স্বপ্নের ফুলকুঁড়ি স্মৃতিময় ফুলকুঁড়ি (দ্বিতীয় পর্ব)

জয়নুল আবেদীন আজাদ

0
49

॥ দুই ॥

ফুলকুঁড়ি প্রথম সংকলনের প্রচ্ছদ

বলছিলাম, মাসুদ আলী ভাই মাঝে কেমন যেন ফেলুদা হয়ে উঠতেন। আবার যখন তিনি ফকফকে দাঁতগুলো বের করে হাসতেন তখন মনে হতো, এ যেন এক ডাগর শিশু। শিশুদের মতো অভিমানও করতেন, চোখ টিপে দুষ্টুমিও করতেন। আর তার চোখেমুখে সব সময় ছিল নতুন কিছু করার একটা চঞ্চলতা। আবেগেও তিনি ছিলেন টইটম্বুর। এ কথা প্রমাণে কোনো মজলিশি উদাহরণ টানার প্রয়োজন নেই, ফুলকুঁড়ির প্রথম সংকলনটির সম্পাদকীয়টিই হবে যথেষ্ট। কোনো গুরুগম্ভীর কথা নেই, উপদেশের বন্যা নেই, যেন বহতা নদীর মতো বয়ে যাওয়া শব্দমালা। ছোট্ট সম্পাদকীয়টি ছিলো এরকম,

তোমরা যারা আজকের ফুলকুঁড়ি- আগামীতে তারাই ফুটবে ফুল হয়ে, আপন রঙে রাঙিয়ে দেবে এ জগতটাকে। সে সব ছোট্টমণিদের হাতেই আমাদের এই উপহার ফুলকুঁড়ি। ছোটরা যা চাও তার সবটুকু হয়তো নেই এতে- তবুও আমরা চেষ্টা করেছি তোমাকে মনের খোরাক মেটাতে। তোমাদের সহযোগিতা পেলে ফুলকুঁড়িআগামীতে আরো সুন্দর হয়ে উঠবে এ বিশ্বাস আমরা রাখি। বড়দের মাঝে যারা ছোটদের জন্য ভাবেন, কাজ করেন- তাদের সহযোগিতাও আমাদের প্রয়োজন। এসো সবাই ফুলকুঁড়িকে সাজাই ফুলকুঁড়িকে নিয়ে ভাবি…. ফুলকুঁড়ি হোক সবার মনের কুঁড়ি….।”

 

আজ এতো বছর পরও কথাগুলো আমাদের জন্য সমান সত্যি। ফুলকুঁড়ি এখনো সবার মনের কুঁড়ি। ছোট-বড় সবাই মিলে আমরা চেষ্টা করছি ফুলকুঁড়িকে সাজাতে। আমাদের এই চেষ্টা অব্যাহত থাকবে ইন্‌শাআল্লাহ।

কথায় কথায় ফুলকুঁড়ির প্রথম সংকলনটির কথা এসে পড়লো। এই সংকলনটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৮ সালের জুলাই মাসে। এখন থেকে প্রায় ৩০ বছর আগের কথা! তোমাদের নিশ্চয় জানতে ইচ্ছে করছে সেই সংকলনটি কেমন ছিল, কারা জড়িত ছিল, কারা লিখেছিল ইত্যাদি বিষয়। সংকলনটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৮/১ কে এম আজম লেন, সাতরওজা, ঢাকা-১ থেকে। এটি তখন ছিল ফুলকুঁড়ি আসরের অফিস। সংকলনটি ছাপা হয়েছিল পুরানো ঢাকার ২৪ শ্রীশ দাস লেনের মনোরম মুদ্রায়ণ থেকে। প্রথম সংকলনটির সম্পাদক ছিলেন মাসুদ আলী, সহ-সম্পাদক ছিলেন জয়নুল আবেদীন আজাদ। সহযোগী হিসেবে কাজ করেন আব্দুল বারী ও খুরশীদ আলম। প্রকাশিকা ছিলেন তামান্না-ই-জাহান। সংকলনটির চমৎকার প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জা সেজান সরকার। লাল-কালো দুই রঙে মুদ্রিত ৪৪ পৃষ্ঠার ঐ সংকলনটির দাম ছিল মাত্র দুই টাকা। অবশ্য ৩০ বছর আগের দুই টাকার মূল্য এখনকার দুই টাকার সাথে মিলালে চলবে না। এই সংকলনে কবিতা লিখেছিলেন কবি আল মাহমুদ, সুকুমার বড়ুয়াসহ আরো অনেকে। রূপকথার গল্প ‘সাত পদ্ম কন্যা’ লিখেছিলেন সানাউল্লাহ নূরী ভাই। শেরে বাংলা একে ফজলুল হককে নিয়ে নিবন্ধ লিখেছিলেন মোহাম্মদ মোদাব্বের। যিনি এক সময় দৈনিক আজাদ পত্রিকার ‘মুকুলের মাহফিল’-এর ‘বাগবান ভাই’ ছিলেন।

