ঘুড়ি উৎসব জমে উঠেছে

0
41

বিজয় মাসে নানা ধরনের উৎসবের কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ ঘুড়ি উৎসবের কথা মনে পড়ে গেল। ঘুড়ি উৎসব হয় সাধারণত জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝিতে। আর এ মাসটা যেহেতু বছরের প্রথম মাস তাহলে তো আনন্দ উৎসবের কথা বলা যেতেই পারে। মাত্র বিজয়ের মাস শেষ হলো। তাতে আমরা অনেক আনন্দ ও উৎসব করেছি। মহামারী করোনা আমাদের উৎসব ও আনন্দকে ব্যহত করতে পারেনি। শহরে অথবা হাটে-মাঠে-ঘাটে যেখানেই গিয়েছি সেখানে গণমানুষকে কাজের মাঝে বা উৎসাহ ও উদ্দীপনার মাঝে জীবন অতিবাহিত করতে দেখেছি। সেখানেই শুনেছি এবারো ঘুড়ি উৎসব হবে।

সামনে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। অর্থাৎ আমাদের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি হবে মার্চ মাসের ২৬ তারিখে। এর মাঝে আমরা দুঃখ-কষ্ট বিষাদের মধ্যে কাটাতে চাই না। আমরা আনন্দের মাঝে জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে চাই।

ঠিক আছে। এ মুহূর্তে আমরা ঘুড়ি উৎসব নিয়ে কথা বলি। সবাই মিলে যেন ঘুড়ি উৎসবের আয়োজন করতে পারি এসো সেদিকেই আমরা এখন মনোযোগ দেই।
তোমাদের মতো বড় হয়ে জেনেছি এই ঘুড়ির নাম ঘুড়ি। খুব মজার খেলা এটা। প্রথম খেলেছি ১৯৫৭ সালে বিরাট এক মাঠে। যাদের বড় বড় বাড়ি ছিল, তাদের কেউ কেউ ছাদে খেলা খেলতো। পরের বছর ছাদে ঘুড়ি উড়াতে গিয়ে ছাদ থেকে নিচে পড়ে গিয়েছিল একজন। সে অনেকদিন হাসপাতালে ভর্তি ছিল। এ নিয়ে শহরে বেশ আলোচনাও হয়েছিল। যার কারণে মহকুমা অফিসার ছাদে ঘুড়ি ওড়ানো নিষেধ করে দিয়েছিলেন। আবার সুতা কাটা ঘুড়ি ধরতে গিয়ে ঠাকুরগাঁও প্রাইমারি স্কুলের আরেকজন ছাত্র ট্রাকের ধাক্কায় আহতও হয়েছিল।
এই ঘটনাটা ঘটে টাঙ্গন নদীর পাশের হাঁড়িপাড়ায়। এটা মজার খেলা হলেও এ খেলায় কিছুটা রিস্ক-ও আছে। বিশেষ করে সুতা কাটা ওই ঘুড়ি সংগ্রহের সময়। বাতাস বেশি থাকলে ঘুড়িটা কোথায় গিয়ে নোঙর করবে কেউ জানে না। সাধারণত শিশুকিশোররা কোনো বাঁধ মানে না।
বিভিন্ন দিক থেকে ওরা দৌড়াতে থাকে। দৌড়ানোর সময় রাস্তাঘাট, বনবাদার, কোনো কিছুকেই তারা ভ্রুক্ষেপ করে না। পৌষ মাসের শেষে উত্তরবঙ্গে তো প্রচণ্ড শীত থাকে। শীতে ঠাণ্ডা লেগে শিশুরা অসুস্থ হয়ে যেতে পারে। একারণে আব্বা এই খেলায় বেশিক্ষণ আমাদের থাকতে দিতেন না।

