ওয়াসিফের ইচ্ছেডানা

জুবায়ের হুসাইন

0
34

এবারের শীতটা বেশ জেঁকে বসেছে। শীতটা যখন শুরু হয় ডিসেম্বরের মাঝামাঝি, তখন তো রীতিমতো হাড়কাঁপানো অবস্থা! চার-পাঁচটা জামা-গেঞ্জি-সোয়েটার গায়ে দিয়েও উষ্ণ করা যাচ্ছিল না শরীর। ধীরে ধীরে অবশ্য কমে আসে শীতের প্রকোপ। কিন্তু মার্চের প্রায় দেড় সপ্তাহ পার হলেও শীতের আমেজ রয়ে গেছে।
ওয়াসিফ এবার ক্লাস ফোরে উঠেছে। স্কুলে ভর্তি হয়ে যেদিন নতুন বই বুকে ধরে নিয়ে বাড়িতে ফিরলো, সেদিন ওর আনন্দ দেখে কে! নতুন বইয়ের ঘ্রাণ ওকে অনেকক্ষণ অবশ করে রাখে। রুমে ঢুকেই আগে উল্টে পাল্টে দেখে নেয় বইগুলো। পৃষ্ঠা উল্টায়। তাতে ঘ্রাণের মাত্রা বেড়ে যায়।
এবার শীতে ওয়াসিফ দারুণ একটা কাজ করেছে।
বাড়ি থেকে বের হয়ে পাকা রাস্তার মাথায় একটা টঙ ঘরে বাস করে বিল্লাল। বিল্লালের ছোট একটা বোনও আছে। নাম পারুল।
টুথপেস্ট ফুরিয়ে যাওয়ায় আব্বুর সাথে দোকান থেকে নতুন টুথপেস্ট কিনতে যায় ওয়াসিফ। তখনই চোখে পড়ে ব্যাপারটা। টঙ ঘরের সামনে একচিলতে মিষ্টি রোদ পড়েছে। যদিও তেজ নেই সে রোদের। তবুও ওই রোদের মধ্যে বসে আছে একটা ছেলে। ওর খুবই পরিচিত। মাঝে মাঝে খেলা করে একসাথে।
বিল্লালটা ওর সামান্য রোদের মাঝে বসে ঠকঠক করে কাঁপছিল। গায়ে ধূসর একটা গেঞ্জির ওপর বুকের কাছটা ছেঁড়া একটা সোয়েটার গায়ে বিল্লালের। পরনে পুরনো একটা ফুলপ্যান্ট। ঠান্ডা থেকে কানমাথা ঠেকানোর জন্য দু’হাত দিয়ে চেপে ধরে আছে। কিন্তু তবুও স্থির রাখতে পারছে না শরীর।
ওয়াসিফ একবার নিজের শরীরের দিকে চোখ বুলালো। চমৎকার কালারফুল একটা হুডি পড়েছে ও। মাথা-কান ও ঘাড় পেচিয়ে মাফলার জড়ানো। হুডির টুপিটা পিঠের ওপরে ঝুলে আছে। হাতে আম্মুর বুনে দেয়া নকশা আঁকা হাতমোজা। গায়ে লম্বা মোজা।
‘আব্বু, একটু ওদিকটায় চলো।’ বলে আব্বুকে টেনে নিয়ে গেল ওয়াসিফ।
প্রথমটায় ইচ্ছে না হলেও ছেলের পীড়াপীড়িতে রাজি হলেন মিজান সাহেব।
সোজা গিয়ে বিল্লালের মুখোমুখি হলো ওয়াসিফ।
হাঁটু মুড়ে বসল ছেলেটার পাশে।
ঘাড়ে একটা হাত রাখল।
আগেই চমকে গিয়েছিল বিল্লাল। ওয়াসিফ এসেছে তাতে সমস্যা নেই, সাথে যে ওর বাবা এসেছেন, এতেই ছেলেটা ঘাবড়ে গেছে।
হড়বড় করে অনেক কথা বলতে ইচ্ছে করল। কিন্তু একটি শব্দও বের হলো না মুখ থেকে।
বার দুয়েক ঢোক গিলল কোঁৎ করে।
‘খুউব শীত করছে, তাই না বিল্লাল?’ ওয়াসিফের কণ্ঠটা বেশ মোলায়েম শুনালো।
অন্তরটা ছুঁয়ে গেল বিল্লালের। এমন দরদমাখা কণ্ঠ শুনে চোখজোড়া ভিজে উঠলো। আলতো করে উপর-নিচ মাথা নাড়াল দু’বার।
টঙ ঘরের টিনের বেড়ার ফাঁক দিয়ে ভেতরে চলে গেল ওয়াসিফের চোখ। ছেঁড়া বিছানায় আঁটোসাঁটো হয়ে শুয়ে আছে একটা মেয়ে। এদিকেই ফিরে শুয়ে মেয়েটা। পারুল, বিল্লালের বোন।
অন্তরটা ভীষণভাবে কেঁদে উঠলো ওয়াসিফের। রাইহাও ঠিক পারুলের বয়সী। রাইহা এখনও শুয়ে আছে ঘরে। মখমলের কম্বল গায়ে জড়িয়ে আরাম করছে।
‘আব্বু বলেছে, নতুন সোয়েটার কিনে দেবে। পারুলেরও দেবে।’ বলল বিল্লাল।
একবার মুখ তুলে আব্বুর দিকে তাকাল ওয়াসিফ।
চোখাচোখি হলো বাপ-ছেলের।
আব্বুর চোখে-মুখে হাসির একটা রেখা ফুটে উঠলো।
খুশি হয়ে উঠলো ওয়াসিফ।
উঠে দাঁড়াল। তারপর দ্রুততার সাথে নিজের গায়ের হুডিটা খুলে ফেলল। হাতেই ধরে রাখল কয়েক মুহূর্ত। এটা ওর খুবই প্রিয়। আম্মুর সাথে বাজারে গিয়ে কিনে এনেছিল।
চাপা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর টেনে তুললো বিল্লালকে।
বিল্লাল কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিজের হুডিটা বিল্লালের মাথা গলিয়ে শরীরের ঢুকিয়ে দিল।
বাঁধা দেয়ার কোনো সুযোগই পেল না বিল্লাল।
ওয়াসিফ যখন হুডির টুপিটা বিল্লালের মাথায় পরিয়ে দিল, তখন বেশ প্রফুল্লতায় অন্তরটা ভরে গেল।
বেশ লাগছে বিল্লালটাকে!
অপলক কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলো ওয়াসিফ।
আবারও আব্বুর মুখের দিকে তাকাল ওয়াসিফ।
এবং দ্রুত পায়ে টঙ ঘরের ভেতরে ঢুকে গেল। নিজের হাত থেকে মায়ের পরম যত্নে গড়া হাতমোজাজোড়া খুলে পারুলের হাতে পরিয়ে দিল।
‘এটা আমার জন্য?’ আধো বোলে কথা বলে উঠল পারুল।
ওয়াসিফের মনে হলো, রাইহাটা কথা বলছে।
‘হ্যাঁ পারুল,’ মিষ্টি হেসে বলল ওয়াসিফ। ‘ওগুলো তোমার! খুশি হয়েছো তুমি?’
পারুল একপাশে বেশ খানিকটা মাথা হেলিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, অনেক খুশি হয়েছি। এ দুটো আমার খুব পছন্দ হয়েছে।’
খুশির একটা স্রোত যেন ওয়াসিফের দেহের সমস্ত শিরায়-উপশিরায় বয়ে গেল।
ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন বিল্লালের মা ও বাবা।
‘এটা তুমি কী করছো বাবা?’ বলে উঠলেন শেফালি বেগম। ‘তোমার মা তোমাকে বকবেন তো!’
‘মোজাটা তুমি নিয়ে নাও বাপ।’ বললেন বেলায়েত আলী। ‘পারু নোংরা করে ফেলবে!’
শেফালি বেগম আর বেলায়েত আলীর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল ওয়াসিফ। বলল, ‘মোজাজোড়া আমি আমার ছোটবোন পারুলকে উপহার দিয়েছি। উপহারের জিনিস বুঝি ফেরত নিতে আছে?’
‘কিন্তু বাবা…’
বেলায়েত আলীকে এবার থামিয়ে দিলেন মিজান সাহেব। বললেন, ‘থাক না বেলায়েত আলী। ওয়াসিফ তো ভালোবেসেই দিয়েছে।’
‘কিন্তু ভাইজান…’
শেফালি বেগমকেও থামিয়ে দিলেন মিজান সাহেব। ‘ভাবি সাহেবা, আমারই ভুল হয়েছে ব্যাপারটা আগে খেয়াল না করে। আপনারা বিশেষ করে আপনাদের ছেলেমেয়ে দুটো যে শীতে এত কষ্ট করছে, এটা আমি জানতাম না। বিকালে ওদেরকে গুছিয়ে দেবেন। বাজারে নিয়ে যাব। পছন্দ মতো শীতের কাপড় বেছে নেবে।’
‘তা হয় না ভাইজান!’ কিছুতেই মানতে পারছেন না বেলায়েত আলী।
‘কেন হয় না বেলায়েত আলী? আল্লাহপাক আমাকে সামর্থ্য দিয়েছেন, তোমাকে দেননি। সে কারণে আমার ওপরে তোমার হক নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সব কিছু জানার পরেও যদি আমি কাজটা না করি, তাহলে মালিকের পাকড়াও থেকে যে আমি রক্ষা পাবো না। তাই এটা মনে করো না যে আমি তোমাদের ওপর দয়া করছি। বরং আমি তোমাদের পাওনা বুঝিয়ে দিয়ে মুক্ত হতে চাচ্ছি।’
হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন বেলায়েত আলী। ‘ভাইজান, আপনি মানুষটা ফেরেশতার মতোন!’
