আয়নাঘরের ফুল

জাকির আবু জাফর

0
22

সবাই তাকে ডাকে ভাবুক। ইশতিয়াক নামটি ডুবেই গেছে ওর। কারো সাথে দেখা হলেই বলে— কী খবর ভাবুক। পাশ দিয়ে যেতে বলে— ভাবুক কোথায় যাও। দূর দিয়ে গেলে বলে— ঐ যে ভাবুক যায়। বন্ধুদের কাছ থেকেই ‘ভাবুক’ ছড়িয়ে পড়েছে। প্রথমে ক্লাসমেটদের মধ্যে। ধীরে ধীরে পাড়ায় মহল্লায় ছড়িয়ে পড়ে। এখন যে দেখে সে-ই বলে ভাবুক।
হ্যাঁ সত্যিই তো। ও ভাবুক। ও ভাবতে চায়। অনেক কিছুই ভাবে। বন্ধুরা কিছু জিজ্ঞেস করলে ভেবেই জবাব দেয়। ভাবতে ভাবতেই ওর নাম হয়ে গেল ভাবুক।
ওর ভাবনার কত যে বিষয়। কত যে ধরন। কত যে কাহিনী। একবার চাঁদের বুড়ি নিয়ে হলো এক কাণ্ড। ওর বয়স তখন বারো বছর। পূর্ণিমারাত। বিশাল চাঁদ উঠেছে আকাশে। জোছনায় সারা পৃথিবী যেন ভেসে যাচ্ছে। ও ভাবলো এটাই চাঁদ দেখার সময়। একেবারে ছোটবেলা থেকেই চাঁদের প্রতি এক ধরনের ভালোবাসা ওর। চোখ পড়লেই পাশের জনকে ডেকে বলত ঐ যে তাদ। রাতে বাসা থেকে বের হলেই চাঁদ খুঁজত। চাঁদ তো সব রাতে আকাশে থাকে না। যখন থাকত না অমনি বলত— তাদ- না-ই। তাদ- না-ই।
একটু বড় হয়ে বুঝে গেছে চাঁদ সবসময় থাকে না আকাশে। মাঝে মাঝে হারিয়ে যায় অন্ধকারে। এখন রীতিমতো হিসাব জানে চাঁদের। কখন নতুন চাঁদ ওঠে। কখন চাঁদটি বড় হয়। কখন পূর্ণিমা। আবার কখন অমাবস্যা!
সন্ধ্যায় লেখাপড়া শেষ করেই চুপে চুপে উঠে গেল বাসার ছাদে। ছাদটা ছিল বেশ সাজানো। এক অংশে নানারকম ফুলের গাছ। অন্য অংশে বৈঠকখানা।
বৈঠকখানা সাজিয়েছে ইশতিয়াকের বাবা। মা লাগিয়েছেন ফুলের গাছ। বিকেলের চা-নাশতা ছাদেই। এই বৈঠকখানায়। বিকেলের ফুরফুরে বাতাস। নরম রোদ আর আকাশের নীল কী যে দারুণ দৃশ্য! এমন মায়াবী পরিবেশে কফি খাওয়ার আনন্দই আলাদা। ইশতিয়াকের বাবা মা আর ছোট বোন। বিকেলটা কাটে একসাথে। একসাথেই নাশতা, চা অথবা কফি। ছাদের রেলিংটা বেশ মজবুত। ছেলে-মেয়ের নিরাপত্তার কথা ভেবে ব্যবস্থা নিয়েছিলেন ইশতিয়াকের বাবা।

হাসনাহেনা ঝোপটি ছাদের এক কোনায়। সন্ধ্যার পরেই সুবাস ছড়ায় হাসনাহেনা ফুল। ইশতিয়াকের খুব প্রিয়ফুল এটি। হাসনাহেনা ঝোপের পাশেই দাঁড়াল ও। দাঁড়াল চাঁদের দিকে ফিরেই। বিশাল চাঁদটি তখন পূর্বদিকের আকাশে। গোটা আকাশ স্বচ্ছ। মেঘের ছিটেফোঁটাও নেই কোথাও। শরতের পূর্ণিমা এমনই হয়। এমন জোছনায় ছাদে ও একা। এমন একাকী আর কখনো ছিল না ছাদে। কী যে ভালো লাগছে ওর। চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকে। কখনো চারপাশের গাছগাছালি দেখে। কখনো চোখ পড়ে উঠানে। উঠানে খালি জায়গায় যেন জোছনাস্তূপ হয়ে আছে। ঝিরিঝিরি বাতাস। হাসনাহেনার গন্ধ। আশেপাশে ঝিঁঝিঁর ডাক। লেবুগাছটার ঝোপে দু’-একটা জোনাকি। আহা কী আনন্দময় পরিবেশ। এসব দেখছে আর ভাবছে। ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ মনে পড়ল চাঁদের বুড়ির কথা। প্রশ্ন জাগে মনে— সত্যি কি চাঁদের গায়ে এটি বুড়ি? বুড়ি হলে কিভাবে থাকে! চাঁদ যখন ছোট হয় তখন বুড়িও কি ছোট হয়? আর যখন ছোট নতুন চাঁদ ওঠে তখন কোথায় থাকে বুড়ি। তাহলে শুধু চাঁদ বড় হলেই বুড়িটি আসে। কিন্তু তা কী করে হয়। বড় হবার আগে বুড়িটি থাকে কোথায়? এমন নানা প্রশ্ন জাগে ইশতিয়াকের মনে।
দাদুর কোলে বসেই গল্প শুনেছিল ও। দাদুই বলতেন চাঁদের বুড়ির কথা। দু’বছর আগে মারা গেলেন দাদু। দাদু বেঁচে থাকলে বেশ মজা হতো। এসব প্রশ্ন করা যেত। কী জবাব দিতেন দাদু? আবার ভাবে ও। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে চাঁদের দিকে। চাঁদের আলোর দিকে খেয়াল নেই ওর। একটিই ভাবনা তার চাঁদের বুড়ি কিভাবে বসে আছে চাঁদের বুকে। কোনো দিকে ফেরে না চোখ। মনও যায় না অন্য কোনো দিকে। দেখছে আর দেখছে! দেখতে দেখতে মনে হলো চাঁদও কি দেখছে ওকে? চাঁদের কি চোখ আছে? আছে কি মানুষের মতো কোনো মন! চাঁদ কি স্বপ্ন দেখে ওর মতো? এসব কাকে জিজ্ঞেস করবে? কার কাছে পাবে এর জবাব? কিসব ভাবনা জাগে ওর মনে? নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে। এসব ভাবতে ভাবতে ওর মনে হলো চাঁদের বুকে এটি একটি বটগাছ। হ্যাঁ, তাইতো। বিশাল ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে বটগাছটি। ভেবে নিজেই হেসে দিলো। এ এক নতুন আবিষ্কার করেছে ও। দাদু থাকলে এখনি ও বলতো— দাদু চাঁদের বুকে ওটি বুড়ি নয় ওটি একটি বটগাছ। হা হা হা, এটি আমার আবিষ্কার। বুঝলে দাদু?
ইশতিয়াকের আম্মা ওকে খুঁজতে খুঁজতে হয়রান। বাসার কোথাও নেই। উঠানে নেই। বাসার পাশের কোনো জায়গাও বাকি রাখল না। খোঁজ করেছে পাশের বাসায়ও। কয়েকটি বাসার পরে ওর বন্ধুর বাসা। না সেখানেও যায়নি। কোথায় গেল তবে!
এর মধ্যে ফোন পেয়ে চলে এলেন ইশতিয়াকের বাবা। সম্ভাব্য সব জায়গায় খবর নিলেন। না কোথাও হদিস মিলছে না। রাত প্রায় দশটা। এর মধ্যে কান্নাকাটি ইশতিয়াকের আম্মার। মায়ের কান্না দেখে কাঁদছে তিন বছরের ফাবিহা, ইশতিয়াকের বোন।
কী চিন্তা করে ছাদে উঠে এলেন ইশতিয়াকের বাবা। বৈঠকখানায় দেখলেন নেই। ফুলের অংশে দেখলেন, না নেই। অস্থির হয়ে উঠেছেন তিনি। নানারকম ভীতিকর চিন্তা জমা হচ্ছে মনে। বাসা থেকে ছেলে গায়েব হয়ে যাবে এটা তো ভাবা যায় না। কিন্তু ছেলেকে এখন পাওয়া যাচ্ছে না এটাই সত্যি।
হাসনাহেনা ঝোপটির এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছে ইশতিয়াক। প্রায় ঝোপের আড়াল হয়ে গেছে ও। ইশতিয়াকের বাবা অস্থির। অজানা আশঙ্কায় ভারী বুক। দু’হাত আকাশের দিকে ছড়িয়ে বললেন- আয় আল্লাহ আমার সোনামানিককে ফিরিয়ে দাও। বুক থেকে যেন গলা চিরে বেরিয়ে এলো বাক্যটি।
হঠাৎ বাবার গলার আওয়াজ কানে এলো ইশতিয়াকের। বলল— বাবা, এখানে আসো।
ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন ইশতিয়াকের বাবা। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না প্রথমে। বাবা, সোনামণি ইশতিয়াক— আপনা থেকেই যেন বেরিয়ে এলো শব্দগুলো। গলা তার কাঁপছে। ইশতিয়াক তখনো স্বাভাবিক। ঝোঁপের আড়াল থেকে বলল— বাবা এদিকে আসো না।