প্রথম সংকলনে ‘আকাশ নিয়ে’ কবিতায় কবি আল মাহমুদ লিখেছিলেন-

আকাশটাকে নিয়ে আমার মস্ত বড়ো খেলা

মেঘের দেশে ভাসাতে চাই চিলেকোঠার ভেলা।

বাতাস যখন থমকে গিয়ে শান্ত হয়ে রয়

মেঘের ঈগল ভেঙে কেবল ফুলের তোড়া হয়।

 

আর ‘ফুলকুঁড়ি’ কবিতায় সুকুমার বড়ুয়া লিখেছিলেন-

ফুলকুঁড়ি ফুলকুঁড়ি ফুল…

লুকানো সুবাসে রঙে

না ফোটা মুকুল।

 

রূপকথার গল্প ‘সাত পদ্ম কন্যায়’ সানাউল্লাহ নূরী ভাই লিখেছিলেন ‘এক পাহাড় কুমারী। বনলতার মত ছিমছাম তার শরীর। ভোমরের মত কালো কুচকুচে তার চোখের মণি। সেই মণি যখন জ্বলে, ভয়ে দূরে সরে যায় পাহাড়ের চিতাবাঘ। সেই ডাগর কালো চোখে যখন হাসি জাগে, বনের মরা গাছে ফোটে থোকায় থোকায় ফুল।”

 

নিবন্ধ ‘শেরে বাংলা ফজলুল হক’- এ মোহাম্মদ মোদাব্বের লিখেছিলেন- হাতেম তাই মজলুমের বন্ধু ছিলেন, আরব্য উপন্যাসে পড়েছি; হাজী মোহসিন দাতা ছিলেন, উপ মহাদেশের ইতিহাসে সে কথা সোনার অক্ষরে লেখা আছে। কিন্তু ফজলুল হক দাতা ছিলেন, সে ইতিহাস এখনো হয়তো লিখিত হয়নি। অগাধ সম্পত্তির অধিকারী হাজী মোহসিন ছিলেন চিরকুমার। সর্বস্ব দান করা তাঁর মত দরাজদিলের মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিল। কিন্তু দরাজদিল ফজলুল হকের বিত্ত ছিল সীমাবদ্ধ। এই সীমাবদ্ধ বিত্ত নিয়ে দানের নেশায়, অসহায়ের সহায় হওয়ার উন্মাদনায় তিনি যে সর্বস্ব দিয়ে ফতুর হয়েছিলেন, এ কথা কি এ যুগের মানুষেরা জানে? আর যারা জানে তারা কি স্মরণ করে? মাঝে মাঝে এই চিন্তা আমার মনকে দোলা দেয়।”

 

ফুলকুঁড়ির প্রথম সংকলনটি বেশ সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়। ফলে লেখকরা ফুলকুঁড়িতে লেখার ব্যাপারে উৎসাহী হয়ে ওঠেন। কিন্তু পুরানো ঢাকার অখ্যাত ঠিকানাটি খুঁজে পেতে অনেককে বেশ বেগ পেতে হয়। তবে শিশুসাহিত্যিক আলী ইমাম প্রাণের টানে ঠিকানাটি ঠিকই খুঁজে নিয়েছেন এবং চমৎকার একটি গল্প উপহার দিয়েছেন ফুলকুঁড়ির দ্বিতীয় সংকলনে। এই সংকলনটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। সংকলনে ছাপা হয় কবি ফররুখ আহমদ, কবি শামসুর রাহমান, আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন, আল-ফরুক, ড. আলী আসগর, আলী ইমাম’সহ আরো অনেক গুণীজনের লেখা। দ্বিতীয় সংকলনটি মুদ্রিত হয়েছিল নওয়াবপুর রোডের মর্ডান প্রিন্টার্স থেকে। দুই রঙে মুদ্রিত ৪৮ পৃষ্ঠার এই সংকলনটির মূল্যও ছিল দুই টাকা। সেই সময় ফুলকুঁড়িতে কী ধরনের কেমন মানের লেখা ছাপা হতো, তা জানার একটা কৌতূহল পাঠকদের থাকতেই পারে। তাই কোনো কোনো লেখার কিছু অংশ তুলে ধরছি।

কবি ফররুখ আহমদের ‘ঈদের বাঁকা চাঁদ’ কবিতার কিছু অংশ-

ঈদের বাঁকা চাঁদ ওঠে ঐ

দূরে তরু শিরে

ঈদ মুবারক! ঈদ মুবারক!

