কয়েক ঘণ্টার আনন্দ

আবুল খায়ের নাঈমুদ্দীন

0
33

শুক্রবার সকাল বেলা। এখনো আমাদের বাসার সবাই ঘুম থেকে ওঠেনি, ঘড়িতে হয়তো নটা বাজতে পারে এমন সময় মোবাইলটা মৃদু সুরে বেজে উঠল, তাকিয়ে দেখলাম ছোট শালিকার নাম্বার থেকে।
রিসিভ করেই বললাম, আসসালামুয়ালাইকুম?
ও প্রথমেই বলল আপা কেমন আছে?
বললাম ভালো, তুমি সালাম কালাম ছাড়া?
সে এমন প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল না। কারণ যাদের টাকা পয়সা বেশি তাদেরকে আদর্শ শিক্ষা দেয়ার জন্য কেউ সাহস করে না, তাই একটু থেমে বলল, ভালো।
প্রশ্ন ছুড়ে দিলো, ঘুম থেকে উঠেছেন?
– কেন, এত বেলা হলো, উঠব না? আমরা নামাজ পড়ে আবার শুয়েছি, ছানি ঘুমও শেষ।
– না, এমনি বললাম। আপনি তো আবার দেরি করে ঘুমান আর বেলা করে ওঠেন।
হেসে বললাম, এই কি হচ্ছে? আমি দেরি করে উঠি! তুমি তো কাজী নজরুল ইসলামের ভোর হলো দোর খোলো পড়োনি তাই আর কি!
– ও আচ্ছা, একটু হেসে বলল আজ উঠে গেছি। বললাম তাহলে তো খুবই ভালো।

আমি একটু নামাজ কালামের জন্য বলি তো তাই সে আমার সাথে কথা বলা থেকে দূরে থাকতে চায়। আমি মনে মনে তাই চাই।
এবার বলল আপুকে দেন, বললাম ঠিক আছে। ডেকে দিলাম ওর বড় বোনকে। এবার তাদের কথোপকথন…।
– আপা তোমার বাসায় যাবার জন্য বাচ্চারা উৎপাত শুরু করছে, আজ শুক্রবার ওদের স্কুল আর কোচিং বন্ধ, তাই বলছিলাম…

– অতি দ্রুতই উত্তর দিলো ওরে এতে আবার বলার কী হলো, আয় তাড়াতাড়ি চলে আয়। প্রতিদিন তোকে আসতে বলি, আসিস না, আজ আসবি বলছিস তা তো খুশির খবর। আয়, কিন্তু আজ আমাদের বাসায় থেকে যেতে হবে। সে বলে, না আপু থাকা যাবে না, আগামীকাল আবার স্কুল খোলা। আচ্ছা পরে দেখা যাবে। আগে তো আয়। একথা বলে আমাকে ফোনটা দিয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
– আপু…।
আমি আওয়াজ করে গলাটা ঝেড়ে নিলাম, যেন সে বুঝতে পারে এখন ফোনটা আমার হাতে। আমার আওয়াজ শুনে বলে উঠল আপু কই?
একটু হেসে বলে দিলাম, ফোনটা আমাকে দিয়ে রান্না ঘরে দিলো দৌড়, আমি কী করব?
এবার আমাকে সতর্ক করে দিলো, আপাকে বলবেন যেন বেশি ঝামেলা না করে। শুধু নরমাল আলু ভর্তা আর ডাল হলেই চলবে। আচ্ছা তা দেখা যাবে। তুমি আগে এসো। বলে ফোনটা রেখে দিলাম।
বলে রাখা ভালো, আমার একমাত্র শ্যালিকা, তার নাম তারানা। ওর জামাই ইঞ্জিনিয়ার। টাকা পয়সার অভাব নেই। জায়গা কিনে বাড়ি করে ভাড়া দিলো। আর আমরা শিক্ষকতা করে নিজে মাথা গোঁজার জায়গাটুকুও নিতে পারছি না।
তার একটা ভালো গুণ তাকে দাওয়াত করতে হয় না, সুযোগ পেলেই চলে আসে। সব বোনেরা যদি এভাবে বাবার বাড়িতে বা ভাইদের বাড়িতে নিজ থেকে মনে হলেই চলে আসত তাহলে কোথাও সম্পর্ক নষ্ট হতো না।

হুমায়রা আমার মেয়ে, বয়স আট। তাকে হুমু বলেও ডাকি। তাকে বললাম তোমার ছোট খালা আসবে সবাইকে নিয়ে। এই শুরু। ওমা, কী মজা! বলে দিলো লাফ! আজ অনেক মজা করব বলতে বলতে দৌড় দিলো সিফাত আর লাবিবাসহ ওদেরকে ঘুম থেকে জাগানোর জন্য। হৈহুল্লোড় করে কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাইকে জাগিয়ে দিলো।
ছোটরা সবাই কী মজা! কী মজা! ছোট খালা আসবে, ছোট খালা আসবে; বলে বলে চিৎকার করে আমার রুমে এসে বলছে আব্বু, আমরা আজ অনেক মজা করব কিন্তু! এটা তাদের জন্য এক ধরনের অনুমতি। আমি সাধারণত ওদেরকে চেঁচামেচি করতে দেই না। মুচকি হেসে মাথা নেড়ে সায় দিলাম। এবার শুরু করল ঘর গোছানো।

বেলা প্রায় বারোটা বেজে গেল। এখনো বাজার নিয়ে বাসায় পৌঁছতে পারিনি। গিন্নির খুব টেনশন হচ্ছে। বাসার কাজের লোক কেউ মসলাগুলো কেটে রেডি করে ফেলেছে, কেউ সব ধোয়ামোছা করছে এমন সময় কলিংবেল বাজিয়ে ঢুকলাম। কুসুম তো ঘাবড়ে গেলো। মেহমান মনে হয় চলে এসেছে। দরজা খুলতেই দেখলো আমি বাজার নিয়ে হাজির। ও নিশ্চিন্ত হলো। এবার তার আর বেশি সময় লাগবে না। ওর রান্নার প্রশংসা স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও করতেন যদি তিনি একবার খেয়ে দেখতেন। বাজারের থলে খুলে দেখলো টাকিমাছ, শিংমাছ, তেলাপিয়া, মুরগি, তরকারি সবজি। টাকিমাছটা সবার জন্য আনি যেন একটু চচ্চড়ি করতে পারে। গ্রামে যারা বেড়াতে আসে তারা এই একটু চচ্চড়ি আর ভর্তা হলে খুব খুশি হতে দেখেছি। সাথে পোলাওর চাল আরো কত কী টুকিটাকি।

বাজার দেখে আমাকে উদ্দেশে করে বলল, আরে বাহ্ আমি তো এত কিছু আনতে বলিনি? আজ দেখি কলিজাপুরা বাজার। উত্তরে মুচকি হেসে বললাম, আরে আজ সবাই আমার বাসায় আসছে না? পারলে তো বাজার শুদ্ধ উঠিয়ে আনতাম।
– সত্যি আমারো অনেক ভালো লাগছে ছোট বোনটা আসবে বলে। আমি গুনগুন করে বললাম, ভালো-ভালো। একটু আওয়াজ করে বললাম, হ্যাঁ, ভালোভাবে রান্না করো এমনিতেই লেট হয়ে গেছে বাজার আনতে, আমি নামাজের জন্য তৈরি হলাম বলে বেরিয়ে এলাম সেখান থেকে।

আজ চকচকে আড়ংয়ের পাঞ্জাবিটা গায়ে দিয়ে মসজিদের জন্য রেডি হচ্ছি। একটা বাজেনি এখনো। ভাবছি, বলবো ফোন করো দেরি করছে কেন? আবার তাদের কিছুটা দেরি হবেই, ওদের কত কাজ সামলে
কোথাও বের হতে হয়। ঠিক তখনই কলিংবেল বেজে উঠল, আমার আগেই ছোটরা দরজার পাশেপাশে। দরজা খুলতেই ওর বাচ্চাদের দেখে সবাই সমস্বরে চিৎকার, চেঁচামেচি। এক বোন আরেক বোনকে দেখে আনন্দের শেষ কোথায়? আমিও সম্ভাষণ জানিয়ে ত্বরিত গেট পেরিয়ে সোজা মসজিদে হাঁটা দিলাম।

ফিরে দেখি, ওদের জন্য টেবিল সাজানো নাশতা। রাখা আছে, চানাচুর, বিস্কুট, কলা, কেক, দু-একটা ফলের আইটেম ছাড়াও চকলেট আইসক্রিম। কিন্তু খাওয়া দাওয়ার দিকে ওদের কারোর কোনো নজর নেই, শুধু হাসাহাসি দুষ্টুমি এ খাট থেকে ও খাটে লাফালাফি আর উল্লাস!
দুই বোন মিলে নানান কথা বলছে আর হাতে হাতে কাজ করছে, প্রথমে কোরবানির গোশত তেল, পেঁয়াজ বাটা, রসুন বাটা, আদা বাটা, হলুদের গুঁড়া, মরিচ গুঁড়া, জিরা, ধনিয়া ও গরম মসলার গুঁড়া, তেজপাতা প্রেসার কুকারে চুলোয় উঠিয়ে দিলো, অন্য চুলায় পোলাও রান্নার পাতিল। নিজেরাই হাতাহাতি করছে কাজ কমানোর জন্য, তারপর লাল শাক, শিম, অন্য সব সবজি কাটাকাটিতে ব্যস্ত। সংসারে ছোট বোনেরা বেড়াতে এলে কাজ টেনে নেয়। বোনেরা বোনদের কষ্ট বুঝে।
পোলাওয়ের পাতিলে তেল, তেল গরম হবার পর গোশত উঠিয়ে দিলো, তারপর চাল আর ফুটানো পানি দিয়ে দিলো পরিমাণমতো, তারপর তেজপাতা, এলাচ, দারুচিনি, আর লবণ দিয়ে দিলো পরিমাণ মতো।
আগেই মসলা মেখে রাখলো চিকেন ফ্রাইয়ের জন্য, পাবদা মাছ, শিং মাছ, এক সাথে রান্না করেছে। টমেটো, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, অন্য প্রয়োজনীয় মসলা দিয়ে। বাকি শিম রান্না করল তেলাপিয়া মাছ দিয়ে, লালশাক ভাজিও কমপ্লি­ট, রান্না পুরোপুরি শেষ যা আয়োজন করার ছিল।

তোহফা কাজের মেয়েটা, আর মিম তারানার মেয়ে সে সালাদ রেডি করল। প্লেট, বাটি, জগ, গ্ল­াস সব মিলিয়ে একটা একটা করে সব খাবার দিয়ে টেবিল সাজানো হলো।
আমার দুই মেয়ে, তারানার দুই মেয়ে আর এক ছেলের প্লেট সাজিয়ে দিলো, ওরা প্লেট নিয়ে বসে গেল, কিন্তু মুখের আর বিশ্রাম নেই। সারা দিন মোবাইলে কথা বলার পরও দেখা হলে কথাগুলো বাঁধ ভাঙা পানির জোয়ারের মতো গড়িয়ে বের হতেই থাকে। কথা বলছেই, হাসাহাসি, দুষ্টুমিও বন্ধ নেই। আমাকে ডেকে বলছে, আব্বু দারুণ হয়েছে সব খাবার বিশেষ করে চিকেন ফ্রাই-পোলাও। আমি হাসলাম আর বললাম, ধন্যবাদ।

টেবিলে খেতে বসে গেল বাকি সদস্যরা, আমি সব রান্নার স্বাদ দেখলাম। তারানার উদ্দেশ্যে বললাম সব পারফেক্ট হলো তো? তারানার মুখে বুবুর মানে বড় বোনের রান্নার গুণ ছাড়া আর কোনো কথা নেই। এভাবেই গল্প আর খাওয়া চলছে।

খাওয়া শেষে ওরা দু’বোন শুয়ে শুয়ে গল্প করছে, আর ছোটরা সাউন্ড বক্সে জোরে জোরে গান, গজল শুনছে।
আছরের আজান দিতেই উঠে ডাইনিংয়ের আশপাশে পায়চারী করছি আর মনে মনে ভাবছি যদি এক কাপ চা হতো? কিন্তু না, এর কোনো লক্ষণ নেই। তাই নিজেই একটু পানি বসিয়ে দিলাম। পানি গরম হলে চা পাতা দিয়ে দিলাম। চিনি খাই না বলে ঝামেলা নেই। কাপে ঢেলে খেয়ে নিলাম।
আমরা নামাজ শেষ করলাম।
তোহফার ফের চায়ে ওরা সবাই মিলে চা খেতে খেতে প্রায় সন্ধ্যা।

তারপর যাবার ঘণ্টা বেজে গেল ওদের বললাম আজ থেকে যাও।
ছোটরাই বলে উঠল, না আজ আর না আঙ্কেল সুযোগ হলে আবার আসবো।
আমি সবশেষে বললাম শোনো বোন, বাচ্চাদের নামাজ কালামের দিকে গুরুত্ব দিও। এখন ওরা কাঁদামাটি, যেভাবে শেখাবে সেভাবেই তারা শিখবে। মা হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর এখানেই সবাই আসল শিক্ষা পায়। তোমাদের কবরের পাশে যেন দাঁড়াতে পারে, সে শিক্ষা তোমাকেই দিতে হবে। বাচ্চাদের এমন শিক্ষা দেয়া উচিত যেন সে সব রকমের পরিবেশে নিজেকে সম্মানিত মনে করতে পারে।

এভাবে হয়তো আর কেউ বলেনি, সে যাই মনে করুক আমার বলা দরকার ছিল বলেছি। এভাবেই শেষ হলো আমাদের হাসি, আনন্দ মজা আর ভালো লাগার একটি অন্তরঙ্গ দিন! এসব ছোট ছোট আনন্দগুলো আপনজনদের মাঝে এক অমূল্য স্মৃতির! আমার মেয়েরা যেন কেঁদে ফেলবে খালামণিদের চলে যাওয়াতে। খালামণিও বেশ মজা দেয় ওদের। প্রত্যেকের গালটিপে দিয়ে বখশিশ দিলো নতুন কয়েকটি নোট। সবাই দরজায় জড়ো হয়ে তাকিয়ে রইলাম। সে বাচ্চাদের বিদায় জানিয়ে গাড়িতে ঢুকে গেল। ড্রাইভার চালিয়ে দিলো, আমাদের সামনে শুধু গাড়ির পেছনের ধুলোটুকু দেখা গেল। এরপর সবাই ভেতরে এসে যে যার মতো।

ভাবলাম সবাই যদি তাদের ভাই-বোনদের বাসায় এভাবে কয়েক ঘণ্টার জন্য মাঝে মাঝেই ঘুরে আসে তবেই সবার আত্মীয়তার বন্ধন দৃঢ় হয় আর শিশুরাও বেশ আনন্দ পায়।