বৈশাখী শালিক

মাহমুদুল হক লিয়ন

0
45

বৈশাখ মাস। সূর্যের তাপ দিনদিন বেড়েই চলেছে। ঠিক দুপুরবেলায় রোজ মোহনদের বড় পুকুরটা ভরে যায় এলাকার ছেলেদের দিয়ে। সেখানে গোসলে মেতে ওঠে সবাই।
মোহন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র, বয়স ১২ বছর। মোহনের সমবয়সী প্রায় সকলেই পুকুরে নামে, ছোটরা তো আছেই। কেউ খেলা করে কেউবা সাঁতার শিখে। শুধু একজন পুকুরের ধারে বসে তাদের দেখে নীরবে। বেলা অবেলায় সবসময় তার মুখ আঁধারে ঢাকা। কী যেন কী ভেবে সমসময় দুঃখী হয়ে থাকে। ছেলেটির নাম শুভ্র। মোহনের খুব করে মনে আছে কয়েক বছর আগে যখন শুভ্রর বাবা-মা বেঁচে ছিল ওরা তখন খুব ভালো বন্ধু ছিল। হটাৎ একদিন সড়ক দুর্ঘটনায় শুভ্রর বাবা-মা মারা যায় এবং সেও গুরুতর আহত হয় পা দুটি হারিয়ে ফেলে। সেদিন থেকেই হাসিটা তার ফুরিয়ে গেছে। অথচ আগে কী সুন্দর করে হাসতো। সে হাসলে মনে হতো বিলের জলে ঢেউ খেলে যাচ্ছে। কষ্টে অভিমানে নীরব হয়ে গেছে এখন। বাবা-মাকে হারানোর পর থেকে দাদু-দাদীর সাথে থাকে শুভ্র। তারা শুভ্রকে খুব ভালোবাসে ও আদর যতœ করে। কিন্তু কিশোর বয়সের দুরন্তপনা মন কি আর বদ্ধ ঘরে আবদ্ধ থাকতে চায়? খেলতে ভীষণ ইচ্ছে করে। দূর থেকে দেখে বন্ধুদের খেলা। খেলতে ভীষণ ইচ্ছে করে ওর কিন্তু খেলা হয় না। মোহন প্রায় সবসময় ওর সাথে কথা বলার চেষ্টা করে জবাবে হ্যাঁ, হু ছাড়া আর কিছুই বলে না। ওর দিকে দেখলেই মনটা ভিজে ওঠে মোহনের। অনিক, অন্তু, জসীম, রহিম, মোহন সবাই মিলে বসে আলোচনা করে কিভাবে শুভ্রর মুখে হাসি ফোটানো যায়। জসীম বলে এটা আমাদের দায়িত্ব। তার মুখে হাসি আমাদের ফোটাতেই হবে।
পুকুর থেকে উঠে আসে ওরা। পুকুরের ধারে শুভ্র আর একটা শালিক পাখি, শুভ্র পাখিটার সাথে কথা বলছে, ওরা বুঝি খেলতে গেল? আমায় কেনো নিলো না? আমিও যাবো। একটানা কথাগুলো বলে কেঁদে ওঠে শুভ্র।
কান্নার আওয়াজে শালিকটা উড়ে যায়, ফিরে যায় নীড়ে। শুভ্র কাঁদতেই থাকে। অনিকরা আবার পুকুরে আসছে, তাদের দিকে লক্ষ নেই তার। মোহন এসে গায়ে হাত দিতেই হতচঁকিয়ে যায়, ভেজা চোখ নিয়ে তাকায় মোহনের দিকে চোখগুলো মোহন েেক প্রশ্ন করছিল অসংখ্য। মোহনের চোখ ভরে আসে ও বলতে গিয়ে থেমে যায়। নীরবে শুভ্রের চোখের জল মুছে দেয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুভ্রকে নিয়ে পুকুরে নেমে যায় সবাই তার জন্য বানানো ভেলায় উঠিয়ে দেয়। এই অল্পক্ষণে কলাগাছ দিয়ে ভেলা বানিয়েছে মোহনরা। সূর্যের রক্তিম আভায় শুভ্রের চোখ ঝলমল হয়ে ওঠে, ও আবার কেঁদে ফেলে তবে এই কান্না কষ্টের নয় ভীষণ আনন্দের। মোহন ওর হাতে পুকুরের পানি তুলে দেয় তা দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলে শুভ্র। তারপর চিৎকার করে হেসে ওঠে। কোথা থেকে শালিকটা এইবার তার গায়ে এসে বসে। পাখিটা একটা গান ধরে সুরের গান, বন্ধুত্বের সুর, যে সুর ভীষণ মধুর।

বিষ্ণু প্রসাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, পঞ্চগড়