‘আপনি আমাদেরকে ঋণী করে ফেললেন ভাইজান।’ বললেন শেফালি বেগম। ‘এমনিতেই সময়ে অসময়ে আপনাদেরকে জ্বালাতন কম করিনে।’
এতক্ষণ নিজেদের মধ্যেই মশগুল ছিলেন তারা। তাই কেউ খেয়াল করেননি যে, কখন বিল্লাল আর পারুলকে নিয়ে ওয়াসিফ খেলা শুরু করে দিয়েছে।
বিল্লালের হাওয়া বের হওয়া ফুটবলটা নিয়ে পা দিয়ে শট মারামারি খেলছে ওরা।

দুই.
ওয়াসিফের আজ মনটা ভালো নেই।
আব্বু ওকে ঘুম থেকে ডেকে না তুলে অফিসে চলে গেছেন। তাই যখন ঘুম ভাঙলো, এবং বুঝতে পারলো, আব্বুটা বাড়ি নেই, তখন ইচ্ছে করেই কম্বলের নিচে রইলো আরও কিছুক্ষণ।
উঠবে না আজ ঘুম থেকে। মজা দেখাবে আব্বুটাকে!
রাইহা এখনও ঘুমাচ্ছে। ঘুমাক। মেয়েটাকে এই শীতের মাঝে উঠিয়ে লাভ নেই। কাল রাতে অনেক কেশেছে।
ওয়াসিফের ছোট্ট হৃদয়টা অভিমানে ফেটে যাচ্ছে। আব্বুটা কি জানেন না প্রতি সকালে তার মিষ্টি ‘আব্বুসোনা’ ডাকটা ওর কত প্রিয়? সারাদিনের বাবার অনুপস্থিতি তো ও ওই ডাকের রেশ বয়েই কাটিয়ে দেয়।
আম্মু এলেন ঘরে। ওয়াসিফকে এখনও ঘুমিয়ে থাকতে দেখে ইচ্ছে করেই ডাকলেন না। ঘুমাক ছেলেটা। এখন উঠে কী করবে? স্কুলে এখনও ভালোভাবে ক্লাস শুরু হয়নি। শীতের সময় একটু বেশি ঘুমালে এমন কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে না। আব্বুর সাথে তো ফজরের নামাজ ঠিকই আদায় করেছে ছেলেটা। এই বয়স থেকেই নামাজ-কালামের প্রতি বেশ ঝোঁক তার দশ বছরের ছেলেটার। মাঝে মাঝে আম্মুর নিজের ফজরের নামাজ কাজা হলেও ওয়াসিফ ঠিকই আব্বু জাগার সাথে সাথে বিছানায় উঠে বসে।
মেয়েটার গায়ের ওপর কম্বলটা একটু নেড়েচেড়ে ঠিক করে দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন রুম থেকে, পেছন থেকে কথা বলে উঠল ওয়াসিফ, ‘আব্বু কখন অফিসে গেছে!’
প্রচণ্ড অভিমান টের পেলেন আম্মু ছেলের কণ্ঠে। এগিয়ে এলেন। মাথার পাশে বসে মাথার চুলে আঙুল বুলিয়ে বললেন, ‘খুব শীত পড়েছে তো, তাই আজ আর তোমাকে ডেকে যাননি তোমার আব্বু।’
‘আব্বুকে বলবে যেন আর কখনও আমাকে না ডাকে। আমাকে না ডেকে কথা না বলেই যেন রোজ অফিসে চলে যায়!’ ফোঁচ ফোঁচ করে উঠল ওয়াসিফ। নাক টানল বার কয়েক।
আম্মু বুঝলেন, কেস খারাপ। ছেলেকে এখন বাগে আনা কষ্টকর হবে। ভেতরে ভেতরে গুছিয়ে নিলেন কী বলবেন। তারপর বললেন, ‘আব্বু তো তোমার ভালোর জন্যই ঘুম থেকে না জাগিয়ে অফিসে চলে গেছেন। তাছাড়া…’
আম্মুকে কথা শেষ করতে দিল না ওয়াসিফ। মাথার চুল থেকে ঝটকা দিয়ে আম্মুর হাত সরিয়ে দিয়ে বলল, ‘তোমাদের কাউকে আর আমাকে ডাকতে হবে না। আমি সারাদিন খালি পড়ে পড়ে ঘুমাবো। উঠবো না বিছানা থেকে। খাবও না কিছুই।’
কান্না আরম্ভ করেছে ওয়াসিফ। ও কখনও শব্দ করে কাঁদে না। যখন কাঁদে, তখন চোখ-মুখ ভিজিয়ে ফেলে। রক্তজবার মতো লাল হয়ে যায় চোখজোড়া।
আম্মু প্রমাদ গুনলেন। কী করবেন তিনি এখন? কীভাবে শান্ত করবেন তার অভিমানী ছেলেকে? আব্বুকে ফোন দেবেন? কিন্তু তিনি তো এখন আসতে পারবেন না। জরুরি মিটিং আছে আজ অফিসে। আর তাছাড়া ফোন পাওয়ার পর হয়তো চিন্তা করবেন। তাতে অফিসের কাজে মন বসাতে পারবেন না। এমনিতেই হাই-প্রেসারের ওষুধ খান নিয়মিত।
ওদের কথোপকথনে কখন জানি জেগে গেছে রাইহা। সটান উঠে বসে আছে। ড্যাব ড্যাব চোখে তাকাচ্ছে আম্মুর দিকে। বার কয়েক চোখের পাতা ফেলে তারপর দু’হাতের ওপর ভর দিয়ে এগিয়ে এলো ভাইয়ের দিকে। ভাইয়ার মাথার সাথে নিজের মাথা লাগিয়ে শুয়ে পড়ল। ভাইয়াকে খুউব ভালোবাসে ও।
ওয়াসিফ কিছু বলল না। জানে, বোনটা ওর মাথার ওপর মাথা রেখে শুয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই এই কাজটা করে দুষ্টুটা! ওয়াসিফ বোনকে আদর করে দুষ্টু বলেই ডাকে।
আম্মু বললেন, ‘দেখো ওয়াসিফ, তোমার দুষ্টুটা তোমাকে উঠতে বলছে। আর তুমি কাঁদছো। ওর কিন্তু খুউব কষ্ট হচ্ছে!’
রাইহাকে টেনে নিজের বাম হাত মেলে দিয়ে তার ওপরে শুইয়ে নিল ওয়াসিফ। দুষ্টুটার নিঃশ্বাস এখনও বেশ গরম। বেশ লাগছে ওর কাছে।
আম্মুর কথার কোনো জবাব দিল না ওয়াসিফ। তবে কান্না থামিয়ে দিল। বলল, ‘এই দেখ দুষ্টু, আমি আর কানছিনে। তোমার আর কাশি লাগছে না তো দুষ্টু?’
দুষ্টুটা কী বুঝল কে জানে, জোরে জোরে এপাশ ওপাশ মাথা নাড়ল।
ঝলমল করে উঠল ওয়াসিফের মুখটা। বোনের কিছু হলে ও একদম ভালো থাকতে পারে না। কাল রাতে কাশি শুনে বারবার উঠে বসেছে বিছানায়।
‘টকাস্’ করে বোনের কপালে একটা চুমু খেল ওয়াসিফ। ডান হাতটা আলতো করে সমস্ত মুখে বুলিয়ে দিল।
আদর পেয়ে রাইহাও ভাইয়ের দিকে চেপে এলো। বাম হাতটা উঠিয়ে দিল ভাইয়ের গায়ের ওপরে।
আপাতত নিশ্চিত হওয়া গেল। ভেবে আম্মুটা টুপ করে রুম ত্যাগ করলেন। সাবধানে দরজা ভেজিয়ে দিয়ে নিজের কাজে মন দিলেন।
‘জানো দুষ্টু,’ বোনের সাথে আলাপ জুড়ে দিল এবার ওয়াসিফ। ‘আব্বু না আজ আমাকে না বলে অফিসে চলে গেছে। বাড়ি ফিরলে আজ তার সাথে কোনো কথাই বলবো না। তুমিও বলবে না কিন্তু! একদম লাফ দিয়ে কোলে ঝাঁপিয়ে পড়বে না বলে দিলাম!’
রাইহা জোরে একটা হাই তুলল। আর এই হাই তোলাটাকেই নিজের কথার সম্মতি হিসেবে ধরে নিল ওয়াসিফ। বলল, ‘ওকে বোন, আব্বুর সাথে আজ আমাদের আড়ি।’ বোনের বাম হাতের কড়ে আঙুলের সাথে নিজের ডান হাতের কড়ে আঙুলটা বিশেষ কায়দায় ছুঁইয়ে নিল ও।
উঠে বসল রাইহা। এবং শুরু করল কান্না। আসলে আম্মুকে না দেখতে পেয়ে ওর এই কান্না।
দরজা ঠেলে ছুটে ভেতরে এলেন আম্মু। মেয়েকে কোলে তুলে নিলেন। রুমের ভেতরে কয়েকবার পায়চারি করে তারপর ওকে বিছানায় বসিয়ে শীতের কাপড়ে প্রায় জড়িয়ে ফেললেন।
মেয়েকে কোলে নিতে নিতে বললেন, ‘ডিম পোচ করে রেখেছি। দ্রুত উঠে দাঁত ব্রাশ করে নাও ওয়াসিফ। তোমার খাওয়া শেষ হলে রাইহাকে খাওয়াবো।’
দশ বছর বয়স হলেও অধিকাংশ সময়ে ওয়াসিফকে খাইয়ে দিতে হয়। ছেলেটা এখনও ভাত চিবিয়ে খায় না।

তিন.