আওয়াজ শুনি ফিরে।

নীল আকাশে ঝলমলিয়ে

খুশীর খবর যায় ছড়িয়ে

আনন্দেরই বান ডেকে যায়

শূন্য প্রাণের তীরে।

 

কবি শামসুর রাহমান ‘তাজ কাহিনী’ কবিতায় লিখেছেন-

এক যে ছিল রাজার কুমার,

তার ছিল না তাজ।

তাইতো কুমার পরে না আর

রাজার বাড়ির সাজ।

কে নিয়েছে সোনার মুকুট?

কোন্ সে জাঁহাবাজ?

বাজপাখিটা ডালে ছিলো,

এটা তারই কাজ।

 

‘পানকৌড়ি’ কবিতায় আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন লিখেছেন-

পানকৌড়ি পানকৌড়ি

করছো তুমি কি?

চুনোপুঁটি ধরতে আমি

বিলে নেমেছি।

পানকৌড়ি পানকৌড়ি

তোমার বাড়ি কৈ?

কাঁকনপুরের মাঠ পেরিয়ে

বাঁশের ঝাড়ে ঐ।

 

‘গুলিস্তানের কামান’ গল্পে আল ফারুক লিখেছেন- “সে সব দিনের কথা তোমরা জান না। সদরঘাটের কামানটা সরানো হলো। সরিয়ে বঙ্গবন্ধু এভিন্যুয়ে গুলিস্তানের সামনের চৌরাস্তায় বসানো হলো। সেই থেকে কামানটা গুলিস্তানের সামনেই রয়েছে। কিন্তু এই যে কামান দেখছো, আরিফ, এর একটা নাম আছে জানো? ঘাড় নাড়লাম। বললাম- জানি। দাই মা বললেন- কি নাম বলো তো? বললাম- বিবি মরিয়ম। দাই মা বললেন- হ্যাঁ, বিবি মরিয়ম। কিন্তু এই কামান, মানে বিবি মরিয়মের অতীত ইতিহাসটা জানো?”

 

আর বিজ্ঞান বিষয়ক নিবন্ধ ‘আয় বৃষ্টি ঝেপে-‘তে ড. আলী আসগর লিখেছেন- ‘আয় বৃষ্টি ঝেপে ধান দিব মেপে। এমন গান গেয়ে যদি বৃষ্টি আনা যেত, কি মজাই না হতো! গান গেয়ে না হোক, অন্য কোনভাবেও যদি আকাশের মেঘকে ইচ্ছামত ঝরাতে পারতাম বৃষ্টিরূপে! অনেক সমস্যা যেত মিটে। চৈত্রের বৃষ্টিহীন শুষ্ক আবহাওয়াকে বদলানো যেত। অনাবৃষ্টিতে শুকিয়ে যাওয়া অনেক শস্যক্ষেত ভরে উঠতো সবুজ ফসলে।”

 

‘সরালী’ গল্পে আলী ইমাম লিখেছেন- “অনেকক্ষণ থেকে একটানা উড়ছে সরালী। পাইনের বন পেরিয়ে এসেছে সেই কখন। এক সময় কলকল করে চোখের সামনে ভেসে উঠলো নীল সমুদ্র। কয়েকটা মাছ ধরা নৌকা যাচ্ছে। মাছের একটা বিরাট ঝাঁক ভেসে যাচ্ছে। তার রূপালী ঝিলিক দেখলো সরালী। বোধহয় শ্যাওলার বনে যাচ্ছে ডিম ছাড়তে।”

 

দ্বিতীয় সংকলনটি প্রকাশের পর আমাদের আর বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। ১৯৭৯ সালের মার্চ মাসেই হলো আমাদের স্বপ্নপূরণ। অর্থাৎ সচিত্র শিশুকিশোর মাসিক হিসেবে স্বাধীনতার মাস মার্চেই শুরু হলো ফুলকুঁড়ির অভিযাত্রা। সে কথা শুরু করবো আগামী সংখ্যায়। (চলবে)

 

প্রকাশকাল : এপ্রিল, ২০০৮

 

 

Author