লেখকের সাথে যাবো এক গহিন বনে

আলী ইমাম

0
15

আজ তোমাদেরকে নিয়ে যেতে চাইছি ডেনমার্কের এক গহিন বনে। এটি হবে মানসভ্রমণ। সেই বনে আমরা চলে যাব শব্দপাখায় ভর করে। শব্দডানায় উড়াল দেবো। সেই বনে রয়েছে পাইন, এলম, ওক আর বার্চ গাছের সারি। অজস্র গাছগাছালিতে ভরা সেই বন। আমরা যাব সেই নিবিড়, গহিন বনের একটি ফার গাছের কাছে। সেই গাছটির সাথে পরিচিত হবো। সারা জীবন ধরে যে দুঃখ, কষ্ট সয়েছে এই ফারগাছটি। ক্রমাগত যন্ত্রণা পেয়েছে। তার জীবনের কথাগুলো জানার পর তার প্রতি আমাদের সহানুভূতি জেগে উঠবে। তার যন্ত্রণায় আমরা দুঃখিত হবো। আমাদের সবার মনে অবশ্যই মায়া জন্মাবে। আর এই পুরো ব্যাপারটি ঘটবে একজন মহান লেখকের কল্যাণে। যাকে বলা হয় রূপকথার জাদুকর। পৃথিবীর সেরা শিশুসাহিত্যিক। তাঁর নাম হান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসন (১৮০৫-১৮৭৫)।
অপরূপ সব রূপকথা লিখেছেন তিনি। সমগ্র পৃথিবী জুড়ে তাঁর সুনাম। শিশুরা দারুণ রকমের মুগ্ধ হয় তাঁর রচনা পড়ে। তিনি অপূর্ব সুন্দরভাবে রূপকথার সাথে তাঁর কল্পনাশক্তিকে মিশিয়ে দিতে পেরেছিলেন। অ্যান্ডারসনের জীবনটা ছিল দুঃখকষ্টে ভরা। তিনি আশ্চর্য সুন্দরভাবে তাঁর জীবনের অনেক দুঃখকে লেখার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল শিশুদের মন থেকে অন্ধকার দূরীভূত করার। আলোকিত করার। শিশুদের কৌতূহলী মন যেন আনন্দে ঝলমল হয়ে ওঠে। যেমনটি হয়েছিল এই গহিন বনের ছোট ফারগাছটির বেলায় ।
অ্যান্ডারসনের মাঝে ছিল সেই দুর্লভ ক্ষমতা যাতে তার নিজের ইচ্ছা, স্বপ্ন, কল্পনা, আর অনুভূতিগুলো লেখার পরতে পরতে ফুলের মতো ফুটে ওঠে। তিনি মমতা আর আবেগ মিশিয়ে রচনা করেছেন অপরূপ সব রূপকথা। যাতে আছে মায়াবি হাতছানি। যেমন রয়েছে সেই ফারগাছের গল্পটিতে। যার হাতছানিতে আমরা মানসভ্রমণে চলে যেতে চাইছি সেই চিরদুঃখী ফারগাছের কাছে। জানতে চাইছি তার জীবনের দুঃখকষ্টগুলোকে। তাঁর কাহিনীগুলো শুধু রূপকথা ছিল না। তার চেয়েও এক ভিন্ন উপাদান তাতে মিশে ছিল।
এদিকে অ্যান্ডারসনের নিজের জীবনটাও ছিল প্রচণ্ড দুঃখকষ্টে ভরা। তাঁর জীবনের প্রতিটি স্তরে দুঃখ তার নাম লিখে গেছে। তাই তিনি প্রকৃতির দুঃখকে বুঝতে পারতেন। গাছগাছালি, লতাপাতা, গুল্মের দুঃখ বুঝতেন। পাখি ও প্রাণিকুলের দুঃখ বুঝতেন।
বাল্টিক সাগরের তীরের ডেনমার্কের ফুলেন দ্বীপের ছোট শহর ওডেন্সের এক সরু গলিতে ১৮০৫ সালের ২ এপ্রিল তাঁর জন্ম। তাদের পরিবারটি ছিল ভীষণ গরিব। হান্স অ্যান্ডারসন তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, আমাদের একমাত্র ছোট ঘরটার প্রায় সমস্ত জায়গায় ভরাট হয়ে থাকত জুতো সেলাইয়ের বেঞ্চি আর সাজসরঞ্জামে। তাছাড়া ছিল বিছানা, একটা তক্তপোষ আর আমার শোবার জন্য ক্যাম্পখাট। চার দেয়ালেই টাঙানো
থাকত ছবি। বাবার কাজ করার বেঞ্চির ওপরে একটা কাভার্ডে থাকত বইপত্র আর স্বরলিপির খাতা। ছোট্ট রান্নাঘরটিতে ছিল এক সারি তামার থালাবাসন আর সেই ছোট্ট রান্নাঘরটির অল্প একটু ফাঁকা জায়গাই আমার কাছে তখন অনেকখানি মনে হতো। ঐটুকু ফাঁকা জায়গায় গিয়ে যখন বসতাম, নিজেকে তখন মনে হতো মস্তবড় লোক বলে।
অ্যান্ডারসনের বাবা ছিলেন সামান্য এক মুচি। নিঃসঙ্গ মানুষ ছিলেন। জুতো সেলাইয়ের চেয়েও স্বপ্ন দেখতে বেশি পছন্দ করতেন। যে রোগটি তখন ছোট্ট হান্সকেও পেয়ে বসেছিল। নিজেও ছিলেন তাঁর বাবার মতোই নিঃসঙ্গ। দেখতে ছিলেন বিচ্ছিরি ধরনের। কুৎসিত চেহারার জন্য সবাই তাকে অবহেলা করত। তাঁর দাদা ছিলেন ভবঘুরে উন্মাদ। ওডেন্সের পথেঘাটে বেখেয়ালে ঘুরে বেড়াতেন। সব মিলিয়ে অ্যান্ডারসনের ছেলেবেলাটি ছিল দুঃখে ভরা।
নিজের কদাকার চেহারার জন্য সবার কাছে উপহাসের পাত্র হয়েছিলেন। সেই দুঃখবোধ থেকেই পরবর্তীতে লিখেছেন বিশ্ব বিখ্যাত ‘কুচ্ছিত হাঁসছানা’ গল্পটি। শৈশবে অ্যান্ডারসন তাঁর মা আনেমেরির কাছে ছেলেবেলার কথা শুনেছিলেন। খুব গরিব ছিল তাদের পরিবারটি। আনেমেরিকে সে কারণে তার বাবা-মা পাঠাত ভিক্ষে করার জন্য। লজ্জায়, কুণ্ঠায় কারো কাছে ভিক্ষে চাইতে পারতেন না আনেমেরি। লুকিয়ে সাঁকোর নিচে ঝোঁপঝাড়ের কাছে বসে থাকতেন। শীতকালে তীব্র ঠাণ্ডায় জমে যেতেন। অ্যান্ডারসন তার মায়ের সেই করুণ অভিজ্ঞতাকে নিয়ে রচনা করেছিলেন ‘এক শীতে ছোট্ট এক মেয়ে’ নামে মর্মস্পর্শী এক কাহিনী।
অ্যান্ডারসনের বয়স যখন এগারো বছর তখন তাঁর বাবা যুদ্ধে গিয়েছিলেন। জুতো সেলাইয়ের কাজে মন টিকছিল না। কিন্তু যুদ্ধে পৌঁছার আগেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়। তাই হতাশ হয়ে ফিরে এসে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। শয্যাশায়ী হন। মৃত্যুর পূর্বে আনেমেরিকে বলে গিয়েছিলেন, হান্স যাই হতে চাক না কেন, তাকে কিন্তু তাই হতে দিয়ো। যদি তা পৃথিবীর সবচেয়ে উজবুক ব্যাপারও হয় তবু তুমি তাতে কোনো প্রকার বাধা দিয়ো না। যা ওর ইচ্ছে তাই যেন হতে পারে।
১৮৪৩ সালে একটি উপন্যাস লেখার সময় অ্যান্ডারসন সিদ্ধান্ত নিলেন যে তিনি শিশুদের জন্য কলম ধরবেন। তখন এক বন্ধুকে চিঠিতে জানালেন, এখন থেকে আমি ছোটদের জন্য রূপকথা লেখা শুরু করেছি। কারণ আগামী প্রজন্মকে আমি জয় করতে চাই।
তা করতে তিনি সফল হয়েছিলেন। অসাধারণ প্রতিভাসম্পন্ন ছিলেন। সৃষ্টি করলেন অপরূপ রূপকথার মায়াবি এক জগত। প্রচলিত লোকপ্রবাদের সাথে নিজস্ব কল্পনার মিশেলে সৃষ্টি করেছেন মনছোঁয়া সব অপূর্ব লেখা।