রাতে এশার ঠিক আগ মুহূর্তে বাসায় ফিরলেন মিজান সাহেব।
এই সময় রুমের দরজাটা ভেজানো থাকে। রোজকার মতো আজও দরজার সামনে এসে সালাম দিলেন তিনি।
তারপর কান পেতে রইলেন জবাব শোনার। সাধারণত ওয়াসিফই প্রথমে সালামের জবাব দিয়ে বিছানা থেকে নেমে দরজার পাল্লা মেলে ধরে। আর আব্বুটা টুক করে তার কপালে একটা চুমু এঁকে দেন।
কিন্তু আজ তার কিছুই ঘটল না। অবশ্য এমনটিই আশা করছিলেন মিজান সাহেব। তবে ঘাবড়ালেন না মোটেও। প্রস্তুত হয়েই এসেছেন তিনি।
‘আমার আব্বুসোনাটা কি গ্যাস লাইটারটা নিয়ে একটু বাইরে আসবে?’ বললেন মিজান সাহেব। অন্তরের সমস্ত কোমলতা মেশানো যেন এই আহ্বানে।
কিন্তু তাতেও কোনো ফল হলো না। এগিয়ে এলো না ওয়াসিফ।
এবার ঘাবড়েই গেলেন মিজান সাহেব। এখন কী করবেন তা ভাবছেন।
অন্যদিকে আগে থেকেই আব্বুর সাড়া পেয়ে কাঁইকুঁই শুরু করে দিয়েছে রাইহাটা। বাবার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য যেন আর তর সইছে না। ভাইয়ার শাসানোটা বেমালুম ভুলে বসে আছে।
বাইরেই জুতা রাখার বক্সের ওপর গ্যাস লাইট রাখা আছে একটা। তিনিই রেখেছেন। বাইরে থেকে টাটকা কোনো খাবার আনলে তাতে আগুনের খানিকটা আঁচ লাগিয়ে তবেই ঘরে ঢোকেন। এর কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে কি না তা তার জানা নেই। তার মা এটা করতেন। তাই এখন তিনিও করেন।
গ্যাস লাইটটা জ্বেলে হাতে ধরা খাবারের প্যাকেটটাতে একটু ছুঁইয়ে নিলেন মিজান সাহেব।
ভেতর থেকে আম্মু ওয়াসিফকে বারবার দরজা খুলে দিতে বলছেন। কিন্তু কিছুতেই শুনছে না ওয়াসিফ।
আব্বু এবার ভেজানো দরজা ঠেলে রুমে প্রবেশ করলেন। এক নজরে দেখে নিলেন ভেতরটা।
বিছানার কিনারায় আম্মুর কোলে দাঁড়িয়ে আছে রাইহা। ঝাঁপ মারার জন্য একেবারে প্রস্তুত। আর বিছানার এক কোণায় দেয়ালের দিকে মুখ করে ঘাপটি মেরে বসে আছে ছেলেটা।
খাবারের প্যাকেটটা স্ত্রী রোকেয়াকে দিয়ে রাইহাকে আর অপেক্ষায় না রেখে কোলে তুলে নিলেন মিজান সাহেব। রোকেয়া খানম ইশারায় ছেলেকে দেখালেন। এবং তার মান ভাঙাতে বললেন।
রাইহাকে একটু আদর করে আম্মুর কোলে দিয়ে এবার বিছানায় উঠে গেলেন আব্বু। ছেলের পেছনে বসে নিজের দিকে টানলেন।
নিজেকে শক্ত করে ফেলল ওয়াসিফ। কাজেই, ওকে একটুও নড়াতে পারলেন না আব্বু।
বুঝলেন, অভিমানের মাত্রাটা অনেক বেশি। সহজে আজ আর পার পাওয়া যাবে বলে মনে হচ্ছে না।
কিছুটা ঢিলা দিয়ে ওয়াসিফকে ধাতস্থ হতে দিলেন মিজান সাহেব। তারপর সুযোগ বুঝে পট করে ওকে নিজের দিকে টেনে নিলেন। এবার আর বাঁধা দেয়ার সময়ই পেল না ওয়াসিফ।
ওয়াসিফের দু’গণ্ড বেয়ে অশ্রুর ধারা বয়ে যাচ্ছে। আব্বু ওকে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে রেখেই ওর সমস্ত মুখে-চোখে চুমু খেতে লাগলেন। চোখের নোনতা পানি বা নাকের পানি— কোনোটাই তখন বিস্বাদ লাগল না। বরং অন্যরকম এক ভালো লাগায় পেয়ে বসল তাকে।
‘চিকেন চাপ আর বাটার নান এনেছি!’ ওয়াসিফের কানের কাছে ঠোঁটজোড়া নিয়ে ফিসফিস করে বললেন আব্বু।
ঝাঁ-করে যেন ওয়াসিফের দেহের ভেতরে কিছু একটা বয়ে গেল। সোজা তাকালো আব্বুর মুখের দিকে। তবে কিছু বলল না। আব্বুর কোল থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইল।
বাঁধা দিলেন না আব্বু।
আম্মু আগেই খাবারের প্যাকেটটা পাশে রেখে দিয়েছিলেন।
ওয়াসিফ সোজা প্যাকেটটা হাতে উঠিয়ে নিল। তারপর আড়চোখে আব্বুর দিকে একবার তাকিয়ে মুচকি মতো হাসল। পরক্ষণই মুখটা ভারী করে ফেলল। কিছুতেই নিজের খুশিটা প্রকাশ করা যাবে না আব্বুর কাছে।
ওয়াসিফ এবার চিকেন চাপ আর বাটার নান নিয়ে খেতে বসে গেল।
আব্বু অফিসের ড্রেসগুলো চেঞ্জ করে নিলেন। মেয়েকে কোলে তুলে নিলেন। খেলা করতে লাগলেন রাইহার সাথে।
একটু পর এক টুকরো রুটির সাথে গোশতের একটা টুকরো মুড়িয়ে আব্বুর মুখের সামনে ধরল ওয়াসিফ। আড়চোখে তাকিয়ে রইল।
আব্বু হাসলেন। এবং ওয়াসিফকে নিরাশ করলেন না। রুটির টুকরোটা মুখে পুরে দিলেন। এবং ইচ্ছে করেই ছেলের একটা আঙুলে দাঁতের আলতো একটা কামড় দিলেন।
ওয়াসিফের সেদিকে খেয়াল নেই। রুটির আরেকটা টুকরো দিয়ে গোশতের টুকরো ছিঁড়তে ছিঁড়তে চোখ না তুলেই জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি আমার ওপরে রাগ করেছো, আব্বু?’
আব্বুর অন্তরটা ভীষণভাবে দুলে উঠল। হু হু করে কান্না বেরিয়ে আসতে চাইল। এই আবেগ, এই অনুভূতি কেবল আপন জনের সান্নিধ্যই এনে দিতে পারে। আল্লাহপাক নাকি তার আবেগ তথা মায়া থেকে সামান্য একটু মানুষের মাঝে দিয়েছেন। সেই সামান্যটুকুই যদি এতো তীব্র হয়, তাহলে তার দয়া তো সারা পৃথিবীর সাগরের চেয়েও বিশাল!
মিজান সাহেব ওয়াসিফের মাথাটা নিজের বুকের মাঝে নিয়ে মাথায় পিঠে আদরের কোমল হাত বুলাতে লাগলেন। মুখে বললেন, ‘এই জন্যই তো তুমি আমার মিষ্টি আব্বু! আর মন খারাপ করো না বাপ!’
‘আমার ভুল হয়ে গেছে আব্বু।’ বলল ওয়াসিফ। ‘আর কখনও এমনটি করবো না। আরবি ম্যাম আব্বু-আম্মুর সাথে সুন্দর ব্যবহার করতে বলেছেন। আমি সেটা করিনি আব্বু। আমার খুব পাপ হয়েছে, তাই না আব্বু?’
এবার মিজান সাহেবের চোখজোড়া সত্যিই ভিজে গেল। অনেক কষ্টে কান্না থামিয়ে বললেন, ‘মানুষ তার ভুল বুঝতে পারলে আল্লাহ পাপ লেখেন না। বরং দ্বিগুণ সওয়াব দেন।’
‘আর এমনটি হবে না আব্বু।’
‘আমারও আর ভুল হবে না বাবা!’ একটু থামলেন মিজান সাহেব। তারপর আবার বললেন, ‘পড়াশোনা কি শুরু করতে পেরেছ বাপ?’
