পরিবর্তনের জন্য লেখো

শাকের জামিল

0
53

সাদাত রহমান। নড়াইলের একটি কলেজে উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষে পড়–য়া ছাত্র। গত বছর নেদারল্যান্ড থেকে দেশের জন্য একটি পুরস্কার বয়ে এনেছে সে। আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার নামের এই পুরস্কারটি দেয় কিডস রাইটস নামের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। শিশুদের অধিকার উন্নয়ন নিরাপত্তা রক্ষায় অসাধারণ অবদান রাখার জন্য ২০০৫ থেকে প্রতি বছর এ পুরস্কার দেয়া হচ্ছে। ২০১৯ সালে এ পুরস্কার পেয়েছিল সুইডিশ পরিবেশ আন্দোলনকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ এবং ক্যামেরুনের ডিভিনা আলম। এর আগে ২০১৩ সালে মালালা ইউসুফজাই এ পুরস্কার পায়। সাদাত রহমানের হাতে পুরস্কারটি অনলাইনে হস্তান্তর করেন মালালা ইউসুফজাই।
কোন কাজের ফলে সাদাত রহমানের এ পুরস্কার লাভ? সাইবার বুলিং এর শিকার হয়ে প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন জায়গায় আত্মহননের ঘটনা আমরা সংবাদপত্রে দেখি। অনলাইনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হয়ে উপায়ান্ত না পেয়ে এ পথ বেছে নেয় ভুক্তভোগীরা। পিরোজপুরের এমন একটি ঘটনা সাদাত রহমানের দৃষ্টি কাড়ে। সাইবার বুলিং প্রতিরোধে কী করা যায় সে পদক্ষেপে নেমে পড়ে সে এবং তার বন্ধুরা। প্রথমে তার বন্ধুরা মিলে ‘নড়াইল ভলান্টিয়ার্স’ নামে একটি সংগঠন তৈরি করে। তাদের কার্যক্রম প্রশংসিত হওয়ায় বেসরকারি সংস্থা ‘অ্যাকশন এইডে’র ২০১৯ সালের ‘ইয়ুথ ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ’ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়। সেখান থেকে প্রাপ্ত তহবিল দিয়ে তারা ‘সাইবার টিনস’ নামে একটি মোবাইল অ্যাপ তৈরি করে। এই অ্যাপ এর মাধ্যমে কিশোর কিশোরীদের ইন্টারনেটে সুরক্ষিত থাকার এবং হয়রানির শিকার হলে তার প্রতিকার পাবার পরামর্শ দেয়া হয়। পুরস্কার পাবার আগ পর্যন্ত তাদের হিসেবে প্রায় ১৮০০ কিশোর কিশোরী এ অ্যাপ ব্যবহার করেছে। হয়রানির শিকার হওয়া ৬০ জন তাদের সমস্যার সমাধান পেয়েছে এবং ৮ জন অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হয়েছে। সাদাত এবং তার বন্ধুদের এ কার্যক্রম নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।
সাদাতের মতো করে তুমিও তোমার জায়গা থেকে পরিবর্তনের সূচনা করতে পারো। সেজন্য তোমার আগ্রহ এবং উদ্যোগই যথেষ্ট। পরিবর্তনের সূচনা করার জন্য দরকার সমস্যা শনাক্ত করা। সমস্যা কোথায় আছে কেমন আছে সেটি কিভাবে সমাধান করা যায় তা নির্ধারণ করতে পারলেই পরিবর্তন সূচনা করা যায়। সমস্যা খুঁজে বের করার জন্য সাংবাদিকের চোখ দরকার। তোমাকে হতে হবে শিশু সাংবাদিক। সমস্যা খুঁজে বের করে দেখিয়ে দিতে হবে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে। বঙ্গবন্ধুর স্কুলজীবনের একটি ঘটনা তোমরা সবাই হয়তো জানো। গোপালগঞ্জ মথুরানাথ মিশন স্কুলের ছাত্র থাকাকালীন স্কুল পরিদর্শনে আসেন বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা একে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তাদের কাছ থেকে হোস্টেলের ছাদের ফাটল সমস্যার কথা তুলে ধরলেন বঙ্গবন্ধু। জানালেন বর্ষাকালে ছাদের ফাটল দিয়ে পানি পড়ে। ফলে এ সময়ে ছাত্রদের কষ্ট হয়। ছাদ মেরামত করতে কত লাগবে সেই টাকার পরিমাণ জানিয়ে সেই অর্থমঞ্জুর করিয়ে নেন তিনি। তার এই নেতৃত্ব এবং সাহসিকতার প্রশংসা করেন শেরেবাংলা এবং সোহরাওয়ার্দী। সুতরাং সমস্যা কোথায় তা বের করতে হবে, কাকে জানাতে হবে অর্থাৎ উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কে সেটা জানতে হবে এবং সেটার সমাধান কিভাবে হতে পারে সেটিও খুঁজে বের করতে হবে। একজন সাংবাদিক এই সব কাজগুলোই করেন। তাই সাংবাদিককে বলা হয় জাতির বিবেক।
এখন তোমার মনে হতে পারে সারাদিন বাইরে টোঁ টোঁ করে ঘুরে সমস্যা খোঁজাই কি আমার কাজ হবে? নাহ্। এর জন্য আলাদা সময় নিয়ে বাইরে বের হতে হবে না। আশেপাশের ছোট ছোট সমস্যাগুলোর কথাই ভাবো। যেমন ধরো, তোমার বাসার আশেপাশে প্রচুর মশা। হয়তো কাছে কোথা বদ্ধ নালা অথবা ডোবা আছে। সেখানে ময়লার স্তুপ হয়ে মশা জন্মানোর বড় ক্ষেত্র হয়েছে। এই সমস্যার সমাধান কী? মশার জন্মানোর জায়গা ধ্বংস করা। অর্থাৎ ময়লার স্ত‚প পরিস্কার করা। এই কাজ করার সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব হলো সিটি কর্পোরেশন অথবা পৌরসভার। সুতরাং তুমি সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার মেয়র বরাবর ঘটনার বর্ণনা দিয়ে চিঠি লিখতে পারো, অথবা ইমেইল পাঠাতে পারো। এখন অনেক মেয়রের ফেসবুক পেইজ বা আইডি আছে। তাকে সেখানে কমেন্টে বা ইনবক্সে জানাতে পারো। যদি এতে কাজ না হয়, তাহলে তুমি পত্রিকায় লিখতে পারো। কী লিখবে?
যেকোনো সমস্যা বা ঘটনার বর্ণনা দেয়ার জন্য ‘৫টি ক’-এর উত্তর অবশ্যই দিতে হয়। কে, কি, কখন কোথায়, কেন এবং এর সাথে ‘কিভাবে’। তোমার ভাষায় তুমি তোমার সমস্যার বর্ণনা দেবে। যেমন ধরো, তোমার স্কুলের সামনে প্রচÐ গতিতে গাড়ি চলে। এতে করে তোমাদের দুর্ঘটনায় আহত হবার আশংকা আছে। সেক্ষেত্রে তোমার স্কুল কোথায় অবস্থিত তার সুনির্দিষ্ট বর্ণনা দেবে। তারপর কতজন ছাত্রছাত্রী আছে তারা কয়টার সময় স্কুলে আসে, কয়টায় ছুটি হয়, অর্থাৎ কোন সময়টাতে বেশি ভিড় হয় স্কুলের সামনে তার বর্ণনা দেবে। রাস্তায় কোন ধরনের গাড়ি বেশি চলে সেটা লিখবে। ইতোমধ্যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে কি না তা লিখবে। এর সমাধান হতে পারে রাস্তায় স্পিড ব্রেকার দেয়া, রাস্তার পাশে ধীরে চলুন বা গতি কমান এ ধরনের সাইনপোস্ট দেয়া। এই পরামর্শ দিয়ে লিখবে। তাহলে কর্তৃপক্ষ এর সমাধানে এগিয়ে আসবে।
অথবা ধরো, তোমাদের খেলার মাঠে মাদকসেবীদের আড্ডা হয়। তারা তোমাদের খেলায় ব্যাঘাত ঘটায়, এলাকায় মাদকদ্রব্য ছড়ায়। সেটা নিয়ে তুমি পত্রিকায় লিখতে পারো। স্কুলের বাইরে বড় বড় ছেলেরা ইভটিজিং করে, সেটা নিয়ে লিখতে পারো। তোমাদের স্কুলে যাওয়ার পথে সাঁকো আছে। সেটাকে পাকা ব্রিজ বানানো দরকার। সেটা নিয়ে লিখতে পারো। অথবা কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু তোমার এলাকায় এমন কিছু আছে যা অন্যদের জন্য অনুসরণীয়, সেটা নিয়েও লিখতে পারো। যেমন তোমার এলাকায় একটি শিশুপার্ক আছে। সেখানে অনেক সুন্দর পরিবেশ, খেলার রাইড আছে। সেটা লিখতে পারো। তোমার স্কুলে বিজ্ঞানমেলা, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, বই উৎসব হয়েছে। এটা নিয়ে লিখতে পারো। তোমাদের পাড়ায় একটি পাঠাগার আছে যেখানে অনেক ভালো ভালো বই আছে। সেটা নিয়ে লিখতে পারো।