অ্যান্ডারসন সময় কাটাতেন পাড়ার ছোট ছেলেমেয়েদের সাথে। তিনি চমৎকারভাবে পুতুল তৈরি করতে পারতেন। ছেলেমেয়েরা সেসব সুন্দর পুতুলের লোভে তার কাছে আসত। তিনি তাদের ছেলেবেলার শোনা রূপকথার গল্পগুলো কল্পনা মিশিয়ে বলতেন। শিশুরা বিস্ময়ে সেসব কাহিনী শুনতো। রূপকথার রচয়িতা হিসেবে নিজের জন্য এমন একটি আসন তিনি তৈরি করে নিতে পেরেছিলেন যার তুলনা বিশ্বে মেলা ভার। দেড় শতাধিক আকর্ষণীয় কাহিনী রচনা করেছেন। সমস্ত পৃথিবীর শিশুরা তাঁর লেখা পড়ে মুগ্ধ হয়েছে। শিশুদের পাশাপাশি বড়রাও তাঁর রূপকথা পাঠ করে অনায়াসে এক আনন্দময় জগতে হারিয়ে যেতে পারে। তাঁকে বলা চলে শ্রেষ্ঠ শিশু মায়াবী।
তাঁর একটি বিখ্যাত রচনা, ‘কোকিল ও কলের কোকিল।’ সেখানে চিনদেশের প্রতাপশালী সম্রাটকে বলছে বুলবুল পাখি, ‘হে নৃপতি, তোমার ঐ মুকুটের চাইতে তোমার হৃদয়টাকেই আমি বেশি ভালোবাসি।’ এতে অ্যান্ডারসনের মনের কথাটি যেন প্রকাশিত হয়েছে।
১৮৫০ সালের ২৬ জুনের দিনলিপিতে তিনি লিখেছেন, ‘একজন ময়লা জীর্ণ পোশাক পরিহিত নোংরা ভবঘুরে লোক দাঁড়িয়ে ছিল ঝর্ণার কাছে। আমার কেন জানি মনে হলো যে, ও আমার পরিচয় জানে। আর আমাকে দেখলেই অপ্রীতিকর কিছু বলে বসতে পারে। বলে বসতে পারে, তুমি তো আসলে ছিলে রাস্তার এক লোক। এখন উঁচু শ্রেণিতে উঠে বসেছ।
অ্যান্ডারসন খুব ভালো করেই বুঝতেন মানুষের মনকে। শুধু মানুষকে নিয়েই গল্প লেখেননি। পশু-পাখি, ফুল-ফল, গাছপালা, উদ্ভিদজগত, লতাপাতা, নিসর্গকে নিয়ে লিখেছেন। তাঁর রচনায় জলকন্যা, ফুলের পরী, মানুষের ছায়া, ডাইনি বুড়ি, সবই ঠিক মানুষের মতো জীবন্ত। তাঁর অপরূপ রচনাশৈলীর কারণে অতি সামান্য তুচ্ছ কোনো জিনিসও যেন পেয়ে যেত প্রাণের ছোঁয়া। অবিরাম ভ্রমণ করতেন। দূরের দেশে যাওয়ার প্রতি তাঁর ছিল প্রবল আগ্রহ। ত্রিশ বছরের পর থেকে প্রতি বছর তাঁর নতুন রূপকথা প্রকাশিত হতো। বই প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে চারদিকে তুমুল সাড়া পড়ে গেল। সবাই বলল, এমন ধরনের রূপকথা এর আগে রচিত হয়নি। তার রূপকথার ভক্ত হয়ে উঠল আবাল বৃদ্ধ বনিতা।

তাঁর আরেকটি চমৎকার গুণ ছিল কাগজ কেটেকুটে পুতুল তৈরি করা। সেসব পুতুল ছিল তাঁর শৈশবকালে শোনা রূপকথার স্বপ্নের চরিত্ররা। সারা জীবন এই পুতুল তৈরির অভ্যাসটি ছিল। তিনি যখন যে বাড়িতেই যেতেন সেখানে বসেই কাঁচি দিয়ে কেটে কেটে নানা রকম ছবি আর পুতুল বানাতেন। শিশুদের নিকট তা ছিল সম্মোহনকারী। তিনি এসব কাগজ কাটা ছবির নানা রহস্য নিয়ে শিশুদের মজার সব গল্প বলতেন। আর এভাবে তাদের নিয়ে যেতেন স্বপ্নের ভুবনে। চমৎকার ছবি আঁকতে পারতেন।

শৈশব থেকে প্রকৃতির সৌন্দর্য তাঁকে আঁকিয়ে হতে সাহায্য করেছে। দৃশ্য থেকে সরাসরি পাখির পালক কিংবা নলখাগড়ার কলমের আঁচড়ে আঁকতেন। এসব ছবি তাঁর অভিজ্ঞতাকে ধারণ করে রেখেছে।
হান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসন তাঁর লেখনীর কারণে অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা পেলেন। রাজা-রানী তাঁর গল্প শোনার জন্য তাঁকে আমন্ত্রণ জানাতেন রাজপ্রাসাদে। রাজার পাশে বসিয়ে তাঁকে আপ্যায়ন করাতেন রানী। সেইসব দুর্লভ মুহূর্তে হান্স কিছুক্ষণের জন্য শৈশবে ফিরে যেতেন। তাঁর তখন মনে পড়ে যেত অনেক বছর আগে একটি হতদরিদ্র বালক ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ছোট একটি পুঁটলি হাতে করে পালিয়ে এসেছিল ওডেন্স থেকে কোপেনহেগেনে।
১৮৬৭ সালে তাঁকে তাঁর নিজ শহর ওডেন্সে এক নাগরিক সংবর্ধনা প্রদান করা হয়েছিল। হান্স বিশ্বাস করতেন যে, সেটি ছিল তাঁর জীবনের সর্বোচ্চ সম্মান। আবেগতাড়িত হয়ে লিখেছিলেন, ‘আমার নিজ শহর ওডেন্স আমাকে যে সম্মান ও স্বীকৃতি প্রদান করেছে তা আমি জীবনে স্বপ্নেও কল্পনা করিনি। আজ থেকে ৪৮ বছর আগে আমি একজন দরিদ্র বালক হিসেবে এই শহর ত্যাগ করি এবং আজকে আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা।
একজন পাঠক তাঁকে চিঠিতে জানিয়েছিল যে বাইবেলের পরেই তাঁর বই সবচেয়ে বেশি পঠিত হয়। এটা পড়ে আনন্দে অভিভূত হন অ্যান্ডারসন। ১৮৭৫ সালের ৪ঠা আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর একটি ঘোষণাপত্র উদ্ধার করা হয়। তাতে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমার মতে সমাজে মুচিরাই হচ্ছে সর্বাধিক বিখ্যাত। কেননা, আমি নিজে একজন মুচি ও ধোপানির ছেলে। আমাদের এই যুগ প্রতিটি সম্প্রদায় ও প্রতিটি মানুষকে কথা বলার অধিকার দিয়েছে।’
অ্যান্ডারসন তাঁর নিজের রচনায় নিজেকে প্রকাশ করতে ভীষণ ভালোবাসতেন। তাঁর অধিকাংশ লেখাতে অ্যান্ডারসনের উপস্থিতি যেন মূর্ত হয়ে উঠত। ‘কুচ্ছিত হাঁসছানা’ গল্পে স্বচ্ছপানিতে নিজের সুন্দর প্রতিবিম্ব দেখে হাঁসছানাটি ভাবল, ‘যখন আমি হতচ্ছাড়া কুৎসিত একটি হাঁসের ছানা ছিলাম তখন কি কোনো দিন আমি মনের কথা, রূপ লাবণ্যের কথা ভেবেছিলাম।’ আসলে সে ছিল রাজহাঁসের ছানা। বোঝা যায় যে, অ্যান্ডারসন এখানে নিজেকে ভিন্ন্ভাবে প্রকাশ করেছেন। ‘খুদে দেশলাই ফেরিঅলি’ গল্পের ছোট মেয়েটির মধ্যদিয়ে অ্যান্ডারসন তাঁর চেনা পৃথিবীর জগতের ছবিটিকে মর্মস্পর্শী ভাষায় তুলে ধরেন। যে মেয়েটি বছরের শেষ দিনের দারুণ তুষারঝরা শীতের রাতে দেশলাই ফেরি করছিল। তারপর প্রচণ্ড হিমে জমে গিয়ে দেশলাই শলাকা পোড়াতে পোড়াতে সে স্বপ্ন দেখেছিল। নববর্ষের শুরুতে বছরের শেষ রাতে ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি নিয়ে সে পরম আনন্দ গৌরবে তার পিতামহীর নিকট স্বর্গে চলে গেল। অ্যান্ডারসনের গল্প পাঠ করলে আমরা যেন সেখানটাতে আমাদের প্রিয়জনের সাক্ষাত পাই। গল্পগুলো পড়ে মন যেন কেমন করে ওঠে। মনে হয় সেখানে কত না আপনজনের কাহিনী বর্ণিত আছে। গল্পগুলো যে ভিন্ন কোনো দেশের, ভিন্ন কোনো সমাজের মানুষের সেটা মনে হয় না। কারণ গল্পগুলো রচিত হয়েছে অন্তর দিয়ে, যা কিনা দেশ কাল পাত্রকে অতিক্রম করেছে।