একরকম লাফিয়ে ছুটলেন ঝোঁপের দিকে। উঁকি দিতেই দেখলেন তার সন্তান। চাঁদের দিকে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে আছে আনন্দে। বাবাকে দেখেই বলল- আচ্ছা বাবা বলো তো চাঁদের বুকে ওটা কী? বুকে টেনে নিলেন বাবা। বললেন— তুমি এখানে কেন সোনা। তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে আমরা হয়রান। তোমার আম্মা কেঁদে একশেষ। কেন এলে এখানে একা এই রাতে?
চাঁদ দেখতে এলাম বাবা। আজ পূর্ণিমা। দেখছো না কেমন গোলগাল চাঁদটি। ভেসে আছে আকাশে। আর সারা পৃথিবীকে ভরে দিচ্ছে তার আলোয়। আচ্ছা বাবা চাঁদের বুকে এটা কি চাঁদের বুড়ি!
এদিকে খেয়াল নেই ওর বাবার। ওকে একরকম টেনে ছাদ থেকে নামিয়ে নিলেন। তখনো কান্না করছে ওর আম্মা। কাঁদছে ছোট বোনটিও।
বুকের ভেতর টেনে নিলেন ছেলেকে। বললেন— বাপ তুই কোথায় ছিলি! খানিকটা বোকার মতো চেয়ে আছে ইশতিয়াক। ওকে খুঁজে এত তুলকালাম এর কিছুই জানে না ও। ওর মাথায় তখনো ঘুরছে একটি কথা— চাঁদের বুকে ওটি বুড়ি নয়। ওটি একটি বিশাল বটগাছ।

দুই
ইশতিয়াকের ওপর নজরদারি বেড়ে গেল বাবা-মায়ের। চাঁদ দেখার বিস্তারিত কাহিনী শুনলেন বাবা মা। শুনে ভয়ও পেলেন কিছুটা। জ্বিন-ভূতের আছর হলো না তো ছেলের ওপর। কিংবা মানসিক কোনো সমস্যা! ভাবতে ভয় করে!
এর মধ্যে একজন মনোচিকিৎসককে দেখালেন। ডাক্তার বললেন— ওর কোনো সমস্যাই নেই। চিন্তার কারণও নেই। তবে ওকে দেখে রাখার কথা বললেন।
দেখেই রাখেন বাবা-মা। বিশেষ করে চোখের আড়াল করতে চান না ইশতিয়াকের আম্মা। সারাক্ষণ ছেলের পাশে। গোসল, খাওয়া, লেখাপড়া, ঘুম, স্কুলে আসা-যাওয়া সর্বক্ষণের সঙ্গী তিনি। সব সময় চোখে চোখে। কী ভয় ঢুকে গেল তার মনে। চোখের আড়াল হলেই কেঁপে ওঠে বুক।

ইশতিয়াকের বন্ধু ইমন। ইমনের আম্মার সাথে শেয়ার করলেন বিষয়টি। তিনি বললেন— আপনার ছেলে কিছুটা ভাবুক প্রকৃতির। চিন্তা নেই। এটি তেমন কিছু নয়। ও তো লেখাপড়ায় খুব ভালো। ক্লাসের ফার্স্ট বয়। গানের গলাও ভালো। আরও ভালো লাগে— আপনার ছেলের ব্যবহার খুব ভালো। কী যে সুন্দর কথা বলে ও।
ছেলের প্রশংসা শুনে বুকটা ভরে উঠল ইশতিয়াকের আম্মার। বললেন— দোয়া করবেন বোন। আমার ছেলেটা যেন ভালো থাকে।
ও ভালো থাকবে। নিশ্চয় ভালো থাকবে। কারণ ও যে ভালো।
ইমনের আম্মার কাছ থেকে ঘটনাটা চাউর হয়ে গেল। এক কান দুই কান করে শুনে গেল অনেকেই। ক্লাসে জেনে গেল সবাই। ফার্স্ট বয় বলে যে কেউ ইয়ার্কি করার সাহস করে না ইশতিয়াককে। কিন্তু দু’চারজন সাহসী বলেই ফেলে— এসেছে, আমাদের ভাবুক সাহেব এসেছে। মুচকি হেসে উড়িয়ে দেয় ইশতিয়াক। এসব কথা পাত্তা দেয় না ও। কিন্তু ভেজালটা করে দিলো ক্লাসটিচার সালাম স্যার। তিনি ক্লাসে ঢুকেই বললেন— আমাদের ভাবুক ইশতিয়াক কেমন আছে?

স্যারের এমন রসিকতা! গোটা ক্লাস হো হো করে হেসে উঠল। শুধু হাসি নেই ইশতিয়াকের মুখে। আর হাসতে পারেনি ইমন। ইশতিয়াকের চেহারাটা গম্ভীর। দেখে এগিয়ে এলেন সালাম স্যার। মাথায় হাত রাখলেন। বললেন— ভাবুক হওয়া খারাপ কিছু নয় বাবা। বিশ্বমনীষী যারা, তাদের সবাই ভাবুক ছিলেন। আমাদের নবীও ভাবতেন। আর নবী ইবরাহিম তো কিশোরকাল থেকেই ভাবতেন কত কিছু। ভেবেছেন গৌতম বুদ্ধও। নিচের দিকে ফিরে ছিল ইশতিয়াক। কথাগুলো শুনে হঠাৎ তাকাল স্যারের দিকে। বলল— আপনি অনেক ভালো স্যার। গোটা ক্লাস চুপ। সবার চোখ ইশতিয়াকের দিকে।
মজা করে স্যার জিজ্ঞেস করলেন— কেন রে এত ভালো আমি ভাবুক। এবার আর কেউ হাসল না ভাবুক শুনে।
ইশতিয়াক বলল— আপনি ভালো কারণ আপনি ভালো হবার কথা বলেন। ভালো হবার পথ দেখিয়ে দেন।
পিঠে চাপড় দিয়ে বললেন স্যার— সাবাস ইশতিয়াক! সাবাস! আমাদের মুখ উজ্জ্বল করবে তুমি। তোমার জন্য দোয়া করি। অনেক দোয়া। এগিয়ে যাও তুমি।

আজ ভীষণ ভালো লাগছে মন। সালাম স্যারের কথা মনে পড়ছে বারবার। মনে পড়ছে সহপাঠীদের আগ্রহের কথা। পুরো ঘটনাটা যেন সাজানো গোছানো। সবকিছু পক্ষে যাবে ভাবতেই পারেনি ও। স্যার টিটকারী দেবে এমনই ধারণা ছিল ওর। বলবে— চাঁদপ্রেমিক চাঁদের দেশে যাও। অথচ এত উৎসাহ দিলেন স্যার। কী আর বলা যাবে। মনের ভেতর আনন্দের ঘুড়ি যেন উড়ে উড়ে যাচ্ছে। আর বড় হচ্ছে ওর ভাবনার আকাশ। সে আকাশে পাখি হয়ে উড়ছে ওর স্বপ্নগুলো।