ওয়াসিফ বাবার বুকে মাথা রেখেই এপাশ ওপাশ মাথা নাড়ল।
আব্বু বললেন, ‘ঠিক আছে, আগামীকাল থেকে শুরু করবে। আর সামনের সপ্তাহ থেকে তোমাদের ক্লাস শুরু হবে।’
‘জানো আব্বু,’ এবার সোজা হলো ওয়াসিফ। পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে গেছে ও। ‘ওই ছড়াটা না আমাদের বাংলা বইয়ে আছে। আমি পড়েছি।’
‘কোন্ ছড়াটা বাবা?’ বলে রোকেয়া খানমের দিকে তাকালেন আব্বু।
‘সেটা তোমার ছেলের কাছেই শোনো।’ এড়িয়ে গিয়ে বললেন রোকেয়া।
‘আরে ওই ছড়াটা। রাতে ঘুমানোর আগে তোমার কাছে কবিতা শুনতে চাইলে তুমি যে ছড়াটা প্রায়ই শোনাতে। তুমি বলতে না যে বৃহত্তর যশোরের মাগুরায় জন্ম বিখ্যাত কবি ফারুক আহমেদের। তার বৃষ্টির ছড়াটা।’ প্রায় এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলল ওয়াসিফ।
খুশি হলেন আব্বু। যাক, নতুন বইগুলো তাহলে মোটামুটি উল্টেপাল্টে দেখা হয়ে গেছে। বললেন, ‘ও তাই বুঝি? তবে বৃষ্টির ছড়ার কবির নামটা একটু ভুল হয়েছে। নামটা ফারুক আহমেদ না হয়ে ফররুখ আহমদ হবে। তাঁর একটা উপাধি আছে— মুসলিম রেনেসাঁর কবি। তিনি মানবতা ও শোষিত মানুষের পক্ষে লিখেছেন। শহীদ শরীফ ওসমান হাদীকে যেমন বিপ্লবী কথা বলতে দেখেছ, আমাদের এই কবিও ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার। ইনসাফ কায়েম ছিল তাঁর লেখনির অন্যতম উদ্দেশ্য। তিনি ছিলেন একজন ভাষা সৈনিক। আমাদের বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ওই সময় তাঁর লেখা গান “মধুর চেয়েও মধুর যে ভাই আমার দেশের ভাষা” বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। আন্দোলনের জন্য উৎসাহ জুগিয়েছিল। বড় হয়ে তুমি তাঁর সম্পর্কে আরও অনেক কিছু জানতে পারবে।’
চার.
ওয়াসিফের চাচাত ভাই তাহসীন। ক্লাস এইটে উঠেছে এবার।
ওয়াসিফের স্কুল পেরিয়ে আরেকটু গেলেই তাহসীনের স্কুলটা। আজ ও একটু আগেই বের হয়েছে। ওর বন্ধু তন্ময়ের সাথে জরুরি প্রয়োজন আছে। তন্ময়েরও আগেভাগে বাড়ি থেকে বের হবার কথা আছে।
পিঠে বইয়ের ব্যাগ ঝুলিয়ে নিজের ক্যাপ্টেন বাই-সাইকেল চড়ে রওনা দিল তাহসীন।
ফুরফুরে মেজাজেই ড্রাইভ করছে সাইকেল। আর ভাবছে তন্ময়ের সাথে বিষয়টা নিয়ে কী কী আলোচনা করবে।
ক’দিন আগের শীতটা এখন বেশ কমে গেছে। যদিও বাতাস বেশ ঠান্ডা। ইচ্ছে করেই মাফলার পরে আসেনি। তাতে কান দু’টোতে দারুণ শীত লাগছে।
ওয়াসিফের স্কুলটা মেইন রাস্তার সাথেই। তবে বামে নেমে একটু ভেতরে মূল বাউন্ডারি। ঠিক যে মুহূর্তে ও ওয়াসিফের স্কুলের গেটটা পার হবে, ঠিক সেই সময় ব্যাপারটা নজরে পড়ল ওর।
ওয়াসিফকে একটা রিকশায় উঠিয়ে নিল একটা লোক। প্রথমটায় একটু দ্বিধা করলেও লোকটার পাশে উঠে বসল ওয়াসিফ।
রিকশার হুড নামানো থাকায় লোকটাকে দেখা যাচ্ছে। উলের সোয়েটারের ওপর মাথায় মানকি টুপি পরা। সেখান থেকে শুধু মুখ আর চোখজোড়া দেখা যাচ্ছে। তবে লোকটাকে পরিচিত মনে হলো না। এমন একজন অপরিচিত লোকের সাথে নিজেরই চাচাতো ভাইকে যে কি না সবেমাত্র ক্লাস ফোরে উঠেছে, উঠতে দেখে অবাকই হলো। আর তাছাড়া ক্লাসই তো এখনও শুরু হয়নি। তাহলে ছেলেটাকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছে লোকটা? বাড়িতে কোনো সমস্যা হলো? লোকটাকে বলেছে তাই বাড়ি নিয়ে যাচ্ছে? কিন্তু একটা অপরিচিত লোক কেন? ওকেও তো বলতে পারতো! ও তো এই পথ দিয়েই যাতায়াত করে।
ব্যাপারটা বেশ সন্দেহজনক মনে হলো তাহসীনের কাছে। না, এখন আর স্কুলের দিকে না, রিকশাটাকে ফলো করতে হবে। দেখতে হবে তার আদরের চাচাতো ভাই ওয়াসিফকে নিয়ে লোকটা কোথায় যায়? সত্যিই কি তাকে বাড়ি পৌঁছে দেয় না অন্য কোনো খারাপ মতলব আছে।
ওয়াসিফকে রিকশায় উঠিয়ে নিয়েই হুড নামিয়ে দিয়েছে লোকটা। চলতে শুরু করেছে রিকশা।
সাইকেল ঘুরিয়ে নিল তাহসীন। খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখেই অনুসরণ করল রিকশাটাকে।
তাহসীন একবার ভাবল সরাসরি রিকশার সামনে গিয়ে সাইকেল দাঁড় করিয়ে থামায় রিকশাটা। তারপর জিজ্ঞেস করে ওয়াসিফকে এই সময় নিয়ে যাওয়ার কারণ। কিন্তু কেন জানি একটা রহস্যময়তায় পেয়ে বসল ওকে। তাই ফলো করার সিদ্ধান্ত নিল।
একটু পর খানিকটা ঘাবড়ে গেল তাহসীন। রিকশাটা বাড়ির পথ না ধরে অন্য দিকে যাচ্ছে। এদিকে সদর হাসপাতাল অবস্থিত। আরও কতকগুলো প্রাইভেট ক্লিনিকও আছে এদিকে। তাহলে কি ওয়াসিফকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? কেউ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে? কে?
এবার একটু ভয়ও পেতে আরম্ভ করল তাহসীন। ও ভুল করছে না তো রিকশাটাকে আগেই না থামিয়ে?
এই সময় তন্ময়কে যেতে দেখে ইশারায় কাছে আসতে বলল। পাশাপাশি সাইকেল চালাতে চালাতে তাহসীন বলল, ‘সামনের রিকশাটাকে ফলো কর। আমার চাচাতো ভাই ওয়াসিফককে নিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছে।’
‘তাহলে আমরা থামাচ্ছি না কেন রিকশাটাকে?’ জানতে চাইল তন্ময়।
‘আমি একটা রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি।’ জবাবে বলল তাহসীন। ‘খবরদার! এক পলকের জন্যও রিকশার দিক থেকে নজর সরাবি না!’
‘ওকে।’ বলে মেনে নিল তন্ময়।
ওদিকে রিকশায় বসে দারুণ অস্বস্তি বোধ করছে ওয়াসিফ। সাথে বসা লোকটাকে ও চেনে না। আগে কখনও দেখেছে বলেও মনে পড়ছে না। কিন্তু লোকটার কথা শুনে ও রিকশায় না উঠে থাকতে পারেনি। ও জানে না ওকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। শুধু জানে, ওকে যেতেই হবে। নইলে ভয়ানক বিপদ হয়ে যাবে!
দারুণ উসখুস করছে ও। এতদূরে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ওকে লোকটা? পথ শেষ হচ্ছে না কেন?
দারুণভাবে ঘাবড়ে গেল তাহসীন, যখন দেখল, সামনের রিকশাটা হাসপাতাল এরিয়া ছাড়িয়ে আরও এগিয়ে যাচ্ছে। তারমানে হাসপাতালকেন্দ্রিক কিছু না।
এবার অজানা আশঙ্কায় প্রাণটা কেঁপে উঠল। সে কথা জানাল বন্ধুকে।
শুনে তন্ময় বলল, ‘তাহলে আমাদের আর রিস্ক নেয়া ঠিক হবে না। আমার কাছে মোবাইল আছে। তুই ওয়াসিফের আব্বুকে ফোন কর। আর তা না হলে বল, আমি আমার আব্বুকে ফোন দিই। তার পরিচিত একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর আছে। তাকে জানাতে বলি।’
‘পাগল হয়েছিস তুই!’ ক্ষেপে গেল তাহসীন। ‘পুলিশকে বললে যদি লোকটা ওয়াসিফের কোনো ক্ষতি করে ফেলে? কী জবাব দেবো তখন চাচা-চাচিকে?’
‘কিন্তু তাহলে আমরা এখন করবো কী?’
