ব্যাঙ রাজপুত্র

আহমেদ কিবরিয়া

0
216

অনেক দিন আগে জঙ্গলে একটা জলাধার ছিল। ওই জলাধারে প্রচুর জলজ উদ্ভিদ, শাপলাফুল ফুঁটে থাকত। আর জঙ্গলের যত ব্যাঙ আছে সবাই ওই জলধারে বাস করত। একটা না, দুটো না প্রচুর ব্যাঙ। ছোট খাটো একটা ব্যাঙ রাজ্য। ব্যাঙের রাজ্যে রাজা আছেন একজন। রাজা মানে হইচই ব্যাপার। রাজা ব্যাঙ্গু আর তার সাত রাণী। রাজা ব্যাঙ্গু সারাদিন রাজকাজে ব্যস্ত থাকতেন। রাণীমারা আর কী বলব। কাজ নেই কাম নেই কারণ প্রাসাদে প্রচুর দাসীবাদী। তাই তো পানের খিলি মুখে পড়ে ঠোঁট লাল করে বাগানে বসে বসে গল্প করতেন আর অকারণেই খিলখিলিয়ে হাঁসতেন। যাক বাবা সে কথা, সাত রাণী একে একে ব্যর্থ হলেন। রাজার একটি ছেলে সন্তান চাই। সে হবে ব্যাঙ রাজ্যের ভবিষ্যৎ রাজা। ব্যাঙ রাজপুত্রের স্বপ্ন দেখতে দেখতে একে একে রাজা সাত রাণী ঘরে আনলেন। কারও সন্তান হল না। রাজা ব্যাঙ্গু সবসময় মন খারাপ করে বসে থাকতেন। কী করবেন। অনেক বদ্দি-কবিরাজ আসলো অন্যান্য ব্যাঙ রাজ্য থেকে। সবাই ব্যর্থ হয়ে ফিরে যেতে লাগল। অবশেষে প্রতিক্ষার অবসান ঘটল। আটতম রাণী কলাবতী সন্তান জন্ম দিলেন। এদিকে সাত রাণী হিংসায় জ্বলে-পুরে ছাঁই। ব্যাঙ রাজপুত্র হাসি আনন্দে বড় হতে লাগল।

দুই
ব্যাঙ রাজপুত্র বলে কথা। ব্যাঙ মন্ত্রী, ব্যাঙ সেনাপতি সবাই রাজপুত্রকে ভয় করেন। তার মন যুগিয়ে চলেন। অবশ্য ব্যাঙ রাজপুত্র সেটা বুঝতে পেরে মুচকি হাসে। একদিনের কথা, সাত রাণী মিলে ষড়যন্ত্র করল, যে করেই হোক মা ও ছেলেকে তারা এরাজ্য থেকে বিতারিত করবে। সাত রাণী তাই সারাদিন রাজা ব্যাঙ্গুর কানে এটা সেটা শুনিয়ে বেড়ান। অবশ্য রাজা ব্যাঙ্গু তাতে বিরক্ত হন না বরং আগ্রহ বাড়তেই থাকে তার। কী জানি হতে পারে। এরা এক একটা ডাইনী কি না। যাক সে কথা। রাণী মা কলাবতী ঘরে বসে আছেন। বসে বসে ছেলের জন্য উল দিয়ে লাল একটা কোট তৈরি করছেন। রাজপুত্র মাকে দেখে ম্লান হাসি দিয়ে বলে, “মা তুমি কি একটু বিশ্রামও করবে না? সারাক্ষণ খালি কাজ আর কাজ”। রাণী ব্যাঙ্গি অর্থ্যাৎ কলাবতী হেসে ফেললেন। বললেন, “না রে খোকা। আমি তোর সাত রাণী মার মতো পান খেয়ে বেহায়ার মতো খালি দাঁত বের করে হেসে বেড়াই না। ওদের কোনো কাজ নেই। তুই বলত খোকা, কাজ না থাকলে কেউ কী তার যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারে?” ব্যাঙ রাজপুত্র মন খরাপ করে বলে, “তাই যদি হয় তাহলে বাবা সাত মায়েদের আজেবাজে কথায় কেন কান দেয়?” রাণী কলাবতী সব বুঝিয়ে বললেন ছেলেকে। ব্যাঙ রাজ্য আজ সাত রানীর ষঢ়যন্ত্রের শিকার। মন্ত্রী মশাই, সেনাপতী সবাই ওদের কথায় উঠে বসে। রাণী কলাবতী ছেলেকে বললেন, “শোন বাবা, তোর বয়স অনেক কম। আর সাত রাণী চায় না আমরা এ রাজ্যে থাকি। তাছাড়া তুই ভবিষ্যতে সিংহাসনে বসবি এটা ওরা চায় না। থাক সে কথা। বলত কোটটা কেমন হয়েছে? আগামী জন্মদিনে তোর বয়স ১৫ তে পূর্ণ হবে আর আমি এটা তোকে সেদিন উপহার দিব। খুব মজা হবে তাই না?” ব্যাঙ রাজপুত্র মৃত্যুঞ্জয় খুশি হয়ে বলে, “হ্যাঁ মা তাই”।