আজ বিকেলটা কাটবে প্রজাপতিদের সঙ্গে। ইমন এতক্ষণে চলে আসার কথা। ঘড়ি দেখে। বিকেল ৫টা পেরিয়ে গেছে। খানিকক্ষণের মধ্যেই এসে পড়বে ইমন। দুজন মিলে দেখবে প্রজাপতি। ভাবতেই আনন্দে ভরে ওঠে বুক। প্রজাপতির মতো ফুরফুরে হয়ে ওঠে মনটা।
কাঁধে হাত রেখে ইমন বলল— কী ভাবছিস রে ভাবুক মশাই!
ভাববো আর কী! দেরি হলো যে তোর?
তেমন কিছু না।
তাহলে কেমন কিছু?
ইমন চুপ।
কী ব্যাপার বন্ধু তুই দেখি কথা লুকাস আজকাল।
না রে বন্ধু লুকাব কেন। তোর কাছে লুকিয়ে কী লাভ।
তাহলে মুখ খোল!
খানিকটা বাদ সেধেছিল আম্মু। বলল— এত প্রজাপতি টতি দেখে কী হবে! মন চাইলে খেলাধুলা কর। না হলে ঘরে থাক। না হলে লেখাপড়া করতে পারিস। ইশতিয়াক ভাবুক-টাবুক কী যেন।
ওর সাথে তাল মিলাবি কিভাবে!
বললাম— ভাবুক টাবুক বুঝি না। ও আমার বন্ধু, প্রিয়বন্ধু। তাছাড়া প্রজাপতি আমারও ভালো লাগে।
বাহ্ দারুণ বলেছিস বন্ধু। চল তবে। হয়তো প্রজাপতিরা অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।
চল চল। কিছুটা দেরিই হয়ে গেল।
দেরি হলো আমার জন্যেই। আম্মুটা কেন এমন করল জানি না। কিছুটা আনমনা হয়ে ওঠে ইমন।
ইশতিয়াক বলল— মন খারাপ করিস না। বাবা-মা সব সময় সন্তানের ভালো চায়। বাবা-মার কথা মান্য করাই ভালো। তোর আম্মুর সাথে খারাপ ব্যবহার করিসনি তো!
কিছুটা করেছি রে। আম্মু বেশি বাধা দিচ্ছিল তো! মেজাজ খারাপ হয়ে গেছিল।
দাঁড়িয়ে পড়ল ইশতিয়াক। দাঁড়িয়ে গেল ইমনও। দুই বাহু ধরে ইশতিয়াক বলল— বন্ধু, মায়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করিস না। বাবার সাথেও না। মা-বাবার মতো এমন দরদি কে হয় বল?
তুই ইদানীং বেশি নসিহত করিস ইশতিয়াক। খানিকটা রেগে বলল ইমন।

রাগ দেখে কিছুটা দমে গেল ইশতিয়াক। চেয়ে থাকল ইমনের চোখের দিকে। ইমন তাকিয়ে আছে দূরের কোনো দিগন্তের দিকে। ধীরে কাঁধে হাত রাখল ইশতিয়াক। বলল— ইমন আমি তোকে কোনো নসিহত দিতে চাই না। দিচ্ছি না। কিন্তু বন্ধু হিসেবে শেয়ার করব না? মনে নেই আমার ছাদে চাঁদ দেখা নিয়ে বলিসনি তুই? বলিসনি রাতে একা ছাদে যাবি না। বলিসনি একা ছাদে গেলে কী ক্ষতি হতে পারে! বলিসনি বল?
ধীরে ধীরে চোখ ফেরায় ইমন। চোখ রাখল ইশতিয়াকের চোখে। বলল— তুই শুধু ভালো ছাত্র নয় একজন ভালো বন্ধুও। তোর মতো বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। কথা দিলাম তোকে— আম্মুর সাথে আমি আর খারাপ ব্যবহার করব না।

ইশতিয়াকদের বাসা থেকে খুব দূরে নয় লেকটি। লেকের পারেই ঝিঙেফুলে খেলা করে প্রজাপতির দল। ফুল আর প্রজাপতি যেন একাকার। দুই বন্ধুর চোখের সামনে শত শত ফুল। এসব ফুলেই উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে শত শত প্রজাপতি। কত রঙ কত রূপ এসব প্রজাপতির। পাখায় পাখায় রঙের ছটা। শিল্পীর তুলির টানে মাখানো রঙ যেন। চোখ ভরে ওঠে। ভরে যায় মন।

বিস্ময়ে দুই বন্ধু চেয়ে চেয়ে দেখছে প্রজাপতির খেলা। শেষ বিকেলের মায়াবী রোদ ছড়ানো ফুলে প্রজাপতির গায়ে। আহা কী মনোরম দৃশ্য! ছবির মতো সুন্দর। লাল নীল হলুদ কালো বেগুনী সাদা কত রঙ জড়ানো। কত রঙ মাখানো এদের গায়ে।
এত প্রজাপতি এখানে কেন আসে রে— জিজ্ঞেস করলো ইমন।
ফুলের আসরে প্রজাপতিই আসবে বলল— ইশতিয়াক।
আরো নানা জায়গায় তো ফুল আছে। সবখানে তো প্রজাপতি উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়ায় না! তাহলে কি অন্য কোনো কাহিনী আছে!
হ্যাঁ রে বন্ধু, এটা ঠিক বলেছিস। সব ফুলে প্রজাপতি বসে না। আমার মনে হয় প্রজাপতিদেরও পছন্দ-অপছন্দ আছে। আছে ভালো লাগা-না-লাগা।
তবে ঝিঙেফুলের সাথে প্রজাপতির একটি গোপন রহস্য থাকতে পারে। ঝিঙেফুল যেখানেই ফুটুক প্রজাপতি আসবেই।
এটা ঠিক বলেছিস বন্ধু। ঝিঙেফুলের সাথে প্রজাপতির অন্যরকম একটি সম্পর্ক আছে। না হলে যেখানে ঝিঙেফুল সেখানে প্রজাপতি কেন আসবে! থামল ইমন।
একটুক্ষণ চুপ থেকে বলল ইশতিয়াক— আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ঝিঙেফুল আর প্রজাপতি নিয়ে কি চমৎকার লিখেছেন। মনে পড়ছে আমার। লিখেছেন—
ঝিঙেফুল ঝিঙেফুল,
দোদুল দুল দোদুল দুল।
প্রজাপতি নিয়ে লিখেছেন-
হ্যাঁ, আমারও মনে পড়ছে বলে উঠলো ইমন। বলল, নজরুল লিখেছেন—
প্রজাপতি প্রজাপতি
কোথায় পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা
টুকটুকে লাল নীল ঝিলিমিলি আঁকা বাঁকা
কোথায় পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা

বাহ্! তোর তো ভালোই মনে আছে— বলল ইমন।
তোর মতো মনে থাকে নারে। তোর স্মরণ শক্তি এক্সিলেন্ট। কিছুই ভুলিস না। এ সময়ই শব্দটা কানে এলো— হো হো হো পৃথিবীটা রহস্যেভরা বোঝে না মানুষ।
হঠাৎ ভরাট কণ্ঠের শব্দে ভয় পেয়ে গেল দুজন। প্রায় একসাথেই উল্টো ঘুরে গেল দুইবন্ধু। দেখল— জটবাঁধা চুলের প্রায় উন্মাদ একজন লোক। ঠিক ওদের পেছনেই দাঁড়ানো। মলিন চেহারা। ময়লাযুক্ত ছেড়াফাটা শার্ট। ধুলোবালি লেগে আছে চুলে। কিন্তু চোখ দুটো ভয়ঙ্কর উজ্জ্বল। কেমন যেন ঘোর লাগা ভয়। কেমন যেন অন্যরকম দৃষ্টি। চেয়ে আছে আকাশের দিকে। মুখে সেই কথা— হো হো হো,
পৃথিবীটা রহস্যে ভরা।
লোকটির গমগম কণ্ঠস্বর যেন বাতাস ছড়িয়ে দিচ্ছে। ছড়িয়ে পড়ছে মাঠ থেকে মাঠে। ইশতিয়াকের মনে হচ্ছে ওদের কণ্ঠ রোধ করে রেখেছে লোকটি। এখন কোনো কথাই বের হবে না কণ্ঠ থেকে।
লোকটি এবার দুটি পা দুদিকে ছড়িয়ে দিলো। দুটি হাত সোজা করে তুলে দিলো আকাশের দিকে। আগের মতো দৃষ্টিও আকাশেই। চিৎকার করে বলল, হায় হায় বোঝে না মানুষ! পৃথিবীটা রহস্যে ভরা। তারপর কিছুক্ষণ চুপ। তারপর বলল— এই ফুল এই প্রজাপতি রহস্যে ভরা। বোঝে না মানুষ! হায় হায় ভাবে না মানুষ! আবার চুপ। তারপর বিড়বিড় করে কী যেন বলছে। এ সময় ইশতিয়াকের মনে হলো লোকটির চোখ যেন উল্টানো। ভয়ে ভেতরটা পানি হয়ে যাচ্ছে দুজনের। লোকটি কি ঝাঁপিয়ে পড়বে ওদের ওপর? নিঃশেষ করে দেবে দুজনের সব?
ভয়ে চেহারা বদলে গেল ইমনের। ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে ওকে। কিন্তু সাহস দেবার সাহস পাচ্ছে না ইশতিয়াক। তবে ভাবছে— ভয় পেলে চলবে না। সাহস রাখতে হবে বুকে। কী হয়ে দেখি।
ইশতিয়াক দেখল কাঁপছে ইমন। ও কি কেঁপে কেঁপে পড়ে যাবে?
মনে আরো সাহস সঞ্চয় করে ইশতিয়াক। ইমনকে ধরে ঝাড়া দিলো।
ফিসফিসিয়ে বলল— কী হলো ইমন! ভয়ের কিছু নেই।
ঝাড়া খেয়ে খানিকটা সাহস সঞ্চয় করে ইমন। কাঁপা কণ্ঠে বলল চল যাই। ভয়ে বদলে গেল ইমনের কণ্ঠ। চল যাই কথাটি কেমন জানি শোনালো।
লোকটি উল্টানো চোখে তখনো চেয়ে আছে আকাশের দিকে। মুখে সেই কথা— পৃথিবীটা রহস্যে ভরা— ভাবে না মানুষ।
ঠিক এ সময় ঘটল আরো বিস্ময়কর ঘটনা। সাঁ… করে বিমানের মতো আকাশ থেকে নেমে এলো একটি স্বর্ণ ঈগল। এসেই বসল লোকটির প্রায় কপালে। দুটি পাখা গুটিয়ে নেবার চেষ্টা করছে ঈগলটি। লোকটি হাত সামনে ধরে বলল— আয় আয় হাতে আয়। বলামাত্র ঈগলটি উঠে এলো হাতে।
কী আশ্চর্য ইশতিয়াক এবং ইমনকে যেন দেখছেই না পাখিটি। কিংবা পাত্তাই দিচ্ছে না বোধ হয়।
এখন আর কোনো ভয় নেই ইশতিয়াকের মনে। বিস্ময়ের সাথে ঘটনাটা দেখছে ও।
লোকটি ঈগলের দিকে চেয়ে আছে। ঈগলও তাকিয়ে রইল লোকটির দিকে। পলকহীন চোখে এসব দেখছে ইশতিয়াক। ইমন একবার লোকটির দিকে একবার ইশতিয়াকের দিকে দেখে। এভাবে কেটে গেল কিছুক্ষণ।
ধীরে ধীরে হাত উঁচু করল লোকটি। ঈগলটি হাতেই বসা। উঁচু হতে হতেই আবার সোজা হয়ে গেল হাত। এখন ডানহাতের মুষ্টিতে বসা ঈগলটি। আরো কী বিস্ময় অপেক্ষা করছে ইশতিয়াকদের জন্য কে জানে!
একটু পরে ঈগলের পিঠে এসে বসল আরেকটি ঈগল। তার কিছুক্ষণ পর দ্বিতীয়টির পিঠে বসল আরেকটি। তার পিঠে আরো একটি। এভাবে একটির পরে একটি করে করে বসল অসংখ্য ঈগল। দেখে মনে হয় ঈগলের মিনার। মনে হয় আকাশ ছুঁয়ে যাবে। বিস্ময়ে প্রায় বোবা হয়ে গেছে ইশতিয়াক-ইমন। এভাবেই ইগল ধরে আছে লোকটির হাত। উপর-নিচ করছে সামান্য। বলছে— পৃথিবীটা রহস্যে ভরা, বোঝে না মানুষ। বলতে বলতেই উদ্ভ্রান্তের মতো পা বাড়াল সামনে। ঈগলের মিনার যেন ঢেউ খেলছে বাতাসে। ইশতিয়াক ইমন দ্রুত বাড়ির পথ ধরল।

তিন
রাত গভীর হয়ে গেছে। তবুও ঘুম নেই ইশতিয়াকের চোখে। দৃশ্যটি মন থেকে সরছে না কিছুতেই। হঠাৎ লোকটির আগমন। তার অবয়ব। ভয়ঙ্কর রকম কণ্ঠ। ঈগলের মিনার এবং তার মুখের বাণী— পৃথিবীটা রহস্যে ভরা, ভাবে না মানুষ। বারবার ভেসে উঠছে মনের আরশিতে। লেখাপড়া শেষ করল। খাওয়া দাওয়া করল। বাবা-মার সাথে গল্প হলো কিছুক্ষণ। কিন্তু মনে দৃশ্যটি গেঁথেই আছে। বাবা-মাকে লোকটির গল্প বলেনি। বললে ওকে আর যেতে দেবে না প্রজাপতির কাছে। প্রজাপতি ওর বন্ধুর মতো। প্রজাপতির কাছে গেলে ভালো হয়ে যায় মন।

হঠাৎ মনে পড়ল লোকটির উল্টানো চোখ। মনে পড়তেই সারা শরীরে একধরনের ভয় ঝাঁকুনি দিয়ে গেল। লোকটি যদি আমাদের গলা চেপে দিত! ভয়ে গায়ের পশম দাঁড়িয়ে গেল সব। কিন্তু না লোকটি তেমন কোনো কিছু করল না। বরং তার মুখের বাণীটি বারবার শোনাচ্ছিল— পৃথিবীটা রহস্যে ভরা, ভাবে না মানুষ। সত্যিই তো পৃথিবীটা কত রহস্য বুকে নিয়ে জেগে আছে। কই তেমন করে তো ভাবে না মানুষ। ও অল্প একটু ভাবে। তাতেই সবাই বলে ভাবুক। মনে মনে হেসে ফেলে ইশতিয়াক। ও ভাবুক! সবাই ওকে ভাবুক বলেই ডাকে। ইশতিয়াক নামটি ভুলেই গেল বুঝি। আবারো হাসি পায়।
এসব ভাবতে ভাবতেই কখন চোখে নেমে এলো ঘুম। ঘুমেই জেগে উঠল স্বপ্নের পৃথিবী। ইশতিয়াক দেখছে সেই লোকটিকে। এসে দাঁড়িয়েছে ওর মুখোমুখি। চোখ উল্টানো নয়। কিন্তু অসম্ভব ধারালো চোখ। তীক্ষ্ণ। ইশতিয়াকের ডান হাত ধরে দ্রুত এগিয়ে চলল। কোনো বাধা দিচ্ছে না ইশতিয়াক। ছুটে চলল লোকটির সাথে। অল্প সময়ে গেল অনেক দূর। যেতে যেতে এক সময় ওরা প্রবেশ করল একটি বাগানে। বাগানটি শুধু গোলাপের। নানা রঙের গোলাপ— সাদা, লাল, নীল, গোলাপি, মেজেন্টা এবং কালো। সারি সারি ফুল ফুটে আছে। বাগানে ঢোকার একটাই মাত্র পথ। শানবাঁধানো ঘাটের মতো। অথচ বেশ প্রশস্ত। বাগানে ঢোকার সাথে সাথে এক পশলা বাতাস এসে শীতল করে দিলো ওদের। কী যে আরাম লাগছে ইশতিয়াকের। বাগানে ঢুকেই লোকটি ছেড়ে দিলো ওর হাত। একটি কথাও বলল না ওর সাথে। লোকটিকে এখন বেশ আপন মনে হচ্ছে ইশতিয়াকের। হাঁটার গতিও কমেছে লোকটির। সামনে লোকটি। পেছনে ইশতিয়াক। ওর মনে হলো ওরা বাগানের মাঝখানে পৌঁছে গেছে। তবুও হাঁটছে লোকটি। এগুলো আরো কিছু দূর। একটি ছোট ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালো। ঘরের দরজাটি ওয়ালের সঙ্গে সাঁটানো। লোকটি বিসমিল্লাহ বলে হাত বুলিয়ে দিলো দরোজায়। সাঁ করে ওয়ালের এক পাশে ঢুকে গেল দরোজাটি।
লোকটি বলল— আল্লাহর নাম নিয়ে প্রবেশ করো।
ইশতিয়াক বলল— বিসমিল্লাহ। বলেই পা বাড়াল সামনে। ঢুকেই একটি সিঁড়ি। নিচের দিকে নেমে গেছে। সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করল লোকটি। পিছে পিছে নামছে ইশতিয়াক। সিঁড়ির শেষ ধাপ থেকে নামলো ফ্লোরে। নেমেই দেখল বিস্ময়। এক আলো ঝলমল বিশাল আয়নাঘর। ডানে বামে সামনে পেছনে ওপরে নিচে শুধু আয়না আর আয়না। যে দিকে তাকায় দেখে ওর নিজের ছবি। কিন্তু লোকটি কোথাও নেই। আর কেউ নেই। কোনো শব্দও নেই। আছে কেবল আলোর তরঙ্গ। আলোর ফুল।

