হাতের মুঠোয় বিশ্ব

আবরার হক

0
4

থাকবো না কো বদ্ধ ঘরে
দেখবো এবার জগৎটাকে,
…………………
বিশ্ব-জগৎ দেখবো আমি
আপন হাতের মুঠোয় পুরে।

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটা বিখ্যাত সংকল্প কবিতার প্রথম আর শেষ ২ লাইন এইমাত্র তুমি পড়লে। এই কবিতা কত আগে লেখা! প্রায় শতবছর আগে লেখা এ লাইনগুলো কবির প্রবল ইচ্ছাশক্তিরই প্রকাশ ছিল কেবল। তখন পর্যন্ত হাতের মুঠোয় বিশ্ব দেখতে পারাটা একেবারে হাতেগোণা কিছু মানুষের কল্পনা বা স্বপ্নে ছিল শুধু, বাকি সবার জন্য তো এমন কল্পনাও অবিশ্বাস্য ছিল। অথচ আজকের দিনে এই কবিতা বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। মুঠোয় পুরে পৃথিবী দেখার স্বপ্ন কবির প‚র্ণ না হলেও আমরা তো দেখছি! এই হাতের মুঠোয় বিশ্ব দেখার স্বপ্ন সত্যি হচ্ছে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে। এই মোবাইলে আমরা অনেকসময় গেম ছাড়া ইন্টারেস্টিং কিছু খুঁজে পাই না। কিন্তু আজ আমরা এমন কিছু জানবো, যার তুলনায় তোমার কাছে গেমকে একেবারে তুচ্ছ মনে হবে।

আমরা আকাশে তো অনেক প্লেন দেখি। মাঝে মাঝে মনে প্রশ্ন জাগে, আচ্ছা এই প্লেনটা কোথায় যাচ্ছে? কিন্তু এভাবে তো আর জানার সুযোগ নেই। তাহলে? পাইলট আঙ্কেলকে জিজ্ঞেস করবে? সেই সুযোগ তো আর নেই। এরজন্য কিছু বেশ সুন্দর এপ আছে, যেগুলো দিয়ে অনেক কিছুই জানা যাবে। ঋষরমযঃৎধফধৎ২৪ এমনই একটি এপ, এখানে তুমি আকাশে চলমান সকল প্লেনকেই চোখের সামনে দেখতে পাবে। অবাক হয়ে দেখবে, কিছু এলাকার আকাশে প্লেন যেন গিজগিজ করছে, আবার অনেক এলাকা শ‚ণ্য। ভাবছ এতেই শেষ? নাহ, অনেক কিছু আরো। এখানে তুমি যে কোনো প্লেনের উপর ক্লিক করে সে প্লেন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবে। যেমন প্লেনটির নাম কি, কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছে, কখন টেক অফ করার কথা (প্লেন আকাশে উড়ে যাওয়ার মুহুর্তটাকে টেক অফ বলে), কখন টেক অফ হয়েছে, পৌঁছানোর কথা, কত উচ্চতায় যাচ্ছে, কত গতিতে যাচ্ছে, কতটুকু দ‚রত্ব অতিক্রম করেছে, কতটুকু পথ বাকি আছে, কতজন যাত্রী নিয়ে যাচ্ছে ইত্যাদি আরো অনেক কিছু। মজার না? মনে করো তোমার পরিচিত কেউ কোনো জায়গা থেকে বিমানে কোথাও যাচ্ছে, তুমি কিন্তু চাইলে সেই প্লেনের নাম্বার জেনেই দেখে নিতে পারো সেই প্লেনের সব তথ্য।