‘ভাব। আমিও ভাবছি।’
রিকশাটা এবার লোকালয় ছাড়িয়ে নির্জন একটা রাস্তায় নেমে গেল।
এক পলকের জন্যও ওদিক থেকে চোখ সরালো না তাহসীন। পাশে যে রাস্তায় বেরিয়ে থাকা ইটের সাথে ঘা খেয়ে তন্ময় সাইকেল নিয়ে পড়ে গেল, সেদিকেও খেয়াল নেই ওর।
শীতের মধ্যেও ভীষণ ঘামছে তাহসীন। কী করবে তা ভেবে পাচ্ছে না।
আরে, ওয়াসিফটা কি পেছন ফিরে তাকাল একবার? চোখাচোখি হলো না ওর সাথে? ছেলেটার চোখের চাহনিটা কেমন যেন মনে হলো।
বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল তাহসীনের। কিছুটা অন্যমনষ্ক হয়ে পড়েছিল। ফলে রাস্তা পার হওয়ারত একটা কুকুরের গায়ে লাগিয়ে দিল সাইকেলটা। হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে সামলে নিল নিজেকে। বাঁচালো সাইকেলটাও। ‘কেঁউ কেঁউ..’ ডাকতে ডাকতে পালাল কুকুরটা।
দ্রুত নিজেকে মাটি থেকে উঠিয়ে সাইকেলটা আবারও টেনে নিল। দৃষ্টি দিলো সামনে।
আর তখনই ‘ধক্’ করে উঠল হৃৎপিণ্ডটা বুকের খাঁচায়। সামনের রিকশাটা আর দেখা যাচ্ছে না!
গায়ের সমস্ত বল যেন নিমেষেই মাটির সাথে মিশে গেল তাহসীনের। পাশে এসে দাঁড়াল তন্ময়।
‘তন্ময়, রিকশাটা নেই! ওয়াসিফকে নিয়ে…’ কথাটা শেষ করতে পারল না তাহসীন।
তন্ময় ওকে শান্ত করতে চাইল। বলল, ‘তুই ঘাবড়াস্ না তাহসীন। ওয়াসিফের কিছু হতে দেবো না আমরা।’
প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল সেটটা বের করল। বন্ধুকে দিতে দিতে বলল, ‘আগে তোর চাচাকে ফোন কর। সাবধান! তাড়াহুড়োয় উল্টোপাল্টা কিছু বলে বসিস না।’
কাঁপা হাতে মোবাইলটা নিল তাহসীন। নম্বর পেতেও দেরি করে ফেলল। তারপর ওপাশ থেকে মিজান চাচা রিসিভ করলে কেবল এতোটুকুই বলল, ‘চাচা, ওয়াসিফ একটা রিকশায় করে কোথায় যেন যাচ্ছে। আমরা আছি পেছনে। তুমিও চলে এসো, দ্রুত।’
তারপর মোবাইলটা তন্ময়ের হাতে দিয়ে দ্রুত সাইকেলে চড়ে বসল। খুঁজে বের করতে হবে ছোট্ট ছেলেটাকে।
একটু সামনে গিয়ে রাস্তাটা ডানে বামে দুই দিকে বাঁক নিয়েছে। বুঝতে পারছে না তাহসীন এখন কোন্ পথে যাবে? সাইকেল দাঁড় করিয়ে তন্ময়কে দ্রুত আসতে বলল। তন্ময় এলে তাকে বাঁয়েরটা ধরতে বলে নিজে ডানের রাস্তাটা ধরল।
কাঁচা রাস্তা। একটু এগোতেই রাস্তার ঠিক মাঝ বরাবর কিছু একটা পড়ে থাকতে দেখল তাহসীন। ওটার পাশে থামল। সাইকেল থেকে না নেমেই নিচু হয়ে উঠিয়ে নিল জিনিসটা। হাতে বেলুন ধরা একটা ছেলের ছবি। শেপটার চারপাশ বেশ সুন্দর করে কাটা। অর্থাৎ কাগজের ওপর হাতে বেলুন ধরা একটি ছেলে ছবি এঁকে সেটাতে দারুণ রঙ করা হয়েছে। এরপর সেটার চারপাশ নিখুঁতভাবে কাঁচি দিয়ে কাটা হয়েছে।
ছবিটা হাতে উঠিয়ে নিয়ে সামনের দিকে তাকাল। তীক্ষ্ম করল চোখের দৃষ্টি। খাঁ খাঁ করছে পুরো রাস্তাটা। কোনো জনমানুষের চিহ্ন নেই।
আবার সাইকেলের প্যাডেলে পায়ের চাপ দিল তাহসীন।
এগিয়ে চললো সামনে।
খুব কান্না পাচ্ছে ওর। ওর দোষেই হারিয়ে ফেলেছে ছোট্ট ভাইটিকে। এতটা রিস্ক নেয়া একদমই ঠিক হয়নি। তখনই রিকশা আগলে ধরে উদ্ধার করা উচিত ছিল ওয়াসিফকে। এখন স্পষ্ট বুঝতে পারছে ছেলেটার সামনে কঠিন বিপদ! অজানা আশঙ্কায় বুকের ভেতরটা হা-হা করে উঠলো।
একটু এগোতেই আরেকটা ড্রয়িং ওর নজরে পড়ল। রাস্তার কিনারে মৃদু বাতাসে কাঁপছে।
একই কায়দায় ওটাও হাতে উঠিয়ে নিল। কচি হাতে আঁকা দু’হাত প্রসারিত আবু সাঈদের স্কেচ এটা।
এবার শিওর হয়ে নিল তাহসীন। এগুলো ওয়াসিফেরই কাজ। ওর এই চাচাতো ভাইটা বাড়িতে সারাক্ষণ এসব নিয়েই মেতে থাকে। কাগজে ছবি আঁকে, সুন্দর রঙ লাগায় সেগুলোতে। তারপর কাঁচি দিয়ে কাটে। ওর ঘরে গেলে সব দেখায় তাহসীনকে।
আশার একটা ঢেউ এবার আছড়ে পড়ল ওর দেহের মধ্যে। রক্তের মাঝে সাহস চনমন করে উঠল। ঠিক পথেই এগোচ্ছে ও। ওয়াসিফকে এদিকেই নিয়ে গেছে লোকটা।
সাইকেলের প্যাডেলে এবার পায়ের চাপ দ্বিগুণ করলো।
প্রায় উড়ে এসে ওর সমান্তরালে এলো তন্ময়। জানাল, ‘বামের পথটা বেশিদূর এগোয়নি। সামনে বিশাল দিঘী। তাই ওদিকটায় আর না খুঁজে চলে এসেছে।’
সাইকেল চালাতে চালাতেই ওয়াসিফের আঁকা স্কেচগুলো সম্পর্কে সংক্ষেপে জানাল তাহসীন।
সব শুনে তন্ময় বলল, ‘তাহলে ওয়াসিফকে এদিকেই নিয়ে গেছে লোকটা। ভয় নেই, আমি আব্বুকে ফোন করে তার পুলিশ বন্ধুকে জানাতে বলেছি। এদিকের বর্ণনাও দিয়েছি। দ্রুতই পুলিশ নিয়ে আসবেন বলে জানিয়েছে আব্বু।’
‘আমার খুব ভয় করছে তন্ময়!’ বলল তাহসীন। ‘ওয়াসিফের কোনো বিপদ হয়ে গেলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না।’
তন্ময় সে কথার কোনো জবাব দিল না।
এবারের স্কেচটা খুঁজে পেল তন্ময়। জুলাই বিপ্লবের শিশু শহীদ জাবির ইব্রাহিমের স্কেচটা রাস্তার ঠিক মাঝখানেই পড়ে আছে।
জাবির একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের নার্সারি শ্রেণির ছাত্র ছিল। অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের জাবির বাসায় ফেলে দেয়া জিনিস দিয়ে হ্যান্ডিক্রাফট ও খেলনা বানাতে পারতো। এই শিশু বয়স থেকেই নামাজ পড়তো। স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে আর্মি অফিসার হওয়ার। চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন যখন চলছে, তখন মায়ের কাছে বারবার পীড়াপীড়ি করত আর বলতো, ‘আম্মু, আমি আন্দোলনে যাব।’ আম্মুও চাইতেন ছাত্রজনতার সাথে মিছিলে যোগদান করতে। যেদিন সিদ্ধান্ত নিলেন যে আন্দোলনে একাত্মতা জানাবেন, সেদিনই দুষ্ট রানিটা দেশ ছেড়ে পালালো। রাস্তায় রাস্তায় আনন্দ মিছিল। জাবিরের পরিবারও সেই মিছিলে যোগ দেয়। এই মিছিলেই পুলিশের গুলিতে শহীদ হয় শিশু জাবির ইব্রাহিম।
আরও এগিয়ে যায় তাহসীন ও তন্ময়।
সামনে একটা তালগাছকে রেখে বামে ঢুকে গেছে রাস্তাটা। তালগাছের নিচে আসতেই এবার জুলাইয়ের সর্বকনিষ্ঠ শহীদ আব্দুল আহাদ ও রিয়া গোপের দুটো স্কেচ কুড়িয়ে নেয় তাহসীন।
ঠিক এই সময় হন্ত দন্ত হয়ে ছুটে আসে সাদা স্কুল ড্রেস পড়া ছেলেটা।

পাঁচ.