তিন
সকাল থেকেই ব্যাঙ রাজ্য উৎসবের আনন্দে মুখরীত। কারণ আজ ব্যাঙ রাজপুত্র মৃত্যুঞ্জয়ের ১৫তম জন্মবার্ষিকী। রাজ প্রাসাদ, বাগানবাড়ী, পুকুর পাড় সব আলোতে ঝলমল করছে। প্রাসাদ নতুন করে রঙ করা হয়েছে। শহর থেকে আনা হয়েছে জন্মদিনের বিশাল কেক। আট রাণীরা নতুন জামদানী শাড়ি, গহনা পড়ে পান খেয়ে ঠোঁট লাল করে বেড়াচ্ছেন। যদিও সাত রাণী মনে মনে হিংসায় জ্বলে যাচ্ছেন। মন্ত্রী, সেনাপতি ও অন্যান্য রাজ কর্মচারীরা তাদের বাচ্চা ও স্ত্রীদের সাথে নিয়ে এসেছেন। মৃত্যুঞ্জয়ের ঘরটা বিভিন্ন লতাপাতা ফুল ও বেলুন দিয়ে সাজানো হয়েছে। বিভিন্ন রঙের মোমবাতি জ্বলছে। বিভিন্ন ব্যাঙ্গরাজ্য থেকে রাজা ও রাণীমারাও এসেছেন। সবাই ব্যাঙ রাজপুত্রের জন্য বিভিন্ন দামীদামী উপঢৌকন নিয়ে এসেছেন। শহর থেকে বিভিন্ন ব্যাঙ কণ্ঠশিল্পীরা এসেছেন গান গাওয়ার জন্য। গোটা ব্যাঙ্গ রাজ্যে উৎসব চলবে সাত দিন ধরে। ব্যাঙ্গ শিশুরা ঘ্যাঙর ঘ্যাং শব্দে জন্মদিনের গান গাইতে লাগল। অবশেষে মৃত্যুঞ্জয় কেক কাটল। প্রথম সে তার বাবা রাজা ব্যাঙ্গু ও তার আট রাণীমাকে কেক খাওয়ালো। তারাও রাজপুত্রকে কেক খাইয়ে দিলেন। কেক কাটা পর্ব শেষ। এবার অভর্থনা ব্যাঙ উপস্থাপক ঘ্যাঙর বলে উঠলেন, “প্রিয় ব্যাঙ রাজ্যবাসী আমাদের প্রিয় রাজপুত্র মৃত্যঞ্জয়ের আজ জন্মদিন। আর কেক কাটা পর্ব শেষ। এবার উপস্থিত মেহমানদের উদ্দেশ্যে গান গাইবেন ঘ্যাচাং শহরের বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী ঘ্যাঙ্গী ও তার দল।” সবাই আনন্দে করতালী দিতে লাগল। কণ্ঠশিল্পী ঘ্যাঙ্গী গান শুরু করলেন,
ঘ্যাং…ঘ্যাং…ঘ্যাং,
রাজপুত্র ব্যাঙ,
সাত রাণী ব্যর্থ হলো,
কলাবতীর ছেলে হলো,
ব্যাঙ রাজা চমকে গেল।
ঘ্যাং…ঘ্যাং…ঘ্যাং…
রাজপুত্র ব্যাঙ্গ।
সাতজনের চক্রান্ত
রাজপুত্র ও আক্রান্ত
দেশ ছেড়ে পালিয়ে
কোথায় যাবে ব্যাঙ
ঘ্যাং…ঘ্যাং…ঘ্যাং….।
গান শেষ হলো। রাজা ব্যাঙ্গু সাত রাণীর দিকে তাকালেন। সাত রাণী রাজাকে দেখে ঢোক গিলল। ভয়ে সাত রাণী মুরমুরি অবস্থা। অভর্থনা পর্বে উপস্থিত সকলের উদ্দ্যেশে রাজা ব্যাঙ্গু ভাষণ দিলেন।
চার
