
গ্রিক বিষয়ে পরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগে ভান্না মূর্তি দেবতার ওপর চুমু খেলো। তার পাকস্থলি মনে হলো উপুড় হয়ে গেছে। তার বুকটা যেন ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছে। কী এক অজানা আশঙ্কায় ধড়ফড় করছে তার হৃৎপিণ্ড। সে আজ কী পেতে যাচ্ছে? দুই, না কি তিন? ছয়বার সে তার মায়ের কাছে গেল দোয়া নেয়ার জন্য এবং যখন সে পরীক্ষার জন্য বের হয়ে গেল তখন সে তার চাচীকেও বলল যেন তিনি তার জন্য দোয়া করেন। সে স্কুলে যাওয়ার পথে একজন ভিক্ষুককে দুই কোপেক এই আশায় দিলো যে, এই পয়সা তার অজ্ঞতার প্রায়শ্চিত্য ঘটাবে। সে প্রাণপণ প্রার্থনা করতে থাকল যাতে আল্লাহ তাকে অসম্মানজনক নম্বরপ্রাপ্তি থেকে পরিত্রাণ করেন।
সে স্কুল থেকে ফিরল অনেক দেরিতে, বিকেল চারটা ও পাঁচটার মধ্যে। সে ঘরে ঢুকল এবং চুপটি করে শুয়ে পড়ল। তার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। তার লাল চোখ দুটোর চারপাশে কালো দাগ পড়ে গিয়েছিল। তার মা তার বেডের পাশে গিয়ে বলল, ‘পরীক্ষা কেমন দিলি? কত নম্বর পেলি?’ ভান্না চোখ পিটপিট করলো, মুখ কুচকালো এবং কান্নায় ভেঙে পড়ল। তার মায়ের মুখ মুহূর্তে বিবর্ণ হয়ে গেল, হাঁ করে সে তাকিয়ে রইল তার পুত্রের দিকে এবং এক হাত দিয়ে নিজের আরেক হাত সজোরে চেপে ধরল। সুঁইসুতো দিয়ে ছেঁড়া পায়জামায় জোড়াতালি দিচ্ছিল সে; সেটি তার হাত থেকে খসে পড়ল। সে জিজ্ঞাসা করল, ‘তুই কাঁদছিস ক্যান্? তাহলে ফেল করেছিস?’
‘আমাকে ছিঁড়ে ফেলানো হয়েছে… আমি দুই পেয়েছি।’
‘আমি জানতাম এরকমই হবে। আমি আগেই টের পেয়েছিলাম।’ তার মা বলতে লাগল, খোদা করুণা করুন! হায়, কী হলো যে তুই পাস করতে পারলি না? কী জন্য তুই ফেল করলি? কোন সাবজেক্টে ফেল করেছিস?’
‘গ্রিকে…মা, আমি… তারা আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল ঢ়যবৎড়-র ভবিষ্যত কী, এবং আমি… ড়রংড়সধ বলতে গিয়ে ড়ঢ়ংড়সধর বলে ফেলেছিলাম। তারপর… তারপর সেখানে একটা টান ছিল না, যদি শেষের ধ্বনিটা লম্বা হয় এবং আমি…আমি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম….আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে, এর মধ্যে আলফাটা লম্বা ছিল….আমি এখানে একটা টান দিয়েছিলাম। তখন আরটাক্সেভ আমাকে বলল শব্দানুসমূহের একটি তালিকা দিতে…আমি দিলাম এবং দুর্ঘটনাবশত একটি সর্বনামের সাথে তা আমি মিশিয়ে ফেলেছিলাম…এবং আমি একটা ভুল করে বসলাম…..এবং এজন্য তিনি আমাকে দুই নম্বর দিলেন…আসলে আমি একজন হতভাগ্য ব্যক্তি….সারা রাত আমি এর ওপর পরিশ্রম করেছিলাম….এই সপ্তাহে প্রতিদিন আমি সকাল চারটায় ঘুম থেকে উঠেছি…’