সাইকেল থেকে দ্রুত নামে তাহসীন। পাশে ছিটকে পড়ে যায় দুই চাকার যানটা। সেদিকে খেয়াল নেই ওর। ওর নজর তখন সামনে থেকে ছুটে আসা ছেলেটার ওপর।
ওয়াসিফকে বুকে জড়িয়ে ধরে তাহসীন।
খুব দ্রুত উঠানামা করছে ওয়াসিফের ছোট্ট বুকটা।
পেছনে ছুটে আসছে তিনটে মানুষ। তিনজনই গুণ্ডা টাইপের।
তাহসীন খেয়াল করল, ওই তিনজনের মধ্যে ওয়াসিফকে রিকশায় করে আনা লোকটাও আছে।
সামনে ছোট্ট ছেলেটার সাথে আরও দুটো ছেলেকে দেখে একটু যেন থমকে দাঁড়াল তারা। কিন্তু সেটা ক্ষণিকের জন্য।
আবার ছুটে আসতে লাগল।
দ্রুততার সাথে সাইকেল ঘুরিয়ে নিল ছেলেরা।
ওয়াসিফকে পেছনের ক্যারিয়ারে না বসিয়ে সামনে রডে বসিয়ে নিল তাহসীন। ওকে আর বিপদে ফেলতে চায় না। এখন দ্রুত এখান থেকে কেটে পড়তে হবে। কিছুতেই লোকগুলোর হাতে পড়া চলবে না।
দ্রুত ওঠানামা করছে ছেলেদের হৃৎপিণ্ড। হাঁফাচ্ছে। ঘামছে দরদর করে।
খানিকটা চলার পরই সামনে থেকে একটা সাদা মাইক্রো গাড়িকে আসতে দেখা গেল। আরেকটু কাছে যেতেই ড্রাইভারের পাশের সিটে বসা তন্ময়ের বাবার পুলিশ বন্ধুকে চিনতে পারল তন্ময়।
এরপরের ঘটনা খুবই সংক্ষিপ্ত।
মাইক্রোর পেছন থেকে নেমে এলেন চারপাঁচজন পুলিশ। অল্প দৌড়েই গুণ্ডা তিনজনকে ধরে ফেললেন।
থানায় সংক্ষিপ্ত কিছু ফরমালিটিজ সেরে ওয়াসিফকে নিয়ে বাড়ি ফিরল সবাই।
পথে দেখা হয়ে গেল মিজান সাহেবের সাথে।
বাড়িতে বিরাট হুলস্থুল শুরু হয়ে গেল।
চারদিক থেকে সবাই মিলে মিজান সাহেবকে বকাবকি করছেন। কিছুতেই তার এমনটি করা উচিত হয়নি বলছেন সবাই।
আসলে ব্যাপার হয়েছে কী, আজ সকালে অফিসে মিজান সাহেবের জরুরি মিটিং ছিল। হেড অফিস থেকে ঊর্ধ্বতনরা আসবেন। তাই তিনি ওয়াসিফকে স্কুলের গেটেই নামিয়ে দিয়ে চলে যান। যা ছিল অন্যদিনকার ঘটনার বিপরীত। তিনি কোনোদিনই ওয়াসিফকে ক্লাসরুমে বসিয়ে না দিয়ে অফিসে যান না। আজই প্রথম ব্যতিক্রম ঘটেছে। আর আজই চরম সর্বনাশটা ঘটে যাচ্ছিল।
ওয়াসিফের আম্মু তো এখনও সমানে কেঁদে চলেছেন। ওয়াসিফকে একদমই কাছছাড়া করছেন না। রাইহা যে তার দিকে কেবলই ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছে, সেদিকে তার কোনো খেয়ালই নেই। রাইহা কিছুই বুঝতে পারছে না। বাড়ির সবার আজ হলোটা কী? সবাই ভাইয়াকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ওকে কেউ আদর করছে না। কোলে তুলে নিচ্ছে না। মনে মনে দারুণ অভিমান হচ্ছে ওর। কিন্তু অভিমানটাকে কীভাবে প্রকাশ করবে তা যে ওর জানা হয়ে ওঠেনি!
মিজান সাহেব ওয়াসিফের স্কুলে ফোন করলেন। হেডস্যারকে জানালেন সবটা। শেষে বললেন, গেটের দারোয়ানকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে। সে কিছু জানতে পারে। কিংবা ওয়াসিফের কিডন্যাপের বিষয়ে তারও হাত থাকতে পারে।
একটু পরে হেডস্যারই ফোন করলেন। জানালেন, মিজান সাহেবের অনুমানই ঠিক। এই ঘটনার সাথে গেটের দারোয়ানও জড়িত। তাকে পুলিশে দেয়া হয়েছে। হেডস্যার খুব করে মাফ চাইলেন মিজান সাহেবের কাছে।
মিজান সাহেব সেদিন আর অফিসে গেলেন না। তাহসীনও গেল না স্কুলে।
বাড়িটা যখন মোটামুটি শান্ত হয়ে এলো, তখন তাহসীন ভাইয়ার রুমে মিলিত হয়েছে তাহসীন, তন্ময়, ওয়াসিফ আর তাহসীনের অন্য এক সহপাঠী সিহাব। সিহাবটা আজ স্কুলে যায়নি। কয়েকদিন ধরে প্রচণ্ড জ্বর আর সর্দিতে ভুগছে। আজ কিছুটা কমলেও স্কুলে যায়নি।
‘তোমাকে বলল, আর তুমি লোকটার সাথে রিকশায় উঠে গেলে, ওয়াসিফ?’ এ কথা সে কথার পর জিজ্ঞেস করল তন্ময়।
‘বারে!’ বেশ ভারিক্কি চালে জবাব দিল ওয়াসিফ। ‘লোকটা যে বলল রাইহাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আম্মু তাকে পাঠিয়েছে আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমি তখন রিকশায় না উঠে কী করবো শুনি?’
তাহসীন বলল, ‘কিন্তু কাজটা একদমই ঠিক হয়নি।’
ওয়াসিফ বলল, ‘সেটা তো পরে বুঝতে পেরেছি তাহসীন ভাইয়া। জানো রাইহার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কথা শুনে আমার কত খারাপ লাগছিল? তাইতো অতকিছু তখন মাথায় ঢোকেনি।’
‘কিন্তু তুমি পালালে কীভাবে ওদের হাত থেকে?’ প্রশ্নটা করল সিহাব।
‘হাতে কামড়ে দিয়েছি।’ বেশ উৎফুল্লভাবে জবাব দিল ওয়াসিফ। ‘এমন জোরে কামড়ে দিয়েছি, ব্যাটাকে পেইন কিলার খেতে হবে।’
ওর বলার ধরনে হাসল সবাই। পরিবেশটা বেশ হালকা হয়ে গেল।
‘তবে তোমার বুদ্ধিটা বেশ কাজে দিয়েছে। তুমি যদি স্কেচগুলো রাস্তায় না ফেলতে, তাহলে হয়তো শেষ পর্যন্ত তোমাকে আমরা খুঁজেই পেতাম না! আর বেশিদূর না এগিয়ে ফিরে আসতাম। আর তারপর কী হতো, ভাবতেই আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছে!’ নিজের শরীরের কাঁটা দেয়া নিজেই অনুভব করল তাহসীন।
‘আমি কিন্তু একটুও ঘাবড়াইনি তাহসীন ভাইয়া। আমি তো আমার বোনের অসুস্থতার কথা শুনে যাচ্ছি। কিন্তু এক এক করে যখন সব হাসপাতাল ছাড়িয়ে ওই নির্জন রাস্তায় নিয়ে গেল আমাকে, তখন মনটা বেশ ভয় পেয়ে গেল। আশেপাশে তাকাতেই তোমাকে দেখতে পেলাম। সাথে তন্ময় ভাইয়াকেও। তখন বুকে সাহস ফিরে এলো। আর তারপরই তো নিয়মিত গ্যাপ দিয়ে দিয়ে আমার আঁকা ছবিগুলো ফেলে চললাম, যাতে তোমরা ক্লু পেয়ে আমাকে উদ্ধার করতে পারো।’
সিহাব বলল, ‘তোমার বুদ্ধিটা দারুণ হয়েছে ওয়াসিফ। কিন্তু ওই বিপদের মুহূর্তে এসব তোমার মাথায় এলো কীভাবে?’
মুচকি হাসল ওয়াসিফ। কে বলবে তাকে দেখে যে, একটু আগেই কিডন্যাপারের হাত থেকে ফিরে এসেছে?
‘আব্দুল আহাদেরা আমাকে শক্তি দিয়েছে।’ বলল ওয়াসিফ। ‘শহীদ আব্দুল আহাদ সেদিন বারান্দায় খেলা করছিল। ঘাতকের বুলেট ওর মাথা ভেদ করে। ওখানেই শহীদ হয় সে। আর রিয়া গোপের অবস্থাও তো একই রকম। নাইমা নামের মেয়েটা তো আর্মি হতেই চেয়েছিল। কত সাহসী ছিল ওরা, তাই না? তাইতো প্রাণ দিতে একটুও ভয় পায়নি। তাহলে আমি কেন ভয় পাবো ভাইয়ারা? আমাদের দেশকে আমরা বুক দিয়ে আগলে রাখব। তবুও কারোর অত্যাচার মেনে নেব না। জানো তোমরা? আমার বন্ধুরাও তাই বলে। কে কয়টা জুলাই শহিদের ছবি এঁকে নিয়ে যেতে পারে স্কুলে, আজ তারই প্রতিযোগিতা ছিল। আমি সেজন্যই এঁকেছিলাম ছবিগুলো। কিন্তু সেগুলো প্রতিযোগিতার কাজে না লেগে ছেলেধরাকে ধরার কাজে লেগে গেল।’
শেষের দিকে ওয়াসিফের কণ্ঠটা বেশ ভারী হয়ে এলো। স্কুলের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেনি বলে মন খারাপ হয়তো।
অন্যরা, বিশেষ করে তাহসীন বেশ অবাক হলো— এতটুকু ছেলে ওয়াসিফ। অথচ ওর মনের মাঝে জুলাই বিপ্লবটা কী গভীরভাবে গেঁথে গেছে! কতটা ওউন করে জুলাই বিপ্লবকে! বোধকরি ওর মতো অন্য শিশুরাও আজ বুকে একই স্বপ্ন লালন করে। যে কুঁড়িরা এখনও ঠিক মতো ফুটতে পারেনি পুরো পাপড়ি মেলে, তাদের এই অনুভূতিটা দারুণভাবে পুলকিত করে তাহসীনকে। অন্যরকম এক আবেশে চোখজোড়া ছলছল করে ওঠে।

ছয়.