এরপর চলো আরেক জগত থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসি তোমায়। বিভিন্ন ফুলের বাগানের কথা জানো, কিন্তু আমরা এখন বলবো রেডিওর বাগানের কথা। বিশ্বাস হচ্ছে না? সত্যি সত্যি এই এপের নাম জধফরড় এধৎফবহ। এই এটি আরেক অসাধারণ ও মজার এপ। এটি ওপেন করলেই তোমার সামনে অনেকগুলো সবুজ বিন্দু নিয়ে বিশ্ব মানচিত্র হাজির হবে। আর এই সবগুলো বিন্দুই কিন্তু একেকটি শহরকে বোঝায়, যেখানে রেডিও স্টেশন আছে এবং সেখানে ক্লিক করলেই পেয়ে যাবা ঐ শহরের সব রেডিও স্টেশনের নাম। ভাবছ নিশ্চয়ই, ওমা! নাম দিয়ে কী করবো আমি! উহু, এত সিম্পল হলে তো তোমাকে এভাবে জানাতেই আসতাম না। যেকোনো রেডিও স্টেশনের নামে ক্লিক করলেই বেজে উঠবে ঐ স্টেশনের স¤প্রচার! এবং অবশ্যই এন্টেনার ঝামেলামুক্ত একদম পরিষ্কার। চেষ্টা করেই দেখতে পারো কিন্তু!

হাতের মুঠোয় বিশ্ব দেখার এ সময়ে সত্যি সত্যিই বিশ্বটাকে হাতের মুঠো দেখার সবচেয়ে বড় সুযোগ দিয়েছে গুগল আর্থ। মোবাইলে গুগলের এই সেবাটি তোমাকে এমন অভিজ্ঞতা দিবে, মনে হবে, সত্যি সত্যি তুমি তোমার আঙ্গুল দিয়ে পৃথিবী নাড়াচ্ছো, ঘুরাচ্ছ, মুহুর্তে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছ। গুগল আর্থের অনেক ফিচারের একটা হলো “ও’স ভববষরহম ষঁপশু” বাটন। কিছুটা ছক্কার ডাইসের মত এই বাটনটি টাচ করলেই সে তোমাকে প্রতিবার নিয়ে যাবে একেবারে নতুন নতুন কোনো জায়গায়। কোথায় নিয়ে যাবে এটি একেবারে র‌্যান্ডমলি বা দৈবচয়নে ঠিক হয়। যাদের অনেক কিছু জানার, অনেক জায়গা দেখার ইচ্ছা আছে, তাদের জন্যে এটা অনেক সুন্দর একটা সুযোগ। একেক ক্লিকে পৃথিবীর একেক প্রান্তে নিয়ে যাবে তোমাকে। সারা পৃথিবীর সকল সুন্দর সুন্দর জায়গা এভাবে ফ্রিতে দেখতে পারার সুযোগ দেখে মার্কিন ধনকুবের এন্ড্রæ কার্নেগীর কথা মনে পড়ে যায়। উনি ছোটবেলায় অনেক দরিদ্র ছিলেন। তার পোশাক অনেক মলিন ও পুরনো থাকায় একটি পার্কে ঢুকতে গিয়ে দারোয়ানের বাঁধায় ঢুকতে পারেন নি। পরবর্তীতে উনি বিত্তবান হয়ে উনি সেই পার্কটিই কিনে নিয়ে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেন। গুগলের প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেইজ ও সার্গেই ব্রেইনের জীবনে এমন কোনো ঘটনা আছে কিনা তা অবশ্য জানা নেই। যাই হোক, এছাড়াও গুগল আর্থের আরেকটি বেশ মজার ও তথ্যবহুল ফিচার হচ্ছে একটু ভয়েজার। এটিও তোমরা ব্যবহার করে বেশ মজা পাবে।