ও ডানে বাঁয়ে তাকায়। সামনে পেছনে দেখে। ওপরে-নিচে যায় চোখ। চতুর্দিক থেকে ওর ছবিই দেখছে ওকে। যেদিকে তাকায় দেখে ওর ছবি চেয়ে আছে ওর দিকে। নিঃশব্দ এমন ঝলসানো আলোর বন্যায় নিজের ছবিকেই ভয় লাগছে ভীষণ ভয়। মনে হচ্ছে ওর ছবি আয়নার ভেতর ড্রাকুলা হয়ে উঠছে। বিকৃত হয়ে উঠছে ওর চেহারা। ভয়ে একরকম চিৎকার দিলো ও। লোকটি কোথায় নিয়ে এলো ওকে। এসে গেল কোথায়! কিছু না বলেই চলে গেল কেন? গেল কোন পথে! ওর সামনে সামনেই তো নামলো লোকটি। তাহলে অন্য কোনো পথ আছে কি? যে পথে চলে গেছে লোকটি? ভাবতে ভাবতে ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। দেখল ঠিক ফ্লোরের মাঝখানে একটি আঁকা ছবি। এমনভাবে আঁকা ছবিটি যেন আয়নার ওপর ভাসছে। চেনা চেনা মনে হয় ছবিটি। খেয়াল করে দেখে ইশতিয়াক। হ্যাঁ, তাই তো ঐ লোকটিরই ছবি। যে তাকে নিয়ে এলো এখানে। কিন্তু ছবিতে লোকটাকে দারুণ খুশি খুশি মনে হচ্ছে। চুল-চোখ-মুখ সবই। ঠিক অবিকল। মুখে একটি হাসির রেখা ঝুলে আছে। বেশ জীবন্ত ছবিটি। যেন চেয়ে আছে ইশতিয়াকের দিকে।
হঠাৎ ও দেখল পাশে হুবহু আরেকটি ছবি। ওই ছবিটিও চেয়ে আছে ওর দিকে। এটি ওটি করে দুটো ছবিই দেখে ও। দেখতে দেখতেই দেখে পাশে আরেকটা ছবি। ওটা দেখতে দেখে পাশে আরেকটি ছবি। ওটার পাশে আরেকটা ছবি। এভাবে একটার পর একটা ছবি বাড়ছেই। যেখানে চোখ যায় সেখানেই ছবি। সব ছবিই তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ভয়ে ওর কলিজা যেন পানি হয়ে যাচ্ছে। কোনো দিকে পা বাড়াতেও পারছে না। মনে হচ্ছে পা ফেলতেই পড়বে লোকটির ছবির ওপর। ছবির ওপর পা পড়লে আস্ত থাকবে না ওর পা। এর মধ্যে কে যেন পেছন থেকে ঠেলে দিলো ওকে। দু’কদম এগুলো সামনে। বিস্ময়কর ব্যাপার! ওর পা মেঝেতে পড়ার আগেই ছবিটি সরে যায় ওখান থেকে। নিজেই পরীক্ষা করে এবার। পা বাড়ালো সামনে। হ্যাঁ, তাই তো ছবিটি সরে যায় পা পড়ার আগেই। কিছুটা দ্রুত পা ফেলার চেষ্টা করে। ছবিও দ্রুত সরে যাচ্ছে। হঠাৎ দৌড় দিলো ইশতিয়াক। তার থেকে বেশি দৌড়ে সরে যাচ্ছে ছবি। মনে হয় ওর সাথে খেলছে ছবি। থামল ও। ছবিও থেমে গেল। ও স্থির হয়ে আছে। ছবি স্থির। হঠাৎ অট্টহাসি। হাসিটি চতুর্দিক থেকে। দেখল সেই লোকটি। চারদিকের আয়নায় ভেসে আছে সে। হাসির শব্দটা অদ্ভুত। ক্রমাগত হাসছে আর হাসছে। চতুর্দিকে হাসির দৃশ্য। মনে হচ্ছে মেঝের ভেতর থেকেও ফুটছে হাসির শব্দ। তাকাল মেঝের দিকে। একি কোনো ছবিই নেই মেঝের ভেতর। ভাবে— এ কেমন জাদুর জগতে এসে পড়ল ও।
ধীরে ধীরে আবার পেছনে গেল ও। যেখানে দেখছিল মেঝের প্রথম ছবি। পৌঁছাতেই দেখল আগের মতোই একটি ছবি। চার দেয়ালে হাসির শব্দ নেই। ছবিও নেই। আবার মেঝে তাকাতেই দেখে পাশে আরেকটা ছবি। এভাবে পুরো মেঝে ছবিতে ভরে গেল।
ইশতিয়াকের মাথায় এলো নতুন বুুদ্ধি। ওখান থেকে আরো ডানে সরে এলো ও। সরতেই দেখল কোথাও কোনো ছবি নেই। ওর ছবিও চারিদিকে নেই। সামনে তাকাল দেখল ঘরের আয়নার মতো ওর ছবি। তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ও দেখছে নিজেকে। দেখতে দেখতেই দেখলো ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে আয়নার ছবিটি। বদলে যাচ্ছে অদ্ভুতভাবে। বেরিয়ে পড়ছে ওর চেহারা, শরীরের ভেতরের জিনিস। কী আশ্চর্য! ওর হাড়গোড় রক্ত মাংস সব স্বচ্ছ হয়ে দেখা যাচ্ছে। ওই তো ওর হৃদপিণ্ড। ওর ফুসফুস নাড়িভুড়ি সব সবকিছু পরিষ্কার।
সায়েন্স ক্লাসে একটি এক্স-রে মেশিনের কথা বলেছিলেন টিচার। যেখানে মানুষের শরীরের কোনো কিছুই লুকানো থাকবে না। সব স্বচ্ছ করে দেখাবে। এটাই কি সেই এক্সরে মেশিন। বিস্মিত ইশতিয়াক। মানুষের শরীর সম্পর্কে যা পড়েছে তার সব ওর চোখের সামনে ভাসছে। ও দেখছে ওর শরীরে পাঁচ শ’র বেশি মাংসপেশি। দুই শ’র বেশি হাড়। প্রায় একশ ট্রিলিয়ন কোষ বা সেল। প্রতিটি সেলে খাবার পৌঁছানোর জন্য রয়েছে এতসংখ্যক শিরা ও ধমনী। যা জোড়া দিলে ষাট হাজার মাইল দীর্ঘ হয়ে যাবে। এটা পাইপলাইন যা সারা শরীরে ছড়িয়ে আছে মানুষের। হৃদপিণ্ড স্পন্দিত হচ্ছে প্রতিদিন প্রায় এক লক্ষ বার। পাম্প করছে রক্ত। এ রক্তের পরিমাণ ষোল শত গ্যালনেরও বেশি এবং এসবই হচ্ছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে।
বিজ্ঞান বইতে পড়ে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল ইশতিয়াকের। এখন ও চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছে। দৃশ্য দেখে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। টিচার বলেছিলেন- মানুষের বডির মতো বিস্ময়কর কিছু জগতে নেই। তার চেয়েও বিস্ময়কর হলো মানুষের ব্রেইন বা মস্তিষ্ক। মস্তিষ্কে রয়েছে এক শ’ বিলিয়ন নিউরোন সেল। যার প্রতিটি সেল এক হাজার থেকে পাঁচ লক্ষ নিউরোনের সাথে সংযুক্ত। প্রতিটি মুহূর্তে কমপক্ষে একশত ট্রিলিয়ন যোগাযোগ ঘটছে মস্তিষ্কে। এসব বইয়ের পাতা থেকে মুখস্থ করেছে ইশতিয়াক। মুখস্থ করলে কী হবে। বাস্তবতা তো আর দেখা হয়নি। এখন ওর সামনে খুলে গেল রহস্যের দুয়ার। এ কথাই কি বলেছিল লোকটি— পৃথিবী রহস্যে ভরা, ভাবে না মানুষ। ও তো ভাবে। অনেক কিছুই ভাবে। শেষ নেই ওর ভাবানার। আরো ভাবতে চায়। আরো আরো অনেক ভাবনা।

