্টা করবি। ভগবানের দিব্যি লাগে, ভুল হলেও কেউ হাসবি না। আমিতো তোদের পাশে থাকবোই। এবার তাহলে আমরা নাটক শুরু করছি। ঠিক আছে।
পর্দা উঠে গেল। দর্শকরা আনন্দের সঙ্গে নাটক দেখছে। একটার পর একটা দৃশ্য শেষ হচ্ছে আর সবাই খুব হাততালি দিচ্ছে। সপ্তম দৃশ্যে বড় একটা ঝামেলা বাঁধল। সাধুর চরিত্র করছিল রানা। নাটকে ওর কাজ ছিল গুহার মধ্যে বসে থাকা। গুহা বানানো হয়েছিল চটের বস্তা দিয়ে। সেখান থেকে হঠাৎ একটা তেলাপোকা বের হয়ে শিমুলের পা বেয়ে প্যান্টের ভিতরে ঢুকে গেল। শিমুল বটগাছের পিছনে এটাকে ধরে বসে ছিল।
পরমূহূর্তে দেখা গেল বটগাছটা সাধুবাবার মাথায় সজোরে আঘাত হানলো এবং পিছন থেকে একটা ছেলে ‘বাঁচাও, বাঁচাও, খেয়ে ফেললোরে’ বাঁচাও, বাঁচাও, খেয়ে ফেললো রে বলে … লাফাতে লাফাতে ভিতরে দৌড় দিল। বটগাছটা সরিয়ে যখন সাধু বাইরে এল তখন তার মাথা ফুলে একটা তালের আকার ধারণ করেছে। পরক্ষণেই বিকট আওয়াজে সাধুবাবাজী ভূমিশয্যা গ্রহণ করলেন। ঘটনাগুলো এত দ্রুত ঘটে গেল যে, দর্শকরা সব হা করে তাকিয়ে রইল। লোকজন প্রচন্ড হৈ চৈ শুরু করল। তখন দেখা গেল পর্দা নেমে যাচ্ছে।
এক মাস পর। সবার ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে। এখন শুধু সকাল-বিকাল ফুটবল খেলা। নাটকের সেই আকস্মিক দুর্ঘটনায় সবচে বেশি কষ্ট পেয়েছেন পার্থ ভাইয়া। তিনি মন ভাল করতে দিনাজপুরে তাঁর মাসীর বাসায় গেছেন। পার্থভাই একটা বড় কাজ হাতে পেয়েছেন। এক ছবির পরিচালক তাঁর ছবির কাহিনী লেখার জন্য পার্থ ভাইকে অনুরোধ রেখেছেন। পার্থ ভাই খুশির সঙ্গে সে অনুরোধ রক্ষা করেছেন। ছবির নাম ‘তাল গাছের কসম’। উদ্ভট নামের এই ছবির প্রধান বিষয়বস্তু হচ্ছে, এক তাল গাছের নিচে নায়ক নায়িকার দেখা, দেখার পর ইয়ে, তারপর ইত্যাদি, ইত্যাদি। পার্থ ভাইকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মোটামুটি এতটুকুই জানা গেছে। আসলে পার্থ ভাই দিনাজপুর গেছেন গ্রাম্য পরিবেশে ছবির ঘটনা লিখতে। কারণ, ছবির পটভূমিকা গ্রামের। যাহোক, খেলা শেষে সবাই বসে বিশ্রাম করছে।
ধ্যুত, আর ভাল লাগে না। একই খেলা আর কতদিন খেলা যায়? নিরবতা ভাঙল অজয়।
আসলেই মনটা কেমন যেন বিষিয়ে উঠেছে। বলল খালেদ।
রানা বসে বসে কমিক্স পড়ছিল। ও ফুটবল খেলেনি, হঠাৎ পড়া বন্ধ করে বলে উঠল।
দারুন মজা, চার্মিং
করতে পারলে ক্যাম্পিং।
আইডিয়াটা মন্দ না। তবে তাতেও ঝামেলা আছে। তারচে বরং কোন জায়গা হতে কিছুদিন বেড়িয়ে আসলে কেমন হয়? বলল শিপলু।
লাফিয়ে উঠল শিশির, খুব ম-ম-মজা হবে। কিন্তু যা যা-যাবি কোথায়?
