দুষ্টু বক ও চুনোপুঁটি

দিপংকর দাশ

0
183

এক পুকুরে বাস করে অসংখ্য মাগুর, কই, শিং, রুই, কাতলাসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ। এসব মাছের ভিড়ে বাস করে এক চুনোপুঁটি। চুনোপুঁটির একটি পরিবার রয়েছে। তার পরিবারে আটজন সদস্য। মা, বাবা, ভাই, বোন, স্ত্রী ও দুই সন্তান। এই পুকুরে ছিল কয়েকটা রাক্ষুসে মাছ। তাদের সাথে বিরোধিতা করলে এক কামড়ে খেয়ে নেয়। তাই তাদের খোশামোদ করেই থাকতে হয় চুনোপুঁটি ও তার পরিবারকে। এভাবেই চলে যাচ্ছে দিনকাল।

হঠাৎ চুনোপুঁটি একদিন মাগুরের বিয়ের দাওয়াত পায়। সে দাওয়াত রক্ষা করার জন্য একটি উপহার নিয়ে মাগুরের বাড়িতে যায়। খাওয়া দাওয়া শেষে যখন সে তার আস্তানায় ফিরে আসে, ভীষণ অবাক হয় সে। আস্তানায় কেউ নেই! কোথায় গেল সবাই? কোথাও বেড়াতে গেছে নাকি। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর চুনোপুঁটি ভীষণ চিন্তায় পড়ে যায়। এত দেরি হওয়ার তো কথা নয়। তাহলে, কোনো বিপদ হলো না তো! সে বেরিয়ে পড়ে সবাইকে খোঁজার জন্য। সবার আস্তানায় খোঁজ নিয়েও খুঁজে পায়নি। সে ভেঙে পড়ে। এক মলা মাছ এগিয়ে আসে। তাকে সান্ত¡না দিয়ে বলে, তুমি নিজেকে শান্ত করো। তোমার পরিবারের ক্ষতি কে করেছে আমি জানি।
চুনোপুঁটি রাগান্বিত হয়ে বলে, বলো বলো কে করেছে এই ক্ষতি? আমি এখুনি তাকে শাস্তি প্রদান করব।
– তোমার কি পাখা আছে? তুমি ওকে ধরবে কিভাবে?
– মানে? সে কে?
– ওই যে পুকুরের পাশের আমগাছে থাকে এক দুষ্টু বক। সে তোমার পরিবারকে লোভ দেখিয়ে খেয়ে ফেলেছে।
– ওই দুষ্টু বককে তো আমি ছাড়ব না। আমার পরিবারকে হারিয়ে আমি যে কষ্ট পেয়েছি তাকেও সেই কষ্ট পেতে হবে। ওর অপরাধের শাস্তি ওকে পেতেই হবে।
– কিন্তু কিভাবে?
– আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। চলো আমরা কাক বন্ধুর সাহায্য প্রার্থনা করি। যদি সে সাহায্য করে তাহলে দুষ্টু বকের শাস্তি দেওয়া যাবে।
দুজনেই পুকুরের পশ্চিম পাশ ঘেষে কাক বন্ধুকে ডাকতে থাকে। কাক তখন বিশ্রাম নিচ্ছে। ওদের ডাকে সাড়া দিয়ে পাড়ে এসে ডাকার কারণ জানতে চায়। চুনোপুঁটি তার পরিবারের সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের বিচার চায় তার কাছে। কাক বিষয়টি বুঝতে পেরে চুনোপুঁটিকে এই আশ্বাস দেয় যে, তুমি বিচার পাবে আর অবশ্যই সে বিচার কঠোর হবে।

এ কথা বলে কাক বকের বাসায় যায়। বককে বাসায় না পেয়ে সে তার ছানাদের নিয়ে আসে নিজের বাসায়। ছানারা ভীষণ কাঁদছে। কিন্তু কাক তাদের ভয় দেখিয়ে কান্না থামিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পর বক বাসায় ফিরে আসে। এসে দেখে তার ছানারা কোথাও নেই। সে পাগল হয়ে যায়। সে এদিক সেদিক খুঁজতে থাকে। কিন্তু কোথাও খুঁজে পায় না। কাঁদতে কাঁদতে বুক ভাসিয়ে দেয়। কাক এসে তার সামনে দাঁড়ায়। সে জিজ্ঞেস করে কেন কাঁদছো বক?
– আমার ছানাদের খুঁজে পাচ্ছি না। তুমি কী দেখেছো ওদের?
– না তো। আগে একটা কথা বলো, তুমি কী কারো পরিবারের ক্ষতি করেছো?
– না তো।
– ভেবে দেখো। পুকুরের সেই চুনোপুঁটির পরিবারের সবাইকে তুমি খেয়ে ফেলেছো। মনে পড়েছে?
– ওদের খেয়েছি তো কী হয়েছে? ওদের বেঁচে থেকেই কী লাভ?
– এসব কী বলো? প্রত্যেকেরই বেঁচে থাকার অধিকার আছে। তুমি ওদের চেয়ে একটু শক্তিমান বলে কী ওদের ওপর এভাবে অত্যাচার চালাবে? তাহলে তো তোমার চেয়ে যারা শক্তিশালী তারাও তোমার ওপর অত্যাচার করবে। এমন হতে থাকলে কেউই শান্তি পাবে না। তাই দুনিয়ায় অপরাধের বিচারের ব্যবস্থাও রয়েছে। আর তোমাকেও তার আওতায় এনেছি । তোমার শাস্তি হলো, তোমার একটি ডানা কেটে দেবো।
– না না। এমনটা করো না। আমি অন্যায় শিকার করছি। আর আমি কখনো এমন কাজ করব না।। আমাকে ক্ষমা করে দাও।
– অন্যায়ের শাস্তি তো পেতেই হবে। আর হ্যাঁ, তোমার সন্তানদের হারিয়ে তুমি যে কষ্ট পাচ্ছ, ভেবে দেখো চুনোপুঁটির কী অবস্থা! নিজের ওপর পড়লে বুঝা যায় কত ধানে কত চাল।
ভেবো না। আমি তোমার বাচ্চাদের ফিরিয়ে দেবো। আর তোমার ডানা এখুনি কেটে দেবো।

কাকের এ বিচারে চুনোপুঁটির মনে কিছুটা শান্তি অনুভব হলো। সে বিশ্বাস করতে থাকে যে, অন্যায় হলে শাস্তি পেতেই হবে। অপরাধী যতই শক্তিশালীই হোক, তার পতন সুনিশ্চিত।