॥ সাত ॥
গত সংখ্যায় আমরা উল্লেখ করেছিলাম যে, বিদেশে অবস্থান দীর্ঘায়িত হওয়ায় ২০০১ সালের ডিসেম্বরে সম্পাদক জনাব মাহবুবুল হক ফুলকুঁড়ি পত্রিকার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন। এর আগেই অর্থনৈতিক সংকটসহ সমন্বয়ের সংকটও সৃষ্টি হয়েছিল ফুলকুঁড়ি পত্রিকায়। সমন্বয়-সংকটের বাস্তব কারণও ছিল। আসলে ছোটরা ও বড়রা মিলেই তো ফুলকুঁড়ি পরিবার। ঐ সময়টায় জনাব মাহবুবুল হক ও আমার অনুপস্থিতিতে তরুণদের কাঁধেই পড়েছিল ফুলকুঁড়ি পত্রিকার দায়িত্ব। ফুলকুঁড়ি পত্রিকা শুরু থেকেই পত্রিকার কর্মীদল ও ফুলকুঁড়ি আসরের স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে প্রকাশিত হয়ে আসছিল। এবং এই সমন্বয়ের দায়িত্বটা মূলতঃ সম্পাদকই পালন করতেন। সম্পাদকের অনুপস্থিতিতে এক্ষেত্রে কিছুটা সমস্যা দেখা দেয়। অবশ্য ২০০২ সালের শুরু থেকে সেই সমস্যা কেটেও যায়। এ প্রসঙ্গে একটি সন্ধ্যার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। তারিখটা ঠিক মনে নেই।
ফুলকুঁড়ি আসরের তখনকার প্রধান পরিচালক ছিলেন মেসবাহ উদ্দিন মাহিন। ফোনে তিনি জানালেন, সন্ধ্যায় আমার নিউ পল্টন লাইনের বাসায় আসবেন। সন্ধ্যায় তিনি ঠিকই আসলেন, সাথে আরো কয়েকজন। এঁদের মধ্যে ফুলকুঁড়ি আসরের তখনকার সংস্কৃতি-উপদেষ্টা হাসান মুর্তাজা, শুভাকাংখি বুলবুল ভাইয়ের কথা মনে করতে পারছি, হয়তো আরও কেউ ছিলেন। নানা কথার মধ্যে প্রধান হয়ে উঠলো ফুলকুঁড়ির সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি। সবাই নিয়ে আমাকে দায়িত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানালেন। সেই সময় পেশাগত দায়দায়িত্বের কথা বিবেচনা করে সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণে আমি কিছুটা দ্বিধা করছিলাম। কারণ শিশুকিশোর পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্বটি যে তেমন সহজ দায়িত্ব নয়, সেই উপলব্ধিটা আমার ছিল। তখন প্রধান পরিচালক বললেন, কাজতো সব আমরাই করবো আপনি শুধু দিকনির্দেশনা দেবেন। বুলবুল ভাই বললেন, আপনি মাসে একদিন সময় দিলেই চলবে। আলোচনার পরিবেশ থেকে বিষয়টি স্পষ্ট হলো যে, দায়িত্ব আমাকে নিতেই হবে এবং সহযোগিতার কোনো অভাব হবে না।
সান্ধ্যসভার ফলাফল এই হলো যে, ২০০২ সালের জানুয়ারি সংখ্যা থেকেই আমাকে ফুলকুঁড়ির সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হলো। ফুলকুঁড়ি পত্রিকার কর্মীদল এবং ফুলকুঁড়ি আসরের স্বেচ্ছাসেবীরা কথা রেখেছে। ফুলকুঁড়ি পত্রিকাকে এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে ওদের প্রাণবন্ত তৎপরতায় আমিও বেশ উৎসাহিত হলাম। প্রথম বৈঠকেই আমরা পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতিমালা, লেখার বিষয়-আশয়, বানানরীতিসহ আরও কিছু জরুরি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম। সমন্বয়ের সংকট কেটে যাওয়ায় ফুলকুঁড়ি পত্রিকার প্রকাশনায় লক্ষ্য করা গেল নতুন জোয়ার। এ পর্যায়ে আমরা রঙে-রূপে-আকারে ও বিষয়- বৈচিত্র্যে ফুলকুঁড়িকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে চাইলাম। ২০০২ সালের জানুয়ারি সংখ্যায় লিখেছিলেন কবি আল মুজাহিদী, জুবাইদা গুলশান আরা, মোশাররফ হোসেন খান, জাকির আবু জাফর, শরীফ আবদুল গোফরান, আহসান হাবিব বুলবুল, হাসান শরীফ, মনসুর আজিজ প্রমুখ।
‘ফুলকুঁড়ি’ কবিতায় কবি আল মুজাহিদী লিখেছেন-
ফুলকুঁড়ি ফুলকুঁড়ি ছোটো ছোটো ফুল
কচি কচি কাঁচা কাঁচা পাতা তুল তুল,
তোমাদের সাথে ভাই ভাব করে পাখি
পাখিদের সাথী হয়ে করি ডাকাডাকি।
‘স্বপ্নের বাক্সো আর মিরির কাণ্ড’ গল্পে জুবাইদা গুলশান আরা লিখেছেন- “শর্মিদের প্রিয় টিচার লিলিআপা। লিলিআপা তাকে খুব আদর করেন। দেশ-বিদেশের গল্প বলেন। শর্মি ক্লাশে ফার্স্ট হয়, মজার মজার বই পড়ে। তাই টিচারের কাছে ওর আদর বেশি। সেদিন লিলিআপা বললেন, আজ তোমাদের একটা মজার বাক্সো দেখাবো।”
‘শীতের নানা কথা’ ফিচারে জাকির আবু জাফর লেখেন- “শীত, শব্দটি শুনলেই সারা শরীরে যেন ঠাণ্ডা বাতাস হাত বুলিয়ে যায়। কে অস্বীকার করবে এ অনুভূতির কথা? আব্বু? আম্মু? ভাইয়া? না না কেউ না। কেউ অস্বীকার করবে না। অস্বীকার করার কথা কোথায়? দাদু যে ঠক্ ঠক্ করে কাঁপছে শীতে।”
২০০২ সালের জানুয়ারি সংখ্যা থেকে ফুলকুঁড়ির যে নতুন অভিযাত্রা শুরু হয় তাতে ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ছিলেন মেসবাহউদ্দিন মাহিন, সহকারী-সম্পাদক ছিলেন জাকির আবু জাফর, সহ-সম্পাদক ছিলেন শরীফ আবদুল গোফরান ও মনসুর আজিজ, প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণের দায়িত্ব পালন করেন মীম। পৃষ্ঠপোষক ছিলেন জনাব মোহাম্মদ ইউনুছ ও জনাব মাহবুবুল হক।
২০০২ সালের ডিসেম্বর সংখ্যাটি ছিল ফুলকুঁড়ির ঈদসংখ্যা। সংখ্যাটি ছিল বেশ ঢাউশ। এ সংখ্যায় লিখেছিলেন কবি শামসুল ইসলাম, নয়ন রহমান, ড. আশরাফ সিদ্দিকী, সুকুমার বড়ুয়া, অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান, মাহবুবুল হক, একেএম বদরুদ্দোজা, আবু জাফর মুহাম্মদ ওবায়েদুল্লাহ, লুৎফুল খবীর, হাফিজ রাসা, … আহমদ চৌধুরী, মোশাররফ হোসেন খান, তমিজউদ্দিন লোদী, আহমদ মতিউর রহমান, আবদুল কুদ্দুস ফরিদী, আহসান হাবিব বুলবুল, মনসুর আজিজ, আলফাজ আনাম, রহীম শাহ, আবু নেসার শাহীন সহ আরও অনেকে। দু’টি সম্পূর্ণ উপন্যাস উপহার দিয়েছিলেন জুবাইদা গুলশান আরা ও দিলারা মেসবাহ। ঈদ সংখ্যার বিশেষ আকর্ষণ ছিল কবি আল মাহমুদের সাক্ষাৎকার।
এখনো প্রতিবছর ঢাউশ আকারে ঈদসংখ্যা প্রকাশের ঐতিহ্য চালু আছে। এবছর অর্থাৎ ২০০৮ সালেও বর্ণাঢ্য একটি ঈদসংখ্যা প্রকাশের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পত্রিকা কর্তৃপক্ষ এবং ফুলকুঁড়ি আসরের মিলিত প্রচেষ্টায় প্রতিমাসে ফুলকুঁড়ি’র প্রচার সংখ্যাই শুধু বাড়ছে না, মানও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এজন্য আমরা মহান আল্লাহর দরবারে জানাই অশেষ শুকরিয়া।
দেখতে দেখতে নিয়মিত প্রকাশনার ৩০ বছরে পদার্পণ করেছে প্রিয় পত্রিকা ‘ফুলকুঁড়ি’। যতদিন বাংলাভাষা ও বাংলা সাহিত্যের ধারা প্রবাহমান থাকবে, ততদিন ফুলকুঁড়ি’র প্রকাশনাও অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ। ফুলকুঁড়ি পত্রিকার সাথে জড়িত কর্মী ভাইদের আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং ফুলকুঁড়ি পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা ও সমর্থনে একদিন বাংলার তিটি ঘরে ‘ফুলকুঁড়ি’ পঠিত হবে- এই আশাবাদ ব্যক্ত করে লেখার ইতি টানছি।
[সমাপ্ত]
প্রকাশকাল : সেপ্টেম্বর ২০০৮।