‘কেবলই মনে হয়, সব ছোট ছেলেমেয়ের মনের মধ্যে একটা গোপন দেশ আছে, যেখানে সব সুখের বাস। দুঃখ যে সেখানে নেই তা নয়, কিন্তু সে দুঃখ শুধু জয় করার জন্যই, সে দুঃখ ফুলের মতো সুন্দর, মখমলের মতো কোমল। সেই দেশকেই বলা চলে পরীর দেশ। সেখানে সব কিছুই সুন্দর। যা কিছু কুৎসিত তাদেরও সুন্দর দেখায়। নিষ্ঠুর সৎমায়েরা সেখানে সাজা ভোগ করে। সেখানকার শিশুরা সেকালেরও নয়, একালেরও নয়, তারা হলো চিরকালের। তারা সব দেশের। তারা কোনো নির্দিষ্ট সীমা বা গণ্ডির মাঝে আবদ্ধ নয়। সব মানুষের ছেলেমেয়েদের বুকের ভেতর যে চিরন্তন শিশুমনটি বাস করে, হান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসন তাদের গল্পই লিখতেন। খুঁজলে পৃথিবীর সব দেশেই পরীদের দেশ পাওয়া যায়। ঐ পরীদের দেশটা আমাদের এই চেনা পৃথিবী ছাড়া আর কিছুই নয়। সেটা হচ্ছে মনের ইচ্ছের দেশ। যা দেখতে হবে কল্পনা আর সমবেদনার চোখ দিয়ে।
এসো আজ আমরা রূপকথার মায়াবি জগতের নায়ক হান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের সাথে তার রচিত গহিন বনের সেই ছোট ফারগাছটির কাছে যাই। শুনি তার দুঃখ কাহিনী।

গহিন বনের ভেতর তাজা বাতাস এসে বেশ একটা চমৎকার পরিবেশ তৈরি করেছিল। ঝিরঝিরে পাতাকাঁপা বাতাসের সাথে মিশে ছিল সোনালি রোদ। এতে সেই জায়গাটি উজ্জ্বল হয়ে থাকত। সেখানে একটা ছোট্ট সবুজ ফারগাছ জন্মাল। সেখানে আগে থেকেই ছিল উঁচু পাইন আর পুরানো ফারগাছ। নতুন জন্ম নেয়া ছোট ফারগাছটিকে ঝকঝকে রোদ আদর করত। তার ওপরে ছড়িয়ে দিত সোনালি আলোর ঢেউ। উত্তর দক্ষিণের এলোমেলো বাতাস এসে সেই ফারগাছের খুদে পাতাগুলোকে ঝিরঝির করে নাড়িয়ে দিত। কিন্তু এসব পেয়েও সেই ফারগাছটি সুখী ছিল না। সোনালি রোদ, ঝিরঝিরে বাতাস পেয়েও সে আনন্দিত হতো না। বনের পাশের গাঁ থেকে যেসব শিশুরা দলবেঁধে সেখানে এসে খেলত তারাও তাকে আনন্দিত করত না। কোনো কোনো শিশু বন থেকে বুনোজাম কুড়িয়ে ঝুড়িভর্তি করে সেই ফারগাছটির কাছে আসত। তারা গাছটির সুন্দর রূপকে ভারি পছন্দ করত। তারা বলত, কী যে চমৎকার দেখতে এই ফারগাছটা। শিশুরা হাসিমুখে তাকিয়ে থাকত সেই ফারগাছটির দিকে। কিন্তু শিশুদের কাছ থেকে এত প্রশংসা শুনেও ফারগাছটি আনন্দিত হতো না। বরং গাছটা মন খারাপ করে থাকত। সেই ছোট ফারগাছটি ধীরে ধীরে বাড়ছে। বছরের শেষ দিকে খানিকটা বাড়ল। তার পরের বছর আরো কিছুটা বাড়ল। এভাবে তরতর করে বেড়ে চলল। প্রতি বছরই বাড়বে গাছটা। তার চিহ্ন থাকবে গুড়ির গাটে। গাটের সংখ্যাই জানিয়ে দেবে যে কত বয়স হলো গাছটির।
তবে সেই গাছটির মনে অনেক দুঃখ ছিল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবত, ‘আহা, আমি যদি আমার চার পাশের পাইন আর ফারগাছগুলোর মতো আরো অনেক বেশি উঁচু হতাম তাহলে কী যে ভালো হতো। উঁচু হলে অনেক দূর পর্যন্ত আমার ডালপালাগুলোকে মেলে দিতে পারতাম। তখন আমার সুবিধে হতো সবার মাথার ওপর দিয়ে উঁকি মেরে এই বিশাল পৃথিবীটাকে দেখার। পাখিরা তখন আমার উঁচু ডালে এসে বাসা বাঁধত। আর যখন প্রবল বাতাসের ঝাপটা আসত তখন আমি মাথা ন্ইুয়ে অভিবাদন জানাতাম। যেভাবে অন্যান্য উঁচু ফারগাছগুলো জানায়।
সেই ফারগাছটি অনায়াসে পেত উজ্জ্বল সূর্যের আলো। পাখিরা শোনাত গান। সকাল-সাঁঝে মাথার ওপর দিয়ে ভেসে যেত মেঘের সারি। গোলাপি রঙের মেঘ যেন অনেক ঝুঁকে। এতকিছু দেখার পরেও ফারগাছটির নিরানন্দ ভাবটি কাটত না। সে থাকত বিষাদমাখা অবস্থায়। মনে নেই কোনো ধরনের সুখ। একসময় চলে আসে শীতকাল। হিমেল বাতাসের ঝাপটায় গহিন বনটি যেন কেঁপে ওঠে। ধবধবে সাদা বরফে ছেয়ে যায় মাঠ প্রান্তর। চারপাশে বরফের আস্তরণ। সেসময় একটা খরগোশকে দেখা যেত বনের ভেতর আসছে খেলার জন্য। সে পছন্দ করত স্কি খেলতে। স্কি করে সে লাফিয়ে ছোট ফারগাছটির ওপর দিয়ে যেত। চমৎকার ভঙ্গিতে যেন উড়ে যেত। আর সেটা দেখে ফারগাছটি আবার রেগে যেত। এভাবে পরপর দুটো শীতকাল চলে যায়। তৃতীয় শীতকালের সময় দেখা গেল যে সেই ছোট্ট ফারগাছটি দীঘল হয়ে উঠেছে। তখন খরগোশটির পক্ষে আর সম্ভব হয় না ফারগাছটিকে লাফ দিয়ে ডিঙিয়ে যেতে। কারণ গাছটি যথেষ্ট লম্বা হয়ে গেছে। খরগোশটি তখন বাধ্য হলো ফারগাছটিকে পাশ কাটিয়ে ঘুরপথে যেতে।
এদিকে ফারগাছটি বেড়েই চলেছে। সে ভাবতে থাকে তাকে আরো দীর্ঘ হতে হবে। আরো অনেক লম্বা হতে হবে। সবার চাইতে উঁচু হতে হবে। এ বনের কোনো গাছ যেন নাগাল না পায়। সে থাকবে সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে। সেই ফারগাছটির কাছে তখন মনে হয় শুধু তরতর করে বেড়ে ওঠা আর উঁচু হওয়ার মাঝেই রয়েছে আনন্দ। হেমন্তকালে বনে কাঠ সংগ্রহ করতে আসে কাঠুরের দল। তারা আসে কুড়াল নিয়ে। চকচকে ধারালো অস্ত্র হাতে নিয়ে বেপরোয়া ভঙ্গিতে ঢোকে। ঢুকে বনের সবচেয়ে বড় গাছগুলোকে বাছাই করে। তারপর কয়েকটা বড় গাছকে কেটে নিয়ে যায়। প্রতি বছরই কাঠুরেরা এই কাজটি করে থাকে। সেই ফারগাছটি তরতরিয়ে বেড়েছে। তত দিনে সে যুবক গাছে পরিণত হয়েছে। সে তখন দেখত যে কাঠুরেদের কুড়ালের কোপে আকাশছোঁয়া দীর্ঘ গাছগুলো মাটিতে আছড়ে পড়ছে তখন দারুণ ভয় পেত। গাছভাঙার মরমর শব্দে সে শিউরে উঠত। ঐ রকম গাছ পড়ার কারণে আশপাশের ঝোপঝাড়গুলো তছনছ হয়ে যেত। গাছের সমস্ত সৌন্দর্য যেন নষ্ট হয়ে গেছে। এমন দেখাত যে গাছগুলোকে যেন আর চেনা যাচ্ছে না। আগের মতো সেই উদ্ধত ভাব নেই। গর্বিত ভাব নেই। তারপর কাঠুরেরা গাছের টুকরোগুলোকে ঘোড়াটানা গাড়িতে তুলে নিয়ে বনের বাইরে চলে যেত। সেই ফারগাছটি চিন্তা করত, তাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে?