গুগল আর্থের কাছাকাছি আরেকটা গুগলের জনপ্রিয় সেবা হলো গুগল ম্যাপ। এই গুগল ম্যাপ আমাদের শহরের পথচলাকে অনেক সহজ করে দেয়। বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে, যেখানে ট্রাফিক জ্যাম নিত্যদিনের এবং সবসময় মাথাব্যথার কারণ, সেই ব্যাপারটাকে অনেকটা সহজ করে দেয় গুগল ম্যাপ। কোন রাস্তায় কেমন জ্যাম আছে, তা এর থেকে সহজেই দেখা যায়। এছাড়া কোনো জায়গায় যেতে হলে কেমন সময় লাগবে, দ‚রত্ব কতো, কতভাবে যাওয়া যেতে পারে, তার ব্যাপারেও অনেক তথ্য এই ম্যাপ থেকে আমরা সবসময় জানতে পারি। এছাড়া কেউ ফোনে যদি লোকেশন অন করা থাকে এবং সবসময় ফোন সাথে রেখে চলাফেরা করে, তাহলে তার প‚র্বের পুরো ট্রাভেল হিস্ট্রি মানে কতক্ষণ থেকে কতক্ষণ সময় নিয়ে কোথায় গেছে, কোনো জায়গায় কতক্ষণ ছিল, এমনকি কীভাবে গিয়েছিল্ তাও সে দেখতে পারবে।

শীতের সকালে কাঁপতে কাঁপতে তোমার যদি ইচ্ছে করে, এই সময়ে ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপের মানুষেরা কেমন আছে, কিংবা কেমন আছে হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থান করা মানুষরা, অথবা পৃথিবীর যে কোনো জায়গার অধিবাসীরা, তোমার জন্য সহজ সমাধান নিয়ে আসবে ডবধঃযবৎ জধফধৎ এর মতো এপগুলো। যেকোনো জায়গার বায়ু, তাপমাত্রা, আবহাওয়ার প‚র্বাভাস প্রভৃতি তোমার ইচ্ছামতোই দেখতে পাবে এই এপগুলোতে।
কিন্তু এত এপের সন্ধান পাবে কোথায়? এই উত্তর লেখার একদম শেষে দিচ্ছি। তার আগে চলো ফিরে যাই অনেক আগের দিনে। যখন ইন্টারনেট ছিল না, মোবাইল ছিল না, টেলিফোন বা আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির কিছুই ছিল না। এখন তো আমরা মোবাইলে কল করাটাকে মোবাইলের সবচেয়ে কম পাওয়ারফুল ব্যবহার মনে করি। কারণ উপরে বলা শক্তিশালী এপগুলোর মত আরো লাখো এপ আছে এই মোবাইলে। কিন্তু যখন এর কিছুই ছিল না, তখন মানুষ কিভাবে যোগাযোগ করতো একজন আরেকজনের সাথে? দ‚রে কাউকে খবর পাঠাতে হলে কী করতো তখন?
এর সবচেয়ে পুরনো পদ্ধতি পায়রার পেয়ে বেঁধে চিঠি পাঠানোর কথা তোমরা শুনে
থাকবে। আচ্ছা, তখন কি পায়রাকে কানে কানে কথা আর ঠিকানা বলে দেয়া হতো? সেই ঠিকানা মনে রেখে পায়রা জায়গামতো পৌঁছে যেতো! ব্যাপারটা আসলে একেবারেই সেরকম না। এ পদ্ধতি চালু হয়েছিল এখন থেকে প্রায় দুইহাজার বছর আগে। এখন আমরা এই বিষয়টি আসলে কিভাবে কাজ করতো, তা বুঝার চেষ্টা করবো। মনে করো তুমি আর সিফাত খুব ভালো বন্ধু। তোমরা গ্রামে থাকো। ক্লাস এইটের পর সিফাতের আব্বু আম্মু ওকে শহরের স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলো। ছুটিতে বা মাঝে মাঝে সে বাসায় আসলেও তোমাদের ইচ্ছে অন্যান্য সময়ও একজন অন্যকে চিঠি পাঠাবে। এখন কিভাবে কী হবে? মজার বিষয় হলো তুমি পায়রা পোষ মানিয়ে লালনপালন করো। পায়রাগুলো দ‚রে যেখানেই যাক, যেই আটকে রাখুক, ছাড়া পেলেই উড়ে তার বাসায় চলে আসে। অতএব তোমরা বুদ্ধি করে একটা কাজ করলে। সিফাত তোমার পায়রা থেকে দুটো পায়রা সাথে নিয়ে গেলো। সপ্তাহখানেক পর সে একটা চিঠি লিখে তোমার পায়রাগুলোর একটি শরীরে বেঁধে সেটা উড়িয়ে দিলো। আগেই বলেছি, পায়রা যেখানেই থাকুক, ছাড়া পেলেই বাসায় চলে আসে। এখন পায়রা শহর থেকে গ্রামে তো এলোই, সাথে চলে আসলো তোমার জন্য সিফাতের চিঠি। এভাবেই ম‚লত পায়রা দিয়ে চিঠি পাঠানো হতো। পোষ মানানো পায়রা সাথে নিয়ে যাওয়া হতো সাথে। পরে সেই পায়রার গায়ে চিঠি পাঠিয়ে বেঁধে তাকে উড়িয়ে দিলে সেটি উড়ে চলে আসতো নিজের বাসায়, সাথে চলে আসতো সেই চিঠি। এটা দেখে সিফাতও শহরের বাসায় পায়রা পোষ মানানো শুরু করলো। সে গ্রামে আসলে তোমার জন্য ১/২টি নিয়ে আসে আর তুমি সেগুলোর মাধ্যমে তার কাছে চিঠি পাঠাতে লাগলে।