রাত তখন প্রায় নয়টা বাজে। শীতের রাত নয়টা মানে অনেক রাত।
তখনই বের হতে হলো মিজান সাহেবকে।
ওয়াসিফের নানা বাড়ি থেকে জরুরি খবর এসেছে। ওর নানি ভীষণ অসুস্থ।
ওয়াসিফ ও রাইহাকে নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লেন ওদের আব্বু-আম্মু। একটা অটো ঠিক করে তাতে চেপে বসলেন।
নানা বাড়ি পৌঁছতে প্রায় সাড়ে দশটা বেজে গেল। ও বাড়িতে তখন অনেক লোকের ভীড়।
আত্মীয়-স্বজন প্রায় সবাই চলে এসেছেন। সবাইকেই জরুরিভাবে আসতে বলা হয়েছে।
উঠানে পা রেখেই আম্মু ছুটলেন নানির ঘরে।
পেছনে ওয়াসিফ ও রাইহাকে নিয়ে মিজান সাহেব।
ওয়াসিফের নানি সে রাতেই ইন্তেকাল করলেন। অবশ্য ওয়াসিফ সেটা জানতে পারে পরদিন ভোরের দিকে। ও ঘুমিয়ে পড়েছিল ছোটবোনটাকে পাশে নিয়ে।
ইনিয়ে বিনিয়ে কান্নার মাতম চলছে এখানে ওখানে। গ্রামের বাড়ি, দরজার ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে। বেশ শীত শীত করছে ওয়াসিফের। উঠতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু ঘরের বাইরের নানান কথা আর গুঞ্জনে শুয়ে থাকা সম্ভব হলো না।
দরজা খুলতেই বিভিন্নজনের নানান কথাবার্তা যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ল ভেতরে। বাইরে পা রাখল ও। এগিয়ে এলেন আব্বু। ওর ডান হাতটা ধরে বললেন, ‘ঘুম ভেঙে গেছে ওয়াসিফ? এসো, আমার সাথে এসো।’
ওয়াসিফ অবশ্য তখনও জানে না মূল ঘটনা। ও বেশ অবাক হয়েই বাবার সাথে চলতে থাকে।
নানিকে তার ঘরের বারান্দায় রাখা হয়েছে। একটি খাটিয়ায় শুইয়ে চাদর দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। আর পুরো খাটিয়াটা পুরু চাদরে ঢাকা।
এ রকম খাটিয়া ও ওদের মসজিদে দেখেছে। খাটিয়াকে সামনে রেখে জানাজার নামাজও পড়েছে। ও জানে, ওই খাটিয়ার মাঝে লাশ থাকে। তাহলে কি…
চোখ ফেটে কান্না বেরিয়ে আসতে চায় ওয়াসিফের। নানি ওকে অনেক ভালোবাসতেন। ও যখন বেড়াতে আসত, তখন তিনি মজার মজার গল্প শোনাতেন। আবার তিনি যখন ওদের বাড়িতে বেড়াতে যেতেন, তখন বিভিন্নরকম পিঠা বানিয়ে খাওয়াতেন। নানির হাতের তেলের পিঠে ওর ফেভারিট। অনেকক্ষণ জিভে লেগে থাকে তার স্বাদ।
খাটিয়ার চারপাশ ঘিরে বেশ কয়েকজন মহিলা বসে কুরআন তেলাওয়াত করছেন। কোনো পুরুষকে দেখা গেল না সেখানে। নানি খুব পর্দানশীন ছিলেন। কাজেই সেই এখনও তাকে পর্দার ভেতরেই রাখা হচ্ছে।
মিজান সাহেবকে ওয়াসিফসহ আসতে দেখে এগিয়ে এলেন ওয়াসিফের বড় খালা। তিনি মিজান সাহেবের হাত থেকে ওয়াসিফকে নিজের হাতে নিলেন। তারপর নিয়ে গেলেন খাটিয়ার কাছে। মুখ খুলে নানির মুখটা দেখালেন।
ধক্! করে উঠলো ওয়াসিফের বুকটা। নানি যেন ওর দিকেই তাকিয়ে আছেন। মুচকি হাসছেন। যেমনটি সবসময়ই হেসে থাকেন। ঠোঁটজোড়া সামান্য ফাঁক হয়ে আছে। যেন ওয়াসিফকে ডেকে কিছু বলবেন। কিন্তু ওয়াসিফ ঠিকই বুঝতে পারছে, নানি আর কথা বলবেন না। মারা গেলে কেউ আর কথা বলতে পারে না।
হাউমাউ করে কান্না পাচ্ছে ওয়াসিফের। আবার এতোগুলো মহিলার সামনে কাঁদতেও লজ্জা লাগছে। শেষে বড় খালার কোলে মুখ লুকালো। সঙ্গে সঙ্গে ডুকরে কেঁদে উঠল। ওকে জড়িয়ে ধরে খালাও কাঁদতে লাগলেন। ওদিক থেকে আম্মুটা একবার মুখ তুলে ফ্যালফ্যাল করে তাকালেন ছেলের দিকে। তারপর নিজেও আরও জোরে কেঁদে ফেললেন।
ওয়াসিফ আর ওখানে থাকতে পারল না। ছুটে চলে এলো।
তখন অনেকটাই সকাল হয়ে গেছে। আলো ফুটে ফরসা হতে শুরু করেছে চারপাশ।
বাড়ির পেছনে বাতাবি লেবুর তিনটে গাছ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দারুণ একটা পরিবেশ সৃষ্টি করে আছে। জায়গাটা বরাবরই ওয়াসিফের বেশ পছন্দের। তাই ছুটে ওখানে চলে গেল ও।
একটা লেবু গাছে হেলান দিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। মাথাটা পেছনে গাছের গায়ে লাগিয়ে দৃষ্টি ছুড়ে দিল শূন্যে। বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করছে ওর। অনেক ঘটনা হুড়মুড় করে আছড়ে পড়ছে ওর স্মৃতিতে।
সেবার যখন বেড়াতে এসেছিল ও আম্মুর সাথে, তখন রাইহাটা আম্মুর পেটে ছিল। তাই ওর দেখাশোনার অধিকাংশ দায়িত্বই নানিকে করতে হয়। এক বিকেলে ও এই লেবুতলায় এসে বসেছিল। তখন লেবু গাছে সবে ফুল ফুটতে শুরু করেছে। সাদা সাদা ফুলের পাপড়িরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল নিচে। চারপাশে দারুণ মন মাতাল করা একটা ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়েছিল। আনন্দে বিভোর হয়ে যাচ্ছিল ও। ঠিক এই সময় আসেন নানি। হাতে প্লাস্টিকের একটি বাটিতে মুড়ি আর বাতাসা। নাতির পাশে বসে পড়েন তিনি। আদর করে মুড়ি আর বাতাসা তুলে দেন ওর মুখে। আহ্! কী অমৃত স্বাদ সেই মুড়ি আর বাতাসায়! পুরো এক বাটি মুড়ি-বাতাসা ও নিমিষেই খেয়ে শেষ করে ফেলে। অথচ এই খাবারটা যদি আম্মু দিতেন ওকে খেতে, তাহলে কমপক্ষে আধাঘণ্টা তো লাগিয়ে দিতোই।
খাওয়া শেষ হলে নিজের শাড়ির সাদা আঁচল দিয়ে নাতির মুখ মুছে দেন নানি। তখনই আবার বুদ হয়ে যায় ওয়াসিফ। নানির শাড়ির আঁচলের ভাঁজে চমৎকার একটা ঘ্রাণ জড়িয়ে আছে। ওই ঘ্রাণ ওর নাকের ভেতর দিয়ে ঢুকে সমস্ত দেহে একটা অন্যরকম ভালোলাগার আবেশ ছড়িয়ে দেয়।
‘তুমি আমার মিষ্টি নানি!’ নানির বুকে মাথা গুঁজে বলে ওঠে ওয়াসিফ।
‘তুমিও কিন্তু কম দুষ্টু না!’ মজা করে বলেন নানি।
‘ওয়াসিফ, তুমি একা একা এখানে কী করছ, মামা?’ ডাকতে ডাকতে এলেন ওর ছোট মামা হাসান।
চিন্তায় ছেদ পড়ল ওয়াসিফের। ছোট মামাকে আসতে দেখে উঠে দাঁড়াল।
চোখজোড়া তখনও ভেজা ওর।
মামা এসে ওর চোখ মুছে দিলেন। বললেন, ‘কাঁদতে হয় না ওয়াসিফ মামা। এই দেখ না, তিনি তো আমার মা। আমাকে পেটে ধরেছিলেন। জন্ম দিয়ে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছেন। নিজের বুকের দুধ খাইয়ে বড় করে তুলেছেন। আমি কি কাঁদছি বলো?’