পরের বছরে পরিযায়ী পাখিরা গরমের দেশে শীতকালটাকে কাটিয়ে ফিরে এলো বনে। সোয়ালো পাখিরা এলো। সারস পাখিরা এলো। তখন সেই ফারগাছটি কৌতূহলী হয়ে পরিযায়ী পাখিদের জিজ্ঞেস করে, ‘তোমারা কি আমাকে জানাতে পারবে যে মানুষেরা এ বনের বিশাল গাছগুলোকে কোথায় নিয়ে গিয়েছে। সোয়ালো পাখিরা অবশ্য এ বিষয়টি সম্পর্কে কিছুই জানত না। সারস পাখি বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে জানায়, ‘মনে হয় আমি যেন তাদের দেখেছি। আমি যখন মিসর দেশ থেকে ফিরছিলাম তখন ফেরার পথে সাগরে প্রচুর জাহাজ দেখেছিলাম। তাদের ছিল উঁচু মাস্তুল আর তাদের গা থেকে বেরোচ্ছিল ফারগাছেরই গন্ধ। যদি ওগুলো তোমার সেই গাছেরা হয়ে থাকে তাহলে তো তোমাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। কারণ তোমার ফারগাছ ভাইগুলো চমৎকার জাহাজের মাস্তুল হয়েছিল। আর তারা সমুদ্রের বুকে ভেসে যাচ্ছিল অপূর্ব ভঙ্গিতে। ফারগাছটি তখন জানতে চায়, ‘আমি কি যথেষ্ট উঁচু হয়েছি সাগরের বুকে মাস্তুল হিসেবে ঘুরে বেড়ানোর জন্য? আচ্ছা বলো তো সাগর দেখতে কী রকম?’ সারস পাখি বলল, ‘তুমি জানতে চাইছো যে সাগর দেখতে কেমন? তা বোঝাতে গেলে তো অনেকটা সময় লেগে যাবে। আমার তো অত সময় নেই।’ এ কথা বলেই সারস উড়াল দিয়ে চলে যায়। তখন সূর্যের আলো ফারগাছের সবুজ পাতায় ঝিকমিকিয়ে উঠে বলল, ‘এই যে এখন তোমার মাঝে যে সবুজটুকু আছে তা নিয়েই আনন্দিত হও। তোমার ভেতরে এখন নতুন প্রাণশক্তি বইছে। তা দিয়েই চারপাশ থেকে আনন্দ শুষে নাও। তখন ঝিরঝিরে বাতাস এসে সেই ফারগাছের শাখাগুলো ছুঁয়ে যায়। আর সারারাত ধরে শিশিরবিন্দু ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে তাকে ভেজালো।

কিন্তু ফারগাছটি এসবের কোনো কিছুতেই আনন্দ পেল না। আসলে সে এসবের মর্মই বুঝতে পারল না। ঠিকমতো অনুভব করতে পারল না। একসময় বড়দিনের উৎসবের সময় ঘনিয়ে আসে। ক্রিসমাস বৃক্ষ হিসেবে ফারগাছকে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। নগরী থেকে মানুষেরা বনে এসে বেশকিছু মাঝারি আকারের ফারগাছকে কেটে ফেলল। এসব গাছের কিছু ছিল সেই ফারগাছের চাইতেও ছোট। যে ফারগাছটি বন থেকে বেরুবার জন্য অস্থির হয়েছিল। মানুষেরা সবচেয়ে সুন্দর আর সবুজ গাছগুলোকে বাছাই করে কাটল। তাদের ডালপালা অবশ্য ছাঁটা হলো না। সবুজ পাতাভরা ডালপালাগুলোকে রেখে দেয়া হলো। তারপর সেই আস্ত গাছগুলোকে ঘোড়াটানা গাড়িতে চাপিয়ে বনের বাইরে নিয়ে যাওয়া হলো।
সেই ফারগাাছটি জানতে চায়, ‘কোথায় যাচ্ছে ওরা? ওরা তো আমার চাইতে দীর্ঘ না। ওদের ডালপালা ছাঁটা হলো না কেন? ওদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে? চড়ুই পাখিরা বলল, ‘ওদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে তা কিন্তু আমরা জানি। শহরে গেলেই তো আমরা মানুষদের ঘরবাড়ির জানালাতে উড়ে যাই। আমরা জানালার শার্সি দিয়ে উঁকি মেরে দেখেছি ওদেরকে সুন্দরভাবে রাখা হয় ঘরের মাঝখানে। ওদের শরীরে ঝুলিয়ে দেয়া হয় প্রচুর রঙিন বাতি। ডালে ডালে ঝোলানো হয় রাংতা মোড়ানো উপহার। জরি ফিতে ঝুলতে থাকে। তারা কত সমাদর পায়। সেই ফারগাছটি চড়ুই পাখিদের কাছ থেকে এমন বিবরণ শুনে উদগ্রিব হয়ে ওঠে। ব্যাকুল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,‘ তারপর কী হয়? চড়ুই পাখির ঝাঁক কিচিরমিচির করে জানাল, ‘এরপরের ঘটনাগুলো আর আমাদের দেখা হয়নি। তবে এ কথা বলা যায় সেটা ছিল এক জাঁকজমকের উৎসব। সেখানে অবশ্যই ছিল প্রচুর আনন্দ। প্রচুর ফূর্তি।’

সেই ফারগাছটির মনে তখন দুঃখ টলমল করে উঠল। বলল, ‘আহা আমার ভাগ্যে কী এমন উৎসব জুটবে। এতো দেখছি সাগরে ভেসে বেড়ানোর চেয়ে বেশি ভালো। জানি না এই বনের ভেতরে আমাকে আর কতকাল দাঁড়িয়ে থেকে অপেক্ষা করতে হবে। কবে আবার বড়দিন আসবে? এখন তো আমি বেশ বড় হয়ে গেছি। কত সুন্দর ডালপালা গজিয়েছে আমার বুকে। তার ছিল ঠিক তেমন ধরনের যাদের গেলবারের বড়দিনের উৎসবের সময় কেটে নেয়া হলো। আমি যদি এখনি ঐ ঘোড়াটানা গাড়িতে উঠতে পারতাম। কী যে ভালো হতো। আমি চলে যেতে পারতাম উৎসব নগরীর ঘরে। সেখানকার জাঁকজমকের উৎসবে অংশগ্রহণ করতে পারতাম। সেখানে নিশ্চয় আরো ভালো কিছু ঘটে যা চড়ুইরা দেখেনি। বড়দিন আসতে যে কত দেরি?’
