কুমিরছানার ভেলকি

আমিনুল ইসলাম হুসাইনী

0
39

হিজলতলী বন। দূর থেকে পাহাড়ের মতো দেখায়। বনের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ছোট্ট একটা নদী। নদী ভরা থইথই জল। সেই জলের নিচে কুমিরের বাড়ি। তুমি যদি কখনো সেখানে যাও, তাহলে সাবধানে থেকো। কুমিরের বড় ছানাটা ভারি পাগলাটে। মানুষ দেখলেই কামড়াতে আসে।
তবে ছোট ছানাটা খুবই ভালো। সবার সাথে মেশে। কারো সাথে ঝগড়া করে না। ভালুক দাদুর ইশকুলেও নিয়মিত যায়। তুমি ইশকুলে যাও তো?
বনে থাকে একটা লোভী শেয়াল। চোয়ালে ইয়া বড় বড় দাঁত। হাতে-পায়ে কোদালের মতো নখ। আর চোখগুলো আগুনের মতো লাল।
দেখতে কী যে ভয়ংকর!
একদিন সেই লোভি শেয়াল নদীতে মাছ ধরতে যায়। গিয়ে দেখে- নদীর তীরে একটা কুমিরছানা। আরাম করে ঘুমিয়ে আছে। অমনি জিভে জল চলে এলো তার। মনে মনে বলল, অনেকদিন হলো কুমিরের মাংস খাই না। আজ ব্যাটাকে মজা করে খাব।
এই বলেই কুমিরছানার ঘাড় কামড়ে ধরে। তারপর বনের গভীরে ছুটে যায়।
শেয়ালের বাড়ি ছিল বনের গভীরে। বাড়ি ছিল বটে। তবে কোনো চাল-চুলো ছিল না। পুকুর-ডোবাও না। ছিল শুধু কলাপাতার একটি মাদুর। তাতেই কুমিরছানাকে রাখলো। আর বলল, আজ তোকে চিবিয়ে খাব।
কুমিরছানার হাত-পা বাঁধা। পালাবার কোনো সুযোগ নেই। তবুও সাহস হারালো না। সে মনে মনে বলল, ভয় পেলে চলবে না। যেভাবেই হোক, শেয়ালকে বোকা বানিয়ে পালাতে হবে।
যেমন ভাবা, তেমনই কাজ।
কুমিরছানা শেয়ালকে বলল, শেয়াল মামা! ও শেয়াল মামা! একটা কথা শোনো।
শেয়াল কপাল কুঁচকে বলল, কী?
কুমিরছানা বলল, রোজই তো কাঁচা মাংস চিবিয়ে খাও। তাতে এমন কী আর মজা পাও শুনি? আমাকে বরং পাউরুটির মতো ভিজিয়ে খাও। অনেক মজা পাবে।
শেয়াল কোনোদিন পাউরুটি দেখেনি। তাই কপাল কুঁচকে বলল, পাউরুটি! সেটা আবার কী?
কুমিরছানা মুখ টিপে হাসলো। বলল, বনের পেছনেই একটা টং-দোকান আছে। সেখানে গেলেই দেখতে পাবে। খেতেও পারবে।
লোভি শেয়াল কি আর বসে থাকে?
তখনই বনের পেছনে ছুটলো।
বনের পেছনে গিয়ে দেখলো, বানরের চা-দোকান। সেই দোকানে পশুপাখিরা চা দিয়ে পাউরুটি ভিজিয়ে খায়। লোভি শেয়ালও পেট ভরে চা-পাউরুটি খেলো। আর মনে মনে বলল, কুমিরছানা ঠিকই বলেছে। পাউরুটি ভিজিয়ে খেতে অনেক মজা।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়।
বনে তখন সুনসান নিরবতা। কুমিরছানার একটু একটু ভয় করছে। যদি মায়ের কাছে আর ফিরে যেতে না পারে!
তাই শেয়ালের কাছে জানতে চাইলো- শেয়াল মামা! আমাকে কখন খাবে?
শেয়াল বলল, কাল সকালে খাব। এখন পেট ভরা।
তাহলে এখন আমাকে জলে ভিজিয়ে রাখো। সারারাত ভিজে পাউরুটির মতো নরম হয়ে থাকব। আর তুমি সকালে মজা করে খাবে।
শেয়াল কপাল কুঁচকে বলল, কথা তো খারাপ বলিসনি। তবে…
তবে কী?
তোকে ভিজিয়ে রাখার মতো জল পাব কোথায়?
কুমিরছানা বলল, বনের পাশেই তো নদী। সেখানেই ভিজিয়ে রাখো।
শেয়াল আফসোস করে বলল, কী বোকা আমি! নদীর কথা মনেই ছিল না।
এই বলে সে কুমিরছানাকে নিয়ে নদীর দিকে ছুটলো।
নদীর বুকে ছোট ছোট ঢেউ। চাঁদের আলোয় চিকচিক করছে। তা দেখে শেয়াল গান ধরে— হুক্কা হুয়া…, হুক্কা হুয়া…।
এমন বেশুরো গান ভালো লাগে? তবুও কুমিরছানা মিছেমিছি বলল, বাহ! কী দারুণ গলা তোমার। শুনে মন জুড়িয়ে গেল।
শেয়াল তো বেজায় খুশি।
কুমিরছানা বলল, এবার আমার হাত পায়ের বাঁধন খুলে দাও। নাহলে পাউরুটির মতো নরম হতে পারব না।
বোকা শেয়াল তাই-ই করে। কুমিরছানার হাত পায়ের বাঁধন খুলে নদীতে ভিজিয়ে রাখে।
তারপর?
তারপর আর কী! কুমিরছানা টুপ করে ডুব দিলো। সেই যে ডুব দিলো। আর ভেসে উঠলো না।
এদিকে লোভী শেয়াল দাঁড়িয়ে থাকলো বোকার মতো। হি হি হি।