কাঁকড়া রহস্য

হাসান হাফিজ

0
25

এক যে ছিলেন রাজা। একদিন তার একটা আংটি হারিয়ে গেল। মহা দামি সেই আংটি। আঁতিপাঁতি করে খুঁজলেন চারদিকে। নাহ। পাওয়া গেল না। রাজা ফরমান জারি করলেন, যে আংটির খোঁজ দিতে পারবে, তাকে দেওয়া হবে অনেক দামি পুরস্কার।
গোটা রাজ্যে এই ঘোষণা দেওয়া হলো। সব মানুষই সেটা জানতে পারলো। গরিব এক চাষি। তার নামটা অদ্ভুত, কাঁকড়া। যাহ, কাঁকড়া কোনো মানুষের নাম হয় নাকি? হয় রে ভাই। গল্পে সবই সম্ভব। গরিব চাষিটাও রাজার ঘোষণা শুনেছে। সে কোনো লেখাপড়া জানে না। মুখ্যসুখ্য মানুষ। রাজার ঘোষণা শুনে তার ইচ্ছে জাগল জ্যোতিষী হওয়ার। চেষ্টা করে দেখতে তো কোনো ক্ষতি নেই। রাজার হারানো আংটির খোঁজ বের করতে পারলেই ব্যস। জুটবে লোভনীয় পুরস্কার।
রাজবাড়ির দিকে রওনা হলো চাষি। পৌঁছে গেল যথাসময়ে। রাজার কাছে গিয়ে হাজির হলো। রাজাকে কুর্নিশ করে বললো, জাঁহাপনা। আমি একজন জ্যোতিষী। আমার ছেঁড়া পোশাক দেখে ভুল বুঝবেন না। আমি জানি, আপনার একটা আংটি খোয়া গেছে। আমি এ নিয়ে পড়াশোনা করব। চেষ্টা করে দেখব, আংটিটির কোনো হদিস মেলে কি না।
শুনে রাজা বলেন, আচ্ছা বেশ। আংটির খোঁজ পাওয়া গেলে কী পুরস্কার চাও তুমি?
জাঁহাপনা, সেটা আপনার মরজি। আমার কিছু বলার নেই। আপনি যা ভালো মনে করেন, তাই দেবেন।
ঠিক আছে। কাজে লেগে পড়ো তাহলে। আজ থেকেই তুমি পড়াশোনা শুরু করে দাও। দেখা যাক, তুমি কতো বড়ো জ্যোতিষী।
গরিব চাষিকে থাকার জন্য একটা ঘর দেওয়া হলো। সেই ঘরে আছে বিছানা। টেবিলে বইপত্র, কাগজ কলম। চাষি গম্ভীর হয়ে বইয়ের পাতা উল্টায়। কাগজে কীসব হিজিবিজি লেখে। রাজপ্রাসাদের চাকর-বাকররা ভাবলো, বাপ রে লোকটা না জানি কত বড় পণ্ডিত!
ওই চাকর-বাকরদের দলেই ছিল সে লোক, যে চুরি করেছে আংটিটা। চাষি সবার দিকেই সরু চোখে তাকালো। সন্দেহের দৃষ্টি। সবাই ঘাবড়ে গেল এতে। তারা ভাবলো, এই লোকটা মনে হয় কামেল। আংটি চোরকে ঠিকঠাক ধরে ফেলবে। তেমন এলেম বোধহয় এর আছে। চাকর-বাকররা জ্যোতিষীকে খুব তোয়াজ করলো তাই।
চাষি লোকটা লেখাপড়া জানে না ঠিকই। কিন্তু অতিশয় ধূর্ত সে। খুবই সাবধানী। তার মনে হলো, এই চাকরগুলো নিশ্চয় আংটিটা সম্পর্কে জানে। সে ঘরে বন্দি থাকলো। দিনরাত বইপত্র নাড়াচড়া করে, কাগজে কী কী সব হিজিবিজি লেখে।
এইভাবে কেটে গেল একটা মাস। একদিন বৌ এল তাকে দেখতে। বৌকে সে বললো, খাটের নিচে লুকিয়ে থাকো তো। কোনো চাকর যখন আমার জন্য খাবার নিয়ে আসবে, তখন বলবে ‘এই এল একটা’। যখন আরেকজন আসবে, তখন বলবে এটা হলো দ্বিতীয়। এইভাবে বলতেই থাকবে।
তাই হলো।
চাষির বৌ খাটের নিচে ঢুকে পড়লো। এমনভাবে লুকালো যে, বাইরে থেকে কেউ ঘরে ঢুকলে তাকে দেখতে পাবে না।
রাতে খাবার নিয়ে এল এক চাকর। খাটের নিচ থেকে আওয়াজ এলো, এই হলো একটা। যখন দ্বিতীয় লোক এল, তখন শোনা গেল, এটা হলো দ্বিতীয়। এইভাবে চলতে থাকলো। চলতেই থাকলো।
এ কী কাণ্ড! জ্যোতিষীর ঘরে গায়েবি আওয়াজ আসছে কোত্থেকে? ভারি রহস্যময় ব্যাপার তো। চাকরের দল ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। তারা সবাই একজোট হয়ে আলাপ-আলোচনা করলো। ভূতুড়ে কাণ্ড ঘটছে। একের পর এক। ভাবলো তারা, শলা পরামর্শ করে একটা সমাধান খোঁজা দরকার। নাহলে ধরা খেয়ে যেতে হবে। কী করা যায়?
একজন বলে, আমাদের কী করা উচিত এখন?
আরেকজন বলে, চলো, আমার সবাই জ্যোতিষীর কাছে যাই। তাকে খোলাখুলি সব বলি। আমরাই যে আংটি সরিয়েছি, সে কথা স্বীকার করি। সে যেন আমাদের বিশ্বাস না ভাঙে। তাকে অবশ্য আমরা ভালো পরিমাণ টাকা দেবো এ জন্য। তোমরা কী বলো?
ঠিক ঠিক। তাই করা হোক।
সবাই বলে সমস্বরে।
সক্কলে গেল জ্যোতিষীর কাছে। মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানালো তাকে। বিনয়টা অন্যদিনের চাইতেও বেশি। একজন তাকে বলে,
জ্যোতিষী স্যার। আমরাই যে আংটি চুরি করেছি, আপনি সেটা ধরতে পেরেছেন। আমরা গরিব মানুষ। আপনি যদি রাজামশাইকে সব কথা বলে দেন, তাহলে সর্বনাশ হবে। কারো চাকরি তো থাকবেই না, জানে মারা পড়তে হবে। আমরা কিছু টাকা আপনাকে দিচ্ছি। আমাদের প্রাণে বাঁচান। আপনার পায়ে পড়ি।
চাষি দেখে, ওষুধে কাজ হয়েছে। খুশিতে নাচতে ইচ্ছে করছে তার। আবেগ সামলাতে হবে। নাহলে উল্টা ধরা খাওয়ার আশঙ্কা। নকল গাম্ভীর্য নিয়ে সে বলে, হুম। ঠিক আছে। তোমাদের কথা দিচ্ছি। আমি বিশ্বাস ভঙ্গ করব না। কিন্তু একটা কথা। আমি যা বলব, তা শুনতে হবে।
সবাই মাথা নেড়ে সায় দেয়। হ্যাঁ, একথা মেনে চলবে তারা।
চাষি তাদের বলে, মুরগির খোঁয়াড়ে যাও। সবচেয়ে বড় যে মোরগটা, ওকে সাবধানে আংটিটা খাইয়ে দাও। বাকিটা আমি দেখছি।
চাকররা স্বস্তি পায়। হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। জ্যোতিষী যা বলে দিয়েছে, তাই করে।
পরের দিন কাঁকড়া নামের চাষি যায় রাজ দরবারে। কুর্নিশ করে রাজাকে বলে, জাঁহাপনা। টানা এক মাস বিস্তর পড়াশোনা ও গবেষণা করেছি আমি। অবশেষে সমস্যার সমাধান পাওয়া গেছে। আপনার আংটি যে কোথায়, তার ঠিকঠাক হদিস মিলেছে।
রাজামশাই শুনে অবাক। কৌতূহলী হয়ে তিনি জানতে চান, কোথায়, কোথায় আমার আংটি? খুলে বলো সবটুকু।
খামারের সবচেয়ে বড় যে মোরগটা আছে না, সে-ই আপনার আংটি খেয়ে ফেলেছে।
তাই নাকি? আংটি উদ্ধারের ব্যবস্থা করো। এখনই। কোনো দেরি নয়।
রাজা হুকুম দেন।
মোরগ জবাই করা হলো। তার পেটে পাওয়া গেল সেই আংটি।

