ডায়েরির পাতা হোক স্মৃতির খাতা

শাকের জামিল

0
73

কথায় আছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালিকণা, বিন্দু বিন্দু জল, গড়ে তোলে মহাদেশ, সাগর অতল। সেকেন্ড সেকেন্ড সময় মিলেই ঘণ্টা, দিন, সপ্তাহ, মাস আর বছর গড়ে ওঠে। এই সময়ের বর্ণনা ধরে রাখতে পারলে তা হয়ে ওঠে স্মৃতি। আর এর মাধ্যম হলো ডায়েরি লেখা।
পৃথিবীতে যত বিখ্যাত ব্যক্তি আছেন তাদের প্রায় সবারই স্মৃতি রচনা আছে। তাদের স্মৃতিগুলো তারা লিখে রেখেছেন সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন ঘটনার সাথে মিলিয়ে। অনেক ক্ষেত্রে স্মৃতির টুকরোগুলোই অমর সাহিত্য হয়ে উঠেছে। একটি ডায়েরিই হয়ে উঠেছে বিশ^ সাহিত্যের অমরকীর্তি। যেমন ধরা যায়Ñ আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি। একটি কিশোরীর দিনলিপি, টুকরো টুকরো স্মৃতি, অভিজ্ঞতা, আশংকার ধারাবাহিক বর্ণনা সারা পৃথিবীর পাঠকদের নাড়া দিয়েছে। সবাই সেই কিশোরীর ডায়েরি পড়লেই দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের দিনগুলোতে পরিভ্রমণ করে আসে কিছুক্ষণের জন্য। সেই দুঃসহ দিন পার করেছে অনেক কিশোর কিশোরী, প্রাপ্তবয়স্ক এবং অনেক শিক্ষিত মানুষও পার করেছে তাদের জীবন। কিন্তু তাদের দিনগুলো মানুষের মাঝে বেঁচে নেই, হারিয়ে গেছে বিস্মৃতির অতলে। আনা ফ্রাঙ্কের নাম আমরা এখনো জানি একারণেই যে সে ডায়েরিতে প্রতিদিনের স্মৃতিগুলো, অনুভ‚তিগুলো লিখে রাখতো। আজ থেকে প্রায় আশি বছর আগের লেখা সেই ঘটনাগুলো আমরা এখনো পড়ি, শিহরিত হই, আনা ফ্রাঙ্ককে স্মরণ করি।
দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের সময় যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন স্যার উইনস্টন চার্চিল। তিনি ছিলেন অসাধারণ লেখক এবং তুখোড় বক্তা। তিনি প্রতিদিনকার কাজগুলো ডায়েরিতে টুকে রাখতেন। এসব স্মৃতির সঙ্কলন করে তিনি বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। যার মধ্যে আছেÑ গু বধৎষু ষরভব, ঞযব জরাবৎ ডধৎ, ওধহ ঐধসরষঃড়হ’ং গধৎপয, খড়হফড়হ ঃড় খধফুংসরঃয ারধ চৎবঃড়ৎরধ, ঞযব ঝবপড়হফ ডড়ৎষফ ডধৎ ইত্যাদি। এছাড়া তিনি তাঁর পূর্বপূরুষকে স্মরণ করেও কিছু বই লিখেছেন যেমনÑ গধৎষনড়ৎড়ঁময: ঐরং ষরভব ধহফ ঃরসবং, খড়ৎফ জধহফড়ষঢ়য ঈযঁৎপযরষষ. এগুলো সবই হচ্ছে স্মৃতির সঙ্কলন। আর এই সঙ্কলনগুলো গড়ে ওঠে দিনলিপি বা ডায়েরি লেখার মধ্য দিয়ে। চার্চিলের এইসব স্মৃতির সঙ্কলন যুক্তরাজ্যের ইতিহাস এবং বিশ^যুদ্ধের ইতিহাসের অসামান্য দলিল হয়ে উঠেছে। ইতিহাসভিত্তিক সাহিত্যে তাঁর এই অবদানের জন্য ১৯৫৩ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর ব্যক্তিজীবন এবং রাজনৈতিক জীবন নিয়ে অনেক মতপার্থক্য থাকতে পারে কিন্তু তাঁর সাহিত্য বা লেখালিখির প্রশংসা করতেই হবে। সাংবাদিক পল জনসন তাঁর ব্যাপারে বলেছেন যে চার্চিল প্রায় চল্লিশটি বই এবং হাজারের বেশি নিবন্ধ লিখেছেন। প্রতিদিনের লেখালিখির ফলেই তাঁর এত সমৃদ্ধ রচনা তৈরী হয়েছে। সুতরাং বুঝতেই পারছো যে ডায়েরি লেখা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আসি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দুটি বই প্রকাশিত হয়েছে। একটি হলো অসমাপ্ত আত্মজীবনী, আরেকটি কারাগারের রোজনামচা। দুটি বইয়ের ভিত্তিই হলো স্মৃতি লেখা। কারাগারে বসে তিনি তাঁর শৈশব, কৈশোর, শিক্ষাজীবন এবং রাজনৈতিক জীবন নিয়ে লিখেছেন। তাঁর লেখা স্মৃতি এখন বাংলাদেশের ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ। বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ তরুণ বয়সে নিয়মিত ডায়েরি লিখতেন। ১৯৪৬-১৯৫৬ সাল পর্যন্ত তার ডায়েরি ছিল বলে জানা যায়। ১৯৪৬-১৯৫২ সাল পর্যন্ত তাঁর লেখা ডায়েরির সংকলন ৪টি খন্ডে বই হয়ে বেরিয়েছে। সেসময়কার ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য দলিল এই বই, যা শুধু ডায়েরির পাতা থেকেই তৈরী হয়েছে।
মাদাম মারি কুরির নাম তো অবশ্যই শুনেছ। দুইবার তিনি নোবেল পুরস্কার জিতেছেন। রেডিয়াম এবং পোলোনিয়াম আবিস্কারের সাথে যুক্ত থাকায় তিনি নোবেল জিতেন। মারি কুরি তার গবেষণার কিছু দিক লিখে রেখেছেন তার ডায়েরিতে। সেই ডায়েরি এখনো সংরক্ষিত আছে ফ্রান্সের প্যারিসের জাদুঘরে। লিওনার্দো দা ভিঞ্চিও ডায়েরি লিখতেন। তার লেখা ডায়েরিও সংরক্ষিত আছে বিভিন্ন মিউজিয়ামে।
কবি-সাহিত্যিকদের নিয়মিত চর্চার মধ্যে ডায়েরি লেখা অন্যতম। এর কারণ হলো ডায়েরি লিখলে লেখার হাত চালু থাকে। সাহিত্যজগতে একটি টার্ম আছে- রাইটার্স বøক। এর মানে হলো লেখার জড়তা। যখন লেখক লিখতে চাচ্ছেন কিন্তু তার লেখা আসছে না, তার ভাব প্রকাশ করতে পারছেন না। এমন সমস্যা সমাধান করা কঠিন হয়ে যায়। তাই লেখকদের নিয়মিত কিছু না কিছু লিখতে হয়। একবার জড়তা এসে গেলে আবার লেখার গতি এবং সমৃদ্ধি আনা কঠিন কাজ।
এখন কথা হলো ডায়েরি লিখে কী লাভ? তুমি কি বিখ্যাত কেউ হতে পারবে? বা তোমার লেখার মধ্যে এমন গুরুত্বপূর্ণ কী থাকবে যা পরবর্তী মানুষের পড়ার বস্তু হয়ে দাড়াবে? অথবা কেউ না পড়–ক, লিখলে তোমার কী কাজে লাগবে ? প্রথম কথা হলো ডায়েরি লিখলে তোমার দৈনন্দিন কাজের একটি রেকর্ড দাড়াবে। প্রতিদিন তোমার নতুন কিছু করতে ইচ্ছে হবে। প্রতিদিন নতুন অনুভ‚তি জাগবে। এক সপ্তাহ বা এক মাস পর তোমার ডায়েরি পড়লে তুমিই মজা পাবে। এক বছর পর পড়লে আরো বেশি মজা লাগবে।