দেখতে দেখতে ১০টা বছর কেটে গেল। ব্যাঙ রাজপুত্র মৃত্যুঞ্জয় ২৫ বছরে পা দিলো। এখন সে তাগড়া জোয়ান। রাজা ব্যাঙ্গুর সময় হয়েছে অবসর নেয়ার। আর ব্যাঙ রাজপুত্রকে সবকিছু বুঝিয়ে দেয়ার। এদিকে এর মধ্যেই ব্যাঙরাজপুত্র প্রজাদের প্রিয়মুখ হয়ে উঠেছে। শুধু কী ব্যাঙ? না কাঁকড়া ও জলজ পোকারাও মৃত্যুঞ্জয়ের সততা, সরলতা আর সাহসের নজির দেখে মুগ্ধ। এদিকে সাত রাণী চুপি চুপি পার্শ্ববর্তী শত্রুরাজ্যের সাথে হাত মিলিয়েছে। যার পরিণতি যুদ্ধ। ভয়ানক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। ব্যাঙ সেনাবাহিনী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। কাঁকড়া আর জলজ পোকারাও দলবেঁধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। তিন দিনের মধ্যেই রাজা শংখরাজ ও তার বাহিনী নিয়ে ব্যাঙ রাজ্যে আক্রমন শুরু করল। তারা গোটা রাজ্যে হত্যা, অগ্নিকা- শুরু করে দিলো। রাজা সেনাপতির দায়িত্ব দিলেন ব্যাঙ রাজপুত্রকে। যুদ্ধে রাণীমা কলাবতীও যোগ দিলেন। ব্যাঙ রাজপুত্র মৃত্যুঞ্জয়ের হাতে মৃত্যুবরণ করলো রাজা শংখরাজ। শত্রুপক্ষ ব্যাঙ, কাঁকড়া ও পোকাদের সাথে পেরে উঠল না । সবাই জান নিয়ে পালিয়ে গেল। অবশেষে রাজা ব্যাঙ্গুর কাছে সাত রাণীর চক্রান্ত ফাঁস হয়ে গেল। রাজা সাত রাণীর জন্য শাস্তির ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু ব্যাঙ রাজপুত্র তা মানলো না। সে তার সাত মায়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করল ব্যাঙ আদালতে। অবশেষে সাত রাণীমা ত দের ভুল বুঝতে পেরে শর্ত দিলো,তারা আর কখনো এমনটা করবে না। ব্যাঙ আদালত তাদের আবেদন মঞ্জুর করল। সাত রাণী নির্দোষ সাবস্ত হলো। এবার রাজার পালা। তিনি সাত রাণীকে শর্ত দিলেন, যদি তারা পুনরায় এ রকম করে কিংবা করার চেষ্টা করে তাহলে তিনি তাদের মৃত্যুদ- কার্যকর করবেন।
পাঁচ
মহাধুমধামে ব্যাঙ্গ রাজপুত্রের সিংহাসনে অভিশেখ ঘটল। সিংহাসনের আহরণ করার পূর্বে রাজপুত্র তার বাবা ও আট মাতার পা ছুঁয়ে আর্শিবাদ নিলো। রাজা ব্যাঙ্গু নতুন রাজাকে সব দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে আট রাণীমাসহ তীর্থভ্রমণে বের হলেন। এভাবে কেটে যাচ্ছিল বছরগুলো। নতুন রাজা ব্যাঙ রাজ্যের উন্নয়নে সব ধরনের ব্যবস্থা নিলেন। শিশুদের জন্য বিদ্যালয়, খেলার মাঠ, ব্যাঙ হাসপাতাল নির্মাণ, রাস্তাঘাট মেরামত করলেন। ব্যাঙ সেনাবাহিনীকে অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত করলেন। বেকার ও গরিব ব্যাঙদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলেন। রাজ্য এতটাই উন্নত আর সমৃদ্ধশালী হলো যে, আশেপাশের ব্যাঙরাজ্যগুলো এই রাজ্যকে সমীহ করে চলতে লাগল। দু’বছর পর রাজা ও রাণীমারা রাজ্যে ফিরলেন। অনেকদিন পিতা মাতাদের না দেখে রাজা রাজপুত্র সবসময় মন খারাপ করে থাকতেন। কিন্তু তারা ফিরে আসতে রাজা যেন প্রাণ ফিরে পেলেন। মহাধুমধুামে রাজ্যবাসী রাজা ও রাণীমাদের বরণ করে নিলো।
ছয়
রাজা ব্যাঙ্গু, রাণী কলাবতী ও সাত রাণীর সাথে বৈঠকখানায় বসেছেন। উদ্দেশ্য একটাই। নতুন রাজা মৃত্যুঞ্চয়কে ভালো দেখে বিয়ে দেয়া। কারণ তাদের বয়স হয়েছে। তাড়াতাড়ি নাতী-নাতনীর মুখ দেখতে চান তিনি। কিন্তু‘ কী মুসকিল। যোগ্য রাজকন্যা পাবেন কই? পাশের সব রাজ্যে ঢোল পিটিয়ে দেয়া হলো। নতুন রাজা মৃত্যুঞ্জয়ের জন্য সুন্দরী গুণবতী কন্যা চাই। যে কি না হবে ব্যাঙ রাজ্যের ভবিষ্যৎ রাজমাতা। বিভিন্ন ব্যাঙ রাজ্যে লোক পাঠানো হয়েছে মেয়ে দেখার জন্য। কিন্তু রাজা ব্যাঙ্গুর পছন্দ হচ্ছে না। রাজপুত্র মাদের সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছে তারা যেটা সিদ্ধান্ত নিবেন সেটাই তিনি মেনে নেবেন। অবশেষে ঘটক হরিপদ কাঁকড়া জানালেন পাশের রাজ্য ঘ্যাংয়ের রাজকন্যা মনিমালার কথা। ব্যাঙরাজপুত্র মৃত্যুঞ্চয়ের সাথে বেশ মানাবে।

সাত
অবশেষে বিয়ে ঠিক হলো। মহাধুমধামে বিয়ে শুরু হলো। বিভিন্ন রাজ্য থেকে রাজারা নতুন দম্পতির জন্য নানা রকম সোনা গহনা, হিরে জহরত উপঢৌকন পাঠালেন। সাত দিন ধরে দুই রাজ্যে উৎসব চলবে। হাতিশালের হাতি, ঘোড়াশালের ঘোড়া দিয়ে শোভাযাত্রা করে রাজপুত্র হাতির পিঠে চরে কনের বাড়িতে গেলেন। জলজ পোকারা আনন্দে গান গাইতে লাগল। অবশেষে সাতপাকে বাঁধা পড়লেন রাজপুত্র ও রাজকন্যা মনিমালা। বরযাত্রীদের অভ্যর্থনা ও খাওয়া দাওয়াপর্ব শেষ হলে সকাল সকাল তারা কনে নিয়ে ঘ্যাচাং রাজ্যের উদ্দেশ্য রওনা দিলেন। রাজা ধীর্তরাজ ও রাণী মিথিলা কেঁদে একমাত্র মেয়ে মনিমালাকে বিদায় দিলেন। সন্ধ্যার মধ্যে তারা ঘ্যাচাং রাজ্যে পৌঁছলেন। নতুন রাজা ও রাণীকে বরণ করে তাদের কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো।
আট
সুখেই দিন কেটে যাচ্ছিল ব্যাঙরাজ্যের। নতুন রাজার নতুন যুবরাণী মনিমালা। কথায় যেন মুক্ত ঝড়ে। মনিমালা ইতিমধ্যেই আট রাজমাতার ও রাজা ব্যাঙ্গুর মন জয় করে ফেলেছে। রাজ্যবাসীর চোখের তারা যুবরাণী মনিমালা। যুবরাজ মৃত্যুঞ্চয় সারাদিন রাজ কার্য্য সম্পাদন করে বিকেলে বাগানে যুবরাণী মনিমালার সাথে সন্ধ্যা পর্যন্ত গল্প করে কাটান। রাতে সবাই একসাথে রাতের খাবার খায়। মনিমালার নিজ হাতের রান্না। রাজা ব্যাঙ্গু তো আঙুল চাটতে থাকেন। কিছু দিন পর সংবাদ এলো রাজা ধীর্তরাজ ও রাণীমা মিথিলা মেয়েকে দেখতে আসছেন। খবর শুনে মনিমালা তো আনন্দে আতœহারা। কতদিন মা-বাবাকে দেখি না। মা সময়মতো খায় তো? নাকি শুধু বাবার সাথে আমার গল্পই করে, করবেই তো। একমাত্র মেয়ে তাদের। রাজা ধীর্তরাজ ও রাণীমা মিথিলা এলেন। তাদের রাজকীয় সংবর্ধনা দেয়া হলো। তিন দিন তিন রাত থেকে তারা বিদায় নিলেন। আর রাজা ব্যাঙ্গু ও আট রাণীমাকে তাদের রাজ্যে নিমন্ত্রন জানালেন। মা-বাবার বিদায় যুবরাণী মনিমালার মন খারাপ হয়ে গেল। যেন সে কেঁদেই ফেলবে। রাণী মিথিলা মেয়েকে বুঝালেন, বিয়ের পর স্বামীর ঘর হলো মেয়েদের আসল ঠিকানা। তারা বিদায় নিলো। মনিমালা শুধু তাকিয়ে রইল।