ও ভুলেই তো গেলাম। গুড্ডি বা ঘুড়িটি কিভাবে বানানো হয় তা তো তোমাদের বললাম না। পৌষ মাসের শেষের দিকে বিভিন্ন দোকানে ঘুড়ি পাওয়া যেত। রঙিন কাগজের সাথে থাকত বাঁশের কঞ্চি। আঠা দিয়ে বা স্কচটেপ দিয়ে ঘুড়িটা বানানো হতো। ঘুড়ির সঙ্গে সংযুক্ত করা হতো সুতায় লাটাই। ঘুড়িটা শুন্যে ছেড়ে দিয়ে লাটাই থেকে সুতা ছেড়ে দিতে হয়। বাতাসের মধ্যে হেলেদুলে ঘুড়িটা আকাশের দিকে চলে যায়। অনেকটা ছিপ দিয়ে মাছ ধরার মতো। ছিপের গোড়াতে থাকে সুতা। আগায় থাকে মাছ ধরার জন্য খাবারসহ ধারালো বাঁকানো আংটা। ছিপের কাজ হলো মাছ ধরা। আর ঘুড়ির কাজ হলো অন্য ঘুড়ির সুতা কাটা। যে ঘুড়ি অন্য ঘুড়ির সুতা কাটবে সেই ঘুড়ি বিজয় লাভ করবে। এর মধ্যেও আবার কিছু নিয়মকানুন আছে। সবটা এখন আর আমার মনে নেই। যারা ঘুড়ি কাটবে তারাই যে কাটা ঘুড়ির মালিক এমনও নয়। যে কাটা ঘুড়ি পাবে সে তো ঘুড়িটা নিয়েই যাবে। সবাইকে তো আর নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভবও হয় না। এখানে আমরা দেখছি যে বিজয়টা দুজনের বা দু’গ্রুপের। সে যা-ই হোক, আসল বিজয় তো যে বা যারা ঘুড়িটা কাটলো।
এখানে এসেই বাংলাদেশের বিজয়ের আরেকটা বড় বা মহৎ কথা আমার মনে পড়ে গেল। যেমনÑ স্বাধীনতার জন্য যারা যুদ্ধ করেছেন। তাদের কিছু অংশ তো সাথে সাথেই হতাহত কিংবা শহীদ হয়েছেন। কিন্তু স্বাধীনতার সুফল আমরা যারা যুদ্ধ করিনি তারাই বেশি ভোগ করছি। যে ঘুড়িটা কাটলো সে হয়তো ঘুড়িটা পেল না, পেল আরেকজন। যুদ্ধ করল একজন ফল পেল আরেকজন। যে অধ্যাবসায় করবে, পরিশ্রম করবে, সাধনা করবে, জীবনপণ চেষ্টা করবে সেই যে সুফল বা এর ফলাফল ভোগ করবে এমনটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয় না। ফলটা ভোগ করে ক্ষেত্রবিশেষে মানুষ ও পশুপাখি। যেমন একটা আমগাছ কেউ লাগাল সে-ই শুধু আমটা খায় না। মানুষ আর পশুপাখিরা সেই গাছের আমও খায়।

