সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহার

আব্দুর রহমান

0
346

প্রযুক্তির এই ক্রমবর্ধমান উন্নতির পরিক্রমায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। বছর দশেক আগেও যেখানে মানুষ ফোনালাপ, ইমেইল আদান-প্রদান কিংবা ফ্যাক্স মেশিন ব্যবহারের মাধ্যমে দূর দূরান্তের মানুষের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করত, আজ সে জায়গার অনেকাংশ দখল করে নিয়েছে নানাবিধ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির অংশ হিসেবে বহুল ব্যবহৃত সামাজিক মাধ্যমের মধ্যে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম, ভাইবার, লিঙ্কডিন অন্যতম। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় পুরোটা জুড়েই আছে সামাজিক মাধ্যমের আনাগোনা। সকালে ঘুম জড়ানো চোখেই আমরা মোবাইলটা খুঁজে একটু ফেসবুকে চোখ বুলিয়ে নিই। যেকোনো মাধ্যমে বিদ্যমান গুরুত্বপূর্ণ বার্তাগুলোয় নজর দেই। আমাদের অনেকেরই দিনের শুরুটা এভাবে স্মার্টফোনের পর্দায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঢুঁঁ মেরেই শুরু হয়। সামাজিক মাধ্যমগুলোর বৈচিত্র্যময়তার জন্যই তা এত জনপ্রিয়। তবে এক্ষেত্রে ইতিবাচকভাবে এর ব্যবহার নিশ্চিত করাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যবহারকারীর তার নিজস্ব পরিচয় বহন করতে পারে। বিশ্বের আনাচেকানাচে অবস্থান করা যেকারো সাথেও খুব সহজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের যোগাযোগ স্থাপন করিয়ে দিতে সক্ষম। ক্রমশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের নিজের মত প্রকাশের ও অন্যের সাথে নিজের ধারণাবোধ ও মত আলোচনা করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমে রুপ নিয়েছে। আজকাল এ মাধ্যমকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য। খুলে গেছে ই-কমার্সের দুয়ার। এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ঘিরেই গড়ে উঠছে নানা জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য চর্চার বিভিন্ন সংগঠন। মোটকথা, জীবনের এমন কোনো দিক নেই যেখানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব নেই। গত এক দশকে বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এক নবদিগন্তের সূচনা হয়েছে। এর ফল হিসেবে আমরা এখন যোগাযোগ মাধ্যমে এক অভূতপূর্ব উন্নতি লাভ করেছি।

এ যোগাযোগ মাধ্যমের যথার্থ ব্যবহার আমাদের ব্যক্তিগত ও জাতিগত উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। তাই এক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে পর্যালোচনা করা অতি জরুরী। এর কারণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার আমাদের কতটা সামাজিক কিংবা কতটা অসামাজিক করে তুলছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বটে। এ প্রশ্নের উত্তর ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির কাছে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। তবে আমরা যদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইতিবাচক দিকগুলোর দিকে যথাযথভাবে আলোকপাত করি, তাহলে এর ইতিবাচক দিকগুলো আমাদের আশ্চর্যান্বিত করে তুলতে বাধ্য। জগতের প্রতিটি বিষয়েরই ইতিবাচক এবং নেতিবাচক উভয় দিক-ই থাকে। কিন্তু যেকোনো বিষয়ের ইতিবাচক দিকগুলোকে সাদরে গ্রহণ করে সেগুলোকে আমরা কিভাবে কাজে লাগাচ্ছি সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আজকাল এ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে ব্যবসা-বাণিজ্যের এক বিরাট মাধ্যমের সূচনা হয়েছে। ই-কমার্সের ব্যাপক সম্প্রসারণ হয়েছে। এই যান্ত্রিক কর্মব্যস্ত জীবনে অনেকেই নিজের নিত্যপ্রয়োজনীয় নানাবিধ পণ্য কিনতে দোকান, মার্কেটে যেতে পারেন না। তাদের এই ব্যস্ত জীবনে আশার আলো হয়ে এসেছে ই-কমার্স। বিভিন্ন নামিদামী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান কিংবা ছোটখাট ব্যবসায়ীদের বেঁচে থাকার অবলম্বন এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যার ফলে তারা নিজেদের বিক্রয়যোগ্য পণ্যের প্রচারণা ক্রেতাদের নিকট পৌঁছে দিতে পারেন। এই ই-কমার্স এর সুফল ভোগ করতে বর্তমানে বহু বেকার তরুণ উদ্যোক্তা হওয়ার দিকে ঝুঁকছে। ফলে অনেকেই এখন অনলাইন ব্যবসামুখী হচ্ছে ও সফলতার মুখ দেখছে। শুধু চাকরির জন্য ব্যতিব্যস্ত না হয়ে বিকল্প পথ হিসেবে ধীরে ধীরে নিজের ই-কমার্স ব্যবসার সম্প্রসারণ করতে পারলে পরবর্তীতে নিজেদের-ই চাকরিদাতা হয়ে ওঠা সম্ভব। অগণিত বেকার তরুণের বেকারত্বের অসহায়ত্ব ঘুঁচাতে তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, বেকারত্ব দূরীকরণের পথে যা রীতিমত এক বিস্ময়কর ধাপ। পৃথিবীর সবথেকে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের নাম উল্লেখ করতে গেলে সন্দেহাতীতভাবেই ফেসবুক সবার প্রথমে আসবে। বর্তমান বিশ্বে পৃথিবীর সর্বত্র এর জনপ্রিয়তা রয়েছে। এই আধুনিক বিশ্বে ফেসবুক মার্কেটিং-এর প্রচলন প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ফেসবুকের মাধ্যমে বিশ্বের সর্বত্র ফেসবুক ব্যবহারকারীদের কাছে কোনো প্রতিষ্ঠান, পণ্য বা সেবার প্রচারণা করে দেয়াই ফেসবুক মার্কেটিং নামে পরিচিত। এটি যে কেউ নিজে অথবা কোন দক্ষ ফেসবুক মার্কেটারের মাধ্যমেও করতে পারেন। অর্থাৎ পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচারের মাধ্যমে তার দ্বারা ক্রেতাদের আকৃষ্ট করাই এর মূল লক্ষ্য। যেকোনো ধরনের বিজ্ঞাপন-ই ফেসবুকে অর্থ প্রদান করে দেয়া যায়। ফেসবুক ব্যবহার করতে গেলে আমরা প্রায়ই আমাদের ফেসবুক নিউজফিডে বিভিন্ন পণ্যের স্পন্সরড পোস্ট দেখতে পাই, বিভিন্ন পণ্যের ছবি বা অফার দেখা যায়, এগুলোই ফেসবুক বিজ্ঞাপন। এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ঘিরেই গড়ে উঠছে শিল্প-সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, খেলাধুলা কিংবা সাহিত্য চর্চার বিভিন্ন সংগঠন। এসব সংগঠনে অন্যের সাথে মতের আদান-প্রদান এর মাধ্যমে নিজের প্রতিভাকে আরো বিকশিত করা যায়, শাণিত করার সুযোগ পাওয়া যায়। ছাত্রজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব ব্যাপক। পাঠদানের সময় নির্ধারণ থেকে শুরু করে পাঠক্রমের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ এর জন্য ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপের মত যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার অপরিহার্য। তবে আমাদের এই সত্যটি স্বীকার করে নেয়া জরুরী যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যথেচ্ছ ব্যবহার আমাদের বাস্তব জীবন সম্পর্কে নেতিবাচক পরিবর্তন বয়ে আনছে ও আমাদের পরিবারের সদস্য, আতœীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরির ক্ষেত্রে বিরাট অন্তরায় তৈরি করছে। যে কারো সাথে মনের ভাব বিনিময়ের জন্য সামনে বসে বলা সর্বোত্তম। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাত্রাতিরিক্ত আসক্তির ফলে আমরা ভার্চুয়ালি মনের ভাব আদান-প্রদানেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছি। কিন্তু বাস্তবতা হল প্রযুক্তির ওপর আমাদের এই নির্ভরশীলতা আমাদের প্রতিনিয়ত বাস্তব জীবন থেকে দূরে ঠেলে দিয়ে ক্রমেই আমাদের যান্ত্রিক করে তুলছে। আপনি যখন কোনো একটা রেস্টুরেন্ট কিংবা হোটেলে খাবার খেতে যান, একটু চারপাশে চোখ বুলালেই দেখতে পাবেন যে আপনার চারপাশে বসে থাকা অধিকাংশ মানুষ তাদের মুঠোফোনে ব্যস্ত রয়েছে। তাদের কেউ কেউ খাবারের ছবি তোলায় ব্যস্ত, কেউ আবার পাশে আপন মানুষকে রেখেও নিজের স্মার্টফোনের পর্দায় চোখ বুলাচ্ছে। অনেক সময় পরিবারের কর্তা যান্ত্রিক জীবনের অবসাদ থেকে মুক্তি পেতে পরিবারের সবাইকে নিয়ে ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা করেন, পিকনিকের ব্যবস্থা করেন একসাথে সিনেমা দেখার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সেখানে গিয়েও দেখা যায় পরিবারের সদস্যরা প্রত্যেকে একে অন্যের থেকে বিচ্ছিন্ন। সবাই যার যার মতো নিজ নিজ স্মার্টফোনে ব্যস্ত। আর তাদের এই ব্যস্ততা তাদের একসাথে থাকার আনন্দ কেড়ে নিচ্ছে, তাদের পারিবারিক বন্ধন শিথিল করে তুলছে, ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে ব্যবধান। যোগাযোগ মাধ্যমের এই বিস্ময়কর অগ্রযাত্রার ফলে সমগ্র পৃথিবীর মানুষ যেন একটি ক্ষুদ্র জনপদে রূপ নিয়েছে। পুরো বিশ্ব এখন আমাদের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এত ইতিবাচক দিক থাকার পরেও এর অপব্যবহার এবং তার ফলে সৃষ্ট নেতিবাচক ঘটনা বেশ উদ্বেগজনক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায়ই কোনো আলোচিত ঘটনার প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে ‘গুজব’ ছড়িয়ে যাওয়া এখন বেশ নিয়মিত। এছাড়া বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে ইভটিজিং, হুমকি, প্রতারণা ব্ল্যাকমেইলিং-এর মত নানাবিধ সাইবার ক্রাইমের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া অশুভ লক্ষণ যা সামাল দেয়া যথেষ্ট দুরূহ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দ্বারা সংঘটিত এসব অপরাধপ্রবণতা মানবজীবনে সৃষ্টি করেছে নানা জটিলতা। এসব মাধ্যমে আমরা বাস্তবতা বিবর্জিত হয়ে অন্যের সাথে ভার্চুয়ালি পরিচিত হচ্ছি, যেখানে সম্পর্কগুলো বাস্তবতা থেকে পুরোপুরি ভিন্ন। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আমরা এসব ভার্চুয়াল সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছি, ফলে আমাদের প্রকৃত সম্পর্কগুলো হুমকির মুখে পড়ছে। আপনজন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের দৈনন্দিন জীবন করেছে সহজবোধ্য, দূরে বসবাসরত কাছের মানুষকে এনে দিয়েছে অতি নিকটে। কিন্তু এর ব্যবহার করতে হবে ইতিবাচক ফলাফলের উদ্দেশ্যে, আত্মকেন্দ্রিকতা পরিহার করে বরং সামাজিক ব্যক্তিগত ও জাতিগত উন্নতির স্বার্থে জ্ঞান-বিজ্ঞান,
সংস্কৃতি, সামাজিক মূল্যবোধের শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে আমাদের সবার মাঝে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহার সুনিশ্চিত করলে একদিন আমাদের দেশ এক সুন্দর আগামীর পথে এগিয়ে যাবে। তাই তরুণদের উচিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের জন্য সুনির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা, অনেক বেশি সময় এক্ষেত্রে ব্যয় না করা, ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা এবং উদ্ভাবনীমূলক ও সৃজনশীল কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করে আনন্দের সাথে জীবনকে উপভোগ করা।
শিক্ষার্থী, তা’মীরুল মিল্ল­াত কামিল মাদরাসা, গাজীপুর