রাজা হতবাক। মহা খুশি। জ্যোতিষীকে প্রচুর টাকা বখশিস দিলেন। তার সম্মানে রাজকীয় ভোজের আয়োজন করা হলো। সেই ভোজে রকমারি সুখাদ্যের সমাহার। রাজা ও জ্যোতিষী একই টেবিলে বসেছেন। দামি দামি সব খানা টেবিলে। আছে কাঁকড়াও। ওই কালে কাঁকড়া ছিল খুবই দুষ্প্রাপ্য ও মহা দামি। সবাই এর নামও জানে না। শুধু রাজা ও তার মন্ত্রীরা জানে। রাজামশাই জ্যোতিষীকে বলেন,
তুমি তো মহা চালু লোক। বলো তো দেখি, এই খাবারের নাম কী!

বড়োই কঠিন পরীক্ষা। আগেরবার বার না হয় চালাকি করে উৎরানো গেছে। এবার নিজের ধরা খাওয়ার পালা।
বড্ড চিন্তায় পড়ে গেছে চাষি। এ দফায় বোধ করি আম ছালা দুটোই যাবে। এখন উপায়? দিশেহারা হয়ে সে নিজের উদ্দেশ্যে বিড়বিড় করে বলে উঠলো,
হায় রে কাঁকড়া!। কী দুর্দশায়ই না পড়েছো তুমি। স্রষ্টা তোমাকে রক্ষা করুন।

রাজাসহ আশেপাশের সবাই একথা শুনতে পেলো। রাজা ও মন্ত্রী কেউই তো আর চাষির নাম জানে না। তারা চমকে উঠলেন। সত্যিই তো? এই লোক তো মোটেও সামান্য নয়। ঠিকঠাক বলতে পেরেছে কাঁকড়ার নাম। বলতে একটুও সময় লাগেনি। অবাক কাণ্ড! রাজা সহাস্যে তার পিঠ চাপড়ে দেন। বলেন,
সত্যিই হে। তোমার কোনো তুলনা নেই। এখন প্রমাণ হলো, তুমি হচ্ছো গিয়ে দুনিয়ার সবচেয়ে সেরা জ্যোতিষী।