একি মনের ভাবনাটাও দেখা যাচ্ছে আয়নায়। মনে লুকানো লোভ, হিংসা-ভালোবাসা সবই ভেসে উঠছে। হঠাৎ ভেসে এলো লোকটির কণ্ঠ— হ্যাঁ মানুষকে ভালোবাসো। ঘৃণা করো না কাউকে। মনে রেখ না বিদ্বেষ। রক্ষা করো মানুষের মর্যাদা। অন্যায় করো না মানুষের প্রতি। মানুষ মানুষের জন্য। হা হা হা। পৃথিবী রহস্যে ভরা, বোঝে না মানুষ।
কোন দিক থেকে ভেসে এলো শব্দ বোঝে না ইশতিয়াক। দৃষ্টি ঢালে চতুর্দিকে। না কোথাও নেই লোকটি। কিংবা তার ছবি। খুঁজতে খুঁজতে সরে এলো আরো একটু ডানে। ও সরে আসতেই যেন সরে গেল আয়নাটি। আরো একটু সামনে এলো। আসতেই দেখল ভঙ্ককর দৃশ্য! চতুর্দিকের আয়নায় উল্টানো চোখে লোকটি। মানুষের হৃদপিণ্ড টেনে বের করলে যেমন উল্টে যায় চোখ তেমনি। নড়াচড়া নেই। নেই কোনো শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ। যেন আয়নার ভেতর বড়শিতে গাঁথা ছবি।
ভয় এত বেশি আগেই পেয়েছে এখন আর মনে নতুন ভয় ঢোকার জায়গাই নেই। পাথরের মতো চোখ তুলে চতুর্দিকে দেখে ইশতিয়াক। সামনে পা ফেলে ধীরে। তিন কদম এগুতেই দেখলো স্বাভাবিক চোখে লোকটি। কিন্তু তার চোখ দুটি অসম্ভব সুন্দর এবং মায়াবী। চোখ থেকে যেন ঠিকরে পড়ছে আলো। চারপাশে সুন্দর চোখের দৃষ্টি। এ দৃষ্টি দেখছে শুধু ওকেই। দেখছে ও নিজেও। হঠাৎ তার চোখে পড়ল দৃশ্যটি। বিস্ময়ের সাথে দেখল— প্রতিটি চোখের কালো মণিতে ফুটে আছে লাল গোলাপ। গোলাপের পাপড়িগুলো ঝিরিঝিরি বাতাসে যেন কাঁপছে।
ইশতিয়াক ভাবছে— এ কী রহস্যের পর রহস্য খুলে যাচ্ছে ওর চোখের সামনে। এ কী বিস্ময়ের পর বিস্ময় দেখছে ও। জগতটা কেন এত রহস্যময়?
ভাবতে ভাবতে হাঁটছে ও। দু কদম পা বাড়াতেই দেখল লোকটির চোখের গোলাপগুলো বৃষ্টির মতো এসে পড়ছে ওর পথের ওপর। ফুলের ওপর পা দিতে মন চাইছে না ইশতিয়াকের। খানিকটা বাঁ দিকে সরে গেল ও। সরতেই দেখল ফুলগুলোর পাপড়ি ছড়িয়ে পড়ছে ও পথে। নির্মিত হয়ে গেল লাল গোলাপের পাপড়িতে মোড়ানো একটি সরু পথ। এ পথটিও মাড়াতে চাইলো না ইশতিয়াক। ও আরো একটু সরে গেল বাঁয়ে। যেই না পাপড়ি বিছানো পথের বাইরে পা রাখল মনে হলো ওর পায়ের পাতা পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ গো বলে দিলো চিৎকার। একরকম গোঙানির ভেতর দিয়ে বেরিয়ে এলো। সেই সাথে ভেঙে গেল ঘুম। ঘুম ভাঙতেই ধড়ফড় করে উঠে বসল বিছানায়। বেড সুইচ চেপে দিলো। আলোয় ভরে গেল রুমটি। দেখল ওর গোটা বিছানা প্রায় ঘামে ভেজা। মাথা মুখ বুক পিঠ সবই ভেজা। গেঞ্জিটি ঘামে ভিজে চুবচুবে। এক ধরনের ঘোর জেগে আছে ওর ভেতর। ও বসে আছে ঘোরের ভেতর। আয়নাঘরের রাজ্য যেন ওকে জমিয়ে রেখেছে। ইশতিয়াকের ঘরে আলো। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে দরজায় এলেন ওর আম্মা। দেখলেন ছেলে তার ঘামে ভেজা। দরদর করে ঘামছে। উদভ্রান্ত চোখে বসে আছে। বিড়বিড় করছে মুখে।

ভয় পেয়ে গেলেন তিনি। দ্রুত ঢুকলেন রুমে। ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বললেন— কী হলো বাবা? এমন ঘামছো কেন? দুঃস্বপ্ন দেখেছ?
মাথায় মুখে পিঠে হাত বুলিয়ে দেন। ঘাম মুছে দেন। জিজ্ঞেস করলেন— পানি খাবে বাবা?
জবাব দেয় না ইশতিয়াক। বিড়বিড় করে তাকায় চার দেয়ালে। কী যেন খুঁজছে। মেঝের দিকে দেখে। সেখানেও খুঁজছে কিছু।
কী হলো বাবা! কী খুঁজছিস? আলতো একটি ঝাঁকি দেন আম্মু। বললেন— দুঃস্বপ্ন দেখেছিস বল?

মায়ের দিকে তাকাল। মা দেখলেন ছেলের দৃষ্টিতে কী এক ঘোর। স্বাভাবিক নয় সে। মনে মনে ভয়। কি জানি কী হলো! ছেলেকে নিয়ে গেলেন নিজের রুমে।

বাবা-মার মাঝখানে ইশতিয়াক। তখন রাত সাড়ে ৩টা। বাবা ঘুমিয়ে গেলেন। ঘুমিয়ে গেলেন মা-ও। ঘুম নেই শুধু ওর চোখে। আয়নাঘরের সমস্ত দৃশ্যগুলো ঘুরছে ওর মনের চোখে। আর সেই লোকটির জন্য খুব মায়া হচ্ছে ওর। যে তাকে নিয়ে চলে গেল আয়নাঘরের ভেতর।