কথা হচ্ছে কোন পত্রিকায় লিখবে আর কিভাবেই বা পাঠাবে। এখন প্রতিটি পত্রিকারই ইমেইল অ্যাডড্রেস থাকে। পত্রিকার সম্পাদক বরাবর লিখতে পারো। পত্রিকার ওয়েবসাইটে গেলেই দেখবে ইমেইল অ্যাডড্রেস দেয়া আছে। ইউনিসেফ এবং বিডিনিউজের উদ্যোগে হ্যালো নামে একটি ওয়েবসাইট আছে যেখানে শিশু সাংবাদিক হিসেবে তুমি তোমার নাম অন্তর্ভুক্ত করতে পারো। হ্যালোর উদ্যোগে শিশু সাংবাদিক প্রশিক্ষণ কোর্সও হয়। সেখানেও অংশ নিতে পারো। হ্যালোর ওয়েবসাইটে কিভাবে সাংবাদিক হতে হবে তার সংক্ষিপ্ত গাইডলাইন দেয়া আছে। সেটি অনুসরণ করে তুমিও তোমার সংবাদকর্ম শুরু করতে পারো। ফুলকুঁড়ির উদ্যোগে শিশু সাংবাদিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আছে। সেগুলো কখন হয় তা খেয়াল রেখো। তাহলে তুমিও সাংবাদিক হতে পারবে।

লিখতে হলে পড়তে হবে এটা তো নিশ্চয়ই জানো। তাহলে অন্য শিশু সাংবাদিকরা কী করছে? কিভাবে লিখছে তা নিয়মিত পড়বে। বড় বড় সাংবাদিকের লেখা পড়বে। সাংবাদিকতা ও লেখালিখির ওপর অনেক বই আছে। সেগুলো সংগ্রহ করে পড়বে। তাহলে তুমি সফল শিশু সাংবাদিক হতে পারবে। সুতরাং আর দেরি কেন? কী নিয়ে লিখবে তা খোঁজা শুরু করো, লেগে পড়ো আজই।