তখন ঝিরিঝিরি বাতাস আর সোনালি রোদ ফারগাছটিকে বলল, ‘তুমি আনন্দ করো। তোমার ভেতরে যে সজীব তারুণ্য রয়েছে তা নিয়ে আনন্দ করো। পুরোপুরি আনন্দে মেতে ওঠো। তুমি এ কথা জেনে খুশি হও যে আমরা তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি। তুমি কিন্তু এখনো স্বাধীন। বাতাস আর রোদের কাছ থেকে এমন কথা শুনেও কিন্তু সেই ফারগাছটি খুশি হলো না। পুরো শীত আর গ্রীষ্মকাল জুড়ে সে শুধু বেড়েই চলল। তার ঘন পাতারাশির সুবাস দেখে লোকজন প্রশংসা করত। বলত, ‘ভারি সুন্দর দেখাচ্ছে তো এই ফারগাছটিকে। কী সবুজ! দেখে মনে হচ্ছে সবুজ মখমলের চাদরে মোড়া। আবার বড়দিনকে সাথে নিয়ে চলে আসে শীতকাল। কনকনে শীতল বাতাস বইতে থাকে। বরফ পড়া শুরু হয়। লোকজন বনে আসে ক্রিসমাস বৃক্ষ সংগ্রহ করার জন্যে। কাঠুরেরা তাদের কুড়ালের প্রথম কোপটি বসাল সেই ফারগাছটির গোড়াতে। যে সবসময় বনের বাইরে চলে যাবার কথা ভাবত। কুড়ালের প্রচণ্ড আঘাতে তার শরীরে যন্ত্রণার অনুভূতি ছড়িয়ে যায়। তীক্ষ্ম ব্যথায় সে থরথরিয়ে কেঁপে উঠল। ক্রমাগত আঘাতে সে উৎপাটিত হলো। মুখ থুবড়ে পড়ল মাটিতে। এতদিন ধরে সে যেসব সুন্দর কল্পনা করেছিল তা কুঠারাঘাতে তছনছ হয়ে গেল। সে তার কল্পনাতে কত না হাসিখুশির রঙ মিশিয়েছিল। যাতে তার নিরানন্দ জীবনটা সুখী হয়। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় তখন সবকিছু ভুলে যায় সে। তার সুন্দর কামনা বাসনার অনুভূতিগুলো বিলীন হয়ে যায়। সুখের পরিবর্তে তার ভেতরে তীব্র কষ্টের এক অনুভূতি হয়। সে বুঝতে পারে এবার তার চিরচেনা আবাসস্থলটি ত্যাগ করে যেতে হবে। এখানেই সে জন্মগ্রহণ করেছিল। এখানকার পরিবেশে বড় হয়েছে। এখানকার আলো, বাতাস, তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। সে পুষ্ট হয়েছে। বাড়-বাড়ন্ত হয়েছে। এতে তার যে অনুভূতি হলো সেটা তার সমস্ত সুখের কল্পনার চাইতেও গভীর ছিল। সে ভাবছিল যে এরপর থেকে তার চিরচেনা বন্ধুদের সাথে আর দেখা হবে না। দেখা হবে না প্রতিবেশী বন্ধু গাছগুলোর সাথে। চারপাশে গজিয়ে ওঠা বুনো ফুলের ঝোপঝাড়ের সাথে। বন্ধু পাখিদের সাথে। যখন তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য ঘোড়াটানা গাড়িতে তোলা হলো তখনও তার কোনো রকমের আনন্দ হচ্ছিল না। ব্যথার যন্ত্রণায় সে কুঁকড়ে যাচ্ছিল। ঘোড়াটানা গাড়িতে চেপে গহিন বনের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে কেটে ফেলা ফারগাছটি। গাড়িটি একসময় তাকে নিয়ে এলো শহরের এক বাড়ির উঠানে। বাড়ির ভেতর থেকে ক্রিসমাস বৃক্ষটিকে দেখার জন্য লোকজন বেরিয়ে আসে। তারা গাছটিকে দেখে খুশি হয়। একজন তো উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে,‘ বাহ, চমৎকার গাছ। আমরা তো ঠিক এমনটাই চেয়েছিলাম। আমাদের ইচ্ছেটি একেবারে মিলে গেছে।
দুজন সুবেশধারী লোক সেই ফারগাছটিকে ঘোড়াটানা গাড়ি থেকে নামিয়ে বয়ে নিয়ে গেল বাড়ির সাজানো গোছানো বৈঠকখানাতে। সেই ঘরের দেয়ালজুড়ে টাঙানো ছিল রঙিন চিত্র। শাদা চিনামাটির তৈরি ফুলদানিতে ছিল সিংহের মাথা খোদাই করা। এধারে ছিল দুটি বড় আরামকেদারা। রেশমি ঝালর দেয়া কয়েকটি গদিআঁটা চেয়ার ঝকঝক করছিল। টেবিলে সাজানো ছিল ছবিঅলা বইপত্র। নানা রকমের পুতুল, খেলনা।
ফারগাছটি শুনতে পেল যে সেগুলো খুব মূল্যবান। শিশুরা সেই সব দামি জিনিসপত্র নিয়ে বলাবলি করছিল। লোকজন ফারগাছটিকে বসালো বালুভর্তি এক পিপের ভেতরে পিপেটাকে সবুজ কাপড়ে জড়ানো হলো। পিপেটাকে রাখা হয়েছিল একটা নকশা করা গালিচার ওপরে। এমন চমৎকারভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছিল যে পিপেটাকে আর সাধারণ একটি পিপে বলে চেনাই যাচ্ছিল না। অন্য রকমের দেখাচ্ছিল। পিপেতে বসানো ফারগাছটি ভাবছিল এবার না জানি তার বেলায় কী ঘটবে। বাড়ির মেয়েরা ফারগাছটিকে সাজাতে থাকে। রঙিন কাগজের ঠোঙাতে মিষ্টি খাবার, কেক ভরে ঝুলিয়ে দেয় ফারগাছের ডালে। আপেল আর নাশপাতি ফল দেয় চকমকে রাংতা কাগজ দিয়ে। ফলগুলোকে এমন নিপুণভাবে ঝুলিতে দেয় যেন মনে হয় সেগুলো ঐ গাছের ডালেই ধরেছে। পাতাপুতির ফাঁকে বসিয়ে দিল রঙিন ছোট মোমবাতি। পাতার ফাঁকে পুতুল সাজিয়ে রাখা হলো। সেই পুতুলগুলো দেখতে ছিল জীবন্ত মানুষের মতো। এত সুন্দর পুতুল ফারগাছটি আগে আর কখনো দেখেনি। সবশেষে ফারগাছের মাথায় বসানো হলো এক ঝকঝকে তারা। যা ছিল সোনালি রাংতায় জড়ানো। সেই উজ্বল তারাটিকে গাছের মাথায় লাগিয়ে দেয়ার ফলে পুরো গাছটাই দেখতে অপূর্ব, সুন্দর হয়ে উঠল। তার মাঝে অনিন্দ্য সুন্দর রূপ যেন বিকশিত হয়ে উঠল। পুরো পরিবেশটাই আলোকিত হয়ে যায়। বাহারি রূপে ঝলমল করতে থাকে। ঘরের লোকজন বলাবলি করছিল যে সাঁঝবেলাতে সব আলো জ্বেলে দেয়া হবে। এ কথা শোনার পর ফারগাছটি ভাবল, ‘এখনি কেন সন্ধে নেমে আসছে না। সন্ধে হওয়া মাত্রই তো জ্বলে উঠবে সব আলো। ফারগাছের তখন একটা বিষয়ে কৌতূহল জাগে। ভাবে, বনের অন্য গাছেরা কি তার এই বর্তমান অবস্থাটা দেখতে আসবে। একসময় চড়ুই পাখিরা তাকে জানিয়েছিল যে তারা কিভাবে শহরের বাড়িগুলোর জানালার কাঁচের শার্সিতে উঁকি দিয়ে ঘরের ভেতরের উৎসব অনুষ্ঠানের কিছুটা দেখেছে। যা শুনে তার মনে আগ্রহ জেগেছিল। সেসব চড়ুই পাখির দলও কি