কিশোর মুক্তিযোদ্ধা গেদামনি

আশরাফ পিন্টু

0
47

– মিয়া ভাই, আমি ভাষণ শুনতে যামু।
– তুই ভাষণের কী বুঝিস; ভাগ এখান থেকে।
ছোট ভাই গেদামনির কথায় বড় ভাই জাহাঙ্গির আলম খান রেগে ওঠেন।
– মিয়া ভাই, তোমরা তো কয়েক দিন থাকবে; আমি না হয় ভাষণ শুনেই বাড়ি চলে আসব।
মুখ কাঁচুমাচু করে বলে গেদামনি।
– সামনে তোর বৃত্তি পরীক্ষা, এক দিনও সময় নষ্ট করা যাবে না। যা পড়তে বস।
– সে তো অনেক দেরি…
– আবার?…
বড় ভাইয়ের চোখ গরমে গেদামনি এবার চুপসে যায়।
গেদামনি পাবনা জেলা স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। যেমন মেধাবী, তেমনি দুরন্ত। দশ ভাই-বোন ওরা। সাত ভাইয়ের মধ্যে বড় চার ভাই-ই মুক্তিযুদ্ধে যাচ্ছেন। সে নিজেও মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে চায়, কিন্তু বয়সের কারণে তা হয়ে উঠছে না। গেদামনির পড়ার টেবিলে মন বসে না। উপায় খুঁজতে থাকে কী করে ঢাকায় যাওয়া যায়? যে করেই হোক বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ শুনতে হবে। এছাড়া বঙ্গবন্ধুকে দেখার তার বড়ই সাধ!
তখন পাবনা থেকে ঢাকা যাতায়াতের পথ ছিল দুটো। একটি সড়ক পথে নগরবাড়ি-আরিচা হয়ে; আরেকটি ঈশ^রদী থেকে ট্রেনে উঠে সিরাজগঞ্জ ঘাট নেমে স্টিমারে পার হয়ে ভ‚ঞাপুর থেকে আবার ট্রেনে উঠে ঢাকা পৌঁছানো। দুটো পথই সংকুল। গেদামনি মনে মনে একটি পথ বেছে নেয় এবং বাড়ির কাউকে না জানিয়ে ৬ই মার্চ কাকডাকা ভোরে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
সিরাজগঞ্জ ঘাটে পৌঁছে স্টিমারে উঠে গেদামনি চিন্তায় পড়ে যায়- যদি মিয়া ভাইয়ের সাথে দেখা হয় তাহলে নির্ঘাত মার খেতে হবে। কারণ ওনারা সবাই একই ট্রেনে ঢাকা যাচ্ছেন। স্টিমার লোকে লোকারণ্য। এর মধ্যে হয়তো ওকে চোখেই পড়বে না। গেদামনি নিজেকে সান্ত¡না দেয়। ওদিকে খিদেয় পেট চোঁ-চোঁ করছে। পকেটেও তেমন পয়সা নেই। অগত্যা এক খিলি বারোভাজা খেয়ে কিছুটা খিদে নিবারণ করা যাক। গেদামনি ভিড় ঠেলে আস্তে আস্তে বারোভাজাওয়ালার কাছে এগিয়ে যায়। এমন সময় পেছন থেকে কে যেন ডেকে ওঠে, গেদামনি তুই এখানে? পিছন ফিরে দেখে মেজভাই শাহনেওয়াজ খান। সাথে রয়েছেন সেজভাই শাহ আলম খান এবং কয়েকজন বন্ধুবান্ধব। গেদামনির পিলে চমকে যায়। এই বুঝি মিয়া ভাই এসে গালে কসে চড় বসায়। কিন্তু মেজভাইয়ের সাক্ষাতে কিছুটা স্বস্তি পায়। মেজভাই অত্যন্ত নরম স্বভাবের। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে পড়েন।
– কি রে, কিছু খেয়েছিস?