বললেন ঠিকই যে তিনি কাঁদছেন না, কিন্তু চোখজোড়া তার সজল হয়ে উঠেছে।
ওয়াসিফ বলল, ‘জানো মামা, গতবার যখন আসি আমি, নানি আমাকে এখানে বাটিতে করে মুড়ি-বাতাসা এনে খাইয়েছিলেন। নানিকে খুব মনে পড়ছে মামা!’
মামা-ভাগ্নের কান্নার রোলে তখন চারপাশ মুহূর্তেই ভারী হয়ে উঠল। এতক্ষণ লেবু গাছের ডালে একটা ময়না পাখি ঘুরে বেড়াচ্ছিল। এক্ষণে উড়ে চলে গেল। যেন এই মায়ার সাগরে সে ভেসে যেতে চায় না।

সাত.
ওয়াসিফের ক্লাস পুরোদমে আরম্ভ হয়ে গেছে। পড়ার বেশ চাপ। বিকালে ঠিক মতো খেলতেও পারে না ছোট্ট ছেলেটা।
ওর জন্য একজন ম্যাডাম রাখা হয়েছে। সন্ধ্যার পর এসে পড়িয়ে যান।
আর স্কুল থেকে ফিরে একগাদা হাতের লেখা করতে হয়। এরপর ম্যাডামের দেয়া পড়া তৈরি করতে হয়। কাজেই, খেলাধুলা করার টাইম কোথায়?
খাওয়া-দাওয়াও ঠিক সময়মতো হয় না কোনো কোনো দিন।
অল্প ক’দিনেই হাঁফিয়ে ওঠে ওয়াসিফ। এক রাতে প্রচণ্ড জ্বর আসে। সেই সাথে কাশি।
আম্মু-আব্বু সারারাত জেগে ছেলের জ্বর নামানোর চেষ্টা করেন। মাথায় বেশি পানি দিতেও ভয় পান। তাতে যদি হিতে বিপরীত হয়, এই আশঙ্কায়। অর্থাৎ, শীত তো তখনও চলে যায়নি পুরোপুরি। এখনও পাতলা কাঁথা গায়ে দিয়ে ঘুমাতে হয় রাতে। মাথায় বেশি পানি ঢাললে যদি জ্বরের মাত্রা বেড়ে যায় বা অন্য কোনো অসুখে পেয়ে বসে!
আর এখন এই রাতে কোনো ডাক্তারকেও পাওয়া যাবে না। সদরের ইমার্জেন্সিতে নেয়া যায়। কিন্তু সেটা করতে হলেও তো কোনো যানবাহন দরকার হবে। এতো রাতে কোথায় পাবে যানবাহন?
ঘরে সবসময় প্যারাসিটামল রিজার্ভ থাকে। ইতোমধ্যে একটা খাইয়ে দেয়া হয়েছে ওয়াসিফকে।
আম্মু ওর কপালে-ঘাড়ে পানির পট্টি দিতে থাকলেন।
শেষ রাতের দিকে জ্বর কিছুটা কমল। কাশিও। ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে গেল ওয়াসিফ।
আম্মু-আব্বু তখনই ঘুমালেন না। ওজু সেরে এসে নামাজে দাঁড়ালেন।
একটু পর ফজরের আজান দিল। আব্বু চলে গেলেন মসজিদে।
আজ শুক্রবার হওয়ায় মিজান সাহেবের অফিস বন্ধ। কাজেই দশটার পরপরই ওয়াসিফকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে চললেন। খ্যাতিমান শিশুবিশেষজ্ঞকে দেখালেন। ডাক্তার রক্তের ও কাশির দুইটা টেস্ট দিলেন। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর টেস্টদ্বয় করা হলো। রিপোর্ট দেবে সন্ধ্যার সময়।
সন্ধ্যায় আব্বু এলেন রিপোর্ট নিতে। রিপোর্ট নরমাল। মনটাই নষ্ট হয়ে গেল। আর ডাক্তারের কাছে গেলেন না তিনি। এখনকার ডাক্তাররা কিছু হলেই টেস্ট দেন। নিজেরা কেন কোনো রোগ নির্ণয় করতে পারেন না তারা?
প্রচণ্ড রাগ হতে লাগল তার। ফিরে গেলেন বাসায়।

আট.
আব্বু কথা দিয়েছিলেন ওয়াসিফের জ্বরটা পুরোপুরি সেরে গেলে সবাই মিলে পার্কে বেড়াতে যাবে। ছোটোখাটো একটা পিকনিক করবে তারা।
এরপর থেকেই ওয়াসিফ বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়ে। বেড়াতে ওর বেশ ভালো লাগে। আর সেটা যদি হয় কোনো খোলা জায়গা, যেখানে থাকবে অনেক পশুপাখি, গাছপালা, নানান খেলার উপকরণ আর নির্মল বাতাস— তাহলে ওর কী যে ভালো লাগে!
আজ সেই দিনটি হাজির। গত রাত থেকেই গোছগাছ শুরু করেছেন আম্মু।
সকাল হতেই আম্মু প্রিয় সব খাবার রান্না করলেন। তাকে সহযোগিতা করলেন আব্বু। আর ওয়াসিফ বোনকে সামলালো।
মুরগির রোস্ট ওয়াসিফের খুব পছন্দের। রাইহাটাও কুটকুট করে ওসব খায়। সেই রোস্ট তৈরি করলেন আম্মু। হালকা মসলা দিয়ে পোলাও রাঁধলেন। জাফরান রঙ ছিটিয়ে দিলেন তার ওপর। কী যে সুন্দর দেখাচ্ছে ভাতটা!
সাড়ে নয়টার দিকে বেরিয়ে পড়লেন তারা।
অবশ্য সাথে করে বিল্লালকেও নিতে হলো। ওয়াসিফের ইচ্ছে ছিল পারুলকেও নেবে। কিন্তু ও তো বেশ ছোট। আম্মু একা দেখাশোনা করে পেরে উঠবেন না। তাই ওকে আর নেয়া হলো না।
সুন্দর পার্কটা। কী নেই এখানে ছোটদের জন্য! থেকে থেকে থোকা থোকা নানান ফুলের ছোট্ট ঝোপ। রঙবেরঙের ফুল ফুটে আছে তাতে। বাতাসে মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ মিশে নাকে প্রবেশ করছে।
একপাশে মিনি চিড়িয়াখানা। অন্যপাশে আছে একটা লেক মতো। কৃত্রিম উপায়ে পানি তোলার ব্যবস্থাও আছে। সেই লেকে নৌকা বাইচের সুযোগ আছে। আরও আছে নানান প্রকার খেলা ও চড়ার জিনিস। মিনি রেলগাড়িও আছে।
মোটা একটা গাছের নিচে সাথে করে আনা বিছানার চাদরটা বিছিয়ে মালামালগুলো রাখা হলো।
এখন ঘোরাঘুরির পালা। আব্বু-আম্মুর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে বিল্লালকে নিয়ে ঘুরতে বের হলো ওয়াসিফ। তবে কথা দিতে হয়েছে সাবধানে থাকবে এবং লেকের ওদিকটায় যাবে না। বিকালে একসাথে নৌকা চড়বে সবাই।
হাত ধরাধরি করে হাঁটছে ওয়াসিফ ও বিল্লাল। নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। সে কথা শোনার জন্য কেউ আড়ি পাতছে না। অবশ্য আড়ি পাতলেও শুনতে পাবে না। ওদের হৃদয়ের কথাগুলো কেবল সবুজ ঘাস, ঝরে পড়া ফুলের পাপড়ি, বাতাসে কম্পনরত গাছের পাতা, ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে উড়ে যাওয়া পাখি আর বয়ে যাওয়া বাতাস শুনতে পারছে। বাতাসেরা ওদের শব্দমালাগুলো বয়ে নিয়ে যাচ্ছে ঊর্ধ্বাকাশে। তারপর ছড়িয়ে দিচ্ছে বুঝি সর্বত্র। আর তাতে প্রকৃতির খুশিটা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। চারপাশটা আরও সুন্দর করে তুলছে।
এই মুহূর্তে ওয়াসিফ আর বিল্লাল কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ধীর লয়ে হাঁটছে। দু’জনের মাঝে এক্ষণে কোনো ভেদাভেদ নেই। যেন কত আপন ওরা! কতদিনের পরিচিত!
ওয়াসিফ আজ দারুণ খুশি। কতদিন ধরে এমন একটি দিনের স্বপ্ন দেখতো ও! সবুজ ঘাসের ওপর দিয়ে হেঁটে যাবে। চারপাশ থেকে ফুলেরা গন্ধ ছড়াবে। নানান রঙের ডানাওয়ালা প্রজাপতিরা উড়ে যাবে পাশ ঘেঁসে। ঘাসেরা পায়ে কোমল পরশ বুলিয়ে দেবে। বাতাসেরা গুনগুন করে গান শোনাবে আর শরীরে মৃদু দোলা দিয়ে যাবে।
ইচ্ছেডানা মেলে উড়বে ওয়াসিফ। সাথে ওর প্রিয় কেউ থাকবে।
আম্মু ও আব্বু সেদিকে তাকিয়ে রইলেন।
অন্যরকম এক ভালো লাগায় আম্মুর অন্তরটা দুলে উঠলো।
আব্বুর কণ্ঠ চিরে কেবল একটাই শব্দ বের হলো— ‘মাশাআল্লাহ!’
সমাপ্ত