চার
ক্লাস টিচার না থাকলেই আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে ইশতিয়াক। ক্লাসমেটদের প্রায় সবাই ওর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কেউ বলে অন্য ভালো ছাত্রদের মতো অহঙ্কার নেই ওর। কেউ বলে ইশতিয়াকের ব্যবহার খুব সুন্দর। কী সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলে। সহযোগিতার কথা প্রশংসা করে কেউ। বলে— লেখাপড়ায় যারা দুর্বল তাদের অনেক সাহায্য করে ইশতিয়াক। কেউ বলে ইশতিয়াক আমাদের অষ্টম শ্রেণির গৌরব।
আজ সবার একটিই কথা ইশতিয়াককে দেখতে কেমন জানি দেখাচ্ছে। ফোলাফোলা চোখ মুখ। খানিকটা আনমনা। হয়তো কোনো সমস্যা কিংবা অসুস্থতা।
ইমন জিজ্ঞেস করল— কী হলো বন্ধু তোর?
না রে তেমন কিছু না। রাতে একটু ঘুম কম হয়েছে।
কথাটি মনে ধরেনি ইমনের। বলল— আমার কাছে লুকাচ্ছিস? খুলে বল কী হয়েছে!
বলব তোকে। পরে।
শুনে চুপ করে গেল ইমন। ওর মনে নানা প্রশ্ন— আবার কী হলো ইশতিয়াকের? রাত জেগে আবার চাঁদ দেখেনি তো ছাদে?
ঠিক এ সময় ক্লাস রুমে প্রবেশ করলেন বিজ্ঞান টিচার আহমদ আজম। তার স্বভাবভঙ্গিতে বললেন— যে যার জায়গায় ঠিক আছো তো?
সবাই একযোগে বলল- ঠিক আছি স্যার।
ইশতিয়াকের দিকে তাকালেন স্যার। বললেন— তোমার চোখ লাল, মুখ ফোলা কেন?
আমতা আমতা করে ইশতিয়াক বলল— রাতে ঘুম ভালো হয়নি স্যার।
মুচকি হেসে স্যার বললেন— ছাদে চাঁদ দেখেছ নাকি।
স্যারের কথায় পুরো ক্লাস হেসে উঠল হো হো করে।
কিছুটা লজ্জাই পেল ইশতিয়াক। চেয়ে আছে নিচের দিকে।
স্যার হেসে বললেন— তোমরা হাসছো কেন? এটা ওর বিশেষ গুণ। চাঁদ দেখার অনেক আনন্দ আছে। শুধু ভালো ছাত্র হলে চলে না। কিছু অন্যরকম গুণও থাকতে হয়। এমন অনেক গুণ আছে আমাদের ইশতিয়াকের। বলে আদরের চাপড় দিলেন ওর পিঠে। স্যারের আদর পেয়ে স্বাভাবিক হয়ে উঠল ও। পুরো ক্লাস নীরব। বিজ্ঞান স্যার অনেক মজার মানুষ। পড়ানও মজা করে। ক্লাস যাদের ভালো লাগে না তাদেরও প্রিয় ক্লাস এটি। স্যার বিজ্ঞানকে খেলার মতো করে বোঝান। সবচেয়ে খারাপ ছাত্রটিও মজা পায় স্যারের ক্লাসে।
আরেকটি আকর্ষণ থাকে ইশতিয়াকের প্রশ্ন। প্রতিদিন কোনো-না-কোনো মজার প্রশ্ন ইশতিয়াক করবেই।
আজ কী প্রশ্ন করবে? জিজ্ঞেস করলেন স্যার।
প্রশ্ন করলো ও— স্যার এমন কোনো যন্ত্র কি আছে যার মাধ্যমে মনের ভাবনা দেখা যায়? মানুষ যা ভাববে তাই দেখা যাবে।
ইশতিয়াকের প্রশ্ন শুনে অবাক হলেন স্যার। কিছুটা ভাবলেন। ভাবলেন ইশতিয়াকের চিন্তা ভাবনার কথা। এই ছেলে এমন করে ভাবে কিভাবে!
ধীরে ধীরে মুখ খুললেন আহমদ আজম স্যার। বললেন তোমার প্রশ্নটা সত্যিই অদ্ভুত। মানুষের মন দেখা যাওয়ার যন্ত্রের কথা এখনো কেউ ভাবেনি। কম্পিউটারের মাধ্যমে মানুষের ইচ্ছের প্রকাশ ঘটানোর চেষ্টা করছে বিজ্ঞানীরা। কিন্তু ভাবনা দেখানোর কথা ভাবছে না এখনো। ভাবেনি কেউ। তুমি ভাবছ এটি সত্যিই প্রশংসা করার মতো। ইশতিয়াকের জন্য একটি হাত তালি হয়ে যাক। বলেই হাত ওপরে তুলে তালি দিচ্ছেন স্যার। সাথে সাথে পুরো ক্লাসে বয়ে গেল তালির বন্যা। মিটিমিটি হাসছে ইশতিয়াক।
আরো একটি প্রশ্নের সুযোগ চাইলো ও। স্যার বললেন— ইয়েস ইয়েস যত ইচ্ছে প্রশ্ন করো। প্রশ্ন করতে পারাটাও আনন্দের, বললেন স্যার।
ইশতিয়াক উঠে দাঁড়াল। বলল— স্যার জগতে এমন কোনো আয়নাঘর আছে কি যেখানে একজন মানুষের ছবি দেখা যাবে নানাভাবে এবং যেখানে চোখের মণিতে ফুটে থাকবে লাল গোলাপ। পাশ দিয়ে কেউ হেঁটে যেতে গোলাপগুলো লাল গালিচার মতো হয়ে যাবে পথ।
অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন আহমদ আজম স্যার। ইশতিয়াককে আগাগোড়া দেখছেন তিনি। ভাবছেন এই ছেলের মাথায় কী আছে আল্লাহই জানেন।
স্যারের এমন ভঙ্গি এর আগে ক্লাসে দেখেনি কেউ। ছাত্ররা তাকিয়ে আছে স্যারের দিকে। স্যারের দৃষ্টি ইশতিয়াকের ওপর। এভাবে কিছুক্ষণ। তারপর হো হো করে হেসে দিলেন স্যার। বললেন— এক রহস্যময় প্রশ্ন করেছে আমাদের ইশতিয়াক। জগতে কত রহস্য লুকিয়ে আছে। তার চেয়ে বেশি রহস্য মানুষের ভেতর। মানুষ কাঁদে হাসে। মানুষ শেখে শেখায় এবং মানুষই ভালো হয় মন্দ হয়। ভালো মানুষকেই ভালোবাসে পৃথিবীর মানুষ। কিন্তু মানুষ কী অদ্ভুত। কী অদ্ভুত তার চিন্তা। পিঠে হাত রেখে বললেন— এই যে আমাদের ইশতিয়াক। কী অদ্ভুত প্রশ্নই না করল ও।
ক্লাসের সবাই একযোগে বলে উঠল— সত্যি স্যার, অদ্ভুত। হঠাৎ স্যার চুপ। কী যেন ভাবছেন। খানিকক্ষণ। তারপর বললেন— বিজ্ঞানবিষয়ক একটি প্রতিযোগিতা হবে আগামীকাল। হবে স্কুলের সব ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে। এবারের বিষয়— বিজ্ঞানের জগতে নতুন চিন্তা। অর্থাৎ প্রচলিত ধারণার বাইরে বিজ্ঞানের অগ্রগতি কী হতে পারে এমন ভাবনা উপস্থাপন করবে।
স্যারের কথা শুনে যে যার মতো ভাবনায় ডুবে যায়। শুধু বিজ্ঞান যাদের পছন্দের বিষয় নয় তাদের মুখে বিরক্তির চিহ্ন।