ছোটবেলায় আমাদের বাসার সামনেই পৌষ মাসের শেষের দিকে বড় ভাইয়ের সঙ্গে আমরা যখন ঘুড়ি উড়াই তখন সাথে ছিল আমার ছোট দুইবোন নীলু ও বুলু, যারা এখন অতি বয়স্কা। আমার তখন বয়স ছিল মাত্র ৯-১০ বছর। বড় ভাইয়ের বয়স ছিল ১৫-১৬ বছর। কী কারণে জানি না ঘুড়িটা শাঁ শাঁ করে আকাশের দিকে উড়ছিল। ছোটবোন নিলু বলে উঠল গুড্ডিটা কি আল্লাহর কাছে যায়? আমিও খেয়াল করলাম তাই তো! আমার মনে আছে তখন আমি জানতাম ওই আকাশের ওপরেই থাকেন মহান আল্লাহ। হয়তো তার কাছে ছুটে যাচ্ছে আমাদের ঘুড়িটা। তবে কি আল্লাহ ঘুড়িটাকে ডাকছেন। আগে জানলে তো ওখানে কিছু লিখে দিতাম। ভাইকে বললাম। ভাই মজা করে বললেনÑ কী লিখতে? খুব বেশি হলে জানাতাম আল্লাহ আমাকে এক বস্তা লজেন্স দাও। আমি এক ঘণ্টায় সব খেয়ে ফেলি। এখন মনে পড়ছে ভাই জানতেন আমি লজেন্স বা লেমনচুষ মুখে অনেকক্ষণ ধরে রাখতে পারি না। কড়মড় করে খেয়ে ফেলি। এসব কথা আর চিন্তার মধ্যেই কে যেন আমাদের ঘুড়ির সুতাটা কেটে দিলো। সেই ঘুড়িটার আর আল্লাহর কাছে যাওয়া হলো না!

যখন কলেজে পড়ি, তখন কথাসাহিত্যিক শাহেদ আলীর আল্লাহর কাছে ঘুড়ি যাওয়া সংক্রান্ত একটি মহান গল্প পড়ি। এ গল্পটি আমাকে যেমন আনন্দ দিয়েছে তেমনি বিস্বাদও দিয়েছে। বড় হলে তোমরাও ওই গল্পটি পড়ে নেবে।
মূলত ঘুড়ি উৎসব ছিল পাড়ামহল্লায় গ্রামবাংলার একটি চিরায়ত লোকজ সংস্কৃতি। গ্রামবাংলায় যেসব প্রতিযোগিতা হতো তার মধ্যে অন্যতম ছিল ঘুড়ি উৎসব। এক সময় শরৎ, হেমন্তে বিকেলের আকাশ ছেয়ে যেত ঘুড়িতে। লাল, নীল, সবুজ, হলুদ, বেগুনি কত রঙের ঘুড়িতে আকাশ ছেয়ে যেত। দেখে মনে হতো, নানা রঙের মেলা বসেছে আকাশজুড়ে। গ্রামের প্রতি পাড়ামহল্লার লোকজন জেগে থাকত। গ্রামের কিশোরদের সঙ্গে এ উৎসবে যুব, বৃদ্ধরাও যোগ দিতেন। ঘুড়ি উড়ানোর উৎসব ছিল গ্রামীণ মানুষের জীবনে এক অফুরন্ত আনন্দের উৎসব, যা এখন প্রায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
ঢাকায় এসেছি ১৯৬৯ সালে। পুরনো ঢাকায় বসবাস করতাম। ১৯৬৯ ও ১৯৭০ সালে পৌষ মাসের শেষ দিন ঘুড়ি উড়ানোর বিশাল আয়োজন দেখেছি। অধিকাংশ ঘুড়িই উড়তো ছাদের ওপর থেকে। ছোটকালের কথা মনে পড়তো। ঘুড়ি উড়াতে গিয়ে যদি ওরা ছাদ থেকে পড়ে যায়! পুরনো ঢাকার হাটে-মাঠে-ঘাটে সবখানে ঘুড়ি উড়ানো হতো। এখনো হয়।

মজার ব্যাপার কী জানো? বিশ্বজুড়েই এই ঘুড়ি উৎসব আছে। তবে সব জায়গায় ঘুড়ির উপাদান একরকম নয়। নানা আকার ও প্রকৃতির ঘুড়ি আছে। তবে যেসব দেশে এটা উৎসব বলে বিবেচিত তার মধ্যেÑ বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তÍান রয়েছে। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে ঘুড়ির বিভিন্ন নাম আছে। বাংলাদেশে যেসব নাম প্রচলন আছে তার মধ্যেÑ চারকোণা আকৃতির বাংলা ঘুড়ি, বক্স ঘুড়ি, মৌচাক ঘুড়ি, কামরাঙা ঘুড়ি, চরকি লেজ ঘুড়ি, পাল তোলা জাহাজ ঘুড়ি এবং জাতীয় পতাকা আকৃতির ঘুড়ি ইত্যাদি।