তোরা ইচ্ছে করলে আমার সাথে নানু বাড়িতে যেতে পারিস। আমি ঠিক করেছি সামনের সপ্তাহে কিছুদিনের জন্য দেশে যাব। বলল শাহেদ।
তোর নানুবাড়ি নোয়াখালী না? আমার খুব ইচ্ছে ছিল জায়গাটা দেখার। ধরে রাখ, আমি তোর সঙ্গে আছি। বলল মিঠু।
মাসুদ ঘাসের উপর শুয়েছিল। লাফিয়ে উঠে বসে বলল, কেনো ভাই এই অধমকে বঞ্চিত করতে চাস? আমিও যাব তোদের সঙ্গে।
শাহেদ বাম হাতের তালুতে ডান হাত দিয়ে ঘুষি দিয়ে বলল, তাহলে আমি আশা করতে পারি তোরা সবাই যাচ্ছিস। আচ্ছা, শিমুলকে দেখছি না কেন বলতো?
শিপলু গেঞ্জির হাতা দিয়ে চশমার কাঁচ মুছতে মুছতে বলল, শিমুল ওর আব্বু-আম্মুর সাথে দেশে গেছে। সেখানে নাকি ওর জন্ডিস হয়েছে।
মিঠু সবাইকে ইশারায় চুপ করতে বলে রানার দিকে তাকিয়ে বলল, রানা মনে হয় এই বন্ধের মধ্যে কবিতার বই বের করবি, তাই না?
রানা কমিকস্ পড়ছিল, মিঠুর কথায় অবাক হয়ে তাকাল সবার দিকে। তারপর হেসে বলল,
আমি এতই বোকা?
থাকব পড়ে একা?
আমিও দেশে যাব
তোদের সাথেই রবো।
আচ্ছা সে না হয় হল। কিন্তু যাব কিভাবে? জানতে চাইল অজয়।
দুটো পথে যাওয়া যায়। একটা হচ্ছে লঞ্চ, আরেকটা বাস। এখন তোদের ইচ্ছা। বাসে গেলে তাড়াতাড়ি হবে। বলল শাহেদ।
ঘাসের ডগা চিবুতে চিবুতে খালেদ বলল, যাবার ব্যবস্থা আমি করতে পারি। মামার মাইক্রোবাসটা আমরা ধার নেব। তোরা চাইলে মামাও আমাদের সঙ্গে যেতে পারে।
এতে আবার আ আ-আপত্তির কি আছে? তোর মামা মানে আ-আমাদেরও মামা। কি ব-বলিস তোরা, আনন্দের সঙ্গে বলল শিশির।
সবাই একসঙ্গে শিশিরের কথায় সায় জানাল। মিঠু বলল, অবশ্যই তোর মামা সঙ্গে যাবে। একজন গার্ডিয়ান থাকলে তো আমাদেরই লাভ।
শাহেদ দাঁড়িয়ে প্যান্ট ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, কখন, কবে যাব তা কালকে সবাইকে জানাব। ঠিক আছে।
সবাই যার যার বাসার দিকে রওনা দিল। সন্ধ্যার পূর্বাভাস দিয়ে মজিদ থেকে আযানের শব্দ ভেসে এল।
ড্রাইভার বলছে, আর আধ ঘন্টার মধ্যে সবাই শাহেদের নানাবাড়ি পৌঁছে যাবে। পুরো সাড়ে তিন ঘন্টা হয়েছে খালেদের মামার মিনি মাইক্রাবাসটা সবাইকে নিয়ে ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছে। মনে হচ্ছে যেন সবাই লংড্রাইভে বেরিয়েছে। চেহারা খুশি খুশি। কয়েকজন জোরে জোরে গান গাইছে। খালেদের মামা খুব ফুর্তিবাজ মানুষ। নাম আজগর হাওলাদার। ডেলটা লাইফ ইন্স্যুরেন্স -এর খুব একটা বড় পোস্টে চাকরি করেন। ছোটদের ভালবাসেন প্রচন্ড রকম। তিনি মজার মজার গান ধরছেন আর ছেলেরা তার সাথে তাল মিলাচ্ছে। তিনি প্রাণ খুলে হাসছেন কিছুক্ষণ পর পর।