পাঁচ
প্রতিযোগিতার রেজাল্ট ঘোষণা হবে আজ। স্কুলের বিরাট হল রুমে সব ছাত্রছাত্রী উপস্থিত। প্রধান শিক্ষকসহ সব শিক্ষকেরা হাজির।
দু’চারটি উপদেশমূলক কথা বললেন— প্রধান শিক্ষক। বললেন— বিশ্বখ্যাত কজন বিজ্ঞানীর উদাহরণ তুলে। এরপর ধীরে দাঁড়ালেন বিজ্ঞান স্যার, আহমদ আজম। তার হাতে প্রতিযোগিতার রেজাল্ট। সামান্য ভূমিকা দিলেন তিনি। বললেন— তোমাদের অনেকেই আমাদের ভাবনা চিন্তাকে অতিক্রম করেছ। বিজ্ঞানে তোমাদের নতুন যাত্রার চিন্তা সত্যিই অবাক করেছে আমাকে। তবে আমি খুব অবাক হয়েছি একটি ভাবনা দেখে এবং ভাবছি এ চিন্তা কী করে সম্ভব! এটিকে এক বিস্ময়কর চিন্তা বলেই আমি মনে করি। একটি কিশোরের কল্পনা এতটা জাদুময় হবে আমি ভাবতেই পারছি না। কে এই কিশোর?
গোটা হল নীরব। স্তব্ধ। সবার দুটি চোখ বিজ্ঞান স্যারের মুখের ওপর। নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। স্যার বললেন— সম্ভবত এই কিশোরকে তোমরা সকলেই জানো। ইতোমধ্যে স্কুলে নানারকম সুনাম কুড়িয়েছে ছেলেটি। লেখাপড়ায় সেরা। গান আবৃত্তিতেও শীর্ষে। তার বক্তৃতায়ও আছে জাদু এবং কী যে ভদ্র নম্র ছেলেটি! আমরা তাকে নিয়ে গৌরববোধ করতে পারি। আমি ঘোষণা করছি তার নাম। দম নিলেন স্যার। বললেন— সে আমাদের ইশতিয়াক।
সাথে সাথে তুমুল করতালি। তালি দিতে দিতে দাঁড়িয়ে গেল সকলেই। মঞ্চে শিক্ষকেরাও দাঁড়ালেন। তুমুল করতালির মধ্যে ঘোষণা দিলেন বিজ্ঞান স্যার— আমি ইশতিয়াককে মঞ্চে আসার আমন্ত্রণ জানাই।
ধীরে পা ফেলে মঞ্চে উঠে এলো ইশতিয়াক। আবার করতালিতে মুখর হলরুম।
বললেন বিজ্ঞান স্যার— ইশতিয়াক তার চিন্তার বিষয়টি বলবে এখন।
আত্মবিশ্বাসী ইশতিয়াক। দৃঢ়তার সাথে দাঁড়াল ডায়াসে।
শুরু করল কথা। স্বচ্ছ উচ্চারণ। শ্রুতিমধুর কণ্ঠ। প্রাণবন্ত উপস্থাপনা। এবং জড়তামুক্ত শব্দ। ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষক সকলেই জাদু দেখার মতো চেয়ে আছে। আর জাদুর কথাই যেন বলছে ইশতিয়াক। বলছে ওর স্বপ্নে দেখা আয়নাঘর। এটিই ছিল ওর প্রস্তাবিত চিন্তা।
নীরব সময়ের ভেতর বক্তব্য শেষ করল ইশতিয়াক। বক্তব্য শেষ হলেও কোনো শব্দ নেই কিছুক্ষণ। হলভর্তি সবাই যেন আয়নাঘরের যাদুতে বুঁদ হয়ে আছে। আয়নাঘরের ভেতরেই যেন বসে আছে সবাই।
প্রধান শিক্ষক উঠে এলেন ডায়াসে। বললেন— একধরনের জাদুময় চিন্তার কথা যাদুময় ভাষাতেই বলল আমাদের ইশতিয়াক। আমরা ওকে শুধু শুভেচ্ছা নয় সম্মান জানাই। স্যারের কথায় দাঁড়িয়ে গেল সবাই। হলো তুমুল করতালি। আনন্দ আর লজ্জায় লাল হয়ে উঠল ইশতিয়াক।

প্রধান শিক্ষক এবং বিজ্ঞান স্যার দুজন একসাথে পুরস্কার তুলে দিলেন ইশতিয়াকের হাতে।
অনুষ্ঠান শেষে ঘোষণা করতেই মঞ্চে উঠে এলো ইমন। ইশতিয়াককে জড়িয়ে ধরে বলল— বন্ধু তোর এ সাফল্যের সময়ে আমার একটি ছবি থাক তোর সাথে। বলেই তুলল সেলফি। বাস যায় কোথায়। পিঁপড়ার মতো সারিবদ্ধ হয়ে ছেলে মেয়েরা ছুটল মঞ্চের দিকে। শুরু হলো সেলফির জোয়ার। কয়েক শ’ ছাত্রছাত্রী। প্রায় সকলেই চায় ইশতিয়াকের সাথে ছবি।
বিজ্ঞান স্যার ঘোষণা দিলেন গ্রুপ করে ছবি হবে। এক গ্রুপে বিশজন করে। ইশতিয়াকের ডানে দশ। বাঁয়ে দশ। এভাবে সবার সাথে হয়ে গেল ইশতিয়াকের ছবি। শেষে শিক্ষকেরা। মাঝখানে ইশতিয়াক। ডানে প্রধান শিক্ষক বাঁয়ে বিজ্ঞান স্যার। তার দু’পাশে বাকি শিক্ষকবৃন্দ। এ সময়টায় আবার শুরু হলো করতালি। তালিতে মুখর সময়টি ক্যামেরাবন্দী হলো।
হঠাৎ একটি শব্দে থেমে গেল সমস্ত শব্দ— হো হো হো পৃথিবী রহস্যে ভরা, ভাবে না মানুষ। এক অদ্ভুত ধরনের শব্দ। দূরে সমুদ্র গর্জনের মতো শব্দটি ছড়িয়ে পড়ল গোটা হল কক্ষে। সবার চোখ দরজার দিকে। দেখল আউলা চুলের উদ্ভ্রান্ত এক লোক ছুটে আসছে সোজা মঞ্চের দিকে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো পথ ছেড়ে দিচ্ছে সবাই। দরজার দুজন পাহারাদার ছুটছে লোকটির পিছুপিছু। তাকে বাধা দেয়ার সাহস করছে না কেউ। মঞ্চে শিক্ষকেরা যে যেখানে ঠিক সেখানেই দাঁড়িয়ে। সবাই আতঙ্কিত। শুধু ইশতিয়াক স্বাভাবিক। মুখে এক ধরনের খুশির ঝিলিকই দেখা যাচ্ছে ওর।
লোকটি দ্রুত উঠে এলো মঞ্চে। শিক্ষকদের সারি থেকে সামনে টেনে আনল ইশতিয়াককে। বাম হাতে ধরল ইশতিয়াকের বাম হাত। ওপরে তুলল দ্রুত। বলল— হো হো হো পৃথিবী রহস্যময়, ভাবে না মানুষ। বলেই ছেড়ে দিলো হাত। এবার টেনে নিলো বুকে। বুকের সাথে চেপে রেখে বলল— পৃথিবী রহস্যময়
ভাবে না মানুষ।

জাদুর মতো করে সবাই কেবল দৃশ্যটি দেখছে। স্থির হয়ে আছে যে যার জায়গায়। সবার চোখ বিঁধে আছে লোকটির ওপর। ইশতিয়াককে ছেড়ে দিলো লোকটি। দ্রুত নেমে পড়ছে মঞ্চ থেকে। যে পথে এলো সে পথেই বেরিয়ে গেল সে। গোটা হলরুমে বিস্ময় জেগে আছে তখনো। ভোজবাজির মতো কী কাণ্ড ঘটিয়ে গেল লোকটি। মুহূর্তে ওলটপালট করে দিলো সবার জগৎ।
দুষ্টু ক’টি ছেলে-মেয়ে যৌথ কণ্ঠে বলে উঠল— পৃথিবীটা রহস্যময়, ভাবে না মানুষ। ওদের দেখাদেখি সব ছাত্রছাত্রী এক সাথে বলে উঠল— পৃথিবী রহস্যময়, ভাবে না মানুষ। কেউ আনন্দে। কেউ বুঝে শুনে কেউবা উপহাস করে বলছে একই কথা— পৃথিবীটা রহস্যময়, ভাবে না মানুষ।
ধীরে ধীরে আবার ডায়াসে দাঁড়ালেন বিজ্ঞান স্যার, আহমদ আজম। বললেন— সত্যিই পৃথিবী রহস্যময়। এ নিয়ে ভাবতে হবে আমাদের। আমাদের ভাবতে হবে— সত্য-মিথ্যা নিয়ে। ভাবতে হবে সাদা-কালো নিয়ে এবং ভাবতে হবে ন্যায়-অন্যায় নিয়ে। কিভাবে কী ঘটনা ঘটে গেল এর কিছুই আমি জানি না। শুধু জানি এইযে লোকটি এটিও একটি রহস্য। এসব রহস্য আবিষ্কার করতে হলে কাজ করতে হবে সততার সাথে। করতে হবে অনেক অনেক লেখাপড়া।
উদ্ভ্রান্ত লোকটির কথা আমার খুব ভালো লেগেছে। এসো সবাই একসাথেই বলি কথাটি— পৃথিবীটা রহস্যময়, ভাবে না মানুষ। এক কথা। কয়েক শ’ কণ্ঠে এক সাথে বেজে উঠল।
আবার বললেন স্যার— সত্যিই পৃথিবীটা রহস্যময় এবং আজ থেকে ইশতিয়াকও রহস্যময় আমাদের কাছে।
মুষ্টিবদ্ধ হাত একসাথে উঁচু করে সবাই বলল— ঠিক…।

প্রকাশকাল: জুন ২০১৭