ধারণা করা হয়, দুই হাজার আটশত বছর আগে চীন দেশে ঘুড়ির সর্বপ্রথম উৎপত্তি হয়। পরবর্তীকালে এটি এই উপমহাদেশসহ জাপান ও কোরিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া প্রায় ষোলোশত বছর আগে ইউরোপে এ খেলার প্রচলন শুরু হয়। প্রথম দিকে ঘুড়িতে ব্যবহৃত হতো রঙিন কাগজ, সিল্কের কাপড়, বাঁশের কঞ্চি ও নরম কাঠ ইত্যাদি। এখন অবশ্য সিনথেটিক জাতীয় পদার্থের প্রচলন ঘটেছে ঘুড়িতে।
২০১১ সালে অনুষ্ঠিত ব্রিস্টল ঘুড়ি উৎসব শেষে সবচেয়ে বড় ঘুড়িটি প্রায় ২০ মিনিট আকাশে অবস্থান করে। এটি ভূমির প্রায় ১১ হাজার বর্গফুট জায়গা দখল করেছিল।

মহামারী ভাইরাস বাঙালিকে এখনো পুরোপুরি কাবু করতে পারেনি বলেই মনে হয়। তার প্রমাণ মিলে গ্রামাঞ্চলে আকাশে তাকালে। আধুনিক সভ্যতার কল্যাণে তরুণদের এক বিরাট অংশ যেখানে স্মার্টফোন, ফেসবুক, কম্পিউটার গেমসে ব্যস্ত থাকত তারা এখন ব্যস্ত ঘুড়ি তৈরিতে। প্রতিযোগিতা হচ্ছে কে কত বড় ঘুড়ি উড়াতে পারে। কেউ একটি করে ঘুড়ি, কেউ একাধিক ঘুড়ি উড়াচ্ছে। আবার ঘুড়ি তৈরিতেও আছে বৈচিত্র্য। কেউ পলিথিন, কেউবা ঘুড়ি তৈরি করছে কাগজ দিয়ে। পলিথিনের ঘুড়ির ক্ষেত্রে তাতে দেওয়া হচ্ছে নানান আকার। আবার কাগজের ঘুড়ি তৈরিতে অনেকেই ব্যবহার করছেন রঙিন কাগজ। কেউ তাতে আবার যুক্ত করছে নকশা।
স্কুল বন্ধ থাকায় শিশুকিশোররা মেতে উঠেছে ঘুড়ির এ উৎসবে। রাতে ঘুড়ি উড়ানোর জন্য ঘুড়িতে যুক্ত করেছে ব্যাটারি চালিত বাতি, যা রাতে উড়ানো ঘুড়িতে জ্বলছে। বড়দের কেউ কেউ ঘুড়ি বানাতে পারলেও শিশুকিশোররা বেশিরভাগই ঘুড়ি কিনে ওড়ায়। আবার যাদের ঘুড়ি উড়ানোর সুযোগ নেই তারা দূর থেকেই অন্যের ঘুড়ি উড়ানো দেখে আনন্দ উপভোগ করছে। ঘুড়ি উৎসবকে কেন্দ্র করে বিক্রি হচ্ছে ঘুড়ি তৈরি করার উপকরণও।

সুতরাং আমাদের এখন উচিত হাজার বছরের সেই গৌরবকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা। আমরা যদি এসব গ্রামীণ উৎসব বা সংস্কৃতি রক্ষা করতে পারি তাহলে প্রাণ ফিরে পাবে আমাদের এই লোকজ সংস্কৃতি।
এবার এই মাসে সবাই ঘুড়ি ওড়াবে বা উৎসবে অংশ নেবে এটাই কামনা।