এই ‘পায়রা পোস্ট’ বিশ্বের অনেক জায়গাতে সরকারীভাবেই প্রচলিত ছিল বেশ কিছুদিন আগ পর্যন্ত। বিশেষ করে ভিনদেশে গুপ্তচরবৃত্তি করতে গেলে তারা এ পদ্ধতিতে নিজের দেশে তথ্য পাঠাতো। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের উড়িষ্যার সাবেক রাজধানী কটকের ‘পায়রা পোস্ট’ বিশ্বের সর্বশেষ এ ধরণের সার্ভিস হিসেবে ২০০৮ সালে বন্ধ হয়ে যায়।

বলছিলাম বিভিন্ন মজার এপগুলো কোথায় পাবে তা জানাবো। কয়েকবছর আগের কথা। আমরা একবার কয়েকজন বসে আলাপ করছিলাম আমাদের মানে ফুলকুঁড়ি আসরের ক্যাম্পে পারস্পরিক যোগাযোগের জন্য ওয়াকিটকি বা ওয়ারল্যাসের ব্যবস্থা করা দরকার। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতার কারণে আমরা ঠিকমতো কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারছিলাম না। এর মধ্যে আমাদের মাথায় আসলো, আচ্ছা, অনেক কাজ তো এপ দিয়ে করা যায়। ওয়াকিটকি টাইপের কোনো এপ দিয়ে কাজ করলেই তো ঝামেলা থাকে না! মোবাইল দিয়েই কাজ শেষ হয়ে যাবে তাহলে। যেই ভাবা সেই কাজ। প্লে স্টোরে খোঁজাখুঁজি করতে করতে আমরা পেয়েও গেলাম পছন্দসই বেশকিছু এপ, যা আমাদের কাজকে অনেক সহজ করে দিলো। তো তোমরাও কিন্তু বিভিন্ন কিছু জানার জন্য, করার জন্যে মোবাইলের সহযোগিতা নিতে পারো। তাতে তোমাদের জ্ঞান সমৃদ্ধ হবে, একইসাথে মজাও হবে। মোবাইলে ব্যবহারে কিন্তু সাবধানেও থাকতে হবে বেশ। এটা অনেকটা ঢাকার ফুটপাথে হেটে চলার মতো। খুব সাবধানে না থাকলে যেকোনো সময় ম্যানহোলে পড়ে গিয়ে অবস্থা বেগতিক হয়ে যেতে পারে। কিছুদিন আগে তো চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার সময় ম্যানহোলের ভেতরে পড়ে হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তাই সাবধানে থাকতে হবে, মানুষের ক্ষতি হয়, নিজের ক্ষতি হয়, এমন অনেক কিছুতে যেন তুমি জড়িয়ে না যাও। আজ তাহলে এ পর্যন্তই। আল্লাহ হাফেজ!