ডায়েরিতে তুমি আসলে কী লিখবে? সহজ উত্তর হলোÑ যা ইচ্ছে করে, তা-ই লিখবে। যদি লিখতে ইচ্ছে না করে, তাহলে আঁকিবুকি করবে। তবুও ডায়েরির পেছনে প্রতিদিন কিছু সময় দিবে। কোন তারিখে কী কাজ আছে, কোন অনুষ্ঠান আছে সেটা সেই তারিখে উল্লেখ করে রাখো। সারাদিনে লেখার মতো কিছু ঘটেনি? তাহলে আজকে তোমার মন কেমন, সেটা লেখো। অথবা নতুন কিছু নিয়ে তোমার ভাবনা লেখো। অথবা তোমার কোনো বন্ধু, শিক্ষক, আত্মীয়, চাচাতো, মামাতো ভাই-বোনকে নিয়ে লেখো। প্রতিবেশী বা ঘরের দারোয়ানকে নিয়ে লেখো। স্কুলের পিয়ন, কেরানি, স্কুল বাসের ড্রাইভার, বাইরের মুড়িওয়ালা, লাইব্রেরির দোকানদার, চটপটি বিক্রেতাকে নিয়ে লেখো। খেলার মাঠ নিয়ে লেখো। বাসা থেকে স্কুল পর্যন্ত রাস্তার বর্ণনা লেখো। তোমার বাসার ছাদ থেকে শহরটাকে কেমন দেখা যায়? সেই বর্ণনা লেখো। তোমার বাসায় যদি বিড়াল থাকে সেটাকে নিয়ে লেখো। বারান্দার ফুলের গাছ নিয়ে লেখো। বাবা মা নতুন কিছু কিনে দিয়েছে? মজার কোনো খাবার এনেছে? সেটা নিয়ে লেখো। কোথাও বেড়াতে গেছো? তা নিয়ে লেখো। নতুন কোনো বই পড়েছো? গেমস খেলেছো? সেটা নিয়ে লেখো। আজকে মসজিদে গিয়ে কেমন লেগেছে? সেটা লেখো। বাসায় আব্বু আম্মু কী বিষয়ে আলাপ করলো, সেটাও লিখে রাখতে পারো। ছোট ভাই-বোন দুষ্টুমি করে কী করেছে, তা লিখে রাখো। বড় ভাই-বোন তোমাকে আদর করে কী খেতে দিয়েছে বা উপহার দিয়েছে বা কী করতে বলেছে তা লিখে রাখো। স্কুলে কোন অনুষ্ঠান, মেলা, প্রতিযোগিতা চলছে? কী হয়েছে? কারা অংশগ্রহণ করলো? অতিথি হিসেবে কারা এসেছেন তা লিখে রাখো। স্কুলে যাবার পথে একটা ভিক্ষুক ভিক্ষা করে, তার সম্পর্কে লেখো। এসব কোনো কিছুই লেখার নেই? তাহলে দুই লাইনের ছন্দ মিলিয়ে ছড়া-কবিতা লেখো। কারো বলা উপদেশবাক্য বা কোনো ভালোলাগার কথা লিখে রাখো। কেউ তোমাকে খুব কষ্ট দিয়েছে বা কোনো কারণে তোমার মন খুব খারাপ আছে? খুব অভিমান করে আছে, কাউকে বলতে পারছো না? সেটা বিস্তারিত লিখে রাখো। দেখবে লিখে ফেললে কষ্ট কিছুটা কমে যাবে। এভাবে লিখতে লিখতে একটা সময় তোমার লেখায় সমৃদ্ধি আসবে। লেখার জন্য অনেক উপকরণ পাবে তখন।

আরেকটি কথা, ডায়েরি হলো একটা ব্যক্তিগত বিষয়। নিজে অন্যের ডায়েরি তার অনুমুতি ছাড়া পড়বে না। আবার তোমার ডায়েরিও সযতনে সংরক্ষণ করবে যাতে যে কেউ তোমার অজান্তে সেটি নিয়ে যেতে না পারে।
সুতরাং আর দেরি না করে একটি ডায়েরি সংগ্রহ করো। আজই লেখা শুরু করো দিনলিপি। প্রতিদিনের স্মৃতি মিলে তোমার সংগ্রহ বাড়তে থাকুক। এক বছর পর এই ডায়েরি তোমার অতি প্রিয় একটি বিষয় হয়ে উঠবে।