এবার এখানে উড়ে এসে জানালার ফাঁক দিয়ে আমাকে দেখবে? আমি কতটা দীর্ঘ হয়ে এখানে দাঁড়িয়ে আছি। আমি কি এখানে বনের চেয়েও তাড়াতাড়ি বাড়ব? পুরো শীত আর গ্রীষ্মকালের সময়টা কি এমনি করে সজ্জিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকব? যখন ফারগাছটি এসব কথা ভাবছিল তখন তার বাকলের নিচে ব্যথা শুরু হলো। যন্ত্রণার রেশ ছড়িয়ে গেল। সাঁঝবেলাতে জ্বেলে দেয়া হলো ফারগাছে ঝুলিয়ে রাখা মোমবাতিগুলোকে। আলোর ছটায় ঝিকমিক করে উঠল সেই ফারগাছটা। হঠাৎ করে একগোছা পাতায় মোমবাতি থেকে আগুন ছিটকে এসে পড়লো। অমনি পাতাপুতিতে আগুন ধরে যায়। লোকজন তাড়াতাড়ি সে আগুন নিভিয়ে ফেলে। আকস্মিক এ ঘটনায় ফারগাছটি ভয় পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভয় পেয়ে সে উদ্ভ্রান্তের মতো কাঁপল না। যদি তার সাজগোজটি নষ্ট হয়ে যায়।
আচমকা ঘরের বড় দরজাটি খুলে যায়। একদল শিশু হইহই করে ঢুকে পড়ে। তারা ফারগাছটির দিকে ছুটে আসে। বড়রা আসছিল আস্তে ধীরে। ছোটরা আসছিল তাদের পেছনে। শিশুদের কলকাকলিতে ভরে ওঠে ঘরটা। শিশুরা ফারগাছটিকে ঘিরে হাত ধরাধরি করে গোল হয়ে নাচতে থাকে। গান গাইতে থাকে। গাছে ঝোলানো রাংতা মোড়ানো উপহারগুলো এক এক করে খুলে নিতে থাকে। ফারগাছটি ভাবে কী করছে ছেলেমেয়েরা। মোমবাতিগুলো তখন নিভু নিভু করছিল। আবার পাতাপুতিতে আগুন যদি ধরে যায়। সেই ভয়ে তাড়াতাড়ি করে সেগুলো নিভিয়ে ফেলা হয়। শিশুদের ডেকে বলা হলো, ‘তোমরা ইচ্ছেমতো উপহার পেরে নিতে পার। এ রকমের স্বাধীনতা পেয়ে শিশুর দল ফারগাছটির ওপরে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। তারপর মনের খুশিতে উপহারগুলো ছিঁড়ে নিতে লাগলো। গাছের মাথায় ঝকঝকে মস্ত তারাটি বাঁধা ছিল ছাদের সাথে। সে কারণে ফারগাছটি উল্টে পড়ে গেল না। যদিও তার আর কোনো ডাল আর আস্ত ছিল না। সমস্ত ডালই শিশুরা হুটোপুটি করে ভেঙে ফেলেছিল। শিশুরা তাদের মনের মতো খেলনাগুলোকে পেয়ে আনন্দে মেতে উঠল। ফারগাছটির কথা তাদের মনে এলো না। তারা ফারগাছটির কথা ভাবল না। শুধু এ বাড়ির এক বৃদ্ধা গাছের ডালপালা হাতড়াতে লাগলো ফল পাবার আশায়। যদি জুটে যায় পাকা ডুমুর ফল। এমন সময় শিশুরা একটা মোটা লোককে গাছের সামনে টেনে আনলো। তারা লোকটির কাছে গল্প শোনার বায়না ধরে। লোকটি গাছের নিচে বসে জানায়, ‘আমি কিন্তু খুব পছন্দ করি গাছের নিচে বসে গল্প শোনাতে। আর এই গাছটিরও বোধ হয় ভালো লাগবে গল্প শুনতে। আমি আজ একটি গল্প শোনাব। তোমরা কোন গল্প শুনতে চাও? তোমরা কি হাম্পটি ডাম্পটির গল্প শুনবে, যে কিনা সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে পড়ে গিয়েছিল। তারপর রাজকন্যাকে বিয়ে করে রাজা হয়েছিল। এ ছাড়া আমি ইভেডি এভেডির গল্পটাও জানি। তখন শিশুরা দুটি দলে ভাগ হয়ে যায়। একদল শুনতে চায় হাম্পটি ডাম্পটির গল্প। অন্য দল শুনতে চায় ইভেডি এভেডির গল্প। এ নিয়ে তারা প্রচণ্ড হট্টগোল শুরু করে দিলো। চেঁচামেচি করতে লাগলো। তাদের চিৎকার শুনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে ফারগাছটি। ভাবে, ‘ওদের সাথে আমারও কি চেঁচানো উচিত নয়? আমিও তো ওদের দলের একজন। আজকের সাঁঝবেলাতে আমার করণীয় যা ছিল তার সবকিছুই তো করেছি। মোটা লোকটি শুরু করল হাম্পটি ডাম্পটির গল্প বলা। যে সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে একতলায় পরে যাবার পরেও রাজকন্যেকে বিয়ে করে রাজা হয়েছিল। শিশুরা সে গল্পটি শুনে খুশিতে হাততালি দেয়। তারা বাকি গল্পটাও শুনতে আগ্রহী। কিন্তু সেদিনের মতো গল্প শোনার পালা শেষ হয়। একে একে সবাই চলে যায়।

গল্প শোনার পর ফারগাছটি ভাবল যে গহিন বনের পাখিরা তো তাকে কখনো এ রকম করে গল্প শোনায়নি। সে আশ্চর্য হয়ে ভাবতে থাকে হাম্পটি ডাম্পটির কথা। যে কিনা সিঁড়ি বেয়ে একতলায় গড়িয়ে যাবার পরেও রাজকন্যাকে বিবাহ করে রাজা হয়েছিল। বিচিত্র কাণ্ড। ঐ গল্পটি ফারগাছ বিশ্বাস করেছিল। কারণ যে লোকটি গল্পটি শুনিয়েছিল সে দেখতে ছিল সুন্দর। আর তার পরনে ছিল ঝলমলে পোশাক। তাকে দেখেই অভিজাত শ্রেণির বলে মনে হচ্ছিল। ফারগাছটি ভাবল, আমিও হয়তো একদিন ওরকম সিঁড়ি দিয়ে একতলায় গড়িয়ে পড়ে যাব। তারপর বিয়ে করব রাজকন্যাকে। পিপের ভেতরে একঠায় দাঁড়িয়ে থেকে ফারগাছটি আবার খুশি হলো। সে ভাবল পরদিন তাকে আবার মোমবাতি রাংতা কাগজ মুড়ে সাজানো হবে। উপহার ঝুলবে তার ডালে। সে আলো ঝলমলে হবে। সে তখন আর ভয় পাবে না। ভয়ে কাঁপবে না। সে আনন্দ করবে। উৎফুল্ল থাকবে। আবার শুনবে হাম্পটি ডাম্পটির গল্প। লোকটি হয়তো ইভেডি এভেডির গল্পটাও শোনাবে।

ফারগাছটি শুধু কল্পনা করছে পরদিনের উৎসবের কথা। উৎসবে যা কিছু ঘটবে তা ভেবে সে বিভোর থাকে। পরদিন ভোরে বাড়ির কাজের লোকেরা ঢুকলো সেই ঘরে। তাদের দেখে ফারগাছ ভাবল, তারা বুঝি তাকে নতুনভাবে সাজাতে গোছাতে এসেছে। আবার সে নতুন এক রূপ পাবে। ঝলমলে হয়ে উঠবে। কিন্তু সে অবাক হয়ে দেখল যে, তাকে পিপের বালু থেকে উপরে তুলে টেনে নিয়ে চলল সিঁড়ি দিয়ে। তাকে নিয়ে গেল চিলেকোঠায়। সেটা ছিল অন্ধকারে ঢাকা ঘুপচি মতো একটি ঘর। যে ঘরের কোথাও সূর্যের আলো পড়ে না। অন্ধকার জমাট বেঁধে থাকে। অপরিচ্ছন্ন একটি জায়গা। লোকেরা অবহেলায় তাকে সেখানে ধপাস করে ফেলে রেখে যায়। ফারগাছটি অসহায়ের মতো একাকি পড়ে থাকে। সে ধারণাই করতে পারছে না যে তার এমন করুণ দুর্দশা হবে। ফারগাছ ভাবছে, এর কোনো অর্থ হয় না। খুব বাজে ব্যাপার ঘটল। এখানে অন্ধকারে পড়ে থেকে আমি কী করব? আমি কী শুনব? চিলেকোঠার দেয়ালে ঠেস দিয়ে বেচারি ফারগাছটি এসব ভাবতে থাকে। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। এ রকম চিন্তা-ভাবনা করার তার মেলা সময়। এ ছাড়া তার তো আর কিছুই করার নেই। এভাবে ফারগাছটির দুঃসময় পেরিয়ে যেতে থাকে। অনেক মাস কেটে যায়। তবু চিলেকোঠার ঘরে ফারগাছের খবর জানতে কেউ এলো না। একদিন অবশ্য একজন চিলেকোঠায় এলো। তবে লোকটি সাথে করে এনেছিল কয়েকটি থলথলে ব্যাঙ। লোকটি চিলেকোঠায় ব্যাঙগুলোকে রেখে চলে গেল। আর কেউ এলো না। এভাবে ফারগাছটির কথা সবাই ভুলে যায়। কনকনে বাতাস চিলেকোঠার ঘুলঘুলির ফোকর দিয়ে ঢোকে। সেই বাতাসের ছোঁয়া পেয়ে অন্ধকারে শুয়ে থাকা ফারগাছটি ভাবে, বোধকরি শীতকাল এসে গেছে। চরাচর ছেয়ে যাবে বরফে। তাহলে আমাকে তো আর নতুন করে রোয়া যাবে না। তাই বাধ্য হয়ে বসন্তকালের আগমন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। বিশ্রী রকমের অন্ধকার আমাকে এখানে কাবু করে ফেলেছে। একটা খরগোশ পর্যন্ত নেই এ ঘরে। বনের ভেতরে একটা খরগোশ শীতকালে স্কি করতে আসত। এসে লাফিয়ে লাফিয়ে আমাকে ডিঙিয়ে যেত। আমি তখন অবশ্য ওসবে আনন্দ পেতাম না। এভাবে চিলেকোটার কোনায় নিঃসঙ্গভাবে পড়ে থাকা তো ভয়াবহ।

তখন একটি ইঁদুর কিচকিচ করে ফারগাছটির দিকে এগিয়ে আসে। তার পেছনে ছিল আরো একটি ইঁদুর। ইঁদুর দুটো ফারগাছের ডালপালায় লাফঝাঁপ করতে থাকে। ডালপালা তখন সজীবতা হারিয়ে বিবর্ণ হয়ে গেছে। ধূসর হয়ে গেছে। একটা ইঁদুর জানতে চায়, ‘এখানে ভীষণ ঠাণ্ডা। তা না হলে এখানেই হয়তো বেশ আরামে থাকা যেত। তোমার কী মনে হয় বুড়ো ফারগাছ? ফারগাছ বলে, ‘না, না, আমি বুড়ো নই। আমার চেয়ে বয়স্ক গাছ অনেক রয়েছে। ইঁদুরটি জানতে চায়, ‘আচ্ছা তুমি এখানে কিভাবে এলে? তোমার কি ধারণা আছে যে এই পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর স্থান কোনটি? তুমি কি কখনো সেখানে গিয়েছ? তুমি কি কখনো ভাঁড়ারঘরে গিয়েছ? যেখানে তাকে সাজানো রয়েছে চাক চাক পনির, নুনমাখা মাংসের টুকরো। সেখানে আছে চর্বি দিয়ে তৈরি মোমবাতি। যেখানে নাচা যায়। ভারি চমৎকার সেই জায়গাটি। যেখানে সবাই ঢোকে রোগ পটকা অবস্থায়। কিন্তু বের হয়ে আসে হৃষ্টপুষ্ট অবস্থায়। শরীর যায় বদলে।’ ফারগাছ অবাক হয়ে বলে, ‘ও ধরনের গল্প তো আমি কারো কাছেই শুনিনি। আমি তো শুধু গহিন বনের কাহিনী জানি। যেখানকার গাছপালা সবসময় ঝলমল করতে থাকে সূর্যের আলোতে। পাখিরা ঝাঁক বেঁধে আসে গান শোনাতে। ফারগাছ তখন ইঁদুরদের তার ছেলেবেলার গল্প শোনায়। সেইসব সুন্দর দিনগুলোর কথা বলে আবেগতাড়িত হয়। ইঁদুরেরা সেসব শুনে বলে, ‘তুমি তো অনেক কিছুই দেখেছ। অনেক কিছুই শুনেছ। কত আনন্দেই না ভরপুর ছিল তোমার জীবন। ফারগাছ বলল, ‘আসলেই তখন আমার দিনগুলো আনন্দের মাঝে কেটেছিল।’ ফারগাছটি তাদের শোনালো বড়দিনের উৎসবের বিকেলের কথা। সেই জমকালো গল্প শুনে ইঁদুরেরা অবাক হয়ে যায়। বলে, ‘বুড়ো ফারগাছ, তুমি তো দেখছি অনেক ভাগ্যবান। ফারগাছ বলে, ‘আমি কিন্তু বুড়ো নই। কেবল এই শীতকালে আমি বন থেকে চলে এসেছি। আমি যে একদম তরুণ। শুধু এ ঘরে আটকে রয়েছি বলে আমার কাহিল অবস্থা হয়েছে। ঠিকমতো বাড়তে পারছি না বলে জবুথবু হয়ে আছি। আমাকে কেমন বুড়োটে দেখাচ্ছে। ইঁদুরটি বলল, ‘ফারগাছ তুমি কিন্তু খুব সুন্দর করে কথা বলতে পারো। তোমার চমৎকার কথাগুলো শুনতেই ইচ্ছে করে। আমার ইচ্ছে তোমার কথাগুলো অন্য ইঁদুরেরাও জানুক। পরের রাতে ইঁদুরটি সাথে করে তার চারটি ইঁদুর বন্ধুকে নিয়ে এলো চিলেকোঠায় ফারগাছের গল্প শুনবে বলে। এতে খুশি হয় ফারগাছ। ইঁদুরদের কাছে বলতে থাকে তার হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর কাহিনী। সেই দিনগুলো যেন ছিল স্বপ্নের মতো। গল্প বলার সময় ফারগাছটি কেমন স্বপ্নকাতুরে হয়ে ওঠে। ফারগাছটি জানায়, ‘সত্যিই সেই দিনগুলো ছিল অপূর্ব। সেই মধুর দিনগুলো আবার যেকোনো সময় ফিরে আসতে পারে। হাম্পটি ডাম্পটি তো একবার সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে গিয়ে একতলায় পড়েছিল। কিন্তু ঠিকই রাজকন্যাকে বিয়ে করে সে রাজা হয়েছিল।’

রাজকন্যার কথা বলার সময় ফারগাছটির মনে পড়ে যায় গহিন বনে তার প্রতিবেশী ছোট বার্চ গাছটির কথা। অমনি তার বুকের ভেতরটা দুলে ওঠে। এক ধরনের কাঁপুনি শুরু হয়। ঐ বনের মাঝে সেই ছোট বার্চগাছটাকেই তার কাছে মনে হতো রূপসী সবুজ রাজকন্যা। একটি ছোট ইঁদুর জানতে চায়, ‘এই হাম্পটি ডাম্পটি কে? কী তার পরিচয়?’ তখন ফারগাছ ইঁদুরের কাছে হাম্পটি ডাম্পটির গল্পটা আগাগোড়া বলল। কারণ ঐ গল্পের প্রতিটি ঘটনা তার মনে ছিল। গল্প শুনে ছোট ইঁদুরটি খুশিতে বাগবাগ হয়ে ফারগাছের মাথায় উঠে তিড়িং বিড়িং করে নাচতে থাকে। পরদিন ফারগাছের গল্প শোনার জন্যে আরো কয়েকটি ইঁদুর আসে। রবিবার রাতে এলো দুটি ধেড়ে মেঠো ইঁদুর। তারা কিন্তু ফারগাছের গল্প শুনে মোটেই খুশি হলো না। বরঞ্চ বিরক্ত হলো। মুখটাকে গম্ভীর করে বলল, ‘এ তো খুব বাজে গল্প। পচা গল্প। ছোট্ট ইঁদুরেরা কিন্তু ফারগাছের গল্প শুনতে ভালোবাসত। তারা ধেড়ে ইঁদুরের অমন কঠিন মন্তব্য শুনে ভড়কে যায়। তাদের মনেও তখন সন্দেহ জাগে। আসলেই কি গল্পটা অত ভালো? ধেড়ে মেঠো ইঁদুর ফারগাছকে জিজ্ঞাসা করে। তুমি কি মাত্র একটি গল্পই জানো? ফারগাছ উত্তরে জানাল, ‘আমি শুধু এই একটি গল্পই জানি। আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সন্ধেতে আমি এই গল্পটি শুনেছিলাম। যদিও আমি নিজেই তখন অনুভব করতে পারিনি যে আমি কতটা সুখী ছিলাম। ধেড়ে ইঁদুর পরিষ্কার জানিয়ে দিলো, ‘এটা হচ্ছে একটা ঘ্যানর ঘ্যানর কাঁদুনির গল্প। এর কোনোরকম আকর্ষণ নেই। তুমি কোনো মজার গল্প জানো না।’ যেমন ভাঁড়ার ঘরের গল্প। যে ঘরে রয়েছে সুস্বাদু খাবার। যে ঘরের তাকে রয়েছে চাক চাক পনিরের টুকরো। চর্বির মোমবাতি। ফারগাছ জানিয়ে দিলো যে, সে ও ধরনের গল্প জানে না। ধেড়ে ইঁদুর বলল, ‘তাহলে তো এখানে বসে তোমার ঐ ভ্যাজর ভ্যাজর কথা শোনার কোনো দরকার নেই। আমরা যাই। ধেড়ে মেঠো ইঁদুরেরা বিরক্ত হয়ে চলে যায়। এরপর ছোট ইঁদুরেরাও আর কখনো ফারগাছের কাছে গল্প শুনতে আসেনি। ফারগাছ অন্ধকারে একাকী বসে ভাবতে থাকে ‘ঐ ছোট ইঁদুরগুলো আমার কাছে বসে কী সুন্দরভাবে গল্প শুনত। সে দিনগুলো ভালো ছিল। যখন আমাকে এ ঘর থেকে বাইরে নিয়ে যাওয়া হবে তখন আমি খুশি মনে সেইসব পুরনো দিনের কথা ভাবব। কে জানে, সেদিন কবে আসবে।’ বেশ কিছু দিন পর একদিন কিছু লোক এলো চিলেকোঠার জঞ্জাল পরিষ্কার করতে। তারা চিলেকোঠা থেকে ব্যাঙগুলোকে সরিয়ে ফেলে। ফারগাছটাকে কোনা থেকে টেনে বের করে আনে। তারপর সেটাকে জোরে মেঝেতে ফেলে। একজন ফারগাছটাকে হেঁচড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামাতে থাকে। নামিয়ে উঠোনে এনে দড়াম করে ফেলে। যেখানে ফারগাছের অনেকদিন না দেখা সূর্যের আলো ঝিকমিক করছিল। ঘোর অন্ধকার থেকে আলো ঝলমল জায়গাতে চলে আসে ফারগাছটি। ফারগাছের কাছে তখন মনে হচ্ছিল যে আবার বুঝি নতুন করে তার আনন্দময় জীবন শুরু হয়েছে। আবার তার শরীরে মিষ্টি নরম রোদের পরশ লাগে। ঝিরঝিরে বাতাসের ছোঁয়া পায়। খুশির আমেজে সে উদ্বেলিত হয়। সে নিজেকে একটিবার দেখে নিতে ভুলে যায়। উঠোনের চারদিকের রঙিন ফুলের বাগান দেখে। বাগানের বেড়া ঢেকে আছে গোলাপঝাড়ে। লাইমগাছে কুঁড়ি এসেছে। সোয়ালো পাখিরা এলোমেলো উড়ছে। পাখিরা জানাচ্ছে, আমাদের প্রিয় সাথী এসে গেছে। সোয়ালো পাখিরা মনের আনন্দে উড়ছিল। আর নিজেদের খুশিকে প্রকাশ করছিল। ফারগাছটি আনন্দমাখা কণ্ঠে বলে ওঠে, ‘আমি এবার প্রাণভরে বাঁচব। ফারগাছ উজ্জ্বল রোদের মাঝে তার ডালপালাগুলো মেলে দিতে চাইছে। কিন্তু ফারগাছটি চাইলেও আর ডালপালা মেলতে পারল না। কারণ সেগুলো বিবর্ণ হয়ে গেছে। শুকিয়ে ধূসর হয়ে গেছে। ফারগাছটিকে আবার কজন লোক টেনে উঠোনের এক কোনায় কাঁটা ঝোঁপঝাড়ের ওপরে ফেলে। তখনো ফারগাছের মাথায় লাগানো ছিল বড়দিনের রাংতামোড়ানো সেই বড় তারাটি। রোদ লেগে তখন সেটি ঝকমক করছিল। বড়দিনের সেই স্বপ্নমাখা সন্ধেবেলায় যেসব শিশুরা ফারগাছকে ঘিরে হাত ধরাধরি করে নেচেছিল তাদের দুজন একপাশে খেলছিল। তাদের একজন কাঁটাঝোপে ফেলে রাখা ফারগাছটিকে দেখিয়ে বলে উঠল, দেখত এতে কী যেন একটা আটকে আছে। ওরা তখন দৌড়ে এসে ফারগাছের মাথা থেকে সেই ঝকঝকে তারাটিকে খুলে ফেলে। এবার এটাকে দিয়ে তারা খেলবে। তারা ফারগাছের শুকনো ডালপালা পায়ে মাড়িয়ে যায়। ফারগাছটি একবার বাগানের দিকে তাকিয়ে দেখল ফুলের গোছা, নবীন গাছপালা বাতাসে মাথা নাড়ছে। সে তখন নিজের মলিন, বিচ্ছিরি রূপের দিকে তাকাল। তার কাছে তখন মনে হলো সেই চিলেকোঠার অন্ধকার কোনায় পড়ে থাকাটাও এর চেয়ে বেশি ভালো ছিল। হঠাৎ করে তার পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে যায়। সেই ছেলেবেলার সবুজ বনের জীবন। বড়দিনের উৎসবের ঝলমলে সন্ধেবেলার কথা। ছোট্ট তুলতুলে ইঁদুরছানাদের কথা। যারা তার কাছে পরম আগ্রহে শুনতে চাইত হাম্পটি ডাম্পটির গল্প। ফারগাছটির মনে দুঃখের স্রোত বইতে থাকে। তার কাছে মনে হয় তার সবকিছুই বুঝি হারিয়ে গেল। প্রাণভরে বাঁচার আগেই জীবনের সব ফুরিয়ে গেল। সে হাহাকার করতে থাকে। বাগানের মালি এসে ফারগাছটিকে কেটে টুকরো টুকরো করে। তারপর টুকরোগুলোকে এক জায়গায় জড়ো করে। আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয়। ফারগাছের প্রতিটি টুকরো আগুনে পুড়ে যাওয়ার সময় দীর্ঘশ্বাস ফেলছিল। নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছিল ফারগাছটি। পুড়ে যাওয়ার সময় ফারগাছটি ভাবছিল গহিন বনের মাঝে রৌদ্রোজ্জ্বল দিনের কথা। আর হাম্পটি ডাম্পটির কথা। যেটি ছাড়া তার আর কোনো গল্প জানা ছিল না। উঠোনে হইচই করে শিশুরা খেলছিল। ছোট্ট শিশুটির হাতে তখনো ধরা ছিল সেই তারাটি যেটি দিয়ে সাজানো হয়েছিল ফারগাছকে তার জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় সন্ধেবেলায়। সেই আলোজ্বলা শীতের সন্ধের গল্পটা একসময় পুরনো হয়ে যায়। সেই ফারগাছটাও এখন আর নেই। তার গল্পটা সে কারণে অতীত হয়ে গেছে। তার কাহিনী ফুরিয়ে গেছে। আসলে সব গল্পই একসময় কোথাও গিয়ে শেষ হয়ে যায়।

Author