সেজোভাই শাহ আলম বলেন। গেদামনি মাথা নেড়ে না-বোধক জবাব দেয়। এরপর ওরা সবাই ওকে নিয়ে একটি বুফে বসে পেটপুরে খায়।
পরদিন ৭ই মার্চ। রেসকোর্স ময়দান লোকে লোকারণ্য। তিল ধরানোর ঠাঁই নেই। গেদামনিরা পাঁচ ভাই-ই রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত। যথাসময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মঞ্চে আসেন। গেদামনির কাছে বঙ্গবন্ধুকে যেন রূপকথার গল্পের রাজপুত্রের মতো মনে হয়। তাঁর ভাষণ শুনে ওর সারা শরীর উত্তেজনায় কাঁপতে থাকে। রক্ত গরম হয়ে ওঠে।
‘‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।…’’
কয়েক দিন পর। গেদামনি ওর রুমে ঘুমাচ্ছে। বন্ধু হাসনাতের কনুইয়ের গুঁতোয় ও ঘুম থেকে ধড়ফরিয়ে জেগে ওঠে। হাসনাতের হাতে একটি পিস্তল।
– এখনো ঘুমোচ্ছিস? টাউনে প্রচÐ গোলাগুলি হচ্ছে।
গেদামনি চোখ রগড়িয়ে নিয়ে বলে, ‘একটু দাঁড়া দোস্ত, আমি রেডি হয়ে নিই।’
গেদামনি তাড়াতাড়ি প্যান্ট-শার্ট পরে রাইফেলটা কাঁধে ঝুঁলিয়ে হাসনাতের সাথে রওনা দেয়। টেলিফোন এক্সচেঞ্জের কাছে আসতেই ওদের চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। শহর, আশেপাশের গ্রাম ও চর এলাকা থেকে আগত হাজার হাজার জনতা টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ঘিরে ফেলেছে। কারো হাতে বন্দুক, কারো হাতে চায়নিজ পিস্তল, কারো টু-টু রাইফেল, কারো হাতে আছে দেশীয় অস্ত্র- ফাল, সড়কি, বল্লম, হাঁসিয়া, রামদা, তলোয়ার ইত্যাদি। একটি গাছের আড়ালে যেতেই জেলা কমান্ডার রফিকুল ইসলাম বকুলের সাথে গেদামনির দেখা হয়ে যায়। ও মিলিটারিদের উদ্দেশ্যে রাইফেল তাক করে ধরেছিল। দূরে ঘোরাফেরা করছে দুজন মিলিটারি। বকুল ভাইকে দেখেই বলে, ‘লিডার দেব নাকি শেষ করে?’
বকুল ভাই মাথা নেড়ে বলেন, ‘না।’
– কিন্তু…
– যুদ্ধের স্ট্র্যাটেজি তোমার এখনো শেখার বাকি আছে।
বকুল ভাইয়ের কথায় গেদামনির মন খারাপ হয়ে যায়।
– ইচ্ছে করছিল মিলিটারি দুটোকে গুলি মেরে ওদের খুলি উড়িয়ে দেই।
এরপর গেদামনির অপারেশনের দায়িত্ব পড়ে সুজানগর থানায়। এখানে কমান্ডারের দায়িত্বে ছিলেন মুজিব বাহিনীর জেলা প্রধান ইকবাল হোসেন। গেদামনির সঙ্গে ছিল সাধন, স্বপন, সাচ্চু, সেলিম ও সাফি। সকলেই ওর চেয়ে বয়সে বড়। সবাই সাগরকান্দি গ্রামের আওয়ামীলীগ নেতা নূর চৌধুরীর বাড়িতে এসে আশ্রয় নেয়।

একদিন অপারেশন শেষ করে গেদামনিরা রাতে ঘুমাচ্ছিল। এমন সময় গোপনে এক শান্তি কমিটির নেতা নগরবাড়ি ঘাটে যেয়ে পাকসেনাদের কাছে ওদের অবস্থান জানিয়ে দেয়। শেষ রাতের দিকে পাকসেনারা এসে ওদের সবাইকে ধরে নিয়ে যায়। ফেরিতে এনে ওদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালায়। একপর্যায়ে প্রায় সবাইকে হত্যা করে যমুনা নদীতে ফেলে দেয়। শুধু জীবিত থাকে সেলিম ও গেদামনি। সেলিমের গলায় খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী অঞ্জন চৌধুরির দেওয়া ক্রুশচিহ্নের চেইন থাকায় বেঁচে যায়। আর গেদামনি- কিশোর বালক। কী করবে আর্মিরা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। অবশেষে ট্রাকে করে পাবনা হেড কোয়ার্টারে পাঠিয়ে দেয়।
ট্রাক দ্রæত গতিতে পাবনা শহরে দিকে চলছে। চারপাশে রাইফেল হাতে পাকসেনারা দাঁড়িয়ে। যাবার পথে ওরা রাস্তার চারপাশের সবকিছু শকুন দৃষ্টিতে দেখছে। গেদামনি কিশোর, ফলে ওদের মাঝে মুক্ত অবস্থায় চুপ করে বসে আছে। চোখ অশ্রæসজল। হয়তো পাবনা নিয়েই ওকে মেরে ফেলা হবে। শুধু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের জন্য ওকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। এটাই তার শেষ যাত্রা। বুকের ভিতরে চাপা কান্না গুমরে মরছে।
– মা গো! তোমাকে বুঝি আর দেখা হলো না। এ মাতৃভূমি বাংলাদেশকেও হয়তো আর দেখতে পাব না। হে আল্লাহ! আমার জীবন নিয়ে হলেও এ দেশকে এই জালিমদের হাত থেকে রক্ষা করো, স্বাধীন করো প্রভু। চোখে পানি এলেও গেদামনি মনকে শক্ত করে। শহীদ হবার শপথ নিয়েই সে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। তার আরো চার ভাই মুক্তিযোদ্ধা। এটা বিরল ঘটনা। বাংলাদেশের কোনো পরিবারেই হয়তো এমন ঘটনা ঘটেনি। বড় ভাইয়ের কথা মনে হতেই ওর মন শক্ত হয়ে ওঠে। বড়ভাই জাহাঙ্গির আলম অত্যন্ত সাহসী একজন মুক্তিযোদ্ধা। অনেক মিলিটারিকে খতম করেছেন তিনি।
হঠাৎ ট্রাকটি থেমে যায়। গেদামনি ভাবে, হয়তো পৌঁছে গেছে শহরে। কিন্তু না। এটা আতাইকুলার একটি গ্রাম। পাবনা শহর এখনো অনেক দূরে। কিন্তু এখানে ট্রাক থামল কেন? কিছুক্ষণ পর সে লক্ষ্য করে কয়েকজন মিলিটারি দৌড়ে কোথায় যেন যাচ্ছে। দূর থেকে বাঁশির শব্দ শুনেই ওর পাশ থেকে কয়েক জন মিলিটারি ট্রাক থেকে নেমে যায়। গেদামনি ট্রাক থেকে অবাক হয়ে লক্ষ করে কিছু দূরে কয়েকটি বাড়িতে মিলিটারিরা আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। গেদামনির পাশে মাত্র দুজন মিলিটারি পাহারায় ছিল। তারা হাঁ করে বাড়িঘরগুলো পুড়ে যাবার দৃশ্য দেখছিল।
গেদামনি এই সুযোগে চুপিসারে ট্রাক থেকে নেমে পড়ে। এক দৌড়ে পাশের গ্রামের গাছ-গাছালির মধ্যে মিশে যায়। মিলিটারিরা টের পেয়ে গুলি চালায়। কিন্তু গেদামনি ততক্ষণে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে গিয়েছে। ও যমের হাত থেকে বেঁচে
যায়।