॥ ছয় ॥
গত সংখ্যায় আমরা সুকুমার বড়ুয়ার কথা উল্লেখ করেছিলাম। তিনি ভুল বলেননি। ফুলকুঁড়ির সাহিত্যসভা আজও চলছে এবং এর সুবাস সাহিত্যভুবনে ছড়িয়ে পড়ছে। ফুলকুঁড়ির প্রথম দিককার কথায় আবার ফিরে যাই। ফুলকুঁড়ি পত্রিকা প্রথম থেকেই লেখক ও পাঠকদের চমৎকার সমর্থন পেয়ে আসছিল। ফুলকুঁড়ির প্রতিটি সংখ্যাতেই তার পরিচয় পাওয়া যায়। তবে ১৯৮৪ সালের দিকে এসে ফুলকুঁড়ি আর্থিক সংকটে পড়ে। এর প্রধান কারণ ছিল কাগজ, মুদ্রণ ও ব্লকের মূল্যবৃদ্ধি। আর সেই সময়তো এখনকার মতো এতো ব্যাংক-বীমা, প্রসাধনী, মোবাইল, ক্লিনিক ও নানা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল না। তাই অনেক বিজ্ঞাপন ছেপে খরচ পুষিয়ে নেওয়ারও তেমন সুযোগ ছিল না। পত্রিকার এমন দুঃসময়ে ফুলকুঁড়ির হাল ধরতে এগিয়ে এলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক, সাহিত্যিক, প্রকাশক মাহবুবুল হক। সেই সময় মতিঝিলপাড়ায় একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাথেও তিনি জড়িত ছিলেন। ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বর সংখ্যা থেকে তিনি ফুলকুঁড়ির সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফলে সংকটমুক্ত হয়ে ফুলকুঁড়ি আবার নতুন উদ্যোগে তার অভিযাত্রা অব্যাহত রাখে। একই সাথে সাহিত্য ও ব্যবসার সাথে জড়িত থাকায় জনাব মাহবুবুল হক ফুলকুঁড়িকে নিয়ে কিছুটা পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করেন। এর লক্ষ্য ছিল পত্রিকাকে আরও পাঠকপ্রিয় ও ব্যবসাসফল করা। এ প্রসঙ্গে একটা উদাহরণ দেয়া যায়। ফুলকুঁড়ি ডিমাই সাইজে অর্থাৎ এখনকার মতো বড় সাইজে মুদ্রিত হয়ে আসছিল। সে সময় পত্রিকাকে একটু হ্যান্ডি অর্থাৎ ছোট সাইজে ডিমাই-এ মুদ্রণের একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। মাহবুব ভাইয়ের উদ্যোগে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে তখন ফুলকুঁড়িও ছোট আকারে প্রকাশিত হতে লাগলো। ছোট আকারে প্রকাশিত হওয়ায় একই পরিমাণ কাগজে পত্রিকাকে বেশ মোটামোটা মনে হতো। বিজ্ঞাপন ও লেখা ছাপাতে জায়গার সাশ্রয় হতো- সে অনেক কথা।
আমার লেখার টেবিলে আমি এখন সেই সময়ের ছোট সাইজের একটি ফুলকুঁড়ি লক্ষ্য করছি। প্রচ্ছদে ঈদের চাঁদ দেখে ছোট্টমণিদের সেকি আনন্দ! লাল, সবুজ, হলুদ, কালো- এই চার রঙের ঝলমলে প্রচ্ছদ। প্রচ্ছদটি এঁকেছেন ফুলকুঁড়ির তখনকার শিল্প সম্পাদক সবিহ-উল-আলম। তিনি পত্রিকার ভিতরের ছবিও আঁকতেন। পাতা উল্টাতেই নজরে পড়লো টকটকে লাল ও কালো রঙ। তখন ফুলকুঁড়িদের আসর বিভাগে অলংকরণে ছিল ফরিদী নুমান। সে সময় আমি নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতাম। এতক্ষণ আমি আসলে ১৯৮৮ সালের মে সংখ্যার কথা বলছিলাম। এটি ছিল ঈদসংখ্যা। এ সংখ্যায় লিখেছিলেন আবদুল মান্নান তালিব, শামসুল ইসলাম, সালেহ উদ্দিন আহমদ, সাজজাদ হোসাইন খান, মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান, আবু আলী আরিফ, আনোয়ার হোসাইন মঞ্জু, সাবিউল হক, হাসানুর রহমান, মোশাররফ হোসেন খান, আহমদ আখতার, টিপু কিবরিয়া, সারওয়ার-উল-ইসলাম, বাকীউল আলম, মিহির কান্তি রাউৎ, ওয়াসিফ-এ খোদা, মোঃ আব্দুল্লাহ ইব্রাহীম প্রমুখ।
‘ঈদের চাঁদ’ কবিতার কবি শামসুল ইসলাম লিখেছেন-
রমযানের ঐ রোজার শেষ
ঈদের চাঁদে খুশির রেশ।
খুশিতো নয় আনন্দ
বইছে বাতাস সুগন্ধ।
আর ‘ঈদের হাসি’ কবিতার কবি সাজজাদ হোসাইন খান লিখেছেন-
চাঁদটা যেনো ছোট্ট কোশা
নীল সায়রে থকে
চম্পা ফুলের পাঁপড়ি হয়ে
হঠাৎ ওঠে চমকে।
‘বাংলা আমার দেশ’ ইতিহাস বিষয়ক ধারাবাহিক লেখা। এ সংখ্যায় মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান লিখেছেন, ‘দিনের পর যেমন রাত, তেমনি রাতের পর আবার দিন আসে। একশ’নব্বই বছর শোষণের পর ইংরেজরা আমাদের দেশ থেকে পাততাড়ি গুটাতে বাধ্য হয়। স্বাধীন দেশে আবার লুপ্ত লবণশিল্প পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেয়া হয়।’
‘কলা চাচার উকুন বিভ্রাট’ গল্পে টিপু কিবরিয়া লিখেছেন, ‘থ্যাবড়ানো নাক আর তোবড়ানো গালের অধিকারী আমাদের কলা চাচা। চাচার নাকের ডগায় একটা বিরাট তিল আছে। নাকের নিচে কাঠবেড়ালির লেজের মত মোটা একজোড়া গোঁফ। গোঁফের শাখা-প্রশাখা গালের অর্ধেকটুকু দখল করে আছে।
চমৎকার একটি সংখ্যার সাথে তোমাদের কিছুটা পরিচয় করিয়ে দিলাম। তোমরা যারা একটু কৌতূহলী, তারা ফুলকুঁড়ি অফিসে আসলে ফুলকুঁড়ির পুরনো সংখ্যাগুলোর মজার মজার লেখার নানা স্বাদ গ্রহণ করতে পারবে।
জনাব মাহবুবুল হক দায়িত্ব গ্রহণ করার পর ফুলকুঁড়ির সময়গুলি ভালোই কাটছিল। কিন্তু পেশাগত কারণে তাঁকে পাড়ি জমাতে হলো বিদেশে। এর কিছুদিন আগে আমিও পেশাগত কারণে ফুলকুঁড়ি পত্রিকা থেকে অব্যাহতি নিয়েছিলাম। ফলে সময়টা ফুলকুঁড়ি পত্রিকার জন্য কঠিন হয়ে উঠলো। কঠিন এই সময়ে ফুলকুঁড়ির প্রকাশনা অব্যাহত রাখতে শরীফ আবদুল গোফরান, মোজাক্কেরুল হক ও কবি জাকির আবু জাফর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বরে দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০০১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘসময় নিষ্ঠার সাথে ফুলকুঁড়ির সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন জনাব মাহবুবুল হক। কিন্তু বিদেশে অবস্থান দীর্ঘায়িত হওয়ায় সম্পাদকের দায়িত্ব থেকে তাঁকে অব্যাহতি নিতে হয়। এরপর ২০০২ সালের জানুয়ারি থেকে ফুলকুঁড়ির সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন জয়নুল আবেদীন আজাদ। সে কথায় পরে আসছি।
(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)
প্রকাশকাল : আগস্ট ২০০৮