দুপুর দু’টোর দিকে গাড়ি হায়দরগঞ্জ। বাজারে এসে থামল। মামা বাজার থেকে তিন কেজি মিষ্টি কিনলেন। মোটা শরীরটা নিয়ে গাড়িতে উঠে বললেন, খালি হাতে তো আর কারো বাসায় যাওয়া যায় না। কি বলো তোমরা। কথা শেষ করেই গান ধরলেন, ‘যদি তো, ডাক শুনে কেউনা আসে তবে একলা চল রে…’
মেঠোপথ দিয়ে গাড়ি শাহেদের নানাবাড়ি এসে পৌঁছল। মাইক্রোবাসের শব্দ শুনে চারপাশের বাড়িগুলো থেকে মানুষজন বেরিয়ে আসল। শাহেদের নানা-নানু খুব আদর করে সবাইকে ঘরে নিয়ে গেলেন।
বিকেল বেলা সবাই কাচারীঘরে আজগর মামাকে ঘিরে বসল। মামা ভালো গল্পও করতে পারেন। তিনি তার গল্প শুরু করলেনঃ তখন আমি সারজাতে চাকরি করি। বেশ কয়েকবছর আগের কথা…। সেখানে বিদ্যুৎ তখনও পৌঁছায়নি। আমি থাকতাম একটা দোতালা বাড়ির চিলেকোঠায়। সবাই বলত সেই ছাদ থেকে নাকি একবার একটা ছেলে পড়ে মারা গিয়েছিল। জ্যোসনা রাতে নাকি সেই ছেলে ছাদে হাঁটাহাঁটি করে। অনেকেই নাকি ওর কান্না শুনেছে। আমি আবার ভূত-প্রেতে একদম বিশ্বাস করি না। সাহসের সঙ্গেই একা সেই চিলেকোঠায় থাকতাম। তো একদিন জ্যোসনা রাতে কি ঘটল জানো?
সবাই মামার আরও কাছে এসে বসল। শিশির পা দুলিয়ে টেবিলের উপর বসেছিল। ও কাঁপতে কাঁপতে বলল, মামা, সেই ঘ-ঘ ঘটনা না বললে কি চ-চলে না।
মাম্য যেন শিশিরের কথা শুনতেই পেলেন না। তাঁর চেহারা কেমন যেন রহস্যময় হয়ে উঠল। তিনি আবার বলতে শুরু করলেন, একদিন ভরা চাঁদনী রাতে আমি চিলেকোঠায় বসে মোমের আলোতে লিখছিলাম। হঠাৎ দমকা হাওয়ায় মোমটা নিভে গেল। আমি কোথায়ও লাইটার খুঁজে পেলাম না। অথচ স্পষ্ট মনে আছে, সেটা টেবিলের উপরই ছিল। হঠাৎ শুনতে পেলাম ছাদে কে যেন দৌড়াচ্ছে। আমি জানালা খুলে চাঁদের আলোয় দেখতে পেলাম চারদিকে কেমন ধোঁয়াটে হয়ে গেছে। তার মাঝে একটা হাফপ্যান্ট পড়া ছেলে দৌড়াচ্ছে।
আমি ছেলেটিকে ডাক দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম এত রাতে ছাদে দৌড়াচ্ছ কেন?
ছেলেটা বলল, আমি যে সবসময় ছাদে দৌড়াই। কেউতো কিছু বলেনা। আমি ধমক দিয়ে বললাম, যাও, সোজা বাসায় যাও। আর যেন কখনও রাতে ছাদে না দেখি। তখন সে শান্ত ছেলের মতো ছাদ থেকে নেমে গেল।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ছেলেটার কথা মনে পড়াতে খুব মায়া লাগল। ভাবলাম, যাই একটু আদর করে আসি। বাড়িঅলাকে এ কথা বলতেই তিনি কেঁদে বললেন, তাদের ছোট ছেলেটা বছর দুই আগে এই ছাদ থেকে পড়ে মারা গিয়েছিল। আমি হয়ত তাকেই দেখেছি, কারণ, এই বাড়িতে কোন ছোট ছেলে নেই। একথা শুনে আমার মাথা ঘুরে গেল, আমি তার পরদিনই চাকরি ছেড়ে ঢাকা চলে এসেছিলাম। পুরো ঘটনাটা বলে মামা চোখ বন্ধ করলেন।
সেই রাতে ছেলেরা ভয়ে ভয়ে ঘুমুতে গেল। খাটে পা দুলিয়ে বসতেও যেন সবার ভয়। গ্রামের বাড়িতে সাধারণত যা হয়, এখানেও তার ব্যতিক্রম হল না। টয়লেট অনেক দূরে। শিপলু রাতে ঘুমানোর আগে টয়লেটে যায়। কিন্তু কেন জানি ওর মনে হচ্ছে আজকের রাতটা অনেক বেশি অন্ধকার। সবাই শুয়ে পড়েছে। রানা, মিঠুর গলা শোনা যাচ্ছে। শুয়ে শুয়ে গল্প করছে সবাই। শুধু শিপলুর চোখে ঘুম নেই। টয়লেট না সারতে পারলে এই গভীর রাত ওর জেগেই কাটাতে হবে। কাউকে বলতেও পারছে না। এ কথা জানাজানি হলে নির্ঘাত রানা কোনো ছড়া বানিয়ে ফেলবে। ছড়া লেখায় ব্যাটার হাত দারুণ পোক্ত। যে কোন বিষয় নিয়ে ছড়া বানিয়ে ফেলে। সাক্ষাৎ কবিয়াল! টয়লেটে না যেতে পারার সব ক্ষোভ গিয়ে পড়ছে রানাটার উপর। এখন লজ্জায় কাউকে বলাও যাচ্ছে না। কাউকে যে বলবে সে পরিস্থিতিও নেই। কে কোথায় বিছানা করে ঘুমিয়েছে তা বুঝা যাচ্ছে না। শিপলু মনে সাহস সঞ্চয় করে পকেট থেকে টর্চ বের করে বাথরুমের দিকে একাই রওনা দিল। দূর, কি আর হবে? ছোটবেলায় দাদু একটা কথা বলতেন, বনের বাঘে খায় না, মনের বাঘে খায়।
কথাটা খাঁটি সত্য। কিন্তু কেন যেন শিপলু সাহস পাচ্ছে না। অন্ধকার এত বেশি কেন? মনে হচ্ছে, অনেকগুলো চোখ ওর দিকে তাকিয়ে আছে। শিপলু বার বার ডাইনে, বায়ে তাকাতে লাগল। হঠাৎ করেই অঘটনটা ঘটল। কে যেন ওর পা ধরে টান দিল, পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই টর্চ আর খুঁজে পাওয়া গেল না। চশমাটাও চোখ থেকে খুলে গেল। আচ্ছা, সামনে ওটা কী নড়ছে? কেমন মোটা গোল গাল সাদা। ওর দিকেই তো ছুটে আসছে।
কিছুক্ষণ পর গগনভেদী এক চীৎকারে গ্রামের ঘুমন্ত বাড়িগুলো জেগে উঠল। সবাই হারিকেন, কুপি নিয়ে ছুটে আসল।
শাহেদ শিপলুকে পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার করে উঠল। সবাই ধরাধরি করে ওকে কাচারী ঘরে নিয়ে গেল। শাহেদের নানু গরম পানিতে লবণ গুলে শিপলুকে খাইয়ে দিলেন। শিপলু তখনও ভয়ে কাঁপছে। নানু বললেন, অন্ধকারে ভয় পেয়েছ। ঘুম দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। (চলবে)
প্রকাশকাল : অক্টোবর, ২০০০।