‘না, তুই না, হতভাগ্য হলাম আমি। পোড়াকপালে ছেলে আমার! আমি তো শেষ হয়ে গেলাম। দানব কোথাকার, তোর জন্যে আজ আমার এ জীর্ণ দশা; জ্বালাতে জ্বালাতে তুই আমার জীবনটাকেই শেষ করে দিয়েছিস একেবারে। তোর জন্যে আমার সব খরচ করে ফেলেছি রে, গোবর গণেশ। তোর জন্যে খাটতে খাটতে আমার পিঠ কুঁজো করে ফেলেছি, এখন আমি মরতে বসেছি, আমার মতো অসুখী আর কে আছে পৃাথবীতে, কিন্তু তাতে তোর কী যায় আসে? কেমন যে লেখাপড়া করিস তুই, আমি কিছু বুঝি না।’
‘আমি তো সারা রাত পড়াশুনা করেছি…তুমি নিজের চোখে দেখেছ।’
‘আমি এত করে স্রষ্টাকে বললাম, আমাকে তুমি তুলে নাও কিন্তু তিনি কিছুতেই আমার দিকে মুখ ফিরে তাকালেন না, আমি এক পাপী মহিলা… তুই আমাকে আর কত জ্বালাবি! অন্য মানুষেরও ছেলেমেয়ে আছে; আর আমার আছে এক গাধা যার কোনো বোধভাষ্যি নেই। তোকে আমি পেটাবো? পেটাতাম কিন্তু পেটাবার সে শক্তি থাকলে তো! হায় খোদা, কোথায় আমার শক্তি ফিরে পাই?’
মা তার শাড়ির ভাঁজে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। ভান্না মানসিক যন্ত্রণায় মুষড়ে পড়ল এবং সে দেয়ালে কপাল ঠেকিয়ে বসে রইল। তখন তার চাচী প্রবেশ করল ঘরে।
‘হ্যাঁ, এটা হলো তাই যা আমি অনুমান করেছিলাম।’ ভান্না কী ভুল করেছে অনুমান করে সে ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল এবং দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে আবার বলে উঠল, ‘সারা সকাল ধরে আমার মন খারাপ হয়ে ছিল—আমার মনে হচ্ছিল সমস্যা আসছে…এবং শেষ পর্যন্ত তা এলো…’
‘বদমাশ! উৎপীড়ক!’
‘তুমি তাকে এ রকম করে বকছো কেন?’ চাচী তার কফি-কালারের ওড়নাটা মাথা থেকে নামিয়ে ভান্নার মার দিকে ফিরে উদ্বিগ্নতার সাথে বলে উঠল, ‘দোষটা তো তার না, দোষ হলো গিয়ে তোমার। তুমিই এজন্য দায়ী। তুমি কেন তাকে ওই হাইস্কুলে পাঠিয়েছিলে? তুমি এক চমৎকার মহিলা। ভদ্রমহিলা হতে চাও, না? আহ হা, আমি হলফ করে বলতে পারি, তুমি অভিজাত ভদ্রমহিলা হতে চেয়েছিলে। এর চেয়ে তুমি যদি আমার কথামতো ওকে ব্যবসায় লাগিয়ে দিতে, কিংবা আমার কুজ্যার মতো কোনো অফিসে ঢুকিয়ে দিতে…কুজ্যা এখানে বছরে পাঁচ শ রুবল করে ইনকাম করছে…পাঁচ শ রুবল একটা ভালো ইনকাম, কী বলো? তা না করে তুমি করলে কী, তাকে দিলে পড়াশুনায় লাগিয়ে। এখন মরো! সে শুকিয়ে পাতলা হয়ে গেছে, সব সময় কাশে..তার দিকে একবার তাকিয়ে দ্যাখো। তার বয়স তের কিন্তু দেখলে মনে হবে দশ।’
‘না, নাস্তেনকা, না। তাকে আমি যথেষ্ট চাবুকপেটা করিনি। জালিমটাকে চাবুক মেরে সমান করে দেয়ার দরকার ছিল। আহ্… হায় যিশু!’ সে তার মুষ্টি তুলে পুত্রের দিকে নিয়ে গেল, ‘তুই একটা ধাতানি পেতে চাস, কিন্তু আমার সে শক্তি আর নেই। তারা বহু বছর আগে আমাকে ঠিকই বলেছিল যখন সে ছোট ছিল, ‘তাকে চাবকাও! তাকে চাবকাও!’ তখন তাদের কথায় আমি কর্ণপাত করিনি। আমি এক পাপী মহিলা এবং এখন আমি সেই জন্যে ভুগছি। তুই একটু দাঁড়া। আমি তোর ছাল তুলে নেব একেবারে। একটু সবুর কর…’
মা তার ভেজা ভেজা মুষ্টিটা ঝাঁকাতে লাগল, তারপর কাঁদতে কাঁদতে ঢুকে গেল তার ভাড়া করা ঘরে। বাড়ির মালিক ইয়েভ্টিহি কুজমিচ কুপোরোসসভ তার পড়ার টেবিলে বসে নিজে নিজে নাচ শেখা বইটি পড়ছিল। ইয়েভটিহি কুজমিচ ছিল একজন বুদ্ধিমান লোক এবং উচ্চশিক্ষিত। সে সবসময় নাকে কথা বলত, সাবান দিয়ে গা ধুতো যার ঘ্রাণ শুঁকে বাড়ির সবারই হাঁচি উঠত, উপবাসের দিনগুলোতে সে মাংস দিয়ে পানাহার করত এবং সে সবসময় তার জন্য একজন বিশুদ্ধ শিক্ষিত কনে খুঁজে বেড়াত এবং বাড়ির মালিকদের মধ্যে তাকে মনে করা হতো সবচেয়ে বুদ্ধিমান। সে সপ্তম সুরে গান গাইত।
‘আমার একজন ভালো বন্ধু’ মা বলে উঠল চোখের পানি ফেলতে ফেলতে, ‘তোমার যদি মহানুভবতা বলে কিছু থাকে, তাহলে আমার পুত্রটাকে চাবুকপেটা করো… আমাকে এ ব্যাপারে অনুকম্পা করো দয়া করে! সে পরীক্ষায় ফেল করেছে। বান্দর ছেলে কোথাকার! তুমি কি বিশ্বাস করবে যে, সে ফেল করেছে? আমি তাকে শাস্তি দিতে পারছি না, জানো তো আমার শরীর খুব খারাপ…আমার হয়ে তাকে চাবকাও, যদি তুমি সদ্বিবেচক হয়ে থাকো, ইয়েভটিহি কুজমিচ! একজন অসুস্থ মহিলাকে একটু অনুকম্পা করো!’
কুপোরোসসভ তার ভ্রু কুঁচকালো এবং নাক দিয়ে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। সে কিছুক্ষণ চিন্তা করল, টেবিলে আঙুল দিয়ে দড়াম করে শব্দ করল এবং আরেকবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে গেল ভান্নার কাছে।
‘তোমাকে পড়ানো হচ্ছে,’ সে বলতে আরম্ভ করল, ‘তোমাকে শিক্ষিত করা হচ্ছে, তোমাকে সুযোগ দেয়া হচ্ছে, কিন্তু তুমি নিজেই এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসছো! এমনটি কেন করেছ, বলো?’
সে অনেক সময় ধরে কথা বলল, একটা বক্তৃতাই দিয়ে ফেলল বলা যায়। সে বিজ্ঞান, আলো ও অন্ধকারের উদ্ধৃতি দিয়ে কথা বলল।
‘হ্যাঁ, যুবক।’
যখন সে কথা শেষ করল, সে তার পরনের বেল্ট খুলে ফেলল এবং ভান্নার হাত ধরে ফেলল।
সে বলল, ‘এটা দিয়েই তোমাকে শিক্ষা দিতে হবে।’
ভান্না আনুগত্য স্বীকার করে হাঁটু গেড়ে বসে মাথা নুইয়ে দিলো মালিকের পায়ের কাছে। তার প্রসিদ্ধ গোলাপি কানদুটো মালিকের ট্রাউজার ছুঁয়ে এদিক ওদিক নড়তে থাকলো।
ভান্না কোনো টুঁ শব্দ করল না। সন্ধ্যেবেলা পারিবারিক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হলো যে, তাকে ব্যবসায়ে পাঠানো হবে।
প্রকাশকাল